দিল্লী কা লাড্ডু – পর্ব ১০

দিল্লী কা লাড্ডু – পর্ব ১০
————————— রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

দিল্লী শহরটা আসলে একটা আধা-মরুভূমির উপর অবস্থিত। ফলের গাছ এখানে খুব একটা নজরে পড়লো না হাসানের। সবুজ গাছও কম। যা গাছ আছে তার বেশীরভাগই কাঁটা গাছ! তবে ভগ্নদশা দিল্লীর সিটি সেন্টারটিকে তারা গুছিয়েছে খারাপ না। যদিও এটা ইংরেজদেরই তৈরী করা, তারপরেও ধরে রাখাটাও একটা কাজ। সিটি সেন্টারের এক জায়গায় উড়ছে একটা বিশাল আকৃতির তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা, তার নীচেই করমচাঁদ গান্ধীর সেই আবেগ সঞ্চারী চরকা-টি। ইন্টারেস্টিং হলো যে, ভারতের পতাকায় প্রথমে গান্ধীর চরকাটি থাকলেও, পরে আর সেটা রাখা হয়নি। বরং সেই স্থান পূরণ করেছে, বুদ্ধিজম-এর ধর্মচক্র! এটা নিয়ে অল্প বয়সে হাসানের মনে একটা খটকা ছিলো! বন্ধু মহলে অনেকে বলতো যে, ওটা চরকাই তবে একটু ভিন্নভাবে আঁকা! কিন্তু হাসান পরে জেনেছিলো যে, একসময় পতাকা থেকে ‘চরকা’ সরিয়ে ‘ধর্মচক্র’ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিলো। কাজটা করেছিলেন আম্বেদকর। ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ছিলেন ভারতের সংবিধানের মুখ্য স্থাপক। নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আম্বেদকর আবিষ্কার করেন তার পূর্বপুরুষ মহরেরা আসলে প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তাদেরকে গ্রামের বাইরে সমাজচ্যুতদের ন্যায় থাকতে বাধ্য করা হলো, অবশেষে তারাই অস্পৃশ্যতে পরিণত হয়েছিলো। তিনি এই ব্যাপারে তার পান্ডিত্যপূর্ণ বই ‘কারা শুভ্র ছিল?’ তে বর্ণনা দেন। ১৯৫৬ সালে একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে বৌদ্ধ হন। শোনা যায় যে, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতের জাতীয় পতাকায় এই ‘বৌদ্ধ ধর্মচক্র’-এর সংযোজন-কে একদম ভালো চোখে দেখেননি!

