Categories
অনলাইন প্রকাশনা

জমিদার বাড়ীর অভিশাপ (ভুতের গল্প) – পর্ব ২

জমিদার বাড়ীর অভিশাপ (ভুতের গল্প) – পর্ব ২
———————————— রমিত আজাদ

অশিরীরিদের ধারণা আব্রাহামীক ধর্মগুলোতে রয়েছে, তেমনি রয়েছে বুদ্ধিজম-এও। কেন? আবারো সেই কথা চলে আসে, রহস্যময় প্রকৃতির কতটুকুই বা আমরা জানি???

সন্ধ্যার আগে আগে বলা গ্রাম্য বুড়ির কথাটিতে আমাদের সকলের গা ছম ছম করছিলো, অস্বস্তি কিছুতেই কাটছিলো না। আমরা তিনজনই বসে ছিলাম, দোতলার একটি বেডরূমে। দোতলায় তিনটি কামড়া। নীচতলায় কামড়ার সংখ্যা বেশী, পাঁচটার মত হবে। জমিদার বাড়ীর পিছনে কিছুটা জায়গা খালি, তারপর একটা পুকুর, ঐ পুকুরেই আজ গোছল করছিলো সদ্য প্রস্ফুটিত তরুণীরা। তার পিছনে বিস্তির্ণ ধানক্ষেত, তার পিছনে নদী। শুনেছি আগে ঐ নদী পথেই চলাচল হতো। নদীতে ছিলো ঘাট, সেই ঘাটে বাধা থাকতো জমিদারের নৌকা। তবে জমিদার বাড়ীর সীমানা আর ধানক্ষেতের বর্ডার লাইনে একটা বড় টাওয়ার টাইপ উঁচু স্থাপনা দেখা গেলো। আমি আসিফ-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ওটা কি? সে বলেছিলো, “ওটা মুকুট”। আমি বললাম, “কি মুকুট কি?” ও উত্তর দিয়েছিলো, “ওখানে কোন এক জমিদারের মৃতদেহ পোড়ানো হয়েছিলো। সেটারই একটা মেমোরিয়াল টাইপ। আমি ভেবেছিলাম আব্রাহামিক-দের যেমন কবর থাকে মৃতের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে, হিন্দুদের তেমন কিছু থাকে না। এখন দেখছি, পঞ্চভুতে মিলিয়ে যাবার ফিলোসফি সত্ত্বেও, মিশরীয় mausoleum-এর ইমোশন থেকে সরে আসতে পারেনি তারাও!

এই গ্রামে ইলেকট্রিসিটি নেই। তাই রাতে চতুর্দিকে ঘুটঘুটি অন্ধকার থাকে। কেয়ারটেকার মোমেন আমাদের জন্য দুটি হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো। আমাদের সাথে একটি টর্চ ছিলো। এছাড়া আজকাল মোবাইল টেলিফোনেই তো টর্চ থাকে।

বুঝলাম দুর্ভাগ্যক্রমে রাতটি অমাবশ্যার রাত। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক বেড়ে গেলো । বাঁশ ঝাড়ে জ্বোনাকীর আলো, জ্বলছে নিভছে, জ্বলছে নিভছে, চমৎকার দৃশ্য।

কেয়ার টেকার মোমেন আমাদের জন্য রাতের খাবারের আয়োজন করছিলো।
আমি বললাম, “মোমেন”।
মোমেন: জ্বী।
আমি: তুমি তো এই গ্রামের স্থায়ী, তাইনা।
মোমেন: জ্বী। তবে আমার জন্মটা হইছিলো, নানীবাড়ী, এইখান থেকে বিশ মাইল দূরে।
আমি: আচ্ছা, আজ সন্ধ্যায় যে বুড়িটা এসেছিলো, ওকে তুমি চেনো? এই গ্রামেই কি থাকে?
মোমেন: জ্বীনা। ও এই গ্রামের না।
আমি: তবে আশেপাশের কোন গ্রামের?
মোমেন: বলতে পারবো না। ওরে আমি আজকেই প্রথম দেখলাম।

