দিল্লী কা লাড্ডু – পর্ব ৩

দিল্লী কা লাড্ডু – পর্ব ৩
————————— রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

লিফট নীচে নেমে দরজা খুললে হাসান বাইরে পা রাখলো। গ্রাউন্ড ফ্লোরের পুরোটাই গ্যারেজ। সেখানে কয়েকটি টুলে কিছু সাধারণ মানুষ বসে আছে। বোঝা গেলো তারা বিভিন্ন গাড়ীর ড্রাইভার। অবিকল বনানী বা উত্তরার যেকোন একটা বিল্ডিংয়ের মত পরিবেশ। মেইন গেইট দিয়ে বাইরে নেমে হাসান বাড়ীর নাম্বার প্লেটের দিকে তাকালো। নাম্বার ঠিকই আছে, সেই দূতাবাসের হাউস নাম্বার, রোড নাম্বারের সাথে মেলে, তবে ব্লকটা ভিন্ন। এতক্ষন যা খেয়াল করেনি, এবার তা খেয়াল করলো, নাম্বার প্লেটের নীচে লেখা বাড়ীর মালিকের নাম, মেজর জেনারেল ‘এক্স’। হাসান ভাবলো, ইন্ডিয়াতেও বাংলাদেশের মত একই রীতি সম্ভবত প্রচলিত আছে, পদস্থ আমলা অভিজাত এলাকায় প্লট বরাদ্দ পায়। হঠাৎ হাসানের মাথায় প্রশ্ন খেললো, ‘সুনিতা ঐ জেনারেল সাহেবের মেয়ে নয় তো?!’

এলাকাটির নাম ‘ভাসান্ত বিহার’ মানে ‘বসন্ত বিহার’। এলাকাটি অভিজাত, পাশাপাশি এখানে আছে কিছু দূতাবাস। ঢাকার বনানী-গুলশান-বারিধারার মত। দুই লেনের রাস্তার দুইপাশে তিন তলা থেকে ছয়তলা আধুনিক সিঙ্গেল অথবা ফ্লাটবাড়ী। রাস্তার পিচ মোটামুটি ভালো, তবে কোন ফুটপাত নেই, যেমনটা ছিলো বনানী বা গুলশানের রাস্তাগুলো বছরখানেক আগে। তবে বনানী, গুলশানের রাস্তাগুলো এখন দুইপাশে চমৎকার ফুটপাত হয়েছে টাইলস বিছানো, যেটা ‘ভাসন্ত বিহার’-এ নাই। এটা রাস্তার দুপাশে মাটি, তবে কোন কোন বাড়ীর সামনের রাস্তার মাটিতে অথবা বাড়ীর ভিতরের এক চিলতে আঙিনায় কিছু ফুলের গাছ লাগানো আছে। গাছগুলো দেখলেও মনে হবে যে ঢাকায়ই আছি, কারণ সেখানে রয়েছে কল্কে ফুল গাছ, কৃষ্ণচূড়া গাছ, হলুদ সোনালু, চেরি ফুলগাছ, দেবদারু ও বাগানবিলাস গাছ। কোথাও রাস্তায় ঝরে আছে গলুদ রঙের কল্কে ফুল! এখানেও রাস্তাঘাট ফাঁকা, অল্পস্বল্প মানুষ হাটছে, কোন রিকশা বা অটোরিকশা চোখে পড়ছে না আপাততঃ। স্যুটকেসটি হাতে নিয়ে, হাসান হাটতে শুরু করলো। আসপাশ থেকে তাকে দু’একজন তাকে লক্ষ্য করছে। একজন একটা প্রশ্ন করলো, “— কাহা হ্যায়?”। হাসানের কাছে হিন্দি শব্দটা কিঞ্চিত অপরিচিত মনে হলো। তারপর আঁচ করতে পারলো, শব্দটির অর্থ সম্ভবত: যান-বাহন। বুঝলো, তার এমন সাহেবীয়ানা পোষাক ও চেহারার সাথে বাহনহীনতা ঠিক যাচ্ছে না, এমন লোক গাড়ীতে চড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক! যাহোক, আপাতত হাসান একটা অটোরিকশা-র খোঁজে আছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করলো, “ইয়ে ই ব্লক কিধার মে হায়?”
সে আঙুল দেখিয়ে বললো, “ইহাসে সিধা যাওগি। মেইন রোড পড়েগা। উহাসে অটো লাও, ই ব্লক উস তরফ হোগা। উহাপে এক মার্কেট হ্যায়, উসকো ই-মার্কেট কাহতা হ্যায়।” হাসান ভাবতে শুরু করলো, ই-মার্কেট কি? ওখানে কি কম্পিউটার বা এই জাতীয় কিছু বিক্রি হয়? হলে হোক, তার আপাতত এ্যাম্বেসীটা দরকার। তবে ই-মার্কেটের কথা বলে একটা ওরিয়েন্টশন করা যাবে।

