দিল্লী কা লাড্ডু – ১ (ভূমিকা)

দিল্লী কা লাড্ডু – ১ (ভূমিকা)

এই যুগের গল্পের একটা বৈশিষ্ট্য হলো গল্পটা গন্তব্যের শেষ স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছায় না। আগের স্টেশনেই থেমে যায়! এই আগের আগের স্টেশনেই থেমে যাওয়াটা অনেকেই পছন্দ করেন না। কিন্তু তাতে কি? কাহিনীর সমাপ্তিটা লেখককেই করতে হবে কেন? পাঠক নিজেও তো সমাপ্ত করতে পারেন!

যাহোক, আমার এই গল্পের সাথে বাস্তবের কোন চরিত্রের কোন সম্পর্ক নাই। কাহিনীটিও কাল্পনিক! অনুগ্রহপূর্বক এর সাথে কারো জীবনের কোন মিল খুঁজতে যাবেন না। তবে হ্যাঁ, সাহিত্য কিন্তু জীবনেরই দর্পন! গল্প আসলে গল্প নয়! সেও সত্যি! জীবনের গল্প বলেও তো কিছু কথা আছে!

ঘটনার শুরু ঢাকা থেকে। হাসানের হঠাৎ করেই অপ্রত্যাশিত একটা কাজ পড়ে গেলো। কাজটা হবে একটা বিদেশী দূতাবাসে, অথচ ঢাকায় সেই দেশের কোন দূতাবাস নেই। বিশ্বের অনেক দেশের দূতাবাসই বাংলাদেশে নেই। সে আমাদের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণে হতে পারে, আবার দারিদ্রের কারণেও হতে পারে! তাই ঐ দেশগুলোর দূতাবাসের সাথে কাজ পড়ে গেলে দৌঁড়াতে হয় নিকটবর্তী কোন দেশের রাজধানীতে। বাংলাদেশের নিকটবর্তী এমন কোন রাজধানী মানেই দিল্লী! ঢাকা শত শত বছর ধরে বাংলার রাজধানী ছিলো, নবাব মুর্শিদ কুলি খানের কোন এক অসুবিধার কারণে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়ে চলে যায় মুর্শিদাবাদে! অনেকেই মনে করেন যে, এটা ছিলো একটা অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্ত। এর ফলে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ন্যাচারাল ক্যাপিটাল ঢাকা হারায় তার জৌলুশ আর নবাব হারান রাজধানীর এলিটদের সংস্পর্শ ও অনুগ্রহ! একটা রাজধানী বা দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে বা রক্ষা করতে হলে শুধু সৈন্যদল নয়, এলিটদের অনুগ্রহেরও প্রয়োজন রয়েছে। হয়তো কিছুকাল পরে বিদেশী আগ্রাসীদের হাতে মুর্শিদাবাদের পতনের পিছনে এটা একটা বড় কারণ ছিলো বলে অনেকেই মনে করেন।

এদিকে লুটেরা ইংরেজরা একবার চট্টগ্রাম বন্দর দখল করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো। কিন্তু বাংলার সৈন্যদের হাতে বেদম মার খেয়ে পিঠটান দিয়েছিলো তারা। তারপর স্ট্রাটেজি পাল্টে অন্য পথ ধরে। নিজেরাই একটি পোর্ট বানানোর সিদ্ধান্ত নিলো, সেই উদ্দেশ্যে খরিদ করলো, কলিকাতা গ্রাম। কালক্রমে কলিকাতা হলো ক্যালকাটা। পলাশীর ট্রাজেডীতে নবাব সিরাজ শহীদ হওয়ার পরেও ইংরেজরা মুর্শিদাবাদ বা ঢাকা কোথাও-ই নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করতে পারেনি! তাই তারা রয়ে গেলো ক্যালকাটাতেই। সেখানেই বানালো রাজধানী। দুই শতাব্দির কাছাকাছি সময়ের পর ক্যালকাটাতেও আর নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করতে পারলো না। পালিয়ে বাঁচলো দিল্লীতে!

