জমিদার বাড়ীর অভিশাপ (ভুতের গল্প) – পর্ব ৩

জমিদার বাড়ীর অভিশাপ (ভুতের গল্প) – পর্ব ৩
——————————— রমিত আজাদ

নূপুর সিঞ্চনে সিক্ত হৃদয়ভার,
অভাগিনী নটিনীর কে শুনিবে গান?
যাহার দেহের ভাঁজে লেখা রাজাদের ক্ষুধা,
কেশের ছায়ায় তার কে জুড়াবে প্রাণ?

নটিনীর রুপে-রসে উন্মাদ তব কবি,
তুমিও প্রেমিক নও।
রূপসীর আভরণে খোঁজ,
পুঁথির রসদ তাও!

দরবারী বৈভবে তার জাঁকালো উৎসবে,
গাহিবে নহলী গীতি দ্যুতিমান গৌরবে।
ধন্য ধন্য করিবে রাজন্য,
কবির গরিমা বাড়িবে অনন্য!
সেই স্বার্থ যাচি যাও নটিনীর দ্বারে,
দেখিবে না কভু, হাতে হাত রাখি,
সজল তাহার আঁখি
বুঝিবে না তার, কাঞ্চন কারাগার
কি করুণ ব্যাথাভারে!

কলেজে পড়াকালীন সময়ে শ্রদ্ধেয় কয়েকজন শিক্ষকদের কাছ থেকে শুনেছিলাম ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর কথা। ইংরেজরা তখন আমাদের দেশ সদ্য দখল করে নিয়েছে। দরিদ্র ইংরেজদের হাতে পড়েছে একটা অঢেল সম্পদের দেশ। ইংরেজদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে সফল করতে সহযোগীতা করেছিলো এদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার-বিশ্বাসঘাতক। এদের মধ্যে একজন ছিলো কৃষ্ণবল্লভ। যে পরে কিনা পলাশী-র যুদ্ধে বাংলার পরাজয়-কে তার নিজস্ব বিজয় হিসাবে ধরে নিয়ে বিশাল উৎসব-এর আয়োজন করেছিলো। লুটেপুটে এই দেশ খেতে ইংরেজরা সব পরিকল্পনা স্থির করলো। অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে নামিয়ে আনলো ইতিহাসের জঘন্যতম ও নির্মমতম দুর্ভিক্ষ, বাংলা ১১৭৬ সালে (১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ) সংঘটিত হয়েছিলো বলে তার অপর নাম ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ (এক কোটি পঁচিশ লক্ষ) প্রাণ হারিয়েছিলো ঐ দুর্ভিক্ষে। এরপর ইংরেজরা তাদের ক্ষমতা কন্টকমুক্ত করতে কিছু দেশীয় বিশ্বাসঘাতক কুকুর তৈরীর পলিসি অবলম্বন করে। তাদের পলিসির আওতায় একদল দেশীয় কুকুর নতুন ক্ষমতাবান ইংরেজদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে। এরা কেউই বনেদি জায়গীরদার ছিলো না, বরং ছিলো অতি সাধারণ গোমস্তা-পেয়াদা। ইংরেজরা ভিলেনের হাসি হেসে ঐ সকল গোমস্তা-পেয়াদাদের হাতেই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর নামে জমিদারী তুলে দেয়। সেই সাথে দেয় অঢেল ক্ষমতা – ঐ অঞ্চল তোমাকে দিলাম, ওখানকার অধিবাসীরা তোমাদের দাসসম তাদের সাথে যেমন খুশী তেমন আচরণ করো সরকার তোমাদের কিছুই বলবে না, শুধু সময়মতো ও চাহিদামত ইংরেজ সরকারের খাঁজনাটি দিও। ঐ কুকুরগুলো গোমস্তা-পেয়াদা থেকে রাতারাতি জমিদার বনে যাওয়ার আনন্দে ইংরেজ প্রভুদের প্রতি চরম কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ হয় বংশ পরম্পরায়ে। পাশাপাশি হরর নামিয়ে নিয়ে আসে স্থানীয় প্রজাদের উপর, এত নৃশংসতা ইতিপূর্বে আর কেউ দেখেনি!