কিছুক্ষণ হাটার পর সে চারলেনের একটা বড় রাস্তা পেলো এখানে আবার রাস্তার দুইপাশে উঁচু ফুটপাত আছে। এটা খুব সম্ভবত এ্যাভিনিউ। ও হ্যাঁ, এই রাস্তা দিয়েই তো ‘ভাসান্ত বিহার’ ঢুকেছিলো সে। আবার আগের জায়গায়ই ফিরে এসেছে হাসান। অভিজাত এই এলাকাটিতে ঢোকার সময় লক্ষ্য করেছিলো মেইন রাস্তার শুরুতেই বড় বড় ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তায় আংশিক বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে বড় বড় করে লেখা ‘দিল্লী পুলিশ’। ঢাকার মতই অবস্থা! ঢাকায়ও তো অভিজাত এলাকায় ঢুকতেই ব্যারিকেড ও পুলিশের তল্লাশী পোস্ট। যাহোক এই রাস্তায় কিছুদূর হাটার পর একটা খালি অটো পাওয়া গেলো। হাত তুলে তাকে থামালো হাসান। বললো, “মেরা ই ব্লক চাহিয়ে।”
অটোচালক: ই ব্লক মে কাহা যাওগি?
হাসান: উহাপে এক এ্যাম্বেসী হায়। রোড নাম্বার পনেরা। উসকা নজদিক মে, এক মার্কেট ভি হায়, ই-মার্কেট কাহতা হ্যায়।
অটোচালক: ঠিক হ্যায়, বইঠিয়ে।
মিনিট সাতেক চালানোর পরই লাল ইটের একতলা একটা মার্কেটের মত দেখা গেলো। অটোচালক বললো, “এহি হায় ই-ব্লক কি, ই-ব্লক মার্কেট। এবার হাসান বুঝলো, ঢাকার উত্তরা বা বনানী স্টাইলে বিভিন্ন ব্লকের মধ্যে আবার ঐ ব্লকের একটা মার্কেট আছে। ব্লকের নামেই মার্কেটের নাম। হাসান বললো, “রোড নাম্বার পনেরা কাহা হায়?” বলতে না বলতেই চোখে পড়লো একটা সাইনবোর্ড যেখানে রোড নাম্বার ও ঐ এ্যাম্বেসী-র নাম স্পষ্ট লিখে তীর চিহ্ন দেয়া আছে। এবার হাসান নিজেই বললো, “উহা পে, আপ লেফট টার্ন লিজিয়ে।” অটো বামের রাস্তায় গেলো। একটা পার্কেট পাশ দিয়ে মোড় নিলো অটোরিকশাটি। হাসানের কেন যেন মনে হলো, পার্কটি একটা খাদে নেমে গিয়েছে, আর ওখানে প্রচুর কাঁটা গাছ আছে! পরে অবশ্য একটা প্রাচীন ইতিহাস জানতে পেরেছিলো সে ঐ কাঁটা গাছগুলো আর দিল্লী-কে নিয়ে।
বামে কিছুদূর যাওয়ার পরই একটি বড় পতাকা দেখতে পেলো সে। প্রতিক্ষিত সেই দূতাবাসের তেরঙ্গা পতাকা, যার সাথে বাংলাদেশের পতাকার কিছুটা মিল আছে! অটোওয়ালাকে ধন্যবাদ দিয়ে ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়লো হাসান।

