নওরিন এসেছে – পর্ব ১

নওরিন এসেছে – পর্ব ১
———————————-রমিত আজাদ

পাঁচ রঙের পাঁচটি কার্নেশন ফুল হাতে নিয়ে সেদিন ভীড় ও আঁধারে মিলিয়ে গিয়েছিলো নওরিন।
কোটি মানুষের বেদনায় সিক্ত দূষিত বাতাসের ঢাকা নগরীর কোন এক পথে দাঁড়িয়ে আমি তা দেখেছিলাম। মাথার উপরের তারাবিহীন আকাশে জ্বলা কিছু সোডিয়াম লাইটের নিচের টাইলস শোভিত ফুটপাথ ধরে নওরিন চলে গিয়েছিলো পশ্চিমে, আর আমি চলে গিয়েছিলাম পূবে। যেতে যেতে ভেবেছিলাম, ‘নওরিন আমার সাথে দেখা করতে আসবে তো!!!???’

এরপর আমি নওরিনের কথা অনেকবার ভেবেছি। মাঝে মাঝে নিজেকে ছেলেমানুষ মনে হয়েছে। মনে পড়েছে সেই আঠারো বছর বয়সের কথা, যখন ল্যান্ড ফোন ছাড়া যোগাযোগের আর কোন মাধ্যম ছিলো না। সেসময় নারী-পুরুষের পরিচয় হতো ঐ ল্যান্ড ফোনে। একবার সমবয়সী এক তরুণীর সাথে ল্যান্ড ফোনে পরিচয় হয়েছিলো আমার। ফোনটা সেই করেছিলো, এ্যাজ ইফ রং নাম্বারে ফোন করে ফেলেছে! তারপর টুকটাক কথা বলে পরিচয়। পরদিন আবার সে ফোন করেছিলো, কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর মেয়েটি প্রশ্ন করেছিলো, “তুমি কি রাতে আমার কথা ভেবেছিলে?”

ঐ মেয়েটির কথা আমি আসলে কখনো ভাবিনি! তবে নওরিনের কথা ভেবেছিলাম। মানুষের আড়ালে মানুষ থাকে। আমার আড়ালে থাকা মানুষটি মনে মনে চেয়েছিলো, নওরিন যেন আমার সাথে দেখা করে। অপেক্ষা করেছিলাম ও এ্যাটলিস্ট একটা ফোন কল করুক। কিন্তু নওরিন তা করেনি। তারপর মনে হয়েছিলো, এটা তো ওর ব্যাপার, আমি যা চাই ওর মন যে তাই চাইবে, তাতো আর নয়। আমার ভূবন, ওর ভূবন তো আর এক নয়! আমার মতন ও-ও ঘরভাঙা সিঙ্গেল হলেও, ওর সাথে আমার বয়সের পার্থক্যও অনেক!

তারপর মনে হলো, যত স্মার্ট ও আধুনিকাই হোক না কেন, ও তো শেষ পর্যন্ত মেয়েই! বেশিরভাগ মেয়েই স্বপ্রবৃত্ত হয়ে এগিয়ে আসতে পারে না। যারা পারে তাদের সংখ্যা খুব কম। যেমন আকসানা পেরেছিলো। কয়েক বছর আগের কথা, দিন পনেরো অনুপস্থিত ছিলাম ইন্টারনেটে। হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে একটা ফোন পেলাম; ওপাশ থেকে কেউ অস্থির হয়ে বললো, “আমি আকসানা। আপনি সুস্থ আছেন তো? আপনাকে অনেকদিন নেটে দেখি না, তাই দুশ্চিন্তা করছিলাম!” আকসানা-র সাথে যোগাযোগ যা হওয়ার নেটেই হতো, ওর কাছে আমার মোবাইল নাম্বার ছিলো না। তাও সামহাউ নাম্বার যোগাড় করে সে ফোন করেছিলো। বুঝলাম, মনের টান থেকেই ফোন করেছে! নওরিনের কাছ থেকে সেরকম কোন কল না পেয়ে, নিজেই ওকে ফোন কল দেব ঠিক করলাম।

কিন্তু হিউম্যান সাইকোলজি একটা আশ্চর্য্য বিষয়! কেন যেন ওকে আর কল দিতে পারিনি! বহুবার মোবাইল হাতে নিয়েছিলাম ওকে কল দেব বলে। কিন্তু কল আর দেয়া হয় নি।

