দিল্লী কা লাড্ডু – ২

দিল্লী কা লাড্ডু – ২
————————— রমিত আজাদ

তরুনীটিও বিস্মিত! ওর বিস্ময়ের কি আছে?
এটা কি হলো? ঘটনাচক্র তাকে এই বাড়ীতে নিয়ে এলো কেন? এই ফ্লোরটিতে নিয়ে এলো কেন? এতগুলো বছর পরে, এই নাটকের কোন মানে হয়???
চাইলেই অবশ্য নাটকটা এড়ানো যায়। হাসান সেটাই করতে চাইলো। “সরি, কই গলতি হুয়া। ইয়ে এ্যাড্রেস ঠিক নেহি হ্যাঁয়!” কথাগুলো কোনরকম বলেই দ্রুত উল্টা ঘুরলো হাসান। মনে মনে নীচের বেকুব গার্ডটার উপর সব রাগ গিয়ে পড়লো। ব্যাটা না জেনেশুনে কথা বলিস কেন?!
হঠাৎ পিছন থেকে আবার সেই সুমিষ্ট কন্ঠস্বর শুনতে পেলো। “প্রোবাবলি ইউ আর ইন আ ট্রাবল! ক্যান আই হেল্প ইউ সামহাউ?” ইংরেজী উচ্চারণ-টা বেশ চোস্ত! অবিকল তার মত! দিল্লীর কোন অভিজাত ইংলিশ স্কুলে পড়েছে হয়তো!
হাসান: নো নো ইটস ওকে। আই শ্যাল ফাইন্ড দা এ্যাড্রেস।
তরুণী: নেহি, আপ জরুর প্রবলেম মে হ্যাঁয়। হামলোগ হেল্প করুঙ্গা। আইয়ে, অন্দর আইয়ে।
একটা হ্যারাসমেন্টের মধ্যে পড়ে গেলো হাসান। এদিকে তার মাও বিস্মিত হয়ে দুজনার কথা শুনছে।
তরুণী: মাম্মি। দিস জেন্টলম্যান ইজ ইন আ ট্রাবেল। লেট আস হেল্প হিম।
এবার মাও বললো, “শিওর, শিওর। প্লিজ কাম ইনসাইড।”

হাসানের কি হলো, হাসান নিজেও তা বুঝতে পারলো না। কে যেন তাকে সম্মোহিত করে এইসব করাচ্ছে। তরুনীটির আহবানে হাসান একটা রোবটের মত ঘরের ভিতর ঢুকলো, তারপর তাদের লিভিংরূমের একটি সোফায় বসলো। চারপাশের আসবাবপত্র মোটামুটি দামী। ঢাকার বনানী-ডিওএইচএস এলকার যেকোন একটি অভিজাত বাড়ীর লিভিংরুমের মতই ডেকোরেশন। তরুনীটি হাসানের পাশের সোফাটিতে বসলো। তাদের মধ্যে দৈর্ঘ্যের দূরত্ব এবার আরো কমে এলো। হাসান কি তরুনীটির কায়ার সুবাস পেতে শুরু করছে। হালকা মিষ্টি এই সুবাসটি তার অতি পরিচিত! হাসান মনে করার চেষ্টা করলো, এটা কি কোন পরিচিত ব্রান্ডের কসমেটিক্স বা সেন্টের সুবাস, না কি তার শরীরের ন্যাচারাল ঘ্রাণ! সে তো ভারতের সুপরিচিত ‘লাকমে’ কোম্পানীর কসমেটিক্স ব্যবহার করতো। এই নিয়ে হাসান মাঝে মাঝে তাকে ক্ষেপাতোও, এত এত ধনীর মেয়ে কেন সস্তা লাকমে কোম্পানীর প্রসাধনী ব্যবহার করবে কেন, তার তো প্যারিসের L’Oréal বা Estée Lauder কোম্পানীর কসমেটিক্স ব্যবহার করা উচিৎ! তবে এই নিয়ে সে কোন রাগ করতো না। ওর মধ্যে রাগ বলতে কিছু ছিলো না, মাঝে মাঝে অভিমান করতো, তবে সেই অভিমানের কথাও সে বলতো না, শুধু তার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখেই হাসান তা বুঝতে পারতো। হাসান তাকে বিখ্যাত Christian Dior কোম্পানীর Poison পারফিউম উপহার দিয়েছিলো। সেই উপহার পেয়ে ‘আনিতা’ ভীষন খুশী হয়েছিলো! যতটা না খুশী হয়েছিলো দামী উপহার পেয়ে, তার চাইতে বেশী খুশী প্রিয় জনার কাছ থেকে কিছু পেয়ে। তবে আনিতা-কে প্রথম যেই উপহার-টি দিয়েছিলো, তা ছিলো একেবারেই ব্যাতিক্রমধর্মী সেই কারণেই চমকপ্রদ। সেই উপহার-এর কথা পরে বলা যাবে।
: মাম্মী প্লিজ গিভ হিম ড্রিংকস। (তরুনীটি বললো)
ইউরোপ হলে হাসান ঘাবড়াতো। তবে হাসান জানে ইন্ডিয়ান-রা তাকে হার্ড কোন ড্রিংকস অফার করবে না, ওরা এভাবে সফট ড্রিংকস বা ফ্রুট জুসই খায়।