দূতাবাসটি একটি চারতলা ফ্লাট বাড়ীর ভিতরে। সামনে একটি কাঠের গার্ডরুম রয়েছে। সেখানে ইউনিফর্ম পরিহিত একজন মাঝ বয়সী গার্ড দেখা গেলো। হাসান তাকে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলো, “ইয়ে এক্স এ্যাম্বেসী হ্যাঁয়?” হাসান-কে হতবাক করে গার্ড উত্তর দিলো, “জ্বী, এটাই এক্স দেশের এ্যাম্বেসী।”
হাসান: আপনি বাঙালী?
গার্ড: জ্বী, আমি বাঙালী।
হাসান: বাহ্‌! ভালো-ই তো হলো। এখানে নিজের লোক পেয়ে গেলাম।
গার্ড: (মুচকি হেসে) জ্বী। আমাকে নিজের লোক ভাবতে পারেন।
হাসানের মনে হলো। এই গার্ডও সম্ভবত মনে মনে খুশী। কারণ অপ্রচলিত এই দূতাবাসে বাঙালী কেউ হয়তো কালেভদ্রে আসে, অথবা এই প্রথম এলো!
হাসান তার স্যুটকেসটি নিয়ে এগিয়ে যেতে, গার্ড বললো, “স্যুটকেস ভিতরে এলাউ করবে না। আপনি বরং স্যুটকেস নীচে আমার কাছে রেখে যান।” হাসান একটু বিব্রত হলো। একদিকে অচেনা জায়গায় স্যুটকেসটি রাখা নিরাপদ মনে হচ্ছিলো না, অপরদিকে স্যুটকেস নিয়ে দূতাবাসের ভিতর ঢোকাটাও তো ভদ্রোচিত নয়! তারপর ভাবলো, বাঙালী ভাই (হোক না পশ্চিমবাংলার!), আমার জিনিস নিরাপদেই রাখবে আশা করি। একজন অবাঙালী হলে হাসান এতটা নিরাপদ মনে নাও করতে পারতো! হাসান মোটামুটি নিশ্চিন্ত মনেই স্যুটকেস-টি তার কাছে রাখলো, আর মনে মনে ভাবলো, ‘গার্ডটি কি আদৌ আঁচ করতে পারবে এর ভিতর কত হাজার ডলার আছে!’ হাসান সামনে এগোয়ে যেতে গার্ড বললো, “আপনি ভিতরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যান।”

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার পর সে দেখলো, এটি একটি এ্যাপার্টমেন্ট, এবং আর শুরুতেই একজন রিসিপশনিস্ট বসে আছে। অসম্ভব রূপসী নারীটির শ্বেত গাত্রবর্ণ ও মুখের গড়ন দেখে হাসান বুঝতে পারলো যে, সে হিন্দুস্থানী নয়। তবে ভারতেরই অন্য কোন স্টেটের হবে (পরে অবশ্য হাসান জানতে পেরেছিলো যে, সে মহিলার জাতিপরিচয় যা আঁচ করেছিলো, তাই সঠিক)। হাসানখে দেখে হাসিমুখে সে বললো, “ইউ আর হাসান?” হাসানও সুন্দর হেসে বললো, “ইয়েস, আই এ্যাম।”
রিসিপশনিস্ট সামনের একটি রুম দেখিয়ে বললো, “প্লিজ সিট ডাউন হেয়ার। দা এ্যাম্বাসাডার ইজ কামিং।”

হাসান ঐ রূমটিতে গিয়ে বসলো। বেশ পরিচ্ছন্ন সুন্দর টিপটপ একটি লিভিং অর ওয়েটিংরূম। এর মধ্যে একজন মাঝবয়সী মহিলা এসে বললেন, “আপ কেয়া পিয়েগা, চাই অর কফী?” হাসান হেসে বললো, “কফী।” মিনিট তিনেক পরে একটি ট্রে তে করে ফার্স্টক্লাস এক কাপ কফী এনে হাসানকে দেয়া হলো। ব্লাক কফীর পেয়ালায় চুমুক দিয়ে অবসাদ অনেকটা দূর হলো হাসানের। সে সোফায় কিছুটা হেলান দিয়ে বসলো।

মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর, হঠাৎ করেই ঐ রুমে প্রবেশ করলেন বছর পঞ্চান্ন বয়সের একজন সুদর্শন পুরুষ। বললেন, “হ্যালো মিস্টার হাসান। হাউ আর ইউ?” হাসান, হেসে হাত বাড়িয়ে বললো, “ফাইন মিস্টার এ্যাম্বাসাডার! হাউ আর ইউ?”

ঐ দিন কিছু আলোচনা ও কাজের পর হাসান বুঝতে পেরেছিলো যে, রাস্ট্রদূত অসম্ভব ভদ্রলোক। হাসানের কাজটা সহজেই হয়ে যাবে আশা করা যায়। ঐদিন দক্ষিণ আমেরিকান দেশের ঐ রাস্ট্রদূতের সাথে হাসানের কি কাজ ও কথা হয়েছিলো, সেই আলোচনা পরে করা যাবে। আপাতত এই গল্পের মূল কাহিনীতে আসা যাক।