এদিকে হঠাৎ করেই বিপর্যয় নেমে এলো পৃথিবীতে। এমনটি আমার জীবদ্দশায় দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না! খুব সম্ভবত গত বৎসর সেপ্টেম্বর মাসের দিকে আস্তে ধীরে ভেসে এলো সংবাদটি – কি এক ভাইরাসের কবলে পড়েছে চীন। তারপর জানা গেলো, উহান প্রদেশে অনেকেই মারা যাচ্ছে এই প্রাণঘাতি ভাইরাসে! সমাজতান্ত্রীক ও ডিক্টেটরশীপের দেশগুলোয় বাকস্বাধীনতা, প্রেস-ফ্রীডম না থাকার কারণে সংবাদ বের হয় খুব ধীরে ও দেরীতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকতা করতে চায় না সবাই। অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ থাকে না! Allodoxaphobia বা জনমতভীতি এই সকল দেশগুলোর শাসকদের একটা বড় ধরনের সমস্যা। তবে যা হয় আর কি, গণহারে মৃত্যুর সংবাদ তো আর ঠেকিয়ে রাখা যায় না। সংবাদ বের হতে শুরু করলো নানা মাধ্যম দিয়ে। সেই সাথে শুরু হলো এর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে নানান গুঞ্জন। Media Skepticism-এর কারণে জনগণ এখন আর এলিগার্খ নিয়ন্ত্রিত মেইনস্ট্রীম মিডিয়াগুলোকে বিশ্বাস করতে চায় না। সবাই দিনদিন ঝুঁকে পড়ছে সোশাল মিডিয়ার উপর। যার ফলাফল আরো ভয়াবহ! রাম-শাম-যদু-মধু সবাই পোস্টায়, কিছু সত্য নিউজের পাশাপাশি ভূয়া নিউজেরও ছড়াছড়ি! সোশাল মিডিয়ার বদৌলতে মত প্রকাশে মেট্রিক ফেলও বড় স্পেশালিস্ট!

আমি খুব একটা ভড়কাই নাই এই সংবাদে। এমন কতই তো শুনে আসছি সেই তিন দশক ধরে! কখনো সার্স, কখনো বার্ডস ফ্লু, কখনো সোয়াইন ফ্লু, কখনো ম্যাড কাউ ডিজিস, ইত্যাদি। ইভেন্টগুলো পানির মধ্যে বুদবুদের মত ফুস করে জেগে আয়তনে বড় হতে হতে দ্রুত গতিতে উপরে ওঠে তারপর পৃষ্ঠতলে এসে ঠাস করে ফেটে যায়! না, এইসব ঘটনাবলীকে কেন যেন আমার কাছে মহামারীর চাইতে রাজনীতিই বেশি মনে হয়েছে! মনে বারবার প্রশ্ন জেগেছে, এসবের লক্ষ্যবস্তু প্রতিবারই চীন কেন, বা সাউথ কেন? ইস্ট-ওয়েস্ট রাজনীতি গত হয়েছে রোম-পারস্য সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির সাথে। তার সর্বশেষে বিলুপ্তি হয়েছে, বৃটিশ সাম্রাজ্যের ফিজিকাল পতনের সাথে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে শুরু হয়েছে নতুন রাজনীতি — নর্থ-সাউথ রেষারেষি রাজনীতি। সেই নতুন রেষারেষির ফল হয়তো এগুলো। আমার মনে পড়ে, বার্ড ফ্লুর সংবাদ ছড়ালে আমি স্বজনদেরকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিলাম, “বার্ড ফ্লু বলে কিছু নাই। এশিয়ার পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রী ধ্বংস করার জন্য পশ্চিমাদের এটা একটা অপপ্রচার!” তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে আমি মুরগীর মাংস খেয়েছিলাম তখন।

