Categories
অনলাইন প্রকাশনা উপন্যাস সৃজনশীল প্রকাশনা

দারুচিনি দ্বীপের মেয়ে ও কৃষ্ণচূড়ার রঙ – ১

দারুচিনি দ্বীপের মেয়ে ও কৃষ্ণচূড়ার রঙ – ১
—————————————– ডঃ রমিত আজাদ

“স্লামালাইকুম”,
অবিকল বাঙালী মেয়ের মত উচ্চারণ ও বলার ভঙ্গী।
“ওয়া আলাইকুম সালাম।” উত্তর দিলাম আমি মঈনুল। তারপর হালকা দৃষ্টিতে তাকালাম ওর দিকে।
সন্ধ্যার আবছা আলোয়, মিষ্টি হাসি উপহার দিল, হিজাব পরিহিতা ইন্দোনেশীয় তরুণী সুরিয়ানী।
সুরিয়ানীঃ হাউ আর ইউ?
মঈনুলঃ ফাইন থ্যংক ইউ। এ্যান্ড ইউ।
সুরিয়ানীঃ আলহামদুলিল্লাহ্!

আর একবার সুরিয়ানীর শান্ত-সৌম্য মুখশ্রীর দিকে তাকালাম আমি। একটি ভিন্ন প্রকৃতির সৌন্দর্য্য রয়েছে, এই হিজাব পরিহিতা ইন্দোনেশীয় মেয়েটির মুখশ্রীতে।

সুরিয়ানীঃ হোয়ার আর ইউ গোয়িং?
মঈনুলঃ টু দ্য ডরমিটরি। ইউ?
সুরিয়ানীঃ জাস্ট ওয়াকিং। ইটস্ ভেরী নাইস ওয়েদার।
মঈনুলঃ ওকে।
সুরিয়ানীঃ ডু ইউ ওয়ান্ট টু জয়েন?
মঈনুলঃ আঁ, উঁ, (একটু আমতা আমতা করে বললাম) আই উড বি হ্যাপী টু জয়েন বাট নট নাউ।
সুরিয়ানীঃ (একটু দমে গিয়ে হয়তো বললো) বিজি?
মঈনুলঃ ইয়া , এ লিট্ল বিট।
সুরিয়ানীঃ ওকে, দেন এনাদার টাইম।
মঈনুলঃ বাই।
সুরিয়ানীঃ বাই।

সুরিয়ানীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের গাছগাছালিতে শোভিত বাগানের ভিতর দিয়ে হাটতে হাটতে ভাবলাম। কেন না বললাম ওকে। কোন কাজই তো নেই। এখন রূমে গিয়ে তো টিভি দেখা ছাড়া আর কিছুই করবো না। গেলেই হতো। ঘন্টাখানেক কাটানো যেত ওর সাথে। কেন যেন ফস করে না বলে ফেললাম। তারপর আর সেটাকে হ্যাঁ করতে পারলাম না। আমার চরিত্রের এটা একটা খারাপ দিক। বড় বেশী জেদি আমি। না বললে সেটা আর হ্যাঁ হয়না। আমার নিজের কাছেই মাঝে মাঝে খারাপ লাগে, তারপরেও এরকম করি। হরস্কোপে বিশ্বাসী আমার বড় বোন বলেন সিংহ রাশীর জাতক বলেই তোর এই অবস্থা।

রূমে ফিরে, মোবাইল ফোনটা হাতে নিলাম। সুরিয়ানীকে একটা কল দিবো? আবার মোবাইলটা রেখে দিলাম। না থাক। একরোখামীর কারণে যে, ওকে একটু আগে না বলেছি তা না। আসলে ওকে দেখলেই আমার মধ্যে কেন যেন একটা জড়তা এসে যায়। অথচ আমাদের পরিচয়টা হয়েছিলো নিছক ঠাট্টা দিয়ে। ইউনিভার্সিটির পাসপোর্ট অফিসে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, রেজিস্ট্রেশন এক্সটেন্ড করার জন্য। হঠাৎ আমার পিছনেই দেখলাম একটি একেবারে অপরিচিত মেয়ে। ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের মধ্যে ওকে আগে কখনো দেখেছি বলেই মনে পড়েনা। হিজাব পরিহিতা ফর্সা গোলগাল মুখের অধিকারিনী মেয়েটির কালো চোখ দুটি ভীষণ সুন্দর। মুখশ্রী ও দৈহিক গড়ন বলে দেয় মেয়েটি মালেয়শীয় বা ইন্দোনেশীয় হবে। দুটি কারণে মেয়েটিকে ভিন্ন প্রকৃতির মনে হচ্ছিলো।প্রথমত ও হিজাব পড়া ছিলো, মস্কোতে হিজাব পড়া মেয়ে প্রায় দেখাই যায়না, দ্বিতীয়ত মস্কোতে মালেয়শীয় বা ইন্দোনেশীয় মেয়েও দেখা যায় কদাচিৎ।
ওর সাথে আলাপ করার ইচ্ছে জাগলো। ওকে রুশ ভাষায় প্রশ্ন করলাম
মঈনুলঃ তুমি কি এই ইউনিভার্সিটিতে পড়ো?
সুরিয়ানীঃ হ্যাঁ।
মঈনুলঃ তোমাকে আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে হয়না।
সুরিয়ানীঃ স্বাভাবিক। আমি অল্প কিছুদিন হয় এসেছি।
মঈনুলঃ কতোদিন?
সুরিয়ানীঃ ছয়মাস।
মঈনুলঃ ও তুমি কি এখন ল্যাংগুয়েজ কোর্সে পড়ছো?
সুরিয়ানীঃ হ্যাঁ।
মঈনুলঃ কিন্তু তুমি তো ভালোই রুশ ভাষা বলতে পারো! ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ছাত্রী হিসাবে তো অনেক ভালো বলছো।
সুরিয়ানীঃ এখানে আসার আগে আমি দেশে থাকতে কয়েকমাস কোর্স করেছিলাম, তাই হতো একটু বেটার বলছি।
মঈনুলঃ ও আচ্ছা।
সুরিয়ানীঃ তাছাড়া আমি আন্ডারগ্রেড-এর ছাত্রী না। ল্যংগুয়েজ কোর্সের পরপরই আমি সরাসরি মাস্টার্স-ড় ভর্তি হবো
মঈনুলঃ কি করে সম্ভব সেটা?
সুরিয়ানীঃ আমি দেশে গ্রাজুয়েশন করেছি।
মঈনুলঃ ও
এরপর আমি রুশ থেকে ইংরেজীতে চলে এলাম। ভাবলাম এশিয়ান মেয়ে, তার উপর প্রায় আমাদের অঞ্চলেরই মেয়ে। ও নিজেও বোধহয় ইংরেজীতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। তাছাড়া, সারাক্ষণ রুশ বলতে বলতে একঘেয়ে হয়ে গেছে। কিছুটা বৈচিত্রের জন্যও ইংরেজীতে কথোপকথন প্রয়োজন।