: ইউ আর ভেরী টায়ার্ড আই থিংক! (তরুনীটি হাসান-কে প্রশ্ন করলো)
হাসান ক্লান্তই ছিলো। তার উপর ভাগ্যের তৈরী এমন একটা নাটকের মধ্যে পড়ে তার মাথায় নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তাই প্রশ্নাঘাতে সে হঠাৎ জেগে উঠলো।
:ইয়েস, ইয়েস, আই এ্যাম রিয়েলী টায়ার্ড।
:আর ইউ ফ্রম কোলকাতা?
হাসান অবাক হতে গিয়ে অবাক হলো না। ভাবছিলো, সে যে বাঙালী তা তরুনীটি বুঝতে পারলো কি করে? তারপর আবার ভাবলো, বহু বছর ধরে তারা সহাবস্থান করছে; হাসান যে বাঙালী, এটা একজন হিন্দুস্থানীর পক্ষে বোঝা খুব বোধহয় কঠিন না।
: নো, আই এ্যাম ফ্রম ঢাকা।
এবার তরুনীটির ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনে একটা চমক লক্ষ্য করলো হাসান।
: ও! ইউ আর এ বাংলাদেশী?
ওহ! তরুনীটির প্রশ্নের টোন-টাও আনিতা-র মত। এগুলো হাসান কি ঠিক শুনছে, নাকি হাসানের মস্তিষ্ক হাসান-কে নিয়ে খেলছে!!! কিছু একটা ভিতর থেকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে কি তার মস্তিষ্ক?!
: ইয়েস, আই এ্যাম। (হাসান বললো)
ইতিমধ্যে, এক গ্লাস ফ্রুট জুস হাতে নিয়ে মাঝ বয়সী এক মহিলা উপস্থিত। হাসান দেখে বুঝলো, তাদের বাড়ীর গৃহকর্মী হতে পারে।
থ্যাংক ইউ, বলে হাসান জুসের গ্লাসটি হাতে নিলো।
এরপর হাসান নিজে থেকেই বললো
হাসান: আই হ্যাভ এ ওয়ার্ক, ইন এ ফরেন এ্যাম্বেসী হেয়ার। দ্যাট এ্যাম্বেসী ইজ নট ঢাকা, দ্যাটস হোয়াই আি নিডেড টু ট্রাভেল টু দিল্লী।
তরুনী: সো, নাউ ইউ আর লুকিং ফর দ্যা এ্যাড্রেস। এন্ড প্রোবাবলি ফেইসিং প্রবলেম!
হাসান: ইয়েস। (ছোট্ট করে বললো)
তরুনী: ওকে গিভ মি দ্যা নেইম। আই এ্যাম ফাইন্ডিং দ্যা এ্যাড্রেস।
হাসান এ্যাম্বেসী-র নাম দিলো। তরুনীটি এপার্টমেন্টের ভিতরে চলে গেলো। হাসান বসে বসে সাতপাঁচ ভাবতে লাগলো।
একবার এসে, তরুনীটির মা উঁকি দিয়ে বললো, “আর ইউ ওকে?”
হাসান: ইয়েস ইয়েস। নো প্রব্লেম, আই এ্যাম ফাইন!
মিনিট দশেক পর তরুনীটি ফিরে এলো। একটা চিরকূট হাসানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো।
তরুনী: টেক। ভেরী ইন্টারেস্টিং!
হাসান: হোয়াট?
তরুনী: দ্যা এ্যাড্রেস! সেম এ্যাড্রেস!
হাসান: মীনস? (অবাক হয়ে)
তরুনী: আই মীন দ্যা রোড, নাম্বার ইজ সেম, দ্যা হাউস নাম্বার ইজ সেম, ওনলি দ্যা ব্লক নাম্বার ইজ ডিফরেন্ট! আওয়ার ব্লক ইজ ‘এ’, এ্যান্ড দ্যাট ওয়ান ইজ ‘ই’।
হাসান: ওহ!
এবার হাসান হাসতে শুরু করলো।
এখন তরুনীটির অবাক হওয়ার পালা।
তরুনী: হোয়াট মেকস ইউ লাফ?
হাসান: ইউ নো, ইন স্প্যানিশ ল্যাংগুয়েজ, দে প্রোনাউন্স ল্যাটিন E লাইক ‘এ’। প্রোবাবলি দ্যাট মেইক দ্যা কনফিশন।
হি হি হি, এবার তরুনীটিও হাসতে শুরু করলো। তার হাসির রিনিঝিনি শুরু হাসানের কানে নূপুরের ছন্দের মত বাজতে শুরু করলো। তার চাইতেও হাসান অবাক হলো, ওর হাসির ভঙ্গিটি আনিতা-র মতই!
হাসান: লেট মি লীভ নাউ। আই এ্যাম ইন হারি।
তরুনী: শিওর!
হাসান তার স্যুটকেসটি হাতে নিয়ে, দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। তরুনীও পিছনে আসতে শুরু করলো। দরজা পেরোনোর পর, হাসান লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
হাসান: বাই দ্যা ওয়ে, হাউ কুড ইউ ফাইন্ড দ্যা এ্যাড্রেস?
তরুনী: মাই আঙ্কেল ওয়ার্কস ইন দ্যা মিনিস্ট্রী অব ফরেন এ্যাফেয়ার্স। আই কলড হিম, এ্যান্ড হি কনফার্মড।
হাসান: ওহ! ইউ হ্যাভ টেইকেন এ লট অব ট্রাবল ফর মি। আই এ্যাম রিয়েলী গ্রেটফুল!
তরুনী: ইটস ওকে।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে হাসান ভাবলো। ওর নামটা তো জানা হলো না। আর লিফট আসলেই সে নীচে নেমে যাবে, এখানেই এই আচমকা সুন্দরীর সাথে তার শেষ দেখা হবে (হয়তো)। থাক, নাম না জানাই ভালো। আর কোন যোগাযোগ না থাকাই ভালো। এই মাঝ বয়সে এসে সে আর কোন ঝামেলা পাকাতে চায়না। যা, সেই বয়সে হয় নাই, তা আর এই বয়সে অপর এক প্রতিলিপি-র সাথে হওয়ার প্রয়োজনটাই বা কি?! এম্নিতেই তার মাথায় আজ অনেক তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে!!!

