দিল্লী কা লাড্ডু – পর্ব ৫

দিল্লী কা লাড্ডু – পর্ব ৫
————————— রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

অটোওয়ালা মিনিট পনের চালানোর পর একটা হোটেলের সামনে এনে থামালো। ভালো মানের হোটেলই মনে হলো। হাসান, সিঁড়ি বেয়ে উঠে মেইন ডোর ঠেলে ভিতরে রিসিপশনে গেলো। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেলো যে হোটেলে কোন এসি রুম খালি নেই, কেবল একটি মাত্র কোনরকম নন-এসি রুম খালি আছে। নন-এসি রুম নিতে মন চাইলো না হাসানের। তারপর জানার জন্য রুম ভাড়া জানতে চাইলো হাসান। যে ভাড়া তারা বললো, সেটা শুনে চোখ কপালে উঠে গেলো হাসানের!
ম্যানেজার: নেহি চলেগা রুম?
হাসান: নো, থ্যাংকস।
ম্যানেজার: ঠিক হ্যায়। আপ কিৎনি রুপেয়া দেগা?
এবার হাসানের সন্দেহ হলো! এরা বোধহয় মাছের বাজারের মত খেয়াল-খুশী অনুযায়ী দাম হাঁকায়, তারপর মুলামুলি শুরু করে। এটা হাসানের একদম পছন্দ না। হাসান উল্টা ঘুরে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলো।
অটোওয়ালা: কেয়া হোটেল পসন্দ নেহি হুয়া?
হাসান: নেহি।
অটোওয়ালা: ম্যায়নে কাহা হ্যায় না, ইহাপে রেট মাহাঙ্গি হ্যাঁয়! আপকো দুসরি হোটেল দেখাউঙ্গা, চলিয়ে।
আরো একটি হোটেল দেখালো অটোওয়ালা কনাট প্লেসের আশেপাশেই। এটাও ভালো মানের, তবে ভাড়া অনেক বেশী। যেখানে কেবল রাতটাই কাটাবে, তার পিছনে অযথা এত টাকা খরচ করতে চায়না হাসান।
অটোওয়ালা: ঠিক হ্যায়। আভ ম্যায়, আপকো মেরা পসন্দকি হোটেল দেখাউঙ্গা।
হাসান: ঠিক আছে চলেন।
এবার অটোওয়ালা অনেকটা পথ চালালো। দিল্লীতে রাত বাড়ছে। তবে রাস্তাঘাটে লোক কমছে না, সেটাও বরং বাড়ছে। হঠাৎ করে হাসান লক্ষ্য করলো, এইদিকে রাস্তা সরু ও অপরিচ্ছন্ন, জ্যামও আছে। কোথায় এলো সে? আবারও আশংকা চেপে ধরলো হাসান-কে! উপরে সাইনবোর্ডে লেখা দেখলো ‘কারোলবাগ’। এবারকিছুটা স্বস্তিবোধ করলো সে। এই ‘কারোলবাগ’-এর কথা তআকে একজন বলেছিলো ঢাকায়। শুনেছে যে, এখানকার হোটেলগুলোর ভাড়া রিজনেবল!
হাসান: ইয়ে কারোলবাগ হ্যাঁয়?
অটোওয়ালা: হাঁ। এহি হ্যায় কারোলবাগ।
অটোওয়ালা আরো কিছুদূর এগিয়ে জ্যাম ছাড়িয়ে একটা রাস্তায় অটো এগিয়ে নিলো। এই রাস্তাটার সাথে ঢাকার মোহম্মদপূরের একটি সড়কের মিল খুঁজে পেলো হাসান। চারলেন রাস্তাটি থেকে বামদিকের একটি গলিতে ঢুকে গেলো অটোটি বিশ-ত্রিশ মিটার ভিতরে আরেকটি গলির ভিতরে একটা হোটেল, সামনে লেখা ‘লি গ্রান্ড হোটেল’। সেখানে অটো থামালো সে। তারপর হাসানের সাথে অটোওয়ালাও নেমে এলো। এই হোটেলটি মোটামুটি মানের মনে হলো, তবে রিসিপশনটি মামুলি। সেখানে একজন ম্যানেজার দাঁড়িয়ে আছে। হাসান তার সাথে দরদাম করতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত মোটামুটি রিজেনবল রেটে একটা এসি রুম পাওয়া গেলো।
অটোওয়ালা: কামড়া মিলা?
হাসান: হাঁ। মিলা। শুকরিয়া আপকো।
সন্তুষ্ট মনে বললো হাসান। এবার হাসান বুঝলো, এই অটোওয়ালাও একজন ‘এ্যাঞ্জেল ইন দা সিটি’। তাকে পাঠানো হয়েছিলো হাসানকে এই সমস্যায় সাহায্য করার জন্য।!
এবার হাসান অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো, “কিৎনি রূপেয়া চাহিয়ে আপকো?”