মঈনুলঃ ডু ইউ লাইক মস্কো?
সুরিয়ানীঃ ইয়েস, মস্কো ইজ এ ভেরী নাইস সিটি। ডু ইউ স্টাডি হেয়ার? (আমাকে প্রশ্ন করলো ও)
মঈনুলঃ ইয়েস।
সুরিয়ানীঃ ইন হুইচ কোর্স?
মঈনুলঃ কোর্স? ও নো নো। আই হ্যাভ পাস্ড দ্য বেসিক ইউনিভার্সিটি এডুকেশন।
সুরিয়ানীঃ অলরেডী গ্র্যাজুয়েটেড?
মঈনুলঃ ইয়েস। নাউ আই এ্যাম ডুইং মাই পি, এইচ, ডি,
সুরিয়ানীঃ ও মাই গড! ইউ লুক সো ইয়াং!
মঈনুলঃ ইজ ইট?
সুরিয়ানীঃ ইয়েস অফ কোর্স। আই থট দ্যাট ইউ আর এ স্টুডেন্ট। (ওর চোখে বিস্ময়)
আসলে আমাকে যে আমার বয়সের তুলনায়, অনেক ইয়াং মনে হয় সেটা আমি জানি। আমার মনে আছে, এম,এস, কমপ্লিট হওয়ার পর একবার ছুটিতে দেশে গিয়েছিলাম, তখন একজন আমাকে বলেছিলো, “আপনি এম, এস, পাশ! আপনাকে দেখলে তো মনে হয় ইন্টারমিডিয়েট পড়েন।”জানিনা বয়সের তুলনায় ইয়াং দেখালে, এটা ভালো না মন্দ?
হঠাৎ মনে হলো মেয়েটির নামই তো জানা হয়নি। মেয়েটিকে জিজ্ঞাস করলাম।
মঈনুলঃ হোয়াট্স ইওর নেম?
সুরিয়ানীঃ সুরি। (দন্ত স-এর উচ্চারণটা তালব্য-শ-এর মত নয়, ইংরেজী এস-এর মত)
মঈনুলঃ সুরি? ওহ্ নাইস নেম।
সুরিয়ানীঃ ইওর নেম?
মঈনুলঃ মঈনুল।
সুরিয়ানীঃ মুসলিম?
মঈনুলঃ ইয়েস।
সুরিয়ানীঃ ফ্রম হোয়ার?
মঈনুলঃ বাংলাদেশ।
সুরিয়ানীঃ ও, বাংলাদেশ।
মঈনুলঃ ইওর কান্ট্রি?
সুরিয়ানীঃ ইন্দোনেশিয়া।

যা ভেবেছিলাম তাই। মেয়েটি ইন্দোনেশীয়। ইন্দোনেশিয়া বললেই আমার মনে পড়ে ক্লাস এইটের পাঠ্য পুস্তকে পড়া গল্প, ‘দারুচীনি দ্বীপ’। তার পাশাপাশি মনে পড়ে আরেকটি গান – ‘দূর দ্বীপবাসিনী, চিনি তোমারে চিনি, দারুচীনিরও দেশে তুমি বিদেশিনী-গো, সুমন্দ ভাষিনী’ – জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা অদ্ভুত সুন্দর একটা গান।
আমি সুরির দিকে তাকালাম। এই সেই দারুচিনী দ্বীপের মেয়ে!

এর পর সুরি একটা অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন করে বসলো।
সুরিয়ানীঃ আর ইউ ম্যারেড?
আমি বুঝতে পারছিলাম না, কি উত্তর দেব? প্রথম পরিচয়েই ও এরকম একটা প্রশ্ন করবে ভাবিনি। যাহোক, প্রশ্ন যেহেতু করেছে, উত্তরতো একটা দিতেই হবে। বললাম
মঈনুলঃ অ্যাঁ, অলমোস্ট ম্যারেড।
সুরিয়ানীঃ হোয়াই অলমোস্ট?
মঈনুলঃ নট কমপ্লিটলি ম্যরেড বাট……
সুরিয়ানীঃ ওহ্, এনগেজড। আ্যম আই রাইট।
মঈনুলঃ অলমোস্ট
সুরিয়ানীঃ ইজ শি রাশান?
মঈনুলঃ হোয়াই ডু ইউ থিংক দ্যট শি ইজ এ রাশান?
সুরিয়ানীঃ জাস্ট থিংকিং। হেয়ার ইউজুয়ালী বয়েজ গেট ম্যরেড টু রাশান গার্লস।
ওর প্রশ্নের আর উত্তর না দিয়ে, পাল্টা প্রশ্ন করলাম
মঈনুলঃ আর ইউ ম্যারিড?
সুরিয়ানীঃ নো, নো, আই অ্যাম নট।
অনেকটা প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বললো সুরি। আমি বিস্মিত হবার ভান করে বললাম।
মঈনুলঃ ইউ আর নট ম্যারিড! হাউ কাম! হোয়ার ডু দ্য ইন্দোনেশিয়ান বয়েজ লুক। ডু দে নট সি, সাচ এ বিউটিফুল গার্ল?
সুরিয়ানীঃ ওহ্, আই ডু নট লাইক দেম। দে অলসো ডু নট লাইক মি।
মঈনুলঃ হোয়াই? হাউ? ইউ আর সো বিউটিফুল দে শুড লাইক ইউ। (আমি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলছিলাম। আসলে মনের মধ্যে কৌতুক ছিলো)
সুরিয়ানীঃ মে বি, ইট ইজ বি কজ অফ দ্যাট আই অ্যাম ভেরী স্ট্রং

