অনলাইন প্রকাশনা
জ্যামিতিশাস্ত্র – ইতিহাস, দর্শন, উদ্ভব ও বিকাশ (পর্ব দুই)

জ্যামিতিশাস্ত্র – ইতিহাস, দর্শন, উদ্ভব ও বিকাশ (পর্ব দুই)

জ্যামিতিশাস্ত্র – ইতিহাস, দর্শন, উদ্ভব ও বিকাশ (পর্ব দুই)
———————————————- ড. রমিত আজাদ

ভারত উপমহাদেশ ও জ্যামিতি:

প্রাচীন সভ্যতার ক্রীড়াগৃহ ভারত উপমহাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়া। প্রাচীনকাল থেকেই এই ভূমি দর্শন ও জ্ঞান চর্চায় সমৃদ্ধ। আমার এই পর্বের লেখায় এই বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করবো।

সাংখ্য – পৃথিবীর প্রথম দর্শন:
মহাজ্ঞানী কপিল-এর জন্ম যিশুখ্রিস্টের জন্মের সাত শত বছর আগে (মতান্তরে এক হাজার খ্রীষ্টপূর্ব) প্রাচীন বাংলার কোনও এক কৌমগ্রামে। বর্তমান যশোরের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে কপিলমুনি নামে একটি গ্রাম রয়েছে। অনেকে মনে করেন কপিলমুনি গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন কপিল। এই কপিল-ই ছিলেন পৃথিবীর প্রথম দর্শন সাংখ্য দর্শনের জনক। সাংখ্য দর্শনের একটি প্রাচীনতর বইয়ের নাম পাওয়া গিয়েছে – ষষ্টিতন্ত্র। এই বইটি এখন আর পাওয়া যায় না। ধ্রুপদি সাংখ্য দর্শন সম্পর্কে লিখিত আছে এমন যে প্রাচীনতম প্রামাণ্য গ্রন্থটি এখন পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, সেটি হল ঈশ্বরকৃষ্ণের রচিত সাংখ্যকারিকা (২০০ খ্রিস্টাব্দ বা ৩৫০-৪৫০ খ্রিস্টাব্দ)।

ভাগবত পূরাণ-এ কপিলের উল্লেখ আছে:
বৃক্ষের মধ্যে আমি বট, ঋষিগণের মধ্যে আমি দেবর্ষি নারদ, গন্ধর্বগণের মধ্যে আমি চিত্ররথ ও সিদ্ধগণের মধ্যে আমি কপিল। (১০।২৬)

ভগবত পুরাণ-এ আরো লিখিত আছে: “এই জগতে আমি এসেছি সাংখ্য দর্শন শিক্ষা দিতে। যাঁরা অপ্রয়োজনীয় জাগতিক কামনার হাত থেকে মুক্তি পেতে চান, তাঁরা এই দর্শন শিক্ষা করবেন। এই আত্ম-উপলব্ধির পর বোঝা কঠিন। কালের স্রোতে তা হারিয়ে গিয়েছে। তাই আমি কপিলের দেহ ধারণ করে তা পুনরায় প্রবর্তন করতে এবং মানবসমাজে সেই দর্শন আবার শিক্ষা দিতে এসেছি।” (৩।২৪।৩৬-৩৭)

মহাভারতে লিখিত আছে:
ভীষ্ম (যুধিষ্ঠিরকে) বললেন, “হে শত্রুজয়কারী যুধিষ্ঠির, কপিলের অনুগামী সাংখ্য-মতাবলম্বীরা বলেন, মানবদেহে পাঁচটি দোষ আছে। এগুলি হল: কামনা, ক্রোধ, ভয়, নিদ্রা ও শ্বাস। এগুলি সকল জীবের দেহেই দেখা যায়। যাঁরা জ্ঞানী, তাঁরা ক্ষমার দ্বারা ক্রোধকে জয় করেন। সকল কর্মের উদ্দেশ্যকে ছেঁটে ফেলে কামকে জয় করা যায়। সত্ত্বের চর্চার মাধ্যমে নিদ্রাকে জয় করা যায়। সতর্কতার মাধ্যমে জয় করা যায় ভয়কে। আর শ্বাসকে জয় করা যায় নিয়ন্ত্রিত আহারের মাধ্যমে। (মহাভারত, শান্তিপর্ব ভাগ ৩ অনুচ্ছেদ ৩০২)