অটোওয়ালা: দিজিয়ে আপকো যিৎনি চাহিয়ে।
‘আপনার যা খুশী দিন’ এই এক্সপ্রেশনটি হাসানের পছন্দ নয়, এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।! কিন্তু অটোওয়ালার প্রতি হাসান এতটাই প্রসন্ন ছিলো যে তাকে প্রাপ্য ভাড়ার চাইতে বেশী দেয়া উচিৎ মনে করলো।
হাসান: আপ হি কাহিয়ে, কিৎনি রূপেয়া বে-ইনসাফী নেহি হোগা!
অটোওয়ালা একটা ভাড়া চাইলো। হাসান তার সাথে আরও কিছু মিলিয়ে অটোওয়ালাকে দিলো। এবার অটোওয়ালাকেও প্রসন্ন মনে হলো। ভাড়া পেয়েও অটোওয়ালা গেলো না, দাঁড়িয়ে রইলো। হাসান ভাবলো, ও এখনো দাঁড়িয়ে কেন?
তাছাড়া হাসান এতক্ষণ ম্যানেজারের সামনে অটোওয়ালার সাথে স্পেশালী হিন্দি বলছিলো এই কারণে যে, যাতে ম্যানেজার বুঝতে না পারে যে হাসান ইন্ডিয়ান না। যাহোক, এবার ম্যানেজার সাথে আনুষ্ঠানিকতা।
ম্যানেজার: ঠিক হ্যায়। দিজিয়ে আপকি এনআইডি কার্ড।
এবার সমস্যায় পড়লো হাসান। তার তো কোন ইন্ডিয়ান এনআইডি কার্ড নেই! অগত্যা সে তার পাসপোর্ট বের করে ম্যানেজারের টেবিলের উপর রাখলো। তরুণ ম্যানেজার এবার হাসানের দিকে তাকালো
ম্যানেজার: ও আপনি বাংলাদেসি?
তার ‘বাংলাদেস’ উচ্চারণ-টা বলে দেয় যে, সে হিন্দুস্তানী নয়। এবার হাসান-ও পাল্টা প্রশ্ন করলো
হাসান: আপ হিন্দুস্তানী নেহি হ্যাঁয়? বাঙ্গালী?
ম্যানেজার: ম্যায়, ‘উড়িয়া’।
এবার হাসান কিছুটা আশ্বস্ত হলো।
হাসান: ও উড়িয়া! উড়িয়া তো বাঙ্গালি-ই!
ম্যানেজার: হাঁ, উড়িয়া তো বাঙ্গালী-ই আছে।
হাসান: কি নাম আপনার?
ম্যানেজার: সুসান্ত।
হাসান: সুশান্ত! সুন্দর নাম।
অটোওয়ালাও এতক্ষণ তাদের কথা শুনছিলো। হয়তো সেও একটু অবাক হলো এই ভেবে যে হাসান ইন্ডিয়ান নয়। সে বললো
অটোওয়ালা: কাল আপ ঘুমেগা নেহি? ঘুরলে বোলেন, ম্যায় ঘুমাউঙ্গা।
হাসান: ঠিক আছে। আপনার মোবাইল নাম্বার দিয়ে যান।
মোবাইল নাম্বার দিয়ে অটোওয়ালা চলে গেলো। হাসানের উড়িয়া ম্যানেজার সুশান্তের দেয়া একটি ফর্ম পুরণ করতে লাগলো। এরপর হঠাৎ হাসানের চোখ গেলো উপরের একটা বোর্ডের দিকে, সেখানে লেখা, ‘সার্ভিস চার্জ টেন পার্সেন্ট’। এটা হাসানের পছন্দ হলো না। তাহলে সে হোটেলের যে ভাড়া ঠিক করেছে, তার সাথে আরো কিছু যোগ হলো! সে ম্যানেজারকে বললো
হাসান: সুশান্ত। উপরে ওটা কি লেখা? আমাকে কি আরো ১০ পার্সেন্ট বেশী দিতে হবে?
সুশান্ত: হাঁ। আরো দস পার্সেন্ট দিতে হোবে।
হাসান: না, ভাই। আমি আর বেশী দিতে পারবো না সুশান্ত।
সুশান্ত: ঠিক আছে আমাকে একস রুপেয়া বখশিস দিয়েন।
এটা হাসান মেনে নিলো। হোটেলের কার্ডটা হাসানের দিকে বাড়িয়ে দিলো সুশান্ত। হাসান ঠিকালা পড়লো, ‘গলি নং ৭, চিত্রা গুপ্তা রোড, পাহাড়গঞ্জ, নিউদিল্লী’। হ্যাঁ, এই পাহাড়গঞ্জ-এর কথাই এ্যাম্বেসীর মেয়েটি বলেছিলো, যে এখআনে অনেক হোটেল আছে।
এবার কিছু এ্যাডভান্স দিয়ে কাজ মিটিয়ে লিফটের দিকে আগালো হাসান। যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলো রিসিপশনের উপরে ও পাশে দেবদেবীর ছবি, তাতে মালা ঝুলানো ও সামনে আগরবাতি জ্বালানো। বুঝলো, এই হোটেলের মালিক ধার্মিক হতে পারে!