আমি সুরির দিকে আর একবার ভালো করে তাকালাম। মেয়েটির মাথায় হিজাব। ক্রীম কালারের স্কার্ফ দিয়ে পুরো মাথাটা এবং ঘাড়-গলা সব ঢাকা। পরনে ট্রেডিশনাল ইন্দোনেশিয়ান ড্রেস। পোষাকটি ঢিলেঢালা হওয়ার দেহের বাঁকগুলো চোখে পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। ইউরোপীয় তরুনীরা যেখানে দেহের বাঁকগুলো ফুটিয়ে তোলা টাইট উত্তেজক পোষাক পড়াটাই বেশী প্রেফার করে। সেখানে সুরির পোষাক সম্পুর্ণ বিপরীত। যদিও মেয়েটি সুন্দরী তারপরেও ওর শালীণ পোষাকের কারণে কোন উত্তেজনার উদ্রেক হয়না। তবে মেয়েটির দেহের গড়ন তুনামূলকভাবে স্ট্রংই মনে হলো।
কথা বলতে বলতে লাইনে আমার নাম্বার চলে এলো। আমি কাজ সেরে বের হতে আবার সুরির প্রবেশ করর পালা। তাই আর কথা হলোনা। ওকে শুধু বললাম।
মঈনুলঃ এক ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়ি। মাঝে মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হবে আশা করি।
সুরিয়নীঃ আই হোপ সো। (হালকা স্বরে বললো সুরি)

***

Peoples’ Friendship University (PFU) যার বাংলা নাম করা হয়েছে ‘গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়’ ৫ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সরকার কর্তৃক। সোভিয়েত সরকার ২২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম আফ্রিকার জনগণের মুক্তি সংগ্রামের প্রবাদ পুরুষ পাত্রিস লুমুম্বা (Patrice Lumumba)-র প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তার ‘পাত্রিস লুমুম্বা গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠের মূল উদ্দেশ্য ছিলো তৃতীয় বিশ্বের পশ্চাদপদ জনগণকে উন্নত শিক্ষার আলো পেতে সাহায্য করা। তবে অনুন্নত দেশের পাশাপাশি উন্নত দেশের ছেলেমেয়েদের কেউ কেউও এখানে পড়তে আসে।

রাশিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৭৫৭ সালে।অর্থাৎ আজ থেকে ২৫৬ বছর আগে। সেই তুলনায় গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় নতুন হলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি ভীষণ বেড়ে যায়। কারণ, এখানকার বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই ছিলো বিদেশী। ১৯৬৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট ব্যাচটি বের হয়, যেখানে ৪৭ টি দেশের, ২৮৮ জন গ্র্যাজুয়েট ছিলো। আজ সেখানে ১৪০টি দেশের ২৯ হাজারেরও বেশী ছাত্র-ছাত্রী এখানে অধ্যয়নরত। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৭ হাজার গ্র্যাজুয়েট বিশ্বের ১৭০ টি দেশে কর্মরত আছে।

তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতর ঢুকলে দেখ যাবে সাদা, কালো, বাদামী, পিত, ইত্যাদি নানা রঙের নানা বর্ণের মানুষ। সবার সাথে সবার মেলামেশা চলাফেরা ওঠাবসা থেকে সব রকমের রেশিয়াল ও কালচারাল বাঁধা দূর হয়ে এক গভীর বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়ে গণমৈত্রী নামকরণের সার্থকতা প্রমাণিত হয়।

মস্কো শহরের একপাশে, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো স্টেশন ইউগো জাপাদনাইয়া ও মেট্রো স্টেশন বেলিয়াভা-কে সংযোগকারী নিখুঁত সড়ক মিখলুকো মাকলাইয়ার দুপাশে ছড়িয়ে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস। মনোরম এই ক্যাম্পাসটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন ফ্যাকালটির একাডেমিক বিল্ডিং, ডরমিটরি, ক্যান্টিন, ক্যাফে, গাছগাছালীতে ভরা পার্ক, ফোয়ারা, বাগান, শিশুদের খেলার জায়গা, লাইব্রেরী, ইনডোর ও আউটডোর স্টেডিয়াম, জিমন্যাশিয়াম, পলিক্লিনিক, ইত্যাদি। ক্যাম্পাসের এক পাশে রয়েছে একটি ছোট বন আর তার পিছনে একটি সুদৃশ্য লেক। সব মিলিয়ে একটি শৈল্পিক সৌন্দর্য্য।

***

আজ সোমবার উইক এন্ড-এর পরদিন। সুপারভাইজার বলেছেন দুটার পরে ফ্যাকালটিতে উনার সাথে দেখা করতে। তাই সকালে কোন কাজ নেই। ভাবলাম একটু আড্ডা দেয়া যাক। সোজা চলে গেলাম, ইউনিভার্সিটির মেইন বিল্ডিং-এ। এখানকার একতলায় একটা বড় ক্যাফে আছে। এর একপাশের বিশাল কাঁচের প্রদর্শ গবাক্ষ দিয়ে বিল্ডিং-এর সামনের বিস্তৃত চত্বর, বাগান, আর মিখলুকো মাকলায়া সড়ক অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সেই সড়কের আন্ডার পাস ফুরে যখন কোন রূপসী বেরিয়ে আসে। ক্যাফেতে বসা সব পুরুষ মানুষের চোখ চলে যায় সেইদিকে । ছোট মুর্তি থেকে যখন দেহাবয়বটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে পুরুষদের চোখও বিস্তৃত হতে থাকে। তারপর বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি এসে মুর্তিটি রূপসীর পূর্ণ রূপ পেলে, পুরুষের মন বলে, “বাহ্, বেশতো মেয়েটি!”

আমাদের বাংলাদেশীদের বেশ ভালো আড্ডা জমে এই ক্যাফেতে। বিদেশে পড়ালেখা করার কারণে, আমাদের বাঙালী ছাত্র-ছাত্রীদের সুযোগ হয়নি মধুর ক্যান্টিনে চায়ের কাপে ঝড় তোলার। তাই দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর জন্য পি,এফ,ইউ,আর-এর ক্যান্টিনে বসে কফির কাপে ঝড় তুলি। এখন ফল সিজন চলছে। রাস্তা ও ফুটপাথের দুপাশের পপলার, বার্চ, ম্যাপেল, ইত্যাদি গাছ থেকে ঝরে পরা লাল, মেরুন, হলুদ পাতার উপর দিয়ে হেটে হেটে চলে গেলাম মেইন বিল্ডিং-এ। ওপেন ক্যাফেটিতে এসে চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, কোন বাঙালী নেই। সকাল নয়টা মাত্র। তাই বোধহয় এখনো কেউ আসেনি। দশটার মধ্যে বেশ জমে যায়। কি করব? যা হোক একটা টেবিলে বসে আপাততঃ একা একাই এক কাপ কফি খাই। সামনে এগুতেই দেখলাম একটি টেবিয়ে সুরি বসে আছে।