যাহোক, করোনা ভাইরাস নামক নতুন গুঞ্জিত এই মহামারীটিকেও তেমন গুরুত্ব দেই নি। বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে কথোপকথন এমন ছিলো, ‘এটা কেন হলো?” ‘চীনে হঠাৎ এমন ভাইরাস কেন এলো?’ চীনারা যে কি করে!” ‘চীনারা যে পরিমানে সাপ-ব্যাঙ-বাদুর-ইঁদুর ইত্যাদি হাবিজাবি খায়, এজন্যই তো এই দশা!” ‘বিষাক্ত সাপ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস’, ‘বাদুর থেকে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস’, ‘নাউজিবিল্লাহ্‌! এইসব খায় বলেই আজ এই অবস্থা!’ ‘আরে, চীনারা কি, আজকে প্রথম খাওয়া শুরু করলো নাকি, এইগুলা? ওরা তো হাজার হাজার বছর ধরেই সাপ-ব্যাঙ-তেলাপোকা-টিকটিকি-আর্জিনা সবই খায়! তাহলে এখন হঠাৎ মহামারী হবে কেন?’ ‘আরে না, চীনাদের কোন দোষ নাই। আগের মতই এটা আমেরিকার রাজনীতি। ঐ যে সৈন্যদের অলিম্পিক গেমটা হলো, তারপরই তো মহামারীটা ছড়ি্য়ে পড়লো। মানে কি? মার্কিন সোলজাররা ওটা ছড়িয়ে এসেছে। নতুন বিশ্ব রাজনীতি!’, ‘কিভাবে বুঝলেন যে ওটা মার্কিনীদের কাজ?’ ‘না বোঝার কি আছে? দুইয়ে দুইয়ে মেলালে চারই তো হয়! কোথায় কোথায় ছড়িয়েছে দেখেন; চীন, ইরান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে। তিনটাই যুক্তরাষ্ট্রের তিন রকমের শত্রু!’ ‘আরে না ভাই, কাজটা চীনাদেরই, লেভেল ফোর-এর একটা ল্যাবরেটরি আছে উহানে, ওটা লীক করেছে। চীনারা মহাশক্তি হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওদের ল্যাবরেটরি ম্যানেজমেন্ট তো এখনো দুর্বল।’ ‘তাহলে ইরানে কেন করোনা ভাইরাস এত ছড়িয়ে পড়লো?’ ‘ইরানের সাথে চীনের স্ট্রং টাই। চীন-ইরান সব ফ্লাইট চালু ছিলো।’ ‘সেই ফ্লাইট চালু তো বাংলাদেশের সাথেও ছিলো, তাহলে বাংলাদেশে তখন ছড়ালো না কেন?’ ‘মনে হয় না, বাংলাদেশে কিছু হবে!’, ‘আসলে উহানে এখন অনেক শীত। এই শীতে ভাইরাস তাজা থাকে, গরমটা পড়ুক, ভাইরাস মরে যাবে। জাস্ট ওয়েট।’ পজেটিভ-নেগেটিভ এমন অনেক কথাবার্তাই বাতাসে ভাসতে লাগলো। তবে সবাই ভাবছিলো, বাংলাদেশ পর্যন্ত আসবে না এই ঢেউ।

ফেব্রুয়ারী মাসে একদিন আমার অফিসে একজন প্রবীন ডাক্তার এলেন। তিনি আবার ‘পাবলিক হেলথ’-এরও একজন অধ্যাপক। উনাকে সবাই এই বিষয়ে নানান প্রশ্ন করতে থাকলো। তিনি খুব সুন্দর উত্তর দিলেন – এ ধরনের ঘটনা অতীতেও অনেকবার ঘটেছে, এগুলো কোনটা হয় ‘লোকাল’ আর কোনটা হয় ‘ন্যাশনাল’ আবার কোনটা হয় ‘প্যানডেমিক’। ‘ব্রেক আউট’, ‘এপিডেমিক’, ‘প্যানডেমিক’, ইত্যাদি বিষয়ের ডাক্তারী কিছু বর্ণনা তিনি দিলেন। সেখানে একজন ইকনোমিস্টের সাথে সংজ্ঞাগত কিছু বিরোধ উনার হলো। যাহোক, ডাক্তার সাহেব উদাহরণ টানলেন, গত শতাব্দীতে হয়েছিলো স্প্যানিশ ফ্লু। তারপর তিনি বললেন, এই সমস্ত এপিডেমি সিচুয়েশনে সব চাইতে বেশী যেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, তা হলো ‘ম্যাস গ্যাদারিং’ এভয়েড করা। কিন্তু সমস্যা হলো দেশ-সমাজের কর্তা রাজনীতিবিদরা ‘পাবলিক হেলথ’ যত না বোঝেন তার চাইতে বেশি বোঝেন রাজনীতি। উনাদের কাছে ‘রাজনৈতিক ম্যাস গ্যাদারিং’-এর গুরুত্ব অন্য যেকোন কিছুর চাইতেই বেশী। সমাজতান্ত্রীক রাষ্ট্রগুলোতে জনতার কথা কোন কথাই না, স্পেশালিস্ট-সায়েন্টিস্টদের কথা কোন কথাই না, ওখানে কম্যুনিস্ট নেতাদের কথাই শেষ কথা। তাই কোন স্পেশালিস্ট-সায়েন্টিস্ট-দের কথার কোন গুরুত্ব না দিয়ে উহানে দুইটা ম্যাস-গ্যাদারিং করা হয়েছিলো, ফল যা হওয়ার তাই হলো, মহামারী দাবানলের মত ছড়িয়ে গিয়েছে। কেউ কেউ উনাকে প্রশ্ন করেছিলো, ‘তাহলে বাংলাদেশে এখন কি করা উচিৎ?’ তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে এখনো তো আক্রান্তের কোন সংবাদ পাইনি, তবে ম্যাস-গ্যাদারিং অবশ্যই এভয়েড করা উচিৎ।