দিল্লীর লাল কেল্লায় হয়তো তারা উড়িয়েছিলো রক্তাক্ত ‘ইউনিয়ন জ্যাক’। কিন্তু লাল কেল্লা তাদের নয়! আর সাধক পীরের অমর বাণী ‘দিল্লী দূর অস্ত!’ তাই ইংরেজদের শেষ রক্ষা হয়নি! লাল কেল্লা ছেড়েও তাদেরকে পালাতে হয়েছিলো।

দিল্লী যাওয়ার বিষয়টা যখন হাসানের ঘাড়ের উপর এসে পড়লো, তখন হাসানেরও মনে পড়েছিলো সাধক পীরের বাণী ‘দিল্লী দূর অস্ত!’ কিভাবে যাওয়া যায় তাহলে? খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলো, ঢাকা দিল্লী এয়ার যোগাযোগ তেমন নেই! তাহলে? সেই পুরাতন পথ, ঢাকা-কলিকাতা-দিল্লী। হাসান তাই করলো। তবে আজকের গল্প হাসানের ঢাকা-কলিকাতা-দিল্লী ভ্রমণ নিয়ে নয়। সেই গল্প আরেকদিন করা যাবে। যেভাবেই হোক, হাসান দিল্লী তক পৌঁছেছিলো! আর পুরো ঘটনা সেখানেই!

নিউদিল্লী রেলস্টেশনে পৌঁছার পর দেখা গেলো সে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তাকে যেতে হবে ওল্ডদিল্লী-তে! এখন কি করা? নিউদিল্লী থেকে সে ওল্ডদিল্লী যাবে কি করে? অনেক দূরের পথ নিশ্চয়ই! এরপর যা জানলো তা আরো চমকপ্রদ! নিউদিল্লী রেলস্টেশনের একদিকে নিউদিল্লী আর অন্য দিকে ওল্ডদিল্লী। হাসান জাস্ট উল্টা পথ দিয়ে বেরিয়েছে! একটা অটোরিকসা নিয়ে সে স্টেশনের উল্টা দিকে চলে গেলো। ওরে মা, একেবারে ঢাকার ময়লা ও জলাবদ্ধতা!

হাসান যেই দূতাবাসে যাবে তার অবস্থান দিল্লীর ‘ভাশান্ত বিহার’-এ। এটা ওল্ডদিল্লী না নিউদিল্লী হাসান সেটা জানেনা। তবে তার আগ্রহ ছিলো প্রচন্ড, দিল্লী-টা কেমন তা দেখার, প্রথম যৌবনে দিল্লীর গল্প তো আর কম শোনেনি! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম একটা বছর তো ঐ গল্পই শুনেছে! ওল্ডদিল্লী দেখে তার মনের আগুনে পানি ঢালা হয়ে যায়! ঢাকা কোলকাতার সাথে কোন পার্থক্য খুঁজে পায়না!

একটা অটোওয়ালাকে সে বললো, “মেরা ‘ভাসান্ত বিহার’ যানা চাহিয়ে। যাওগি ‘ভাসান্ত বিহার’? অটোওয়ালা বললো, “হাঁ! যাউঙ্গা।”
হাসান আবারো প্রশ্ন করলো, “কিৎনি রূপেয়া লেগা?” অটোওয়ালার সাথে সামান্য দরকষাকষির পর, হাসান অটোতে উঠলো। হিন্দি-টা কাজে লাগলো অনেকগুলো বছর পর!

একটা মোড় ঘুরে অটোওয়ালা ঢুকে গেলো নিউদিল্লীতে। হাসানকে আজ কেউ বলেনি যে, এটা নিউদিল্লী। কিন্তু হাসান শুনেছে যে, নিউদিল্লী-তে শুধু অফিস-আদালত-হাসপাতাল ইত্যাদি আছে। পরিকল্পিতভাবে নির্মিত এই এই অংশটিকে মেইনটেইন করা হয়, তাই এটা টিপটপ!