যাক কাউকে পাওয়া গেল। এখন আর একা কফি খেতে হবেনা।
মঈনুলঃ কেমন আছো সুরি?
চমকে উঠে তাকালো সুরি।
সুরিয়ানীঃ ওহ্! তুমি।
মঈনুলঃ চমকে উঠলে কেন?
সুরিয়ানীঃ না কিছুনা, অন্যমনষ্ক ছিলাম। দাঁড়িয়ে কেন? বসো।
মঈনুলঃ বসার জন্যই তো এসেছি। তার আগে বলো কফি খাবে কিনা?
মিষ্টি হাসলো, সুরি।
সুরিয়ানীঃ উঁ, এই মাত্রই খেলাম। অসুবিধা নেই তোমার সাথে আরেকবার খাওয়া যাবে।
আমি দু’কাপ কফি নিয়ে এসে। ওর পাশে বসলাম।
থ্যংক ইউ বলে মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে, ওর পেলব সুন্দর মসৃন হাতটি দিয়ে কফির কাপটি তুলে নিলো।
পুরো শরীর ঢাকা বলে ওর ঐ হাতটুকুই শুধু দেখা যায়, আর দেখা যায় ওর পবিত্র ভাব ফুটানো অপূর্ব মুখশ্রী। ওর রাঙা পক্ক পীচ ফলের মত ঠোট যখন কফির কাপটি ছোঁয়ালো, মনে হলো শুভ্র চীনামাটির কাপটি বোধহয় আজ ধন্য হয়েছে।

মঈনুলঃ অন্যমনষ্ক ছিলে কেন? দেশের কথা মনে পড়ছে?
সুরিয়ানীঃ না, তেমন কিছু নয়। আমি আসলে অত হোম সিক ফীল করিনা।
বুঝলাম বেশ শক্ত মেয়ে।
আমি শুরুতে ওকে অত মনযোগ দিয়ে দেখিনি। ওর কনজার্ভেটিভ পোষাক-আষাক এর কারণ হতে পারে। ইদানিং কেন জানিনা ওকে দেখি। বসরাই গোলাপের গুচ্ছ দেখা যায়, এখানকার ফুলের দোকানগুলোতে। এখানে আমার ঠিক সামনেই দেখছি।
মঈনুলঃ ক্লাস আছে?
সুরিয়ানীঃ এইতো পরের ক্লাসটাই। আপাততঃ এখানে বসে আছি।
মঈনুলঃ এখানে তোমাদের দেশের কতজন আছে?
সুরিয়ানীঃ আছে কিছু ইন্দোনেশীয়। আমি এক্সাক্ট নাম্বার বলতে পারবো না। আসলে ওদের সাথে আমার যোগাযোগ কম।
মঈনুলঃ ক্লাশ কেমন লাগছে ইউনিভার্সিটিতে?
সুরিয়ানীঃ খারাপ না। ভালো পড়ায় এখানে। হাজার হোক সুপার পাওয়ার। রূশরা আমাদের চাইতে অনেক বেশী জ্ঞানী।
মঈনুলঃ ঠিক কথা। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সব ক্ষেত্রেই তো ওদের বিশাল এচিভমেন্ট।
সুরিয়ানীঃ ল্যাংগুয়েজটা বুঝতে কিছুটা অসুবিধা হয়।
মঈনুলঃ স্বাভাবিক। নতুন ভাষা। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
সুরিয়ানীঃ আমি আশা করি।

এরপর আরো কিছু মামুলী কথাবার্তা হলো ওর সাথে। এর মধ্যে, এক দুজন করে বাঙালী ঢুকতে শুরু করেছে ক্যাফেতে। দু’একজন আমাদের দিকে তাকালো। কারো কারো চোখে কৌতুক ছিলো। মালেক ভাই দূর থেকে হাত দিয়ে ভঙ্গী করে যা দেখালেন তার মানে, “মেয়েটি চমৎকার!”

কিছুক্ষণ পরে সুরিকে বললাম
মঈনুলঃ আমি এখন তাহলে উঠি? তোমারও তো ক্লাস আছে বোধহয়। হ্যাঁ, ক্লাস আছে। আমিও উঠব?
স্মার্ট ভঙ্গীতে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটি। তারপর ধীরে ধীরে করিডোরের অপর পাশে ক্লাসরূমগুলোর দিকে চলে গেলো। এতগুোলো টাইট প্যান্ট, স্কার্ট, মিনি স্কার্ট পরিহিত মেয়ের মধ্যে ওকে বেমানান লাগলেও অসুন্দরী একদম মনে হচ্ছিলো না।
সুরি চলে যাওয়ার পর। মালেক ভাইদের টেবিলে গিয়ে বসলাম। অলরেডী সাত-আটজন জড়ো হয়ে গেছে। আমি যাওয়াতে সরে বসে আমাকে একটা জায়গা করে দিলো। বিপ্লব বললো
বিপ্লবঃ জানেন ভাইয়া দেশে বি, এন, পি, কি করেছে?
এজাজঃ ও শুধু বি, এন, পি,-র দোষ! তোমার আওয়ামী লীগ কম যায়।
মালেক ভাইঃ রাখো তোমাদের আওয়ামী লীগ-বি, এন, পি, মঈনুলের কথা শুনি।
মঈনুলঃ আমার আবার কি কথা?
মালেক ভাইঃ কৌতুকে চোখ নাচিয়ে বললো,
মালেক ভাইঃ তোমারই তো কথা। একটু আগে গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে বসে ছিলে। বেশ গল্প-গুজব কফি খাওয়া-খাওয়ি হচ্ছিলো।