ম্যাগডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে হাসান সুনিতা-কে সুধালো,
“এখন কোথায় যেতে চাও?”
আনিতা: কোথায় নেবে বলো?
হাসান: তোমাকেই তো অপশন দিলাম। তুমি কোথায় যেতে চাও বলো।
আনিতা: তুমি যেখানে নেবে। আমিও সেখানেই যাবো।
হাসান: এটা হেয়ালী হচ্ছে! আমি এখানে একজন বিদেশী কিন্তু! এই প্রথম এলাম তোমাদের শহরে। আমি কি কিছু চিনি?
আনিতা: (রহস্য সুর করে বললো) হুম, তুমি বিদেশী! তোমাকে দেখে কিন্তু কেউ-ই বুঝতে পারবে না যে, তুমি একজন বিদেশী। আর এটার একটা সুবিধাও আছে।
হাসান: কি সুবিধা!
আনিতা: এই ধরো, আমি যদি এখন একজন শেতাঙ্গ বা কৃষ্ণাঙ্গর সাথে ঘুরতাম, তাহলে কি সবাই ধরে ফেলতো না যে, হিন্দুস্তানী লাড়কি এক ফিরিঙ্গীকা সাথ ঘুমতা হ্যায়!
হাসান: ও! ইউরোপে এই সংকীর্ণতা নেই! ঢাকাতে এই সংকীর্ণতা আছে! একজন বাংলাদেশী মেয়ে যদি কোন বিদেশীর সাথে ঘোরাঘুরি করে, বাংলাদেশীরা এটাকে ভালো চোখে দেখে না। অতি প্রাচীন নগরী দিল্লীতেও কি এই সংকীর্ণতা রয়েছে?
সুনিতা: প্রাচীনতা দিয়ে আসলে বিচার না। বিচার তো সংস্কৃতি দিয়ে। একটি জাতি প্রাচীন হলেই যে তার সংস্কৃতি খুব উন্নত হবে তা নয় কিন্তু!
হাসান সুনিতার দিকে তাকালো। মেয়েটা খুব ভারী কথা বলছে! বিষয়টা আসলেই তাই। অতি প্রাচীন জাতির মধ্যেও ব্যাপক সংকীর্ণতা থাকে!
সুনিতা আবার বললো।
সুনিতা: হিন্দু ধর্মে একসময় সাগর পারি দেয়া পাপ ছিলো, তুমি কি এটা জানো?
হাসান: জানি। ‘রামানুজান’ সিনেমাটা-য়ও তা দেখেছি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা ‘সপ্তপদী’ উপন্যাসেও বিষয়টি এসেছে। পরে এটা সিনেমা হয়েছিলো সুচিত্রা-উত্তম অভিনীত।
সুনিতা: কৌন? সূচিত্রাজী?
হাসান: হ্যাঁ। চেনো?
সুনিতা: বিলকুল। ‘Aandhi’ মে এ্যাকটিং কেয়া থা না? জবরদস্ত এ্যাকটিং থা!
হাসান: সূচিত্রাজী কিন্তু আমাদের দেশেও খুব জনপ্রিয়!
সুনিতা: জরুর হোগা। উয়ো তো বাঙ্গালী-ই হ্যাঁয় না।
এবার হাসান চুপ মেরে গেলো। ভারতের এই অংশে সম্ভবত ভারতীয় বাঙালী ও বাংলাদেশী বাঙালীর মধ্যে কোন পার্থক্য ওরা দেখে না।
সুনিতা: বাই দ্যা ওয়ে, দিল্লীতে বিষয়টা ফিফটি-ফিফটি!
হাসান: কোন বিষয়টা?
সুনিতা: ঐ যে, একজন বিদেশীর সাথে একটি হিন্দুস্তানী লাড়কীর মেলামেশা-কে কেমন চোখে দেখে দিল্লীবাসীরা।
হাসান: ও।
সুনিতা: ভূগোল ও পাসপোর্টের বিচারে তুমি একজন বিদেশী হতে পারো। কিন্তু এই ক্ষণে আমার ভূবনে তুমি একজন আপন-দেশী!
একটা ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেলো হাসানের চারদিক দিয়ে। হাসানের মনের একাংশ বলছে না না না, নাটক বন্ধ করো। আরেক অংশ বলছে নাটক চালিয়ে যাও, এটাই নিয়তি!

হাসান: তুমি যেন কোথায় যেতে চাইছিলে?
সুনিতা: আমি জানিনা কোথায় যাবো!
হাসান: মানে কি?
সুনিতা: তোমার এত বয়স হলো, তাও বোঝ না?
হাসান: কি বুঝি না?
সুনিতা: আরে, নারীরা আসলে জানেই না যে, তারা কি চায়!!!
হাসান: ও! হ্যাঁ। কিছুটা অভিজ্ঞতা তো রয়েছেই! একটা রুবাই মনে পড়ে গেলো
সুনিতা: (চোখ সরু করে) কি অভিজ্ঞতা রয়েছে? কি রুবাই মনে পড়ে গেলো?
হাসান: কোনটা আগে বলবো? অভিজ্ঞতা না রুবাই?
সুনিতাকে মনে হলো কিছুটা ঈর্ষান্বিত! বললো, “অভিজ্ঞতা থাক। রুবাই বলো।”
হাসান আবৃত্তি করলো,

‘নারীর মন এক অনিশ্চিতা, দ্বিধায় ভরা অস্থিতি,
এই তো দেখি জোয়ার ভরা, আবার ভাটায় সঙ্গীতি!
দোদুল্যমান মন প্রকৃতি, অন্বয়হীন কার্যক্রম,
অধৈর্য তার মেজাজ রীতি, নিরাকৃতি অনুক্রম!’