জমিদার নামী ইংরেজদের কুকুরগুলো কেবল জনগণের রক্ত চুষেই ক্ষান্ত হয় নি, সেই সাথে তাদের দেহের ক্ষুধা মেটাতে তারা হরণ করতে থাকতে প্রজাদের রূপসী কন্যাদেরকে। কত যে নিষ্পাপ তরুণী ওদের ঘৃণ্য লালসার শিকার হয়েছিলো তা বলে শেষ করা যাবে না।

সেই সাথে রয়েছে নাচনেওয়ালী বা বাঈজীদের জীবনেরও করুণ কাহিনী! ভাগ্যের ফেরে কোন কোন রূপসী তরুণী হয়ে যেত নাচনেওয়ালী বা বাঈজী। সব নারীরই যে স্বামী-সংসারের চিরন্তন স্বপ্ন থাকে সেই স্বপ্ন তাদের পূরণ হতোনা কোনদিনও। আর্য মন্দিরের সেবাদাসীর এ যেন ছিলো এক নব্যরূপ! তাদেরকে জীবন উৎসর্গ করতে হতো এই ধনিক শ্রেণীর পুরুষদের মনোরঞ্জনে! রূপলোভী এই পিশাচেরা শুধু দেহভোগ করেই ক্ষান্ত হতো না, কখনো কখনো তাদের রক্তলোলুপতারও শিকার হতো ঐ সব হতভাগিনী-রা! আজও হয়তো জমিদার বাড়ীগুলোর দেয়ালে দেয়ালে কান পাতলে শোনা যাবে তাদের অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস!!!

দোতলায় উঠে দেখলাম, আসিফ আর মঈনুল গুম মেরে চুপচাপ বসে আছে খাটের উপরে। ওদের মুখের এক্সপ্রেশন স্বস্তির নয়!
আমি: কিরে ঘুমাবি? নাকি আরো আড্ডা দিবি? চল ছাদে গিয়ে বসি। পূর্ণিমা তো নাই, অমাবশ্যার সৌন্দর্য্য উপভোগ করি! অবাক হলাম,
আমার কাব্যিক প্রস্তাবে ওদের মধ্যে কোন ভাবান্তর হলো না।
আসিফ: তুই কোথায় গিয়েছিলি?
আমি: কেন, নীচে, মোমিন-কে বিদায় জানালাম।
মঈনুল: মোমিন আজ রাতে আমাদের সাথে থাকলেই মনে হয় ভালো হতো।
আমি: নারে, মোমিন-এর মতিগতি দেখে মনে হলো এখানে রাতে থাকার কোন ইচ্ছাই তার নাই।
আসিফ: কেন নাই।
কি উত্তর দেব বুঝতে পারলাম না। তাই চুপ করে রইলাম।
মঈনুল: আচ্ছা, ও রাতে এই বাড়ীতে আলো দেখা নিয়ে কি যেন বলছিলো না?
আমি এবারো চুপ করে রইলাম।
আমি: বাদ দে। চল ঘুমানোর আয়োজন করি।
আসিফ: আচ্ছা তুই যখন উপরে উঠছিলি কিছু শুনতে পেয়েছিলি?
একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো আমার মেরুদন্ড দিয়ে। ওরা কি বলতে চাইছে? ওরা যাতে ভয় না পায় আমার এখন ঐরকম কথা বলা দরকার।
আমি: নাহ! কি শুনতে পাবো? আমিতো সোজা উপরে চলে এলাম।
আসিফ: কি যেন টুংটাং বেজে উঠেছিলো?
মঈনুল: আমিও শুনেছি।
আরেকবার শীতল স্রোত বয়ে গেলো আমার মেরুদন্ড দিয়ে। তার মানে ওরাও শুনেছে শব্দটা! এবার আমি লজিকাল হওয়ার চেষ্টা করলাম। আমরা তিনজনই যেহেতু শুনেছি, সেহেতু এটা কোন পরাবস্তব নয়, বাস্তব শব্দই হবে।
আমি: শোন জায়গাটা খুব ফাঁকা। আশেপাশে আর কোন দালান নেই। তিনদিকেই ক্ষেত-খামার। একদিকে গ্রাম। এরকম জায়গায় অনেক দূরের কোন শব্দও অনায়াসে চলে আসে। মনে হয় খুব কাছেই কোথাও কিছু হচ্ছে।
মঈনুল: তুই শিওর?
আমি: শোন আমার একটা বাগানবাড়ী আছে বিজয়পুর, নেত্রকোনায়। চীনামাটির পাহাড়ের কাছাকাছি। ওখানেও আশেপাশে খালি। রাতে অনেক দূরের কোন শব্দ একেবারে কানের কাছে শোনা যায়।
এবার মনে হলো ওরা আশ্বস্ত হয়েছে। আমার খটকা কিন্তু গেলো না। আমি স্পষ্টই শুনতে পেয়েছিলাম। এটা সিঁড়ির আশেপাশেই কোথাও হয়েছে।
কিন্তু আজ রাতে আর কিছু করার নেই। থেকেই যখন গেলাম, তখন সাহসে ভর করে রাতটা পার করতে হবে। সকাল হলেই পালাবো।