উপরের দুইটি বিখ্যাত গ্রন্থের বাণী উদ্ধৃত করার কারণ এই বোঝানো যে এই গ্রন্থগুলিতে স্পষ্টভাবেই মহাজ্ঞানী কপিল ও তাঁর প্রবর্তিত সাংখ্য দর্শনের উল্লেখ রয়েছে।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে কপিলের নামের উল্লেখ রয়েছে, এখান থেকে স্পষ্ট যে কপিলের জন্ম ঐ উপনিষদের রচনাকালের আগে। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ-এর রচনাকাল আনুমানিক ২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ।
এছাড়া কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে সাংখ্য দর্শনের ষ্পষ্ট উল্লেখ আছে – Anvikshaki comprises the philosophy of Sankhya, Yoga and Lokayatika. (Arthashastra: Kautilla, page 9) অর্থশাস্ত্রের রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব ৩২০ অব্দ।

কেন সাংখ্যকে পৃথিবীর প্রথম দর্শন বলা হচ্ছে এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে চাই –
অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে (Richard Garbe) লিখেছেন, কপিলের ডকট্রাইনে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রকাশিত হয়েছে মানব মনের/চিন্তনের পূর্ণ স্বাধীনতা, তার নিজের ক্ষমতার প্রতি পূর্ণ আস্থা (In Kapila’s doctrine, for the first time in the history of the world, the complete independence and freedom of the human mind, its full confidence in its own powers were exhibited)” (The Discovery of India ( P.184) – Jawaharlal Nehru)‎I

এবার আসা যাক সাংখ্য-কে কেন দর্শন বলা হচ্ছে, এই প্রসঙ্গে। তাহলেই প্রথমেই প্রশ্ন আসে ‘দর্শন’ কি। ইংরেজীতে দর্শনকে বলা হয় ‘philosophy’। শব্দটির ব্যুৎপত্তি গ্রীক ভাষা থেকে, এখানে দু’টি গ্রীক শব্দ আছে ‘philo–sophia’, ‘philo’ অর্থ ‘অনুরাগ’ এবং ‘sophia’ অর্থ ‘প্রজ্ঞা’, পুরো অর্থ ‘প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ’ বা ‘love for wisdom’। পরিভাষাটির স্রষ্টা গ্রীক দার্শনিক পিথাগোরাস। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, গ্রীক দর্শন অপেক্ষাকৃত নবীন, আমাদের উপমহাদেশীয় দর্শন প্রাচীনতর। তাই আমাদের উপমহাদেশী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণটি আগে দেখা প্রয়োজন। আমাদের উপমহাদেশের সংস্কৃত ভাষায় শাস্ত্রটির নাম ‘দর্শনা’, হিন্দিতে ‘দর্শন’, বাংলায়ও ‘দর্শন’, যার অর্থ ‘পর্যবেক্ষণ’ অথবা ‘নিরীক্ষা’। কি ‘পর্যবেক্ষণ’ অথবা ‘নিরীক্ষা’ করা? সত্য বা বাস্তবতা ‘পর্যবেক্ষণ’ অথবা ‘নিরীক্ষা’ করা। এই দেখার অন্তর্ভুক্ত ইন্দ্রিয়, মন এবং এমনকি চেতনা। আরো আছে ধ্যান (contemplation)। প্রাথমিকভাবে এটা সাধারণ দেখা ‘ইন্দ্রিয়লব্ধ পর্যবেক্ষণ’ হতে পারে, তবে তা আরো গভীর – ধারণাগত জ্ঞান বা একটি স্বজ্ঞামূলক আভা। এভাবে দর্শন হলো অন্তঃস্থ সবকিছুর প্রতি পূর্ণদৃষ্টি, যেই অন্তঃস্থ-কে আমরা বলি আত্মা। দর্শন কাজ করে সত্য-এর অনুসন্ধান নিয়ে। তাছাড়া দর্শন ‘সত্যের প্রকৃতি (the nature of reality) নিয়েও কাজ করে।
দর্শন জীবন ও মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করে। দর্শনের উদ্দেশ্য অস্তিত্ব-এর প্রকৃতিকে হৃদয়ঙ্গম করা। দর্শন একটি মানবীয় প্রচেষ্টা যা চরম সত্যর দিকে নিয়ে যায়।