একমসয় হাসান পৌঁছে গেলো ‘ভাসান্ত বিহার’। তার হাতে থাকা ঠিকানা অনুযায়ী সে ভাসান্ত বিহার-এর এ ৭ রোডে চলে এলো। ঠিকানা অনুযায়ী বাড়ীটাও খুঁজে বের করলো। অটোওয়ালাকে বললো, “রুখিয়ে ইহাপর।” তারপর অটো ছেড়ে দিলো। হাসানের হাতে একটা মাঝারি সাইজের স্যুটকেস। সাধারণ ধারণায় হাসানের উচিৎ ছিলো আগে একটা হোটেল-টোটেলে ওঠা, তারপর ফ্রেশ হয়ে দূতাবাসে যাওয়া। কিন্তু হাসানের হাতে সেই সময়টা ছিলো না। তাই সে রিস্ক না নিয়ে, গাট্টি-বোঁচকা নিয়েই চলে গেলো। তাছাড়া দিল্লী-তে কোন হোটেলে কোথায় উঠবে সেটাও জানা ছিলো না তার। যাহোক বাড়ীটা খুঁজে পাওয়ার পর, হাসান মোটামুটি অবাকই হলো! এটা একটা প্রাইভেট বাড়ী। আশেপাশে সবই এরকম প্রাইভেট বাড়ী। অনেক সময় ন গরীর অভিজাত এলাকায়ও একটা বাড়ী ভাড়া নিয়ে দূতাবাস চলে। তাই এলাকা বা বাড়ী নিয়ে হাসান মাথা ঘামালো না। কিন্তু এই বাড়ীর কোথাও কোন বিদেশী পতাকা সে দেখলো না! অবাক হয়ে কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে! এখন, এখন কি করবে সে???

বাড়িটির ঠিক উল্টা দিকে দেখলো রাস্তায় দেয়ালের গাঁ ঘেষে, একজন শ্রমিক টেবিল পেতে কাপড় ইস্ত্রী করছে। তার পাশে বোধহয় তার স্ত্রী। দু’জনই দীনহীন বেশে! হাসানের বেশভূষা বোধহয় পছন্দ হলো তার। সে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো, “কেয়া চাহিয়ে সরকার?” হাসান তার প্রয়োজনটা জানালো। এরপর সেই শ্রমিকটি যা জানালো, তা শুনে হাসান হতবুদ্ধি!
:”ইহাপে তো উয়ো এ্যাম্বেসী থা। লেকিন বন্ধ হো গিয়া। আজকাল নেহি। দো সাল পহেলিই বন্ধ হোগিয়া!”
দূর অস্ত দিল্লী-তে সে আসলো যেই এ্যাম্বেসীর কাজে, সেই এ্যাম্বেসীর নাম নিশানাই এখানে নেই!!! এখন সে কো করবে তাহলে?
ওহ! সতেরো ঘন্টা জার্নিতে মাথাটাই জ্যাম হয়ে গিয়েছে! মোবাইল কল করলেই তো হয়!

