Categories
অনলাইন প্রকাশনা খ্রীষ্টধর্মীয় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

খ্রিস্টমাসের খোশখবর

–গৌরী মিত্র

বাইবেলে লেখা নেই যিশুর জন্মদিন কবে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের যাজকরা যিশুর জন্মদিন হিসেবে পঁচিশে ডিসেম্বরকে নির্দিষ্ট করেছিলেন। জন্মদিনপালন, উৎসব আয়োজন শুরু হয়েছিল চতুর্থ শতকের আগে নয়। রোমান জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ছিল ‘স্যাটারনালিয়া’ উৎসবের আয়োজন। স্যাটার্ন মানে কৃষির অধিদেবতার পুজো। উৎসব শুরু হত সতেরোই ডিসেম্বর, চলত সাত দিন। এর সঙ্গেই রোমানরা জুড়ে দিয়েছিল খ্রিস্টমাস— পঁচিশে ডিসেম্বরে।

খ্রিস্টধর্মীয়দের মধ্যে এই উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে যায় পয়লা ডিসেম্বর থেকেই এখন। পঁচিশে ডিসেম্বর— যিশুর জন্মদিনের বারো দিন পরে আসে ‘এপিথ্যানি’। যিশুর দীক্ষা নেওয়ার দিন। সদ্যোজাত যিশুর জন্য উপহার এনেছিলেন তিন জন মহাজ্ঞানী পুরুষ এই দিন। এই সব স্মরণের উৎসব হল টুয়েলফথ নাইট বা এপিফ্যানি। যিশুর জন্মস্থান জেরুজালেমের ‘চার্চ অব নেটিভিটি’তে খ্রিস্টমাস উৎসব পালিত হয় সাড়ম্বরেই। ক্যাথলিকদের উদযাপিত উৎসবে যিশুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু আদি ধর্মনির্ভর কানুন। প্রোটেস্ট্যান্টরা যিশুকেই স্মরণে রেখে চার্চে বাতি জ্বালায়, প্রার্থনা করে, গান গায়। ফ্রান্স, ইটালি, গ্রিস, স্পেন, জার্মান, চিন, জাপান— সর্বত্র এখন খ্রিস্টমাসের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে দেশীয় কিছু প্রথাও। মেক্সিকোয় এ উৎসব উপলক্ষে ‘লস পাসটোরেস’ অর্থাৎ ‘দ্য শেফার্ডস’ নামক নাট্যানুষ্ঠানটি অভিনব।

 

খ্রিস্টমাস উপলক্ষে কেক, পেসট্রি খাওয়া, উপহার বিনিময়, খ্রিস্টমাস কার্ড মানে শুভেচ্ছাপত্র প্রেরণ— এ সব শুরু হয়েছে উনিশ শতকে। ১৮৪৩ সালে এক ইংরেজ আর্টিস্ট জন ক্যালট হার্সলে প্রথম বানিয়েছিলেন খ্রিস্টমাস কার্ড। তাতে লেখা হয়েছিল— এ মেরি খ্রিস্টমাস অ্যাণ্ড এ হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ। খ্রিস্টমাস ট্রি, ‘সাইলেন্ট নাইট, হোলি নাইট’ ক্যারল— এ সব এসেছিল জার্মানদের সৌজন্যে।

খ্রিস্টধর্মী জার্মান যাজক উইনফ্রেড এক গভীর বনে দেখেছিলেন— এক ওক গাছে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এক বালক। বৃষ্টি, বজ্রের দেবতা থরের পায়ে বলি দেওয়ার জন্য বালককে বেঁধে রাখা হয়েছিল। উইনফ্রেড সে ওক গাছ সমূলে উৎপাটিত করলে সেখানে গজিয়ে উঠেছিল এক সুদৃশ্য ফার গাছ— দি ট্রি অব লাইফ। জার্মান ধর্মসংস্কারক মার্টিন লুথার জ্যোৎস্নারাতে অপরূপ সুন্দর হয়ে থাকতে দেখেছিলেন এক ডুমুর গাছকে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন— এটি হল খ্রিস্টমাস ট্রি, চিরসবুজ— সিম্বল অব লাইফ। উর্বরতার প্রতীক।