‘সাংখ্য’ নামটি এসেছে সংখ্যা বা ‘number’ থেকে। অর্থাৎ এই দর্শন সৃষ্টি হওয়ার অনেক আগে থেকেই সংখ্যা ছিলো। সংখ্যা হলো এক ধরনের প্রতীক যার সাহায্যে গণনা করা হয় পরিমাপ করা হয় ও আখ্যা দেয়া হয়।
গণনা ও পরিমাপের বিষয়টি তখনই আসলো যখন বোঝা গেলো যে, জগত-সংসার বিশৃঙ্খল নয় বরং সুশৃঙ্খল। যেমন, প্রতি ৩৬৫ দিন পরপর পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসে, পচাত্তর বছর পরপর হ্যালির ধুমকেতু পৃথিবীতে দেখা দেয়, বীজ থেকে গাছ-গাছ থেকে আবারো বীজ, এমন আরো অনেক কিছু। জগত-সংসার যেহেতু সুশৃঙ্খল তাই এটাকে বোঝা অনেকটাই সহজ। শৃঙ্খলাটাকে বুঝতে পারলেই হবে। এই শৃঙ্খলাটাকে বুঝতে পারার জন্য মানবজাতি নির্মান করে একটি শাস্ত্র যার নাম ‘গণিত’। আর এই গণিতের মূলই হলো সংখ্যা।

সাংখ্য দর্শন হল একটি গণনামূলক দর্শন। যৌক্তিকভাবে সবকিছু ব্যাখ্যা করা হয় এই দর্শনে।
মিথের প্রভাবমুক্ত থেকে বিশ্বজগতের উদ্ভব কীভাবে হল সেটি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন মহাজ্ঞানী কপিল তাঁর সাংখ্য দর্শনের মাধ্যমে। কসমিক এভ্যুলুশন-এর নীতিগুলোকে সংখ্যারোপ করে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে সাংখ্য দর্শন ।
সাংখ্যমতে মূল তত্ত্ব দুটি চেতন পুরুষ ও জড় প্রকৃতি বা অব্যক্ত। প্রকৃতি (যার পরিণাম এই জগৎ) ত্রিগুণাত্মক (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ)। প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগে ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা বিনষ্ট হলে নির্দিষ্টক্রমে সৃষ্টি শুরু হয়। প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত হয় মহৎ বা বুদ্ধিতত্ত্ব, মহৎ থেকে অহঙ্কার, অহঙ্কার থেকে মন, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ), পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ত্বক্) এবং পঞ্চ তন্মাত্র (রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ)। অতি সূক্ষ্ম তন্মাত্র থেকে উদ্ভূত হয় পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ্, তেজ, মরুৎ, ব্যোম)।
পুরুষ ও প্রকৃতি দ্বৈতবাদ সাংখ্য দর্শন, এটির অনুকরণেই পাশ্চাত্য দর্শনে এসেছে পাশ্চাত্য দর্শনে mind and body dualism.
সাংখ্য দর্শনে কারণ-ঘটন (Cause and Effect) সম্পর্কে বলা আছে (http://www.suhotraswami.net/library/The_six_systems_of_Vedic_philosophy.pdf)। এটাও দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও দর্শনশাস্ত্রের অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয়।
সাংখ্যদর্শনের সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি।
প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের সংযোগ হলে বিশ্বজগতের উদ্ভবই কেবল না- বিশ্বজগতের বিবর্তনও শুরু হয়। The chain of evolution begins when purusha impinges on prakriti, much as a magnet draws unto itself iron shavings (Encyclopedia Britannica).
আত্মা সম্পর্কে সাংখ্যা দর্শন বলেছে –পুরুষ হল- আত্মা। প্রকৃতির কোন চেতনা নাই, কিন্তু পুরুষ সর্বব্যাপী, চেতন, সর্বত্রগামী, তবে গতিহীন বা অনঢ়, অপরিবর্তনীয়, অবস্তুগত এবং আকাঙ্খাহীন। এদিকে পুরুষ প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে, এই প্রভাবের মধ্য দিয়েই শুরু হয় সৃষ্টির প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া তৈরী করে ২৪ টি নীতির। মহৎ (১), বুদ্ধি – কার্য ও কারণ (১+১= ২), অহংকার (২+১= ৩), মানস (মন বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়) (৩+১ =৪), পঞ্চইন্দ্রিয় (৪+৫= ৯), পাঁচটি কর্মইন্দ্রিয় (৯+৫= ১৪), পাঁচটি তানমাত্রা – মানে পাঁচটি সূক্ষ্ম উপাদান (১৪+৫= ১৯), পঞ্চভুত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) (১৯ + ৫ = ২৪)।
অনেকে সাংখ্য দর্শনকে বলেন জ্ঞান-যোগ মানে জ্ঞান অর্জনই হলো নির্বান লাভের উপায়।
সাংখ্য দর্শন ‘অহিংসা’ ডকট্রাইনের কথা বলে। এই হিসাবে সাংখ্য বেদের বিপরীত এক কথায় অবৈদিক।
সংখ্য জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology)। যথাযথ জ্ঞানের তিনটি উপায়: উপলব্ধি (perception), অনুমিতি (inference), এবং বৈধ প্রমাণ. (valid testimony)।
সাংখ্য দর্শনের ‘গুন’ কোন গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য নয় তারা গঠন উপাদান।