সুনিতা: বাহ! কার লেখা? নজরুল?
হাসান: তুমি চেনো নজরুল-কে?
সুনিতা: না চেনার কি আছে? বাঙালী শায়ের মানেই তো ‘রবি ঠাকুর’ আর ‘নজরুল’। বাই দ্যা ওয়ে শায়ের আমার দুর্বলতা!
হাসান: তোমাকে প্রথম দেখেই কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো, তুমি খুব পোয়েটিক!
সুনিতা: থাক, আর Flatter করতে হবে না। (কপট সুরে বললো)
হাসান: খোশামুদি নয়। স্বর্গের অপ্সরা ধরায় নেমে আসবে, আর কাব্য ভালোবাসবে না, তা কি আর হয়?
সুনিতা: আবার ফ্লাটারিং? বাই দ্যা ওয়ে, বললে না তো রুবাই-টি কার লেখা।
হাসান: আমার লেখা।
সুনিতা: হোয়াট? ইউ রাইট পোয়েম? তুম শায়ের লিখতা হ্যায়!
হাসান: এমন চিৎকার করে উঠলে যে!
সুনিতা: মাই গুড! আমি একজন কবির সাথে কথা বলছি! তুম কভি হু?
হাসান: এত হৈচৈ করার কিছু নেই। আমি কোন নামী-দামী কবি নই। যা লিখি মনের আনন্দে লিখি!
সুনিতা: কিতাব লিখা হ্যাঁয়? শায়ের-কি?
হাসান: হুম।
সুনিতা: নেট মে মিলেগা?
হাসান: হাঁ। আমাজন-মে হ্যাঁয়।
সুনিতা: ঠিক হ্যাঁয়। পড়ুঙ্গা, ঘর যাকে, আজ রাত মে।
হাসান: হা হা হা! কিভাবে পড়বে? ওগুলো তো সব বাংলায় লেখা!
এবার সুনিতার মুখ কালো হয়ে গেলো।
সুনিতা: ঠিক হ্যাঁয়। কভারলেট তো দেখুঙ্গা জরুর! আর যিতনি দিন তুম ইহাপে হ্যাঁয়। তর্জমা করদেগি।
হাসান: ওরে বাবা! কবিতা লেখাই কত কঠিন কাজ, তার উপর ওর তর্জমা! কোন ভাষায় তর্জমা করবো? হিন্দি অর ইংলিশ?
সুনিতা: দোনোহি চলেগা। চাহো তো মিক্স করো! তুম ফিল্ম দেখা হ্যায়, ‘Saajan’ নাম কি?
হাসান: বিলকুল দেখা। উয়ো তো মেরা জওয়ানী-কি ফিল্ম থা। মাধুরী দিক্সিত-নে এ্যাকটিং কেয়া থা।
সুনিতা: গানটা মনে পড়ে?
হাসান: কোন গানটা?
সুনিতা: ঐ যে, Tu Shayar Hai Main Teri Shayari, Tu Aashiq Hai Main Teri Aashiqui,
হাসান: Tujhe Milne Ko Dil Karta Hai, Tujhe Milne Ko Dil Karta Hai O Mere Saajana।
সুনিতা: হাঁ। এহি গীত হ্যাঁয়। এইসি তারা তুম ভি শায়ের হ্যায়, অওর ম্যায় তুমহারা কাভিতা!

কথাবার্তার ধরন-ধারন ঘটনাপ্রবাহ বহুদূর গড়াবে বলে মনে হচ্ছে! এই দিল্লীতে এসে অখ্যাত কবি হাসান ভাটা বয়সে তার কবিতা-কে পেয়ে গেলো! হাসানের মন বলছে, ‘হে মূর্খ থামো থামো থামো!’