এই কথা শুনে আমার অস্বস্তি আরো বেড়ে গেলো।
আমি: না মানে। যারা এই গ্রামে ভিক্ষা করতে আসে তারা কিপরিচিত মুখ না?
মোমেন: সবই চেনা মুখ। তয় অচেনা দুএকজনও মাঝেসাঝে দেখা যায়।
এই কথায় আমার মনের অস্বস্তি কাটলো না।
আমি: মোমেন, আজ বিকালে দেখলাম, পিছনের পুকুরে কিছু মেয়ে গোছল করছে?
মোমেন: জ্বী, গ্রামদেশ। এইখানে একের পুকুরে অন্যে গোছল করে দোষের কিছু নাই।
আমি: না দোষের কথা বলছি না। ওখানে একটা মেয়েকে দেখলাম, কেমন যেন ……..
মোমেন: কারে দেখছেন? কেমন?
আমি বলতে চাইছিলাম “কেমন চেনা চেনা মনে হলো”। কিন্তু থেমে গেলাম। কি বলতে কি মনে করে বসে! তাছাড়া অনেকগুলো বছর আগে আমার বিদেশে দেখা একটা মেয়ে, ওর কাছে চেহারার বর্ণনা করেই বা কি হবে?
আমি: না, কিছু না।
হঠাৎ দালানের বাইরে কার অট্টহাসির শব্দ পেলাম! হা হা হা!!!
আমরা তিনজনই চমকে উঠলাম!
এবার মোমেন বললো, “জ্বিনা, কোন মানুষ না। রাত্রে এই বাড়ীর ত্রিসীমানা দিয়াও কেউ হাটে না। ঐটা খাটাশ। খাটাশের চিক্কর মানুষের হাসির মতন লাগে।
মইনুল জিজ্ঞেস করলো, “খাটাশ কি?”
আমি বললাম, শুনেছি শিয়ালের চাইতে ছোট কিন্তু বিড়ালের চাইতে বড় একটা হিংস্র প্রাণী। মুরগী-টুরগী খায়।
মোমেন: জ্বী, মুরগী লইতে চায়।
আসিফ: রাতে বাড়ীর ত্রিসীমানায় কেউ আসে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরে মোমেন চুপ রইলো। বুঝলাম ও উত্তর দিতে চায় না।
আমি: তুমি তো রাতে আসলে। আমাদের খাওয়ার পর তোমার বাড়ীতে যাবে কি করে?
মোমেন: আমিও রাইতে আসিনা এই বাড়ীতে। রাইতে এই বাড়িতে আলো দেখলেও আসিনা। আইজ আপনেদের খাওনের লাইগা আছি।
আমি: তুমি বাড়ীতে যাবে কি করে?
মোমেন: আমার চাচা মোতালিব টর্চ লইয়া দাঁড়াইয়া আছে নীচে। আপনেদের খাওয়া শেষ হইলে ওর সাথে চইলা যামু। আমি বেশী দূরে থাকিনা। আমার বাসা থেইকা এই বাড়ী দেখা যায়।

এই ঘোর অমাবশ্যার রাতে চতুর্দিক কেমন থমথমে মনে হচ্ছিলো। আমরা তিনজন দুপুর বেলা যেমন উচ্ছাসে খাবার খেয়েছিলাম, এখন আর তা পারছি না। প্রায় নিঃশব্দেই খেলাম আমরা। আমাদের খাওয়ার পর, সবকিছু গুছিয়ে, মোমেন বললো, “আমি তাইলে আইজকে রাতের জন্য যাই। কাইল সকালে আসমু। আপনেরা সাবধানে থাইকেন। ওর কথায় আরেকবার ধরাস করে উঠলো বুকটা। সাবধানে থাকার কথা বলে কেন ও?!

আমি ওর সাথে সরু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলাম। নীচের তলায় দুইদিকে দুইটি টানা বারান্দা আছে। সামনের দিকের বারান্দায় আমি ওর সাথে দাঁড়ালাম।
আমি: মোমেন ঠিক করে বলো তো। এই বাড়ীর ব্যাপারটা কি?
মোমেন: রাইত-বিরাতে এইসব কথা কইতে নাই।
আমি: তারপরেও কিছু বলো। আমরা সতর্ক থাকতে চাই।
মোমেন: এইটা তো জমিদার বাড়ী, তাইনা। জমিদাররা তো আর ভালো ছিলো না। অত্যাচার তো আর কম করে নাই! হরেন জমিদার নামে একটা শয়তান ছিলো। ঐ যে পিছে যে মুকুট-টা দেখেন ঐখানে ওরে পোড়াইছিলো। ও ছিলো একটা পাকা শয়তান। প্রজাগো উপর অনেক অত্যাচার করছে। তার উপর ছিলো মাইয়া মানুষের স্বভাব। নদীর ঘাটে নৌকায় কইরা নাচনেওয়ালী নিয়া আসতো। একবার ইন্ডিয়া থেইকা এক সুন্দরী নাচনেওয়ালী-রে নিয়া আসছিলো। শোনা যায়, কিছুকাল ক্ষুধা মিটাইয়া মাইয়াটারে মাইরা ফালাইছিলো ও। তারপর পিছনের গাঙ্গের পানিতে ভাসাইয়া দিছিলো। এই বাড়ীর আশপাশ দিয়া রাইতে মানুষ ডরে যায় না, কি সব নাকি দেখা যায়!!!

এই কথা বলার পর থরথর করে কেঁপে উঠলো মোমেন।
মোমেন: স্যার অনেক কথা বইলা ফালাইছি। রাইতে এত কিছু কইতে হয়না। আপনেরা সাবধানে থাইকেন। আমি যাই।
আমাদের অদূরে দাঁড়িয়েছিলো মোমেনের বয়স্ক চাচা। তিনি এতক্ষণ কোন কথা বলেন নাই। এবার এগিয়ে এসে বললেন, “এই বাড়ীতে রাইতে থাকন ভালো না। আপনেরা সাবধানে থাইকেন। আমরা যাই।”

দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে চলে গেলো ওরা দু’জন। আমি মোবাইলের টর্চটা অন করে, সরু সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে শুরু করলাম একতলা ও দোতলার ঠিক মাঝখানে উঠলে সিঁড়ির একটা বাঁক আছে। ওখানে পৌঁছে, হঠাৎ কিসের যেন একটা শব্দ পেলাম! নাকি আমার কানের ভুল। খুব মৃদু, কিন্তু হালকা। আমি কান খাড়া করলাম। ধাতব কোন বাদ্যের শব্দ। হ্যাঁ, নুপুরের শব্দ মনে হলো!!!
(চলবে)

তারিখ: ২৪শে নভেম্বর, ২০১৮ সাল
সময়: রাত ১টা ২৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.