“গঙ্গা: তত্ত্ব ও তথ্য” বইতে তপোব্রত সান্যাল লিখেছেন: ‘ প্রাচীনকালের লেখকরা বঙ্গকে উপেক্ষা করলেও মহামুনি কপিলের সঙ্গে গঙ্গার সম্পর্কে কে মান্য করেছেন। সাংখ্য-দর্শনের প্রবর্তক কপিল যে বঙ্গবাসী ছিলেন, তার প্রমান আছে। সাংখ্যই ভারতের প্রাচীনতম দর্শন। বৌদ্ধধর্মের মূলতত্ত্বের উৎসও এই সাংখ্যদর্শন। বস্তুত, বুদ্ধের দু’জন গুরুই ছিলেন সাংখ্যমতাবলম্বী। সনাতন ধর্মাবলম্বী আর্যশাস্ত্রীরা কপিলের লোকায়ত সাংখ্যশাস্ত্রকে কখনোই মেনে নেন নি, কারণ কপিল বেদকে প্রমাণ বলে স্বীকার করেননি। মনে হয় এই কারণেই বৌদ্ধ-অধ্যুষিত বঙ্গ আর্যদের দ্বারা অবহেলিত হয়েছে।’ (পৃষ্ঠা ১৬)। (http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29663000)

সাংখ্য দর্শন থেইস্ট না এ্যাথেইস্ট এই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে এটা যে দর্শন এই নিয়ে কোন বিতর্ক হতে পারেনা। কারণ মহাজ্ঞানী কপিলই প্রথম পৌরাণিক কাহিনীর আশ্রয় না নিয়ে দেব-দেবী-প্যান্থীয়ন বিবর্জিত সৃষ্টিতত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন।

সাংখ্য দর্শনে সংখ্যা বা গণনার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, জ্যামিতির সাথে এই দর্শনের সরাসরি কোন সম্পর্ক আছে কিনা সে সম্পর্কে আমার ধারণা স্বচ্ছ নয়। তবে জ্যামিতিতে দুটি বিষয় রয়েছে তাত্ত্বিক ও বিমূর্ত জ্ঞান (theoretical or abstract knowledge)। সাংখ্য দর্শনে বিমূর্ত জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া জ্যামিতিতে ব্যবহারিক-এর চাইতে যৌক্তিক ব্যাখ্যার গুরুত্বই বেশী, যার ভিত্তি সাংখ্য দর্শনেই স্থাপিত হয়েছে।

Sacred Geometry (পবিত্র জ্যামিতি)
বিশ্বজগতের গঠনপ্রণালীর সাথে জ্যামিতির সম্পর্ক গভীর। জ্যামিতি অধ্যায়নের মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের নির্মানশৈলী ও স্থায়িত্বের গঠন নীতিগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারি। মহাবিশ্বের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকা শাশ্বত দৃশ্যমান ভাষাগুলো আমাদের শোনায় পবিত্র জ্যামিতি। যা জগতে ফুটে থাকা ঐশ্বরিক শৃঙ্খলাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, যা খচিত রয়েছে অদৃশ্য এ্যাটম থেকে শুরু করে দৃশ্যমান বিশাল আকৃতির তারকা পর্যন্ত। ডিএনএ-র প্যাঁচ, চোখের কর্ণিয়া, ফুলের পাঁপড়ির প্রতিসাম্যতা, স্ফটিকের বিন্যাস, শামুকের কুন্ডলী, সৌরজগতের কক্ষপথ, গ্যালাক্সির স্পাইরাল পর্যন্ত সবখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অগনিত জ্যামিতিক কোড।

