জমিদার বাড়ীর অভিশাপ (ভুতের গল্প) – পর্ব ১

জমিদার বাড়ীর অভিশাপ (ভুতের গল্প) – পর্ব ১

গভীর রাতে কারো কারো ঘুম ভেঙে যায়। হঠাৎ করেই। সে বুঝতে পারেনা যে, ঠিক কি হলো? কিন্তু তার ঘুম চট করে ভেঙ্গে গেলো! ধারনা করা হয় যে, কেউ একজন আসলে তার দিকে তাকিয়ে ছিলো!!!
তা কি করে হবে? কে তাকিয়ে থাকবে? ঘরে বা কামড়ায় তো কেউ ছিলো না! উত্তরে তারা বলে যে প্রকৃতি এক বিশাল রহস্য!!! সেই বিশাল রহস্য জগতের কতটুকুই বা আমরা জানতে পেরেছি???

আমার এক সময় ধারনা ছিলো যে অশিরীরিদের ধারণা শুধু আব্রাহামীক ধর্মগুলোতেই রয়েছে, কিন্তু পরে জানলাম যে, বুদ্ধিজম-এও অশিরীরিদের ধারণা রয়েছে! কেন এই ধারণা???

সেদিন যা ঘটলো!!!

বিষয়টা ভাবিয়ে তোলার মতই। আমি আসিফকে তখনই নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু ও শুনতে চায় নি। অনেক বছর পর বিদেশ থেকে আসলে যা হয় আর কি। আমাকে আর মইনুলকে একরকম জোর করেই নিয়ে এলো এই পুরাতন জমিদার বাড়ীটিতে। ঢাকা শহর থেকে কিছু দূরে একটি গ্রাম। নদীর একেবারে তীর ঘেষে গ্রাম। সেই গ্রামে একটা জমিদার বাড়ী কিনেছে ওরা দুই ভাই মিলে। আসিফ থাকে আমেরিকায়, ওর ভাই ঢাকাতেই ব্যবসা করেন। টাকা আছে প্রচুর। তাই অনেকটা সখের বশেই বাড়ীটা কেনা। বলে, “বুঝলি, চাইলে জমি কিনে আধুনিক একটা রিসোর্টই বানাতে পারতাম। তা, পুরাতন আমলের জমিদার বাড়ী, একটা ভাব আছে না।” সেই বাড়ীতে কেউই থাকে না। গ্রামের একজনকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে, সেই দেখাশোনা করে। তবে সেই লোক নিজে ঐ বাড়ীতে থাকে না, সে তার নিজের বাড়ীতেই থাকে। আসিফের বড় ভাই মাঝে মাঝে এসে একটা দিন কাটিয়ে যায়। কখনো একা আসেন, কখনো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসেন, ভাবী বাচ্চাদেরকেও নিয়ে আসেন মাঝে-সাঝে। তবে দিনে দিনেই আবার ফেরত চলে যান। রাতে না থাকার কারণ হলো আসিফের ভাবী। তিনি জমিদার বাড়ীটিকে শুরু থেকেই পছন্দ করেন নি। তিনি ভাবেন ঐ বাড়ীতে অনেক অত্যাচার-অবিচার হয়েছে! ওখানে থাকা ঠিক নয়।

ঐ একই কথা আমিও আসিফকে বলেছিলাম। ও তো আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিলো। হা হা করে হাসতে হাসতে বললো, “কি ব্যাটা সায়েন্স পড়েছিস? ভিত্তিহীন জিনিসে ভয় পাস!” ওর উপহাসে আমি একরকম চুপসেই গেলাম। আমি বললাম, “না মানে তোরা আমেরিকায় থাকিস, ওটা তো পেল্লায় আধুনিক দেশ! তাই ওখানকার লোকজনে উপকথায় বিশ্বাস করেনা।” ও আবারো হা হা করে হেসে বলেছিলো, “করে না তোকে কে বললো? ওদের হরর মু্ভিগুলো দেখিস নাই?” আমি বললাম, “তাহলে?”
আসিফ: তাহলে আবার কি। সব সমাজেই দুই ধরনের মানুষ আছে, একদল র‍্যাশনাল থিকিং করে, আর আরেকদল থিংক করে ইর‍্যাশনালী”।
মইনুল: আরে চল, এক রাতেরই তো ব্যাপার।

দুই বন্ধুর কথায় আর না করতে পারিনি। হাজার হোক ছেলেবেলার বন্ধু। আসিফ থাকে বিদেশে, মইনুল সরকারী ডাক্তার ঢাকার বাইরে পোস্টিং, তাই দেশে থাকলেও দেখা হয় কম। অনেকদিন পর তিন বন্ধু একসাথে হলাম। এই সুযোগ আবার কবে পাবো বলা যায় না।