মঈনুলঃ ও ঐ বিষয়! তা সেতো আমার গার্ল ফ্রেন্ড না।
মোস্তাক ভাইঃ গার্ল ফ্রেন্ড না, তাহলে কি? বেশ দুজনে মিলে খোশ গল্প করছিলে।
মঈনুলঃ আরে এম্নি চিনি ওকে। আপনারা ছিলেন না, ওর সাথে বসে সময় কাটাচ্ছিলাম।
মালেক ভাইঃ মেয়েটি কিন্তু সুন্দরী!
মোস্তাক ভাইঃ জীবনে কত মেয়েই তো দেখলাম। এই দেখো, চারপাশে চটুল পোষাকে সব মেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাবখানা দেখে মনে হয় পোষাক যত সংক্ষিপ্ত বা টাইট হয় ততই বোধহয় ওকে বেশী সুন্দরী মনে হবে। অথচ ঐ মেয়েটিকে দেখো হিজাব পরা অবস্থায়ও কেমন সুন্দর লাগছে!
মালেক ভাইঃ তুমি চালিয়ে যাও মঈনুল। মেয়েটি ভালো। আর তুমিও নীতিবান মানুষ, তোমার সাথে মিলবে ভালো।
মনে মনে ভাবছি, এরা যা মনে করছে তা নয়। এই মেয়ের প্রকৃতি ভিন্ন। সে দূরাতিক্রম্য একটা ব্যবধান রেখে চলে। সেই ব্যবধান আকস্মিকভাবে ঘুচে যাবে এমন আশা করা যায়না। আবার ভাবলাম, আমিও কি একটি ব্যবধান তৈরী করছি না?
***

এখানে পি, এইচ, ডি, স্টুডেন্টদেরকে ক্লাস নিতে হয়। আমিও দুইটা ক্লাস নেই। গত সেমিস্টারেও নিয়েছি। এই সেমিস্টারে কয়েকটা ক্লাস অলরেডী নিয়ে ফেলেছি। একদিন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাস নেয়ার জন্য রূমে ঢুকে দেখলাম নতুন একজন বিদেশী ছাত্র। দেরীতে ভর্তি হয়েছে সম্ভবতঃ। দেখে মনে হলো ইন্দোনেশিয়ান। ভাবলাম ক্লাস শেষ হলে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব। আমাকে আর জিজ্ঞেস করতে হলো না। ক্লাস শেষে ও নিজেই এগিয়ে এসে জানতে চাইলো যে, আমি কোন দেশের। বললাম, “আমি বাংলাদেশের।” “ও আচ্ছা”, ছেলেটি উত্তর দিলো। জানতে চাইলাম, “ক্লাস কেমন লাগলো?”, “জ্বী, ভালো” ছেলেটির উত্তর। “তোমার নাম কি?” আমি আবার প্রশ্ন করলাম। “আহমেদ”। “বেশ! তোমার দেশের একটা মেয়েকে জানি, সুরি নাম।” ও একটু ভাবলো। আমি বললাম, “ল্যাংগুয়েজ কোর্সে জার্নালিজমে পড়ে”। এবার ও মুখ খুললো, ” ও হ্যাঁ, একটা মেয়ে আছে। সুরিয়ানী নাম।”
আমিঃ ও যে বললো, সুরি!
আহমেদঃ হ্যাঁ, ওটাই ও সংক্ষেপে বলেছে।
বুঝলাম ওর পুরো নাম সুরিয়ানী, সংক্ষেপে বলে সুরি।

***

ডিসেম্বর মাস চলছে। কনকনে ঠান্ডা। এখন আর বাইরে ঘোরাঘুরি করার কোন অপশন নেই। বিল্ডিং-এর ভিতরে ভিতরে সময় কাটাতে হয়। সন্ধ্যার দিকে ইন্টারক্লাবের অডিটোরিয়ামে গেলাম ভিয়েতনামী স্টুডেন্টদের একটা কনসার্ট দেখতে। চমৎকার করেছে ওরা কনসার্ট। আমি খুব অবাক হলাম। যেখানে আমাদের বাংলদেশীদের অনুষ্ঠান হয় বিশৃংখল সেখানে ওদের অনুষ্ঠান খুবই সুশৃংখল। এখানে হলের ভিতরে হৈ চৈ উচ্চস্বরে কথা বলা নেই, কোন মেয়ের নাচ দেখে শিষ দেয়া, অভদ্র কমেন্ট করা নেই। আমরা বাংলাদেশিরা অনুষ্ঠান হলে নিজেদের পারফর্মার খুঁজেই পাইনা প্রায়। সেখানে ওদের অনুষ্ঠানে সব পারফর্মারই ওদের। কেউ গান গাইছে, কেউ নাচছে, কেউ কবিতা বলছে, আর কি বোর্ড থেকে শুরু করে গিটার পর্যন্ত সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ওদের পারফর্মাররাই বাজাচ্ছে। বুঝলাম ভিয়েতনাম আমাদের চাইতে অনেক বেশী এগিয়ে গিয়েছে। অথচ এই ভিয়েতনামের দেশ স্বাধীন করতে লেগেছিলো দশ বছর আর আমাদের লেগেছিলো মাত্র নয় মাস। আর ওরা স্বাধীন হলো ১৯৭৫-এ আর আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম ১৯৭১-এ। আর এখন আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটিতে ব্যস্ত, এইদিকে ওরা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। সুন্দর কনসার্টটি দেখে মন ভালো হওয়ার কথা, কিন্তু নিজের দেশের দৈন্য দেখে আমি মন খারাপ করে বের হলাম। তিনতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখি সুরিয়ানী নামছে। ওকে দেখে আবার মন ভালো হয়ে গেল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাড়ালাম।

মঈনুলঃ সুরিয়ানী।
সুরিয়ানীঃ ওহ্, তুমি। (মিষ্টি হাসলো ও)
মঈনুলঃ হ্যাঁ, কনসার্ট দেখতে এসেছিলে?
সুরিয়ানীঃ হ্যাঁ। তুমি?
মঈনুলঃ আমিও। এখন কোথায় যাচ্ছ?
সুরিয়ানীঃ কোথাও না। মানে নিজের রূমে যাচ্ছি।
মঈনুলঃ কাজ আছে কোন? ব্যস্ত?
সুরিয়ানীঃ না কোন কাজই নেই। ফ্রী। কেন?
মঈনুলঃ চলো তাহলে নীচের ক্যাফেতে গিয়ে কফি খাই।
সুরিয়ানীঃ ওকে। (আবারও মিষ্টি হাসলো সুরি)

অনেকদিন ধরে ভাবছি ওকে রূমে দাওয়াত দেব, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না। আজ ভাবলাম কথাটা বলি।

মঈনুলঃ আগামীকাল তোমার কোন কাজ আছে সুরি?
সুরিয়ানীঃ না, কেন বলতো?
মঈনুলঃ আগামীকাল ষোলই ডিসেম্বর, আমাদের বিজয় দিবস।
সুরিয়ানীঃ ও কনগ্র্যাচুলেশনস্। কিছু হবে? কোন অনুষ্ঠান?
মঈনুলঃ অনুষ্ঠান হবে, তবে সেটা উইক এন্ডে। আপাতত আমি ব্যক্তিগত একটা অনুষ্ঠান করবো। আমি তোমাকে আমার রূমে দাওয়াত দিতে চাইছিলাম।
মুহূর্তে খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো ওর মুখ।
সুরিয়ানীঃ তাই? কখন?
মঈনুলঃ সন্ধ্যার দিকে আসো। একসাথে ডিনার খাবো। নাকি তুমি ব্যাস্ত থাকবে?
সুরিয়ানীঃ না না, ব্যাস্ততা কিসের (ও একটু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো)। আমি আসবো। অবশ্যই আসবো।