হঠাৎ একদিন নিউজে দেখা গেলো যে, কোন একটি আরব রাষ্ট্র এই মহামারী থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দেশের সাথে ফ্লাইট বন্ধ করেছে, সেই তালিকায় বাংলাদেশের নামও আছে! আশ্চর্য্য! বাংলাদেশে তো এখনো কোন ভিক্টিমই পাওয়া যায় নাই, তাহলে ঐ তালিকায় বাংলাদেশের নাম কেন? তারপর একদিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবেই মহামারী আক্রান্তের ঘোষণা দিলো। তখন আর কেউ সুস্থির থাকতে পারলো না। সবার মনেই ভয় ঘিরে ধরতে থাকলো। বাতাসে গুঞ্জন শোনা গেলো, সব দেশই যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ আর বাদ থাকবে কেন? করোনা ভাইরাস মহাসাগর অতিক্রম করেছে, আর বাংলাদেশ তো চীনের ঘরের কাছে!

আঠারোই মার্চ হঠাৎ করেই ঘোষিত হলো সাধারণ ছুটি (লক-ডাউন নয়)। আমাকেও অফিসের কার্যক্রম আপাততঃ স্থগিত রাখতে হলো। মাঝে মাঝে নিজের কিছু কাজে অফিসে যেতাম ও বাইরে বের হতাম। যদিও ফেইসবুক ও সোশাল মিডিয়ায় বারবার দেখানো হচ্ছিলো যে ঢাকায় লোকজন লক-ডাউন মানছে না। কিন্তু আমি উত্তর ঢাকার রাস্তাঘাট ফাঁকাই দেখেছি। তাহলে দক্ষিণ ঢাকা বা নগরীর সাধারণ এলাকাগুলোতে রাস্তা মানবপূর্ণ কেন? ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, তারা কেউই সখে বের হচ্ছে না। বের হচ্ছে জীবনের তাগিদে। অভিজাত এলাকার মানুষের সঞ্চিত অর্থের অভাব নেই। পরিস্থিতির শুরুতেই প্যানিক বায়িং করে তারা ফ্রীজ-ডীপফ্রীজ ভরে ফেলেছে!
প্রয়োজনে তারা ঘরে বসেও বাজার-খাবার বুকিং দিতে পারে। কিন্তু দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত-রা কি করবে? আসলে এ ধরনের ডিজাস্টার এলেই সমাজের মুখোশটা খুলে যায়!