ফোন করলো হাসান। দূতাবাসের কোন এক কর্মকর্তা ধরে থাকবেন ফোনটা। তিনি ইংরেজীতে বললেন, “না না ভাই, ঐ ঠিকানা আমরা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। আপনি বোধহয় নেট থেকে ঠিকানা নিয়েছেন, ওখানে এখনো পুরাতন ঠিকানাই দেয়া আছে। আপনি ভাই অন্য রাস্তায় ‘এ ১৫/১৮’-তে চলে আসুন, ওখানে আমরা আছি।” এখন খোঁজ, ‘এ ১৫/১৮’! আশেপাশে লোকজন প্রায় নাই। বেশ নীরব ও জনশূণ্য এলাকাটি! কিছুদূরে একটা বাড়ীতে সিকিউরিটি গার্ড দেখা গেলো। হাসান এগিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো।
সে বললো, “আপকা তো বহুৎই ঘুমনা পড়েগা! প হেলি রাইট-পে যাইয়ে, ইসকি বাদ লেফট-পে যাইয়ে, ইসকি বাদ টার্ন লিজিয়ে, ……..।’ অনেকক্ষণ সে এত লেফট-রাইট, লেফট-রাইট করলো, যে হাসানের সব তালগোল পাঁকিয়ে গেলো। ভারী স্যুটকেস নিয়ে সে হাটছে, এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তা। এলাকার অনেকগুলো রাস্তা হাটা হয়ে গেলো। আলীশান কিছু তিন থেকে পাঁচতলা বাড়ী। বাড়ীর সামনে এক চিলতে জায়গায় অথবা রাস্তার উপরে কলকে ফুল, কৃষ্ণচূড়া, নয়নতারা, টগর, বাগালবিলাসের গাছ। পুরো এলাকাটার সাথে সে ঢাকার গুলশান-বনানী-ডিওএইচএস–এর ৯৮% মিল খুঁজে পেলো। মানুষজনের চেহারা-ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই যে তারা বাঙালী নয়। তারাও বোধহয় তাঁকে হিন্দুস্তানীই ভাবছে! এভাবে বেশ কিছুক্ষণ লেফট-রাইট করার পর একজন এগিয়ে এসে তাকে একটা পথ দেখিয়ে দিলো। সেই স্ট্রীটের প্রায় শেষ মাথায় এসে পেলো, প্রতিক্ষিত সেই ‘এ ১৫/১৮’ বাড়ীটি। পাঁচতলা একটি বাড়ী। নীচে সিভিল পোষাকে দুজন লোক বসে আছে। ড্রাইভার হতে পারে, গার্ডও হতে পারে। হাসান এগিয়ে গিয়ে বললো, “ভাই ইয়ে বিল্ডিং পনরা-আঠারা হাঁয়?”
:হাঁ।
: ঠিক হ্যাঁয়। মেরা এক এ্যাম্বেসী চাহিয়ে, উয়ো ইহাপে হ্যাঁয়?”
:হাঁ, ইহাপে-ই হ্যাঁয়।
হাসান হাপ ছেড়ে বাঁচলো! পাওয়া গেলো অবশেষে!
হাসান: বহুৎ আচ্ছা! কোন সা ফ্লোর মে হোগা?
গার্ড: (একটু চিন্তা করে) আঁ, তিসরা ফ্লোর মে জরুর হোগা।

হাসান লিফটে চড়ে তৃতীয় ফ্লোরে উঠে গেলো লিফটের দরজা খোলার পর দেখে মনে হলো, এখানে আদৌ কোন অফিস নেই। এটা কোন পারিবারিক এ্যাপার্টমেন্ট। একটা ডিলেমায় পড়ে গেলো হাসান। কি করবে? যাহোক, উঠেছি যখন, তখন শেষটাও করি। কলিংবেলে চাপ দিলো হাসান। একজন মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন। উনার হেয়ার কাটিং পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, তিনি দিল্লীর অভিজাত সমাজের বাসিন্দা।
হাসান: গুড ডে, ইজ দিস এ্যাম্বেসী?”
প্রশ্নশুনে ভদ্রমহিলাতো রীতিমত আকাশ থেকে পড়লেন! হাসানও খুব বিব্রত হলো! এর পাশাপাশি আবার ভয়ও পেলো। তাকে না এখন আবার চোর-বাটপার ভাবতে শুরু করে!!! ঘটনার আকস্মিকতা কাটতে না কাটতেই, ভদ্রমহিলার পিছন থেকে এক তরুণীর কন্ঠস্বর শুনতে পেলো, “কেয়া হুয়া মাম্মি? কৌন আয়া?” এরপর ভদ্রমহিলার পিছনে আবির্ভূত তরুণী-কে দেখে শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো হাসানের! দিল্লী-র ৪১ ডিগ্রী তাপমাত্রায় সে ঘামতে শুরু করেছে!

সেই মুখ! সেই ছবি! কালের ব্যবধানে বয়সের ব্যবধানে দুজন মানুষের মধ্যে এতটা মিল হয়!!!???

(চলবে)

কার কথা জাগে আজ হৃদয়ে তোমার?
কার পথ চেয়ে আজো গুনিছো দিবস?

ভালো হতো যদি, না হতো দেখা!
ভালো হতো যদি, না হতো কথা!
আর যদি হলো দেখা,
বিচ্ছেদ কেন হলো?

একটি হৃদয় আর কত ভার সইতে পারে???

——————————————–

তারিখ: ২৪শে জুন, ২০১৯ সাল
সময়: রাত ২টা ২৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.