হাসান: ওকে সুনিতা। তুমি ইন্ডিয়া গেইট চেনো?
সুনিতা: ইয়ে কেয়া? তুম তাং করতা হ্যায়? ম্যায় ইস শহরকি লাড়কি হ্যায়। তুম হামকো পুছতা হ্যায়, ম্যায় ইন্ডিয়া গেইট জানতা হ্যাঁয় অর নেহি!?
হাসান: না, মানে আমাকে ইন্ডিয়া গেইট দেখাতে নিয়ে চলো।
সুনিতা: চলিয়ে কাভিজ্বী।

সে সময় সোভিয়েত ভাঙা দেশগুলোতে প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল চালু হয়েছিলো খুব! একেবারে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছিলো। ঐ সুবাদে হাসান তার ওয়ান সীটেড ডরমেটরীর রুমে বসে টিভির পর্দায় সিনেমা দেখতো খুব বেশী। হাসানের বন্ধুরা বলতো, “তুই লেখাপড়ায় তো ভালো-ই, আবার সিনেমার নেশায়ও থাকিস! পড়ার সময় কখন পাস বলতো?” পরীক্ষা পাসের পড়া তৈরী করতে হাসানের জীবনেও কখনো ভালো লাগেনি। ওতে কোন আনন্দই পেত না সে। যতটুকু পড়তো সেটা বাধ্য হয়ে। বরং জানার জন্য পড়ায় তার আগ্রহ ছিলো সবচাইতে বেশী। রহস্যময় ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ সে পড়েছিলো প্রবল আনন্দ নিয়ে। একই উচ্ছাস নিয়ে পড়েছিলো ‘পার্টিকেল ফিজিক্স’। কেমন করে একেকটা পার্টিকেল ভেঙে অনেকগুলো হয়ে যায়, আবার কয়েকটি মিলে হয়ে যায় একটি! জগৎ তো এই ভাঙা গড়ারই খেলা! একটি পার্টিকেল কোথায় আছে? তার অবস্থান কোঅর্ডিনেটের ঠিক কোন জায়গাটায়? হা হা হা! অনিশ্চয়তার বিজ্ঞান ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ বলে কখনো-ই জানা যাবে না, কোথায় আছে ঐ পার্টিকেলটি, “আই এ্যাম হেয়ার, আই এ্যাম দেয়ার,
আই এ্যাম নো হোয়ার, আই এ্যাম ইভরিহোয়ার!”
জ্ঞানশাখাগুলোর মধ্যে কনিষ্ঠতম শাখা বিজ্ঞানের প্রয়োজনই হয়েছিলো নিশ্চয়তা বিধান করার লক্ষ্যে, অথচ আশ্চর্য্য, যে সেই বিজ্ঞানই শেষমেশ বলতে বাধ্য হলো যে, জগৎজুড়ে কেবলই অনিশ্চয়তা!”

যাহোক যে সিনেমার কথা হচ্ছিলো। সিনেমা দেখতে দেখতে হাসান জীবন আর সিনেমার মধ্যে তালগোল পাঁকিয়ে ফেলেছিলো! সিনেমা-জীবন, জীবন-সিনেমা। কোনটা ঠিক ,সিনেমাকে জীবনের মত করে তৈরী করা, নাকি জীবনকে সিনেমার মত করে দেখা? হাসানের জীবনটা শেষমেশ সিনেমায়ই পরিণত হয়েছিলো। এই দিল্লী-তে নতুন করে শুরু হলো আরেকটি সিনেমা!

আসবে না সুখ এই জীবনে, জীবন সুখের জায়গা নয়,
বৃথাই লোকে থিওরী বানায়, তত্ত্বকথার ফুল ঝরায়!
আলোর সাথেই আঁধার আছে, মিলেঝিলেই রাত্রীদিবা,
নীল আকাশেই মেঘ জমে যায়, চমকে ওঠে বিজলীবিভা!

(চলবে)

———————————————————–
রচনাতারিখ: ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সাল
সময়: বিকাল ৪টা ৪৬ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.