আমার বড় বোনের ছেলেটা একদিন ফোন করলো। “মামা কেমন আছো?”
আমি: আছি মামা। আমি আপাতত ভালোই আছি। তবে দেশের মানুষ তো আর ভালো নেই!
ভাগ্নে: মামা, সামনে রমজান আসছে। মানুষ এই দুর্যোগে রমজান পালন করবে কি করে?
আমি: কষ্ট হবে রে মামা। ভীষণ কষ্ট হবে।
ভাগ্নে: মামা, তুমি ঈদে কি করবা?
আমি: আমি আর ঈদে কি করবো? একা মানুষ। ঘরে বসেই কাটিয়ে দেবো।
ভাগ্নে: আমাদের বাসায় আসবা না?
আমি: পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় কে জানে? হয়তো কারো বাসায়ই কেউ যেতে পারবে না।
এনিওয়ে থিংক পজেটিভ। আশা করি একদিন মেঘ কেটে যাবে।
ভাগ্নে: তুমি ভাইরাস ভয় পাও না?
আমি: একসময় ভয় পেতাম। আমার অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যেত। এখন আর সেই সমস্যা নেই।
ভাগ্নে: কেন?
আমি: আমার একটা ভেষজ চিকিৎসা জানা আছে। ঐটা প্রয়োগ করলে বেঁচে যাই।
ভাগ্নে: কি চিকিৎসা?
আমি: বলবো আরেকদিন। তোর মা হয়তো আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দেবে!
ভাগ্নে: কেন?
আমি: ছোট ভাই সে যতই লায়েক হোক না কেন, বড় বোন-রা তাকে সবসময়ই পুঁচকে মনে করে। হা হা হা!!!

নওরিন-এর কথা বলতে গিয়ে কত কথাই না বলে ফেললাম!

যাহোক, রমজান শেষ হয়ে ঈদ-উল-ফিতর আসলো। দিনটা ছিলো পঁচিশে মে (সোমবার), ২০২০ সাল। কি করা যায়? ঘরে বসে থেকে ভালো লাগে না! বিকাল বেলায় বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। কোন যানবাহন ছাড়াই। এর আগেও অনেকবার বেরিয়েছি। দিনের এক চিত্র রাতের আরেক চিত্র! রাতে বেরোলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, এই মহামারী দুর্যোগের মধ্যেও ঢাকার রাস্তায় মহাসমারোহে আলোকসজ্জা জ্বলছে! বিকালের শেষ দিকে বের হলাম, যাতে বিকাল ও সন্ধ্যা দু’টাই উপভোগ করতে পারি। মাস্ক সাথে নিয়ে বের হলেও, বেশিক্ষণ নাক ঢেকে রাখতে পারি না। দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই ফাঁকা জায়গা পেলেই মাস্ক নামিয়ে ফেলি। রাস্তাঘাটে লোকজন খুবই কম। হাটতে হাটতে অনেক দূর লেকের পার পর্যন্ত গেলাম। একজন দরিদ্র ব্যাক্তি লেকের পাশে দাঁড়িয়ে ফ্লাক্সে করে চা বিক্রি করছে। এই মহামারীতে ওরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সব চাইতে বেশি। ওদের অসহায় মুখগুলোর দিকে তাকালেই সব বোঝা যায়। ওর দিকে এগিয়ে গেলাম, “ওয়ান টাইম গ্লাস আছে?”
“জ্বী, আছে।”
“দাও তাহলে এক কাপ।”
লেকের শান্ত নির্জন জলের পাশে বসে নীরবে চায়ের স্বাদ উপভোগ করছিলাম। এখান থেকে নগরীর অভিজাত এলাকার উঁচু ও সুদৃশ্য দালানগুলো দেখা যায়। লেকের জলে তাদের প্রতিফলন পড়ে একটা চমৎকার দৃশ্যপট তৈরী করে। একটা জিনিস আজ খেয়াল করলাম উপরের আকাশটা এখন যেমন স্বচ্ছ ঘন নীল, তেমনি লেকের আশেপাশের গাছপালাগুলোও অদ্ভুত সবুজ ও সতেজ। ফুলগুলোও বেশ প্রাণবন্ত! স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় উপর্যুপরী পলিউশনে ওরা খুব বিধ্বস্ত থাকে। এখন ওরা যেন নতুন প্রাণ পেয়েছে, এই মহামারীতে প্রকৃতির মেরামত চলছে।

রাতে একটা ফোন কল পেলাম। দু’একজন মুরুব্বী আছেন, যারা আমাকে খুব পছন্দ করেন, উনারা আগামীকাল আলাপচারীতায় বসতে চান আমি শরীক হবো কিনা জানতে চাইলেন। রাজী হয়ে গেলাম, ঈদের মরসুম, কাজও নেই, বোরিং লাইফ। প্রাচীনতার প্রতি আকর্ষণ কিনা জানি না, আমার বয়স্ক মানুষদের সাথে বসে গল্পস্বল্প করতে ভালোই লাগে। উনারাও আমার সঙ্গ বেশ পছন্দ করেন।