চারতলার হোটেল রূমটি পছন্দ হলো হাসানের। বেশ প্রশস্ত! বড় বিছানা। এসি সুন্দর কাজ করছে। বাথরুমটাও বেশ! ঠান্ডা-গরম দুটা পানিরই ব্যবস্থা আছে। তবে পানির কোয়ালিটি ভালো না, বেশ খরপানি মনে হলো! হতে পারে, দিল্লীর পানির কোয়ালিটি ভালো না। একটা হট শাওয়ার শেষে ধবধবে বিছানায় ক্লান্ত গা’টি এলিয়ে দিলো সে।

বিছানায় শুয়ে সাতপাঁচ ভাবতে শুরু করলো হাসান। এই দিল্লী, এই ইন্ডিয়া; সেই তিবিলিসি, সেই জর্জিয়া! সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলি, সেই আনিতা! হ্যাঁ, জীবনে সুখের সময়গুলো স্থায়ী হয় না! অন্যদিকে জীবনটা কিছু ভুলের সমস্টি! আবার কিছু ভুল থাকে ‘সুখের ভুল’!

আজ পুরো দিনটাই কাটলো দিল্লী-তে। কিছু সময় দিল্লীর পথে পথে, কিছু সময় এ্যাম্বেসীর ভিতরে। এবার একটা চিন্তা হঠাৎ করে হাসানের মাথায় খেললো, ‘আচ্ছা, দিল্লীর তরুণীদের বেশীরভাগের পরনেই তো সে শাড়ী দেখেনি! বয়স্কাদের পরনে শাড়ী ছিলো, কিন্তু তরুণীরা সবাই-ই তো ওয়েস্টার্ন পোষাকে ছিলো! কেউ কেউ দেশীয় পোষাকে ছিলো, তবে সেটাও শাড়ী নয়, সালোয়ার-কামিসও ঠিক নয়, মর্ডান কিছু দেশীয় পোষাক। তবে কি দিল্লীর মেয়েরা শাড়ী পড়া বন্ধ করে দিলো?! এবার মনে করার চেষ্টা করলো, আনিতা কি শাড়ী পড়তো? নাতো ওওতো শাড়ী পড়তো না! সালোয়ার-কামিসেও ওকে দেখিনি কখনো! সেই কয়েক দশক আগেই তো ও প্যান্ট-শার্ট-টিশার্ট, স্কার্ট-টপস, ইত্যাদি পড়তো! ও হ্যাঁ, একবার ওকে শাড়ী পড়া অবস্থায় দেখেছিলো হাসান। সেটা ছিলো একটা ভারতীয় অনুষ্ঠানে। ভিআইপি গেস্টদের রিসিভ করতে দাঁড়িয়েছিলো আনিতা। হাতে একরাশ কার্নেশন ফুল নিয়ে, খুব ঝলমলে একটা শাড়ী পড়ে দাঁড়িয়েছিলো আনিতা। সেদিন ওর দিকে চোখ পড়ার পর আর চোখ ফেরাতে পারে নি হাসান!!!!!