বৌদ্ধ দর্শন ও জ্যামিতি:

গৌতম বুদ্ধের জন্ম আজ থেকে ২৬০০ বছর আগে। উনার প্রচারিত বৌদ্ধ দর্শনে যুক্তির একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।
যেমন:
১। ‘ইহ জগতে শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার কখনও উপশম হয়না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার অবসান ঘটে।’
২। ‘যে জাগরিত থাকে তার নিকট রাত্রি দীর্ঘ বলে মনে হয়, যে শ্রান্ত হয় তার নিকট অল্প পথও দীর্ঘ বলে মনে হয়; সেরূপ যে মূর্খ সত্য ধর্ম জানেনা, তাদের নিকট সংসার পরিক্রমা অতি দীর্ঘ।’
৩। ‘ধর্মদান সর্বপ্রকার দান অপেক্ষা উত্তম। ধর্ম-রস সর্বরসের শ্রেষ্ঠ। ধর্মের আনন্দ নিখিল আনন্দকে অতিক্রম করে এবং তৃষ্ণাক্ষয়ে সর্ব দুঃখের বিনাশ হয়।’ (তণহা বর্গ/ তৃষ্ণা বর্গ)
৪। ‘গঙ্গা, যমুনা, সরভু, সরস্বতী, অচিরবতি ও মহতি মহানদীর জলও প্রাণীদের পাপমল ধৌত করতে পারেনা। বরং ন্যায়-পরায়ন বা শীলাচার রূপ জলের দ্বারাই মানব-চিত্তের পাপমল বিশোধিত করতে পারে। (উল্লেখ্য, সে সময় বহু সন্যাসী মনে করতো ‘নদীর স্নানে পাপ মোচন হয়’ – এ বিশ্বাসে তারা প্রচন্ড শীতের রাত্রেও নদীর জলে ডুব দিত এবং সাঁতার কাটতো, তাদের উদ্দেশ্যেই বুদ্ধ এই কথা বলেছিলেন)
(ত্রিপিটক পরিচিতি – সুদর্শন বড়ুয়া)

বুদ্ধ যখন তাঁর শিষ্যদের সাথে জ্ঞানালোচনা করতেন সেখানে অনেক যৌক্তিক আলোচনা থাকতো। শিষ্য ও শ্রোতাদের বহু প্রশ্নের উত্তর তিনি যৌক্তিকভাবে দিতেন।
Buddhism accepts only two pranama (tshad ma) as valid means to knowledge: Pratyaksha (mngon sun tshad ma, perception) and Anumāṇa (rjes dpag tshad ma, inference)

জ্যামিতিক প্রমাণগুলো লজিকের উপর ভিত্তি করে। বৌদ্ধ দর্শনে লজিক শিখানো হয়।

বৌদ্ধ যুক্তিশাস্ত্র (প্রমাণ) বিকশিত হতে শুরু করে খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে।

বৌদ্ধ দর্শন সতত পরিবর্তনে বিশ্বাসী। বৌদ্ধ দর্শনে শাশ্বত আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ যেই আত্মার ধারণা তখন প্রচলিত ছিলো (বেদে উল্লেখিত আত্মার ধারণা) সেই জাতীয় আত্মার অস্তিত্বকে বৌদ্ধ দর্শন স্বীকার করেনা। বৌদ্ধ দর্শন আত্মাকে নিত্য স্বীকার করে না। আত্মা ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছে।