পরদিন সকালে আবারো নওরিনের কথা মনে পড়লো। ভাবলাম ওকে কি কল দেবো? আজ একটা উপলক্ষ আছে। জাস্ট ‘ঈদ মুবারক’ দেয়ার অজুহাতেও কল দেয়া যায়। মোবাইলটা হাতে নিলাম। সার্চ করে বের করলাম ‘নওরিন’। বাটন প্রেস করলাম, তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে সারা পেলাম।
নওরিন: জ্বী, কেমন আছেন?
ওর কন্ঠস্বর শুনে বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠলো!
আমি: ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
নওরিন: জ্বী, আছি মোটামুটি।
আমি: লক-ডাউন, তাই না?
নওরিন: জ্বী। লক-ডাউনে ঘরে বসে বসে বোর হয়ে যাচ্ছি।
আমি: তোমার অফিস তো বন্ধ তাই না?
নওরিন: হ্যাঁ, অফিস ফিজিকালি বন্ধ, তবে অনলাইনে কিছু কাজ করতে হয়।
আমি: তা ঈদে কি করলে?
নওরিন: তেমন কিছু না। আমাদের বিল্ডিং-এই একটু উপর-নীচ করলাম।
আমি: মানে?
নওরিন: মানে এই বিল্ডিং-এরই দুই একটা এ্যাপার্টমেন্টে বেড়াতে গিয়েছিলাম।
আমি: তাও তো ভালো।
নওরিন: আপনি কি করলেন?
আমি: আমি? হা হা হা! ঘর থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে লেক পর্যন্ত গেলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খেলাম।
নওরিন: কোন লেক?
আমি: (লেকের নাম বললাম)
নওরিন: আহারে!
আমি: আহারে কেন?
নওরিন: আমার এত কাছে এলেন, অথচ একটা ফোন কলও করলেন না?
আমি একটু ভাবলাম। ও কি বলতে চাইছে বোঝার চেষ্টা করলাম। সেন্সেটিভ ব্যাপার, ভুল বোঝাবুঝি হলে ব্যাপারটা ভালো হবে না। ভেবেচিন্তে কথা বলতে হবে।
আমি: ও হ্যাঁ। ফোন তো করাই যেত। তা ফোন করেই বা কি হবে লক-ডাউন তো?
নওরিন: আপনি বললে আমি নীচে নেমে আসতাম। আমার বাসা থেকে কিছুদূর গেলেই তো লেক-টা।
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো। আমি কি এই কথাগুলো শোনার জন্যই এই কয়টা মাস অপেক্ষা করেছিলাম?
আমি: ও হ্যাঁ, তাইতো। বিষয়টা ভেবে দেখিনি। এনিওয়ে আজও তো দেখা করা যায়। (অস্থির হয়ে বললাম)
নওরিন: আজ কখন?
আমি: উ। আজ আমার একটা মিটিং আছে, বিকালের দিকে। মিটিংটা শেষ করে তোমাকে একটা কল দেই?
নওরিন: কোথায় মিটিং?
আমি: দূরে নয়। তোমার বাসার কাছাকাছিই। ওখান থেকে তোমার বাসায় রিকশায় পৌঁছাতে বড় জোড় পনেরো মিনিট লাগবে।
নওরিন: আচ্ছা, তাহলে মিটিং শেষ করে কল দিয়েন। আমি অপেক্ষা করবো।
আমি: কোথায় দেখা করা যায়?
নওরিন: তাই তো! এখন তো ক্যাফে-ট্যাফেও সব বন্ধ! দেখি ক্যাফে ‘সাউথ পোল’-টা খোলা থাকতে পারে।
আমি: কোথায় এটা?
নওরিন: কাছেই মেইন রোডের উপরেই। সমস্যা হবে না।
আমি: ওকে।

(চলবে)

(পূর্ব প্রকাশিত গল্প ‘পথ চলিতে, যদি চকিতে’-এর ধারাবাহিকতা)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.