শুক্রবার খুব সকালে আমরা গাড়িতে উঠলাম। মইনুলের গাড়ী, ও নিজেই ড্রাইভ করলো। সকাল সকাল থাকায় আর কোন জ্যামে পড়তে হলো না। তা নইলে গাজীপুরের জ্যামে পড়লে জানের আর কিছু থাকে না। উন্নয়নের ঠেলায়! যাহোক খুব ভোরে বের হওয়ার কল্যাণে, আমরা দ্রুতই ওখানে পৌছে গেলাম। ওদের সো-কলড কেয়ার টেকারের সাথে আগেই কথা হয়ে ছিলো। তাছাড়া মোবাইল কম্যুনিকেশন তো আছেই। গ্রামে ঢোকার আগেই হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো কেয়ার টেকার মোমিন। আমরা ওকে গাড়িতে তুলে নিলাম। মোমিন আমাদের পথ দেখালো। পাকা রাস্তা কিছুক্ষণ পর শেষ হয়ে কাঁচা রাস্তা শুরু হলো। হেলতে দুলতে চলতে চলতে গাড়ীটা এক জায়গায় এসে থামলো, তবে সেটা আসিফদের সেই জমিদার বাড়ী নয়। আমরা আসার আগে খেজুরের রস বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম, মোমিন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা করে রেখেছিলো। সেই রস তোলার জন্য গাড়ী থামালাম। শীতের সকাল, গ্রামে দেশের শ্যামল প্রকৃতি, পাখীর ডাক সব মিলিয়ে মনটা ফুরফুরেই হয়ে উঠলো। তারপর গাড়ী এসে থামলো ওদের জমিদার বাড়ীতে। উঁচু বাউন্ডারী ঘেরা, বড় গেট আছে। মোমিন গেট-টা খুলে দিলে গাড়ী ভিতরে প্রবেশ করলো। ভিতরে ঢুকে আমি দুটি জিনিস দেখে অবাক হলাম, এক: বিশাল টেরিটরি, ভিতরে দুইটা পুকুর আছে, দুই: জমিদার বাড়ীটিকে আমি যতটা আলীশান ভেবেছিলাম ততটা নয়। দোতলা ছোট্ট দালান। তবে হ্যাঁ, অনেক পুরাতন বাড়ী যে সেটা বোঝা যায়। সেই আমলের ডিজাইনেই বাড়ীটা বানানো, তবে কোন সংস্কার হয়নি যে তা বোঝা যাচ্ছে।

বাড়ীর সামনেই একটা বড়সড় শিমুল গাছ। আমাকে একজন বলেছিলো যে এটা বাংলাদেশের গ্রামের রীতি, বাড়ীর সামনে উঠানে একটা বড় উঁচু গাছ রাখতে হয়। এটা ট্রেডিশন ভেবে সবাই মেনে চললেও, বিষয়টা আমার কাছে সায়েন্টিফিক মনে হয়েছিলো। আসলে বজ্রপাতের হাত থেকে বাড়ীটা রক্ষা করার জন্যই ঐ ব্যবস্থা। বজ্রপাত হলে উঁচু গাছের উপর পড়বে, বাড়ীটা বেঁচে যাবে। ঐ শিমুল গাছ ছাড়াও আরো অনেক গাছ আছে আঙিনার ভিতরে।

আরও কিছু গাছপালা আছে। আছে বেশ কয়েকটা বাঁশঝাড়।

ছাদে উঠলে দেখা যায় যে আশেপাশে কোন দালান তো নেই-ই, গ্রামের টিনের বা বেড়ার ঘরগুলোও এই জমিদার বাড়ী থেকে অনেক দূরে। চারদিকে বিস্তির্ণ মাঠ খেত খামার। একপাশে নদী।

দালানের ভিতরে দেখলাম দেয়ালের গায়ে লেখা, জমিদার শ্রী শ্রী হরিচরণ ও আরো কিছু নাম। আসিফ বললো, “এটা এক হিন্দু জমিদারের ছিলো। বংশ পরম্পরায় তারা এখানে ছিলো, সর্বশেষ ওয়ারিশারের কাছ থেকে ভাইয়া এটা কিনেছে।” আসিফের ভাই বলেছে যে, কেনার পর তারা যখন প্রথম এই বাড়িটিতে আসে তখন গ্রামের কিছু যুবক বাড়িটি দেখতে এসেছিলো তবে ওরা আঙিনায় দাঁড়িয়ে ছিলো, ভিতরে ঢুকতে সাহস পায়নি। কেন সাহস পায়নি তার কারণ দুটি। তবে আসিফের ভাই সবাইকে স্নেহ করে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বাড়িটি ঘুরে দেখিয়েছে।

এই বাড়ীর সর্বশেষ ওয়ারিশার কি এই বাড়িতেই থাকতো? আসিফ: তা তো জানি না। মোতালিব বলতে পারবে।