Sulbhasutra Geometry: বৌদ্ধ গণিতে দুইটি প্রকারভেদ আছে গর্ণ (সাধারণ গণিত) ও সংখ্যায়ন (উচ্চতর গণিত)। তিন ধরণের সংখ্যার কথা উল্লেখ করা হয় সংখ্যা (গণনাযোগ্য), অসংখ্যা (অগণনীয়) ও অনন্ত (অসীম)। নাগার্জুন ডকট্রাইনে শূণ্যতার ধারনা আধুনিক গণিতের ‘nullity’ and ‘infinity’ প্রবর্তনের পথকে প্রশস্ত করেছিলো।
Buddhist mathematics was classified either as Garna (Simple Mathematics) or Sankhyan (Higher Mathematics). Numbers were deemed to be of three types: Sankheya (countable), Asankheya (uncountable) and Anant (infinite). Nāgārjuna’s Doctrine of Emptiness or Śūnyatā had paved the way for the development of the concept of ‘nullity’ and ‘infinity in modern mathematics. (http://www.academia.edu/207066/APPLIED_BUDDHISM_IN_MODERN_MATHEMATICS )

বৌদ্ধদের ললিতবিস্তার (Lalita-Vistara, ১০০ খ্রিস্টপূর্ব)-এ শততমিক মানের ওপর ভিত্তি করে কোটি, অযুত, নিযুত থেকে তাল্লক্ষ্মণ = 1053 (দশের সূচক তেপান্ন) ইত্যাদি সংখ্যাক্রম সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি এমন:
রাজপুত্র সিদ্ধার্থ (বুদ্ধ)-কে তাঁর পিতা রাজা শুদ্ধোধন গণিতের পরীক্ষায় আহবান জানালেন, “আমার পুত্র, তুমি কি গণিতের জ্ঞান পরীক্ষায় মহান গণিতজ্ঞ অর্জুনের মোকাবেলা করতে পারবে?”
উত্তরে রাজপুত্র বললেন, “আমি পারবো, পিতা।” অতঃপর তাঁর পরীক্ষা নেয়া শুরু হলো।
মহান গণিতজ্ঞ অর্জুন প্রশ্ন করলেন, “হে যুবক, তুমি কি কোটিশতোত্তারা-র গণনা জানো?”
উত্তরে রাজপুত্র বললেন, “জ্বী, আমি জানি।”
: তবে বলো, একশত কোটি থেকে পরবর্তি সংখ্যাগণনা কিরূপে হইবে।”
বোধিসত্ত্ব উত্তর দিলেন, “একশত কোটিকে বলে অযুত, একশত অযুতকে বলে নিযুত, একশত নিযুতকে বলে কঙ্করা, একশত কঙ্করা-কে বলে ভিভারা, ……………., একশত ভিভুতাঙ্গমাস-কে বলে তাল্লাক্ষণ।”
এই তাল্লাক্ষণ গণনার সাহায্যে পর্বতরাজীর রাজা মেরু-কে গণনা-পরিমাপ করা সম্ভব। তারপর dvajagravati-র সাহায্য গঙ্গার সব বালুকণা-কে গণনা-পরিমাপ করা সম্ভব, তার উপরে আছে dvajagranisamani, তার উপরে vahanaprajnapti, তার উপরে inga, তার উপরে kuruta। আবার এর উপরে আছে sarvaniksepa যার সাহায্যে দশটি গঙ্গা নদীর বালুকণাদিগকে গণনা-পরিমাপ করা সম্ভব। তার উপরে আছে agrasara যার সাহায্যে শতকোটি গঙ্গা নদীর বালুকণাদিগকে গণনা-পরিমাপ করা সম্ভব। এরপর আছে সর্বচ্চো সংখ্যাপাতকরণ uttaraparamanurajahpravesa যার সাহায্যে অতি সূক্ষ্ম পরমাণুসমূকেও গনণা করা সম্ভব। এইভাবে তথাগত এত জটিল সংখ্যাপাতকরণ বিষয়েও জ্ঞান রাখতেন। তবে তখনও তিনি গৃহত্যাগী হননি।
দ্বিতীয় পর্যায়ে এলো, ‘যোজন-এর হিসাবে পরমাণুর গণনা ও পৃথিবীর ভর’
অর্জুন বললেন, ” হে যুবক, অতি সূক্ষ্ম পরমাণুর ধুলিকণার সংখ্যাপাতন কি করে করতে হয়?” (উল্লেখ্য যে, যোজন হলো দৈর্ঘ্য-র পরিমাপ)
রাজপুত্র উত্তর দিলেন, “সাত সূক্ষ্ম পরমাণু একটি মিহি কণিকা তৈরী করে, সাত মিহি কণিকা একটি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরী করে, সাত ক্ষুদ্র কণিকা একটি কণিকা তৈরী করে যার নাম vatayanaraja, এবং সাত vatayanaraja একটি কণিকা তৈরী করে যার নাম sasaraja, ………………………।” এইরূপে সাত সাত গুন করে গঠিত কণিকাগুলোর নামকরণ তিনি করলেন edakaraja; edakaraja goraja; liksaraja; sarsapa; adyava; anguli; parva; দুই parva তৈরী করে এক hasta; চার hastas তৈরী করে এক dhanu; এক হাজার dhanu তৈরী করে মগধ রাজ্যের এক ক্রোশ (krosa) ; চার ক্রোশ তৈরী করে এক যোজন. এক যোজনে হলো ১০৮*১০^১২ পরমাণুর দৈর্ঘ্য।
সিদ্ধার্থ আরো বললেন, “এবার বলুন আপনাদের মধ্যে কে জানে, এক যোজনের ভর কত, এবং তা কয়টি সূক্ষ্ম পরমাণু ধারন করতে পারে?”