মশারী টাঙিয়ে আমরা তিন বন্ধু এক বিছানায়ই ঘুমিয়ে পড়লাম। হারিকেনের আলোটা কমিয়ে কামড়ার একপাশে রাখলাম। আর মাথার খুব কাছেই রাখলাম টর্চটা। মোবাইলটাও হাতের কাছে রাখলাম।

রাত ঠিক কটা হবে জানি না। আর রাত তো রাতই, নিশুতি অন্ধকার, কটা বাজলো তাতে কি আর আসে যায়। রাতের গভীরতা নিয়েও আমার অত চিন্তা নেই রাতের গভীরতা যত বেশী ভোর তত কাছে। কিন্তু যা হলো তাতে আমার গায়ের সব পশম দাঁড়িয়ে গেলো।

আমি থেমে থেমে শব্দটি শুনতে পাচ্ছি। নূপুরের শব্দ। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম। সুনসান নীরবতা। আবারো সেই নূপুরের শব্দ। শুনেই বুকের ভিতরটা ধুক ধুক করে উঠলো!

আরো জটিলতা, শব্দটি কোন নির্দিষ্ট জায়গায় নয়! থেমে থেমে বাড়ীর বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে। কখনো সিঁড়িতে, কখনো নীচতলার বারান্দায়, কখনো দোতলায় পাশের কামড়াটিতে। এই কামড়ার দরজা আমরা কবাট লাগিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। এখানে কোন কারণে শব্দটি আসছে না। তবে কামড়ার আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে মনে হলো।

বিছানায় তাকিয়ে দেখলাম। আসিফ ও মঈনুল গভীর ঘুমে। ওদেরকে জাগাবো কিনা ভাবছি। মনকে বুঝ দিলাম, ইটস লজিকাল। কাছাকাছি গ্রামের কোন বাড়ীতেই কিছু হচ্ছে। হয়তো কেউ পুঁজোর গন্টা বাজাচ্ছে যেটা এই গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে আমাদের কানে নূপুরের শব্দ হয়ে বাজছে।

এই সময় মনে হলো। নূপুরের শব্দটি খুব কাছাকাছি, সিঁড়ি বেয়ে কেউ নূপুরের শব্দ করে উপরে উঠে যাচ্ছে। তারপর ছাদে উঠে গেলো!!!
আমি এখন কি করবো? ঘাপটি মরে শুয়ে থাকবো? আসিফ, মঈনুল-কে জাগাবো? নাকি ঐ শব্দের অনুসন্ধানে বের হবো? এবার মনে হলো হাসির শব্দ শুনতে পেয়েছি। তরুণীর কন্ঠস্বর! এই কন্ঠস্বরটি কি আমার পরিচিত? এমন সলজ্জ রিনরিনে হাসি আমি আগে কোথাও শুনেছি! হঠাৎ আমার মনে কি যে হলো ঠিক বুঝলাম না। মনে হলো আমি আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। আমাকে কেউ যেন চালাচ্ছে। আমি রোবটের মত মশারী তুলে বিছানা থেকে নামলাম। আমার দুই বন্ধু তখনও ঘুমে। লক্ষ্য করলাম, হারিকেনের আলোটা নিভে গেছে। আমার মাথার কাছের টর্চ, হাতের কাছের মোবাইল, কিছুই আমি নিলাম না। আত্মনিয়ন্ত্রণহীন আমি ধীরে ধীরে কামড়ার দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। উদ্দেশ্য দরজা খুলে ঐ রহস্যময় শব্দটির পিছু পিছু যাওয়া। ও যে আমায় ডাকছে!!!
(চলবে)
——————————————————————-
তারিখ: ২৫শে নভেম্বর, ২০১৮
সময়: রাত ১২টা ৪৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.