সান্টাক্লস ছাড়া খ্রিস্টমাস জমে? সান্টাক্লস কোনও কাল্পনিক চরিত্র নয়। চতুর্থ শতকে নিকোলাস নামে এক ব্যক্তি জন্মেছিলেন তুরস্কে। রোমান দেবতা ভায়ানার বেদিতে তিনি মাথা নোয়াননি বলে রোমান সম্রাট ভায়োক্লিসিয়ান তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তী রোমান সম্রাটের দয়ায় নিকোলাস মুক্ত হয়েছিলেন। তুরস্কের মাইরা শহরের একটি চার্চে বিশপ পদে থাকার সময়ে তিনি ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন অপরাধীদের খোঁজে। দুঃখী-দরিদ্রদের খোঁজে। অপরাধীদের তিনি দণ্ড দিতেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষেরা তাঁর কাছ থেকে পেত অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র। সেন্ট নিকোলাস মারা গিয়েছিলেন ৬ ডিসেম্বর। অনেক দেশেই এই ৬ ডিসেম্বর নিকোলাসকে মনে রেখেই ছোটদের উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সেন্ট নিকোলাস ইউরোপের বিভিন্ন জনজীবনে বিভিন্ন নাম পেয়েছেন: ক্রিস ক্রিঞ্‌টল, সিন্টার ক্লাস, কোথাও পেরে নোয়েল, পাপাই নোয়েল। রাশিয়ায় গ্রাণ্ড ফাদার ফ্রস্ট, ইটালিতে লা বাফানা। লা বাফানা এক যাদুকর যিনি ঝাঁটায় চড়ে ঘুরে বেড়ান আর ছোটদের উপহার দেন এপিফ্যানিতে। আসলে দেশের উপকথা, লোককথা অনুসারে চরিত্রটি পেয়েছে বিশেষত্ব। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কে ‘সেইন্ট লুসিয়া’— আসোর রানিই উপহারদাতা। উত্তর গোলার্ধের মানুষেরা লুসিয়াকে শ্রদ্ধা করে, তাঁর কল্যাণে ছ’মাস রাতের জীবনে পথ হারায় না মানুষ। লাল টুকটুকে জামা গায়ে, মুখ ভর্তি লম্বা সাদা দাড়ি, পিঠে উপহারের থলি — সান্টাক্লস বলতে এখন সবাই একেই চেনে। এমন বিশ্বজনীন রূপ কী করে হল? ইউরোপের মানুষরা যখন আমেরিকায় গিয়েছিল তখন তাদের সঙ্গে এসেছিল খ্রিস্টমাস, আর সেই সঙ্গে সিন্টার ক্লাস নামক উপহারদাতাও।

১৮২৬ সালে নিউ ইয়র্কের এক পত্রিকায় ক্লিমেন্ট ক্লার্ক মুর লিখেছিলেন একটি কবিতা— এ ভিজিট ফ্রম সেইন্ট নিকোলাস। সেটি পড়ে বিশিষ্ট আর্টিস্ট টমাস নাস্ট এঁকেছিলেন নিকোলাসের মনকাড়া অনেক ছবি। সেই ছবির সিন্টার ক্লাস অর্থাৎ সান্টা ক্লসই অনবদ্য হয়ে রইল।

উত্তর গোলার্ধ, দক্ষিণ গোলার্ধ— দু জায়গায় খ্রিস্টমাসের আয়োজন দু রকমের। উত্তরে ডিসেম্বরে অনেক জায়গায় বরফে ঢেকে যায়। গাছপালায় তুষার! খ্রিস্টমাস মানেই ‘হোয়াইট খ্রিস্টমাস’। আর দক্ষিণের দেশগুলোয়? এ সময় গ্রীষ্মকাল। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সবাই আতসবাজি পোড়ায়, রাতের তারা দেখে। সমুদ্রের ধারে নাচগান করে।

‘খ্রিস্টমাস বক্স’, না হলে উৎসব ব্যর্থ। যিশু দরিদ্রের দুঃখমোচন করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপ, আমেরিকায় সব শহরে, পথের মোড়ে সাজানো থাকে বাক্স। বাক্সের গায়ে লেখা থাকে— ‘হেল্প পুয়োর’ অথবা ‘শেয়ার ইয়োর জয়েস উইথ আদারস’। বাক্সয় দরিদ্র বন্ধুর জন্য কিছু দিলে খ্রিস্টমাসের উৎসব পূর্ণাঙ্গ হয়। যিশুও খুশি হন।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ পৌষ ১৪০৯ রবিবার ২২ ডিসেম্বর ২০০২

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.