মোতালিব: কে নারায়ণ? জ্বি না। সে এই বাড়িতে থাকতো না, সে থাকতো কাছের উপজেলায়। ওর বাপেও থাকতো না। বাড়ী খালিই পইড়া ছিলো।
ঃ খালি ছিলো কেন?
মোতালিব: এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললো। “নানা লোকে নানা কথা কয়।”

মোতালিব রান্নার ব্যবস্থা করে রেখেছিলো। গ্রামের ক্ষেতের পোলাউর চাল, ঘন ডাল, গ্রামের টাটকা সব্জি, ওদেরই পুকুরের মাছ, দেশী মুরগী আর ফ্রেশ সালাদ। আমরা ঢাকা থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম স্প্রাইট আর কোক। পথে একটি ময়রার দোকান পড়ে, গরম গরম টাটকা মিষ্টি পাওয়া যায় সেখানে, সেই মিস্টিও সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম। সুস্বাদু খাবারগুলো আমরা বেশ মজা করে খেলাম। তারপর জমিয়ে আড্ডা তিন বন্ধুর। সেই পুরানো দিনের স্মৃতিচারণ কত গল্পকথা!!!

বিকেল যখন নামে নামে গল্পের ফাঁকে আমি একবার গেলাম ছাদে। ভাবলাম, জমিদার বাড়ীর ছাদ থেকে চারপাশের দৃশ্য কেমন দেখা যায় একটু দেখি! ছাদে উঠে যা দেখলাম তা অপরূপ! চারপাশের সবুজ বনানী ও গ্রামের শান্তির নীড়গুলো অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো! কিছুদূরে নদী, সেখানে বিকালের লাল রোদ পড়ে সারা দুনিয়া লালে লাল বানিয়ে ফেলেছে। চোখ জুড়ানো এই দৃশ্য থেকে মুখ ফেরানো যায়না। আমি অভিভূত হয়ে দেখছিলাম।

তারপর হঠাৎ চোখ গেলো বাড়ীর পিছনের পুকুরের দিকে। এখানে যেই দৃশ্য দেখলাম, তা থেকেও চোখ ফেরানো যায় না। পুকুরের পানিতে ওপেন গোছল করছে কয়েকটি গ্রাম্য তরুণী। পুকুরের কাকচক্ষু জলে ভিজে তাদের বসন লেপ্টে গেছে সদ্য যৌবনা গায়ে। প্রস্ফুটিত সবকিছু যখন কাপড় ফুঁড়ে যমুনার চরের মত জেগে ওঠে, এই দেখে সন্যাসীও জেগে উঠবে!!! ওরা কেউ আমাকে খেয়াল করছিলো না। হতে পারে এই ছাদে কখনো কেউ ওঠে না, তাই তারা সতর্ক ছিলো না। হতে পারে তারা উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে স্নান করছিলো এই কারনে, তারা আমাকে লক্ষ্য করে নি। ভাবলাম, নাহ! এভাবে দেখাটা এথিকাল না। নীচে নেমে আসতে যাবো, হঠাৎ তরুণীদের একজন আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালো, আমি চট করে সলজ্জ্ব হলেও, ওর মুখের এক্সপ্রেশনে কোন লজ্জা দেখলাম। যা দেখলাম তা অন্য কোন এক্সপ্রেশন! ঠিক কিভাব যে তাকে প্রকাশ করবি ভাষায় বলা যাবে না। এরপর আমার বুকটা ধরাশ করে উঠলো! ওকে কি আমি আগে কোথাও দেখেছি??? কিন্তু না তা কি করে হয়? বিদেশে দেখা সেই মেয়েটি এই গ্রামে আসবে কি করে? স্কার্ট-জিনস-টপসে দেখা মেয়ে এখানে এমন আটপৌরে শাড়ী পড়ে?! তাছাড়া!!!

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে হবে এরকম সময়ে দিকে এক বুড়ি এলো, “বাবারা তোমরা কিছু খাইতে দিবা?” আমরা তাকে আমাদের বেঁচে যাওয়া খাবারগুলো দিলাম। কিছু টাকাও দিলাম। খাবার নিয়ে সে বললো, “তোমরা আমার উপকার করছো, আমিও তোমাগো উপকার করি! তোমাগো একটা কথা কই,
এই বাড়িতে রাইতে থাইকো না। খারাপ জিনিস দেখবা। শিমুল গাছ থেইকা ঝাপ দিয়া গায়ের উপর আছড়াইয়া পড়ে। রাইতে ’বোবা-য় ধরে।
আমরা হাসতে হাসতে বললাম,
“বুড়িমা তুমি বুঝলা কিভাবে? তুমি কি রাইতে এই বাড়ীতে ছিলা?”
বুড়ি কাঁপা গলায় বলতে লাগলো, “আমার কথা বিশ্বাস হয় না? হইবো হইবো।“

বুড়ীর কথায় আমরা তিনজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম!

(চলবে)
———————————————————–
তারিখ: ২৩শে নভেম্বর, ২০১৮
সময় রাত ১২টা ৩২ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.