দূতাবাসের কাজ সেরে বাইরে বেরিয়ে এলো হাসান। এবার তাকে একটা ভালো হোটেল খুঁজতে হবে। ভালো মানেই দামী হোটেল নয়। মাঝারি মূল্যের কিন্তু নিরাপদ, আবার সিটি থেকে খুব দূরে যেন না হয়। হাসান এতক্ষণে বুঝে গেছে যে, ‘ভাসান্ত বিহার’ নিউ দিল্লী-তে এবং সেটা সিটির একপাশে। ঐ বাঙালী গার্ডটিকেই প্রশ্ন করলো হাসান, “আচ্ছা, দিল্লীতে ভালো হোটেল কোথায় হবে বলতে পারেন?” মনে হয় একটু অবাক হলো গার্ডটি, “আপনি বুকিং করে আসেননি?” “না”, হাসান বললো। হ্যাঁ, বুকিং করেই আসা যেত। তবে হাসান একটা এ্যাডভেঞ্চারই চেয়েছিলো! সবকিছু রোবটের মত হলে ভালো লাগে না। দেশেও হাসান এটা করে, নতুন কোন জায়গায় গেলে, আগে থেকে কারো সাথে যোগাযোগ না করে, হঠাৎ করে উপস্থিত হয়। তারপর সেখানেই অন দা স্পট কারো না কারো সাথে পরিচিত হয়ে তার/তাদের মাধ্যেমেই সব ব্যবস্থা করে। এটার চার্মই আলাদা!

গার্ডটির পাশে এবার নতুন আরেকজনকে দেখলো। তবে সে বাঙালী নয়। সে বললো, “আপ কনাট প্লেস মে যাইয়ে। উহাপে বহুত সারি হোটেল হ্যায়! আচ্ছা হোটেল মিলেগা।” হাসান একটু মিলানোর চেষ্টা করলো, উপরে রিসিপশনিস্ট অবশ্য অন্য জায়গার নাম বলেছিলো। তবে সে এমন ভঙ্গিতে বলেছিলো যে, ভালোমন্দের কোন গ্যারান্টি সে দিতে পারবে না। কনাট প্লেসের নাম আগে শুনেছে হাসান। কনাট প্লেস দিল্লীর সিটি সেন্টার। আসলে স্মৃতি হাতরালে সেই সময়কার পৃথিবীর সব চাইতে রূপসী মেয়ে আনিতা-র বলা কত কিছুই তো মনে পড়ে! আনিতা বলেছিলো, “দিল্লী মে আওগি, ম্যায় তুমকো কনাট প্লেস দেখাউঙ্গা। উহাপে ইউরোপ কি তারা আন্ডারপাস ভি হ্যায়।” দিল্লীর যন্তর-মন্তর-এর কথা আনিতা হাসানকে বলেনি। প্রাচীন এই অবজারভেটরীর কথা হাসানই পড়েছিলো সত্যজিত রায়ের লেখা গোয়েন্দা উপন্যাস ফেলুদার বইয়ে। যন্তর-মন্তর-এর কথা আনিতা-কে বলায় আনিতা অনেকক্ষণ রিনিঝিনি সুরে হেসেছিলো, “তুম যন্তর-মন্তর ভি জানতা হ্যায়!” আনিতার হাত ধরে দিল্লীর কনাট প্লেস ও যন্তর-মন্তর দেখার একটা স্বপ্ন দেখতো হাসান। সেই স্বপ্ন কখনো পূরণ হয় নি হাসানের। এবার কি সেই সখ পূরণ হতে পারে? না, এবারও চাইলেও পূরণ হবে না, যদিও হাসান দিল্লীতে। কারণ হাসান জানে, আনিতা ইন্ডিয়াতে থাকে না। সাত সমুদ্র না হলেও কমপক্ষে তের নদী পার হয়ে হাসান এসেছে দিল্লীতে; আর আনিতা দিল্লী ছেড়ে চলে গিয়েছে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে!!!!!

——————————————–

রচনাতারিখ: ২৮শে আগস্ট, ২০১৯ সাল
সময়: রাত ২ টা ১০ মিনিট

ঢাকার অংশবিশেষের কপি দিল্লী-র এলাকাগুলোতে হাটতে গিয়ে হাসানের মনে পড়লো সেই বিখ্যাত ইংরেজী গানটি।
গানটি কেন যেন একসময় ঝড় তুলতো হাসানের মনে।

I don’t take coffee, I take tea, my dear
I like my toast done on one side
And you can hear it in my accent when I talk
I’m an Englishman in New York.

See me walking down Fifth Avenue
A walking cane here at my side
I take it everywhere I walk
I’m an Englishman in New York.

Oh, I’m an alien, I’m a legal alien
I’m an Englishman in New York
Oh, I’m an alien, I’m a legal alien
I’m an Englishman in New York

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.