অর্জুন বললেন, “যাদের জ্ঞান অপেক্ষাকৃত কম, তাদের কথা বাদ দিলাম, আমি নিজেই তো বিস্মিত হচ্ছি। তরুন রাজপুত্রই আমাদের বলুক, এক যোজনের ভর কত, এবং তা কয়টি সূক্ষ্ম পরমাণু ধারন করতে পারে।”

বোধিসত্ত্ব (বুদ্ধ) উত্তর দিলেন, “এক যোজনের ভরে আছে এক পুরো নিযুত-এর aksobhyas যোগ ত্রিশ-শত-নিযুত এর কোটি যোগ ষাট শত কোটি যোগ বত্রিশ কোটি এবং এক শত হাজার ও বারো হাজার (a ‘mass’ of 10003000000000000060320512000 atoms?)। এই হলো যোজনের ভর।”
এই হিসাবে, Jambu ভূমি হলো সাত হাজার yojanas; Aparagodana ভূমি হলো আট হাজার yojanas; Purvavideha ভূমি হলো নয় হাজার yojanas; Uttarakuru ভূমি হলো দশ হাজার yojanas. [ অতঃপর পৃথিবী হলো ৩৪০০০ ~ måss 3.4E32 পরমাণু (atoms)]

এইরূপে তিনি মহান গণিতজ্ঞ অর্জুনের আরো প্রশ্নের উত্তর দিলেন। রাজপুত্র সিদ্ধার্থ যখন সংখ্যা পাতনের এই জ্ঞান দিচ্ছিলেন স্বয়ং অর্জুন ও অগণিত শাক্যরা পরমানন্দে তা শুনছিলেন। সকলেই মুগ্ধ হচ্ছিলেন, এবং তারা রাজপুত্র-কে পোশাক ও গহনা উপহার দিলেন। মহান গণিতজ্ঞ অর্জুন বললেন,

“শত কোটি অযুত, নিযুত, কঙ্করা, ভিভাহা এবং অক্ষভায়া ইত্যাদি: এত উচ্চস্তরের জ্ঞান আমারও নাই – তিনি আমার উর্ধে। সংখ্যা সম্পর্কে এত জ্ঞান রাখা একজন ব্যাক্তি অতুলনীয়।”
“হে শাক্যগণ আমি নিশ্চিত যে তিনি তিন হাজার বিশ্বের ধুলিকণা গণনা করতে পারবেন, এবং আরো গণনা করতে পারবেন তৃণদল, বৃক্ষরাজী ও ঔষধী উদ্ভিদ সমূহকে, এমনকি পানির ফোটাসমূহকেও, ……….। ………… এর চাইতে চমকপ্রদ আর কি হতে পারে?”