***

আমার রূমের দেয়ালে একটি বিশাল বড় পোস্টার ছিল আমার প্রিয় ফুল কৃষ্ণচূড়া গাছের। অদ্ভুত সুন্দর এই ফুলগুলো! আমার ছোটবেলায় মনে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তার মাঝখানে ঘন সবুজ চওড়া আইল্যান্ডের উপর সারি সারি দাঁড়িয়ে ছিলো অপরূপা কৃষ্ণচূড়ার বিথি। বসন্তের শেষের দিকে, বৈশাখ এলো এলো বার্তা নিয়ে যখন থরে থরে ফুটে উঠত এই সুদৃশ্য প্রসুন। মনে হতো কোন স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য যেন ধরায় নেমে এসেছে।

ছবিটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, সুরিয়ানী প্রশ্ন করলো

সুরিয়ানীঃ কোথাকার ছবি এটা?
মঈনুলঃ বাংলাদেশের। আমার প্রিয় ফুল, কৃষ্ণচূড়া। সুন্দর না ফুলগুলো?
সুরিয়ানীঃ হ্যাঁ, খুব সুন্দর! ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia।
মঈনুলঃ তুমি জানলে কি করে?
সুরিয়ানীঃ ইন্দোনেশীয়াতেও আছে এই ফুল।
মঈনুলঃ তাই? আমি ভেবেছিলাম যে, শুধু বাংলাদেশ ইন্ডিয়ায়ই এটা আছে।
সুরিয়ানীঃ না মনে হয়। অনেক দেশেই থাকার কথা। আর এর জন্মস্থান মাদাগাস্কার।
মঈনুলঃ মাদাগাস্কার? জানতাম না তো।
সুরিয়ানীঃ তোমার দেশের অনেক ফুলই আমাদের দেশের সাথে কমোন হওয়ার কথা। এশিয়া তো।

আমি এতদিন ভেবেছিলাম কৃষ্ণচূড়া একান্তই আমাদের। যেভাবে আমরা তাকে আপন করে নিয়েছি। সুরিয়ানীর দিকে আড়চোখে তাকালাম। ওকে কি কৃষ্ণচূড়ার সাথে তুলনা করা যেতে পারে? পারে হয়তো, অবশ্য ইতিমধ্যে ওকে একবার আমি বসরাই গোলাপের সাথে তুলনা করে ফেলেছি।

মঈনুলঃ আমি যখন ক্লাস এইটে পড়তাম তখন তোমাদের দেশকে নিয়ে একটা লেখা পড়েছিলাম, আমাদের পাঠ্য বই্য়ে।
সুরিয়ানীঃ তাই?
মঈনুলঃ হ্যাঁ।
সুরিয়ানীঃ কি লেখা ছিলো ওখানে?
মঈনুলঃ একটা ভ্রমণ কাহিনী। সেখানে লেখক তোমাদের দেশের নাম কি দিয়েছিলো জানো?
সুরিয়ানীঃ কি নাম?
মঈনুলঃ ‘দারুচিনি দ্বীপ’।
সুরিয়ানীঃ মানে কি এর?
মঈনুলঃ Cinnamon Island
সুরিয়ানীঃ ও হ্যাঁ, আমরা দারুচিনি প্রোডিউস করি।
মঈনুলঃ তাই তো তোমাদের দেশের এই নাম দেয়া হয়েছে।
সুরিয়ানীঃ সুন্দর নাম।
মঈনুলঃ একটা গানও আছে।
সুরিয়ানীঃ কি গান?
মঈনুলঃ তোমাদের দারুচিনি দ্বীপের মেয়েকে নিয়ে।
গালে লাল আভা ফুটে উঠলো সুরিয়ানীর। পাশাপাশি আগ্রাহান্বিত দৃষ্টি নিয়ে বললো।
সুরিয়ানীঃ তাই? কি গানটি? রোমান্টিক গান?
মঈনুলঃ হ্যাঁ, রোমান্টিক গান।
আরো লাজুক হয়ে উঠলো সুরিয়ানী। আবদার করলো
সুরিয়ানীঃ শোনাও না।
মঈনুলঃ আমি তো গান গাইতে পারিনা। তবে কথাগুলো তোমাকে বলতে পারি।
সুরিয়ানীঃ তাই বলো।
মঈনুলঃ দূর দ্বীপবাসীনি, চিনি তোমারে চিনি, দারুচিনিরো দেশে, তুমি বিদেশীনিগো
সুমন্দভাষীনি।।
সুরিয়ানীঃ তুমি তো কেবল বাংলা বলছো, আমি বুঝবো কি করে? ট্রান্সলেট করো।
মঈনুলঃ O girl from an unknown Island, I know, I know you,
In the cinnamon island, you are a foreigner girl,
সুরিয়ানীঃ ‘সুমন্দভাষীনি’ – হোয়াট্স দ্য মিনিং?
মঈনুলঃ ডিফিকাল্ট টু ট্রান্সলেইট। মে বি, দ্য গার্ল হুস ভয়েস ইজ ভেরি সুইট।
সুরিয়ানীঃ ওকে। ভেরি নাইস লিরিকস্। সো সুইট। গো এ্যহেড, ট্রান্সলেইট মি আদার লাইনস।
মনে হলো একটি রোমান্টিক গানের পরশে, ওর চোখমুখ জোনাকীর আলোর মতো ঝিকমিক করছে। আমি কৌতুক করার জন্য বললাম
মঈনুলঃ না থাক। ট্রান্সলেইট করা কঠিন। বাকীটা থাক।
সুরিয়ানীঃ না না থাকবে কেন? প্লীজ ট্রান্সলেইট মি অল, আই লাইক্ড দ্য সং
মঈনুলঃ প্রশান্ত সাগরে তুফানেও ঝড়ে, শুনেছি তোমারি অশান্ত রাগীনি।।
In the Pacific Ocean at storm and hurricane, I heard your billowy melody
সুরিয়ানীঃ বাহ্! তারপর বলো
মঈনুলঃ বাজাও কি বুণো সুর পাহাড়ী বাশীতে, In your flute collected from hilly area, you are playing such a wild tune !
সুরিয়ানীঃ নাইস! দেন (আবেগের মাত্রা বাড়ছে সুরিয়ানীর)
মঈনুলঃ বনান্ত ছেয়ে যায় বাসন্তী হাসিতে।। The whole forest is covered with spring smile
সুরিয়ানীঃ বেশ! তারপরের লাইন?
মঈনুলঃ তব কবরী মূলে, নব এলাচীরো ফুল
দুলে কুসুম বিলাসিনী।।
দোলে, In your pigtail swings fresh Cardamom flower,
O flower lover