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১লা সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সাল
সময়: দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট

আজ তাকে শাড়ীতে দেখেছি
————————ড. রমিত আজাদ

মেয়েটিকে প্রায়ই দেখি,
অসম্ভব সুন্দর, নিস্পাপ একটি মুখ,
বৃষ্টির পরে সবুজ সতেজ ঘাস যেমন,
কখনো তুলনা করি বন ছেয়ে যাওয়া পিংক কাসিয়ার সাথে,
ঐ সৌন্দর্য থেকে চোখ সরানো যায়না।
তার অনুপস্থিতি আমার মাঝে শূণ্যতার সৃষ্টি করে।
আবার কখনো কখনো তাকে দেখি,
অনেক মানুষের ভীড়ে হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়,
অনেকটা দক্ষিণা হাওয়ার দিনে,
গাছের পাতা আর সুর্যের আলোর লুকোচুরির মত
আর আমার চোখ ফিরে ফিরে আসে নতুন মুগ্ধতা নিয়ে।

ব্যাতিক্রম কেবল তার পোশাক,
আধুনিক যুগে সব মেয়ে আর অস্টপ্রহর বাঙালী পোশাক পড়েনা,
সালোয়ার-কামিসের পাশাপাশি
প্যান্ট-শার্ট, স্কার্ট-টপস চলছে বেশ,
একসময় এগুলো ছিল নিতান্তই অপ্রচলিত,
ইন্টারনেট আর আকাশ সংস্কৃতির যুগে,
এখন এটাই হয়ত রীতি।

বাঙালী নারীর আজন্ম লালিত পরিচ্ছদ
শাড়ীটা এখন একেবারেই আনুষ্ঠানিক হয়ে গিয়েছে,
খুব ইচ্ছে হতো চপলমতি ইনোসেন্ট ঐ মেয়েটিকে
একবার শুধু শাড়ীতে দেখতে।

অবশেষে দেখলাম,
অপ্রত্যাশিত একটি জায়গায়, হঠাৎ করেই সে,
ফিরোজা রঙের চমৎকার কারুকাজ করা শাড়ী পড়া,
আমি থমকে গেলাম,
অপ্সরী দেখিনি সত্যি,
কিন্তু ঠিক ঐ মুহুর্তে মনে হলো,
সেই তো অপ্সরী ।

চপলমতি হেটে গেল বাতাসে ঢেউ তুলে,
যেন পাহাড়ী ঝর্নার গায়ে ঝরে ঝরে পরছে সোনালী ফুল,
তখনো নামেনি সন্ধ্যা এই ব্যাস্ত নগরীতে,
বসন্ত এলো এলো বলে ঐ আকাশটাও পুরোপুরি নীল।
শাড়ী? হ্যাঁ শাড়ীই তাকে এতটা সুন্দর করেছে,
শাড়ীই তাকে দিয়েছে রমণীর রূপ,
আচ্ছা এই সুন্দর বসনটি কি চিরস্থায়ী হতে পারেনা?
চিরস্থায়ী সৌন্দর্য হয়ে তুলুক ঢেউ দক্ষিণা হাওয়ায়,
নন্দনের প্রসুন হয়ে বসন্ত বাগানে ফুটুক কামিনী,
তোমাকে আমি বারবার শাড়ীতে দেখতে চাই রমণী।
—————————-
রচনাকাল: এপ্রিল, ২০১২

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.