(http://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%BF%E0%A6%A4) (Mathematics in India – Kim Plofker) (http://iteror.org/big/Source/buddhism/Lalitavistara-ch12.html)

বৌদ্ধ স্তুপা-গুলোতে সেমি-স্ফেয়ার সহ নানা ধরনের জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার দেখা যায়। তবে স্তুপা-গুলো গৌতম বুদ্ধের মহানির্বানের পরে নির্মিত হয়েছে। পরবর্তিকালে নির্মিত বৌদ্ধ উপাসনালয়গুলোতে জ্যামিতির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। আরো রয়েছে ইলোরা অজন্তার বৌদ্ধ আর্ট। আর্ট-এর সাথে জ্যামিতির সম্পর্ক ওতপ্রোত। পরবর্তি পর্বে এই নিয়ে আলোচনা করা হবে।

(চলবে)

(এটি কোন মৌলিক গবেষণা নয়, এক ধরনের সংকলন, তথ্য পেশ ও তার ভিত্তিতে উপস্থাপিত লেখকের কিছু মতামত। এই লেখায় কোন দোষ-ত্রুটি থাকলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত। পাঠকদের প্রতি অনুরোধ রইলো তা ধরিয়ে দেয়ার)

(ইতঃপূর্বে প্রকাশিত)

Geometry – history, philosophy, origin and development
— Dr. Ramit Azad

References:
তথ্যসূত্রঃ
http://www.ucl.ac.uk/~uctymdg/Notes%20from%20Lecture%201.pdf
http://www.roangelo.net/logwitt/logwit19.html
http://plato.stanford.edu/entries/epistemology-geometry/
https://archive.org/details/greekgeometryfro00allmuoft
http://www.hindubooks.org/sudheer_birodkar/india_contribution/maths.html
http://jwilson.coe.uga.edu/emat6680/greene/emat6000/greek%20geom/greekgeom.html
http://geomhistory.com/home.html
http://mathworld.wolfram.com/topics/History.html
http://www.sacred-texts.com/afr/stle/stle05.htm
https://books.google.com.bd/books?id=CSsiAAAAMAAJ&pg=PA244&lpg=PA244&dq=Thales+visited+india&source=bl&ots=yC0gGex8gl&sig=zMPELzT_71Wj5u8yVRA_0bV7zlI&hl=bn&sa=X&ved=0ahUKEwiC8caBqa7JAhXCjo4KHatBBdQQ6AEIPzAF#v=onepage&q=Thales%20visited%20india&f=false
Antl-Weiser, Walpurga. “The anthropomorphic figurines from Willendorf” (PDF). Niederösterreichischen Landesmuseum,. Retrieved 24 December 2012.

(Anderson, Marlow; Wilson, Robin J. (October 14, 2004). Sherlock Holmes in Babylon: and other tales of mathematical history. Google Books. ISBN 9780883855461. Retrieved 2012-03-29)
http://indianphilosophy.50webs.com/samkhya.htm
https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF#cite_note-King1-17
https://horoppa.wordpress.com/category/%E0%A6%8F%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%8B-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE/%E0%A6%A6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B6%E0%A6%A8/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%A6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B6%E0%A6%A8/
ইমন জুবায়েরের ব্লগ
The Discovery of India( P.184) – Jawaharlal Nehru
http://www.sacred-texts.com/hin/sak/
http://www.sacred-texts.com/hin/sak/sak1.htm
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29663000
http://prabhupadabooks.com/pdf/TeachingsOfLordKapila.pdf http://www.ivantic.net/Moje_knjige/karika.pdf , http://www.ivantic.net/Moje_knjige/Sankhya%20-%20An%20ancient%20philosophy%20unifies%20science%20and%20religion.pdf
http://www.wabashcenter.wabash.edu/syllabi/g/gier/306/sankhya.htm
http://www.roangelo.net/logwitt/logwit19.html
http://www.tricycle.com/blog/himalayan-buddhist-art-101-sacred-geometry-part-1
http://www.academia.edu/207066/APPLIED_BUDDHISM_IN_MODERN_MATHEMATICS
http://www.math.ubc.ca/~cass/courses/m309-01a/kong/sulbasutra_geometry.htm
http://www.ancient.eu/stupa/
https://serval.unil.ch/resource/serval:BIB_2042CAABE2E0.P001/REF (Panini and Euclid)
http://www.dhammawiki.com/index.php?title=Rational_teachings_of_Buddha#Kalama_Sutta:_The_Buddha.27s_Charter_of_Free_Inquiry
http://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%BF%E0%A6%A4
http://iteror.org/big/Source/buddhism/Lalitavistara-ch12.html

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.