সুরিয়ানীঃ ফিনিশড্?
মঈনুলঃ ইয়েস।
সুরিয়ানীঃ সাচ এ লাভলী সং! সো রোমান্টিক!
বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো সুরিয়ানী। জানিনা ওর চোখ কি বলছে। ইউরোপীয় রমণীদের সবারই দেহেমনে তাপ আছে, কিন্তু হৃদয়ের উত্তাপটা সবার মধ্যে আছে বলে মনে হয়না। প্রাচ্য দেশীয় শালীন মার্জিত রূচীর সুরিয়ানীর মধ্যে সেই উত্তাপ আছে বলে মনে হলো।

সুরিয়ানীঃ হু ইজ দ্য পোয়েট?
মঈনুলঃ কাজী নজরুল ইসলাম, আওয়ার ন্যাশনাল পোয়েট।
সুরিয়ানীঃ হি মাস্ট বি এ ভেরী রোমান্টিক ম্যান!
মঈনুলঃ ইয়েস হি ওয়াজ।
সুরিয়ানীঃ আই থিংক, ইউ আর অলসো রোমান্টিক।
আমি একটু লজ্জ্বায় পড়ে গেলাম।
মঈনুলঃ হাউ ডু ইউ ফাইন্ড?
সুরিয়ানীঃ যে এত সুন্দর একটা গানের পুরোটাই মনে রাখতে পারে আর তা এত সুন্দর অনুবাদ করতে পারে সে রোমান্টিক না হয়ে যায়?

কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। কিছু না বলে চুপ রইলাম। রুশ ভাষায় বলে ‘মালচানিয়ে জোলোতা’ মানে ‘সাইলেন্স ইজ গোল্ডেন’। আমি ওর নিস্পাপ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এমন সুন্দর রুপ-শুভ্র পেলবতা মর্ত্যের নয়, স্বর্গবাসী কোন শিল্পির তুলিতেই প্রসারিত।

সুরিয়ানীঃ মঈনুল।
মঈনুলঃ কি?
সুরিয়ানীঃ আমাকে একটু গেয়ে শোনাবে গানটি?
মঈনুলঃ আমি? গান গেয়ে শোনাবো? মাথা খারাপ! আরে আমি তো গান গাইতে পারিনা।
সুরিয়ানীঃ একেবারেই পারোনা?
মঈনুলঃ উঁ, গান তো সবাইই গায়। সেই হিসাবে বাথরুম সিংগার বলতে পারো।
হেসে ফেললো সুরিয়ানী।
সুরিয়ানীঃ বাথরুম সিংগার তো সবাই। আমার মনে হয় তুমি গান-পাগলা মানুষ। সুযোগ পেলেই আপন মনে গান গাও। আমার সামনে কেবল সংকোচ হচ্ছে। সমস্যা নেই গাও আমি অভয় দিলাম, উপহাস করব না। আমার গানের সুরটা শুনতে ইচ্ছা করছে।

এর আগেও লক্ষ্য করেছি পুরুষদের তুলনায় তন্বিদের ত্বরিত বুদ্ধি তীক্ষ্ণতর ও বিদ্যুৎগতি সম্পন্ন।
আমি অনিচ্ছা সত্বেও গানটা কিছুদূর গাইলাম। তারপর ভালো হচ্ছেনা ভেবে লজ্জ্বা পেয়ে থেমে গেলাম।

মঈনুলঃ এইতো। এরকম। (লাজুক গলায় বললাম)
সুরিয়ানীঃ পুরোটা তো গাইলে না। খুব সুন্দর হচ্ছে, পুরোটা গাও।
আমি এবার পুরোটাই গাইলাম।
সুরিয়ানীঃ কই তুমি ভালো গাওনা? আমার তো বেশ ভালো লেগেছে। খুব সুন্দর কন্ঠস্বর তোমার।
মঈনুলঃ আসলে আমার গানে ভীষণ আগ্রহ আছে। শেখার খুব ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু নানা কারণে শেখা হয়নি।
সুরিয়ানীঃ শিখলে ভালো করতে। তোমার মধ্যে গান আছে।
মঈনুলঃ আসলেই আমি ভালো গাইনা। কিন্তু আজ হঠাৎ তুমি পাশে আছো বলেই বোধহয় ভিন্ন আবেগ এসেছে। আবার এমনও হতে পারে রোমান্টিক সুরের ছোঁয়ায় এই সাধারণ কন্ঠস্বরই তোমার কানে মধু ঢালছে।মনে হলো ও যেন প্রভাত রঙে রন্জিত হয়েছে। ব্লাশ করে লজ্জ্বায় আরক্তিম হলো।

সুরিয়ানীঃ গানটার সুরও কিন্তু খুব সুন্দর! কে দিয়েছে সুর?
মঈনুলঃ কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই।
সুরিয়ানীঃ উনি সুরকারও ছিলেন?
মঈনুলঃ হ্যাঁ, উনি খুব বড় প্রতিভা ছিলেন। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, গল্পকার।
সুরিয়ানীঃ একসাথে এত প্রতিভা! এরকম তো কমই আছে এই পৃথিবীতে। আশ্চর্য্য! অথচ উনার নাম আমরা বিদেশীরা জানিনা! এমন কেন হলো?
মঈনুলঃ বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ। আমাদের নিয়ে কে ভাববে বলো? আমদের কবিকে কে পরিচিত করিয়ে দেবে
সারা বিশ্বে?
সুরিয়ানীঃ না না তোমার চিন্তা-ভাবনা ঠিক নেই। অন্যের জন্য অপেক্ষা কর কেন? অন্যে তোমার কাজ কখনোই করে দেবেনা। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। তোমার কি ধারণা টলষ্টয়, দস্তয়ভস্কি, পুশকিনকে বিশ্বের দরবারে অন্যেরা পরিচয় করে দিয়েছিলো? রুশরাই উদ্যোগ নিয়ে তাদের লেখক কবিদের সারা বিশ্বে তুলে ধরেছিলো। তোমাদেরই দায়িত্ব, তোমাদের এত বড় কবিকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দেয়া।