তরুনী: বাই দ্যা ওয়ে। হোয়াটস ইওর নেম?
কেয়ক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে হাসান তার নাম বললো। এরপর নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে হাসানও পাল্টা প্রশ্ন করলো,
হাসান: ইওর নেইম?
তরুনী: আই এ্যাম ‘সুনিতা’।

এবার বিশাল ধাক্কা খেলো হাসান। নামের মধ্যেও মিল! কি হচ্ছে আজ এসব???!!! হাসান কি স্বপ্নে দেখছে সবকিছু, নাকি সে নবাব মীর কাশিমের মত পাগোল হয়ে দিল্লীর পথে পথে ঘুরছে??!!!
এর মধ্যে লিফট চলে এলো। লিফটে ডোকার আগ মুহূর্তে সুনিতা বললো,
সুনিতা: ইফ এনি প্রবলেম। প্লিজ কল মি।
হাসান: বাট, আই ডোন্ট নো ইওর নাম্বার।
সুনিতা: ওহ! আই হ্যাভ গিভেন মাই মোবাইল নাম্বার। ইটস রিটেন ইন দ্যাট নোট।

হাসান তার হাতে ধরা চিরকুট-টির দিকে তাকালো, যেখানে এ্যাম্বেসীর ঠিকানা লেখা আছে। হ্যাঁ, সেখানে একটি মোবাইল টেলিফোন নাম্বার চোখে পড়লো হাসানের। নাম্বারটা পড়ে সুনিতার দিকে তাকালো সে। সুনিতা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো!
লিফটের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকলো সেই সাথে আড়াল হতে থাকলো স্মাইলিং সুনিতা।

(চলবে)

নতুন প্রেমের সুবাস যে পাই, নতুন শ্বাসে মদির ঘ্রাণ,
নতুন রূপে মধুর আস্বাদ, মাতায় যে মন নবীন প্রাণ!
তবুও তো মন ফিরে চায়, শুনতে যে চায় একটি ব্রতী,
“এলাম ফিরে প্রিয়তম, না ভেঙ্গে মোর প্রতিশ্রুতি।”

চলে গিয়ে ফিরতে যে চাও, লাল-কপোলা উজাল গুল,
সময় কি আর রিভার্সিবল? ফিরবে শাখে ঝরা বকুল?
না চাইলেও ভুলতে হবে, কেমন ছিলো সেই অতীত,
ধুলোয় ঘুমোয় প্রণয়লীলা, ঘুম ভাঙানো প্রশ্নাতীত।

——————————————–

তারিখ: ২৭শে আগস্ট, ২০১৯ সাল
সময়: সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.