খাবারের পরিবেশন অসামান্য না হলেও সামান্য ছিলনা। আমি ওর জন্য যত্ন করে রেধেছিলাম চিকেন বিরিয়ানী, সব্জি, আর তেলাপিয়া মাছের কারি। সাথে ছিলো গ্রীন সালাদ। এদেশের ডিনার টেবিলে হার্ড ড্রিংক স্বাভাবিক। কিন্তু আমি ওতে কখনোই অভ্যস্ত হতে পারিনি। তাই আমার সাজানো ডিনারের টেবিলে ওর অভাবটা থেকেই যায়। তার জায়গা করে নিয়েছে কোক ও স্প্রাইটের বোতল আর হালকা লিমোনেড। খাওয়ার শেষে ডেসার্ট আইটেম হিসাবে করেছিলাম সেমাই। আমাদের দেশী মিষ্টান্ন ওর জন্য এক্সোটিক হতে পারে তাই ভেবেই করা।
সুরিয়ানীকে বললাম
মঈনুলঃ আয়োজন অতি সামান্য!
সুরিয়ানীঃ একদম না। এযে রাজভোগ! দেখতে খুব রুচীকর লাগছে!
মঈনুলঃ নাও তাহলে শুরু করো।
প্লেট তুলে খেতে শুরু করলো। ধীরে সুস্থে খেয়ে চলছে সুরিয়ানী। আমি চুরি করে দেখছি। ওর আহার ভঙ্গিতে কেমন একটি রূপ সুষমা ও স্বাচ্ছন্দ্য ঝরে পড়ছে। একটু আনমনা একটু সচেতনা। হঠাৎ করেই ও যেন সহজ ও স্বচ্ছন্দ হয়ে গেল।
সুরিয়ানীঃ কই তুমি তো দেখছি আমাকে নিয়েই ব্যস্ত। নাও নিজেও ভালো করে খাও।
বলে আমার খালি গ্লাসে জুস ঢেলে দিলো।

সুরিয়ানীঃ মীট-রাইসটা তো তুমি সামান্যই খেলে। বেশ মজার খাবার। কি নাম এটার?
মঈনুলঃ বিরিয়ানী।
সুরিয়ানীঃ ও।
মঈনুলঃ তুমি মাছ নিলে না যে?
সুরিয়ানীঃ মাছ? হ্যাঁ মাছ আমার ভালো লাগে কিন্তু কাটা ভয় পাই। তাই সাবধানে খাই।
মঈনুলঃ ঠিক আছে এই টুকরোটা নাও, এখানে কাটা কম আছে।
টুকরাটা তুলে দিতে গিয়ে অসতর্কে ওর হাটুতে হাটু লেগে গেল। মুহুর্তে ওর মুখের ব্লাশ আমার চোখ এড়ালো না। পর মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে, একটু সরে বসলো ও।
খেতে খেতে বললো ওর পরিচিতা একজন বাঙালী মেয়ে আছে। একবার ওর রূমে খেয়েছিলো। সেই মেয়েটি মিষ্টি জাতীয় একটি খাবার রান্না করেছিলো, সেটা ওর ভালো লাগেনি। আমি প্রশ্ন করলাম

মঈনুলঃ কি নাম খাবারটির?
সুরিয়ানীঃ নাম মনে নাই। তবে খুব সরু মাকারনি দুধ, চিনি, আর দারুচিনি, এলাচ দিয়ে রাধা।
বুঝতে পারলাম সেমাইয়ের কথা বলছে। হে ধরনী দ্বিধা হও। আমিও যে আজ ওর জন্য সেমাই রেধেছি। এত যত্ন করে রাধা খাবার বিফলে যাবে?
বিরিয়ানী খাওয়া শেষ হলে। জুস খেতে খেতে বললাম
মঈনুলঃ এবার ডেজার্ট টা দেই?
সুরিয়ানীঃ দাও। কেমন ডেজার্ট? কেনা না নিজে বানিয়েছ?
মঈনুলঃ নিজেই বানিয়েছি, তোমার জন্য অতি যত্ন সহকারে।
বেশ উৎফুল্ল হয়ে বললো
সুরিয়ানীঃ দাও দাও দেখি কেমন তোমার ডেজার্ট।
আমি মনে মনে ভাবছি। এবার হবে কৌতুক!

যখন বাটির ঢাকনা তুলে ওকে সেমাই দেখালাম ও চিৎকার করে উঠলো.

সুরিয়ানীঃ নো নো, নট দিস ওয়ান। ও মাই গুডনেস! দিস ইজ হোয়াট আই ডিড নট এক্সপেক্ট।

তারপর আমরা দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে, অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম।
(চলবে)

দেশ-বিদেশ আমাদের খন্ড দৃষ্টি ও অভিজ্ঞতাহীন সংকীর্ণতার অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় সৃষ্টি মাত্র। এই মৃম্ময় ধরনীর সমগ্রটাই আমাদের দেশ এবং রঙে রূপে সৌন্দর্য্যে এত বিভাজন সত্বেও হৃদয় বোধে ও মানবিক আবেগ অনুভূতিতে একই পিতা ও একই মাতা আদম-হাওয়ারা উত্তরাধিকারী সকল মানব-মানবীই অভিন্ন ও একই সত্তায় বিলীন।

নজরুল গীতি

দূর দ্বীপবাসীনি, চিনি তোমারে চিনি
দারুচিনিরো দেশে, তুমি বিদেশীনিগো
সুমন্দভাষীনি।।
প্রশান্ত সাগরে তুফানেও ঝড়ে
শুনেছি তোমারি অশান্ত রাগীনি।।
বাজাও কি বুণো সুর পাহাড়ী বাশীতে
বনান্ত ছেয়ে যায় বাসন্তী হাসিতে।।
তব কবরী মূলে, নব এলাচীরো ফুল
দুলে কুসুম বিলাসিনী।।
O girl from an unknown Island, I know, I know you,
In the cinnamon island, you are a foreigner girl,
In the Pacific Ocean at storm and hurricane, I heard your billowy melody
In your flute collected from hilly area, you are playing such a wild tune !
The whole forest is covered with spring smile
In your pigtail swings fresh Cardamom flower,
O flower lover

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.