নওরিন এসেছে – পর্ব ২

নওরিন এসেছে – পর্ব ২
———————————-রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ঈদের পর কয়েকদিন সবাই একটু ফুরফুরা মেজাজে থাকে। ছুটি থাকে, একটা সুন্দর উৎসবের পরে কোন কাজও নাই। বাড়ীতে মজার মজার খাবার-দাবার থাকে। আপনজনদের সাথে দেখা করাটাই মূল কাজ, এবং আনন্দের কাজ। তবে এবারের ঈদটা অমন নয়, অনেকটাই নিরানন্দ!

ঘরের বাইরে বেরিয়ে বাতাসের কোয়ালিটি অনুভব করে আমার মনে হলো গ্রামের কোন রাস্তা দিয়ে চলছি। এত বিশুদ্ধ বাতাস ঢাকায় বিগত কয়েক দশক পাইনি। খুব ছোটবেলায়, সিটি সেন্টার কমার্শিয়াল এড়িয়া গুলিস্তান-মতিঝিলে গেলে বাতাসে একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পেতাম, যেটা অন্যান্য এলাকায় অতটা ছিলো না। তারপর ধীরে ধীরে সেই ঝাঁঝালো গন্ধটার রেডিয়াস বাড়তে থাকলো, বাড়তে বাড়তে তা মহাখালী, গুলশান পেরিয়ে উত্তরা পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। শুধু রেডিয়াস না গন্ধটার তীব্রতাও বাড়লো। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে এটা মূলত বিভিন্ন যানবাহন থেকে বের হওয়া দূষিত ধোঁয়ার গন্ধ। তাছাড়া থ্রী-হুইলার থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় চোখও জ্বলতো! তারপর ২০০২ সালে টু-স্ট্রোক থ্রী-হুইলার ও সিনথেটিক শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করায় পরিবেশ দূষণ যেমন কমেছিলো, তেমনি চোখ জ্বলাও বন্ধ হয়েছিলো। তবে বায়ু দূষণ ছিলো। ঐ ঝাঁঝালো গন্ধটাও ছিলো। আজ বাইরে বেরিয়ে আর সেই ঝাঁঝালো গন্ধটা পেলাম না। বাতাস খুব ফ্রেশ মনে হলো। এদিকে জ্যাম নামক জিনিসটাও আপাততঃ শীতনিদ্রায় গিয়েছে। একটা জায়গায় গিয়ে রিকশায় উঠলাম। রিকশায় বাতাস খেতে খেতে মনে হচ্ছিলো গ্রামের কোন রাস্তা দিয়েই যাচ্ছি।

লাঞ্চের পরে মিটিং ঠিক করা হয়েছিলো। মিটিং মানে গপ্পো-সপ্পো। সমবয়সী বয়ষ্ক ব্যাক্তিরা বসে গল্প করবেন আর আমার সেখানে হাসিমুখে বসে থাকা। মাঝে মধ্যে তারা আমাকে প্রশ্ন করবেন, “আর তুমি কি বলো?” আমি বলবো, “জ্বী, সব ঠিকই তো বলছেন। আমার তো ভুল কিছু মনে হচ্ছে না!” উনারা সবাই খুব খুশী হন। মতামতের সাথে একমত হলে সবাই-ই খুশী হয়। সমস্যা যত সব তো দ্বিমত ও ভিন্নমত নিয়ে। এই দ্বিমত ও ভিন্নমতের কারণে নির্বাসন, মৃত্যুদন্ড সবই হয় সর্বকালেই!

করোনা ভীতি ও সাধারণ ছুটির কারণে রাস্তাঘাট সবই ফাঁকা। নগরীর রাস্তায় কোন ট্রাক-বাস একবারেই চলছে না। দুইএকটা গাড়ী চলছে। প্রোবাবলি সেগুলো সেলফ-ড্রিভেন। কার ঔনারদের মধ্যে যারা হৃদয়বান ও সমর্থবান তারা ড্রাইভারদেরকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। আমি নিজেও আমার ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু যাদের সামর্থ্য কম এবং যাদের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হৃদয়বান নন, তারা তাদের বহু বছরের ড্রাইভারকেও চাকুরীচ্যুত করেছে! এটা খুবই হার্ট-ব্রেকিং! এই দুঃসময়ে চাকুরী গেলে তারা খাবে কি? গুটিকতক রিকশাচালক পথে বেরিয়েছে পেটের টানে। এদেশের বহু পেশাজীবি-ই ডে-লেবারার তারা দিন আনে দিন খায়। তিনদিন আয় বন্ধ থাকলেই তাদের আর ভাত জুটবে না।

রিকশায় যেতে যেতে ভাবলাম নওরিন-কে একটু জানাই যে আমি মিটিংয়ে যাচ্ছি। তা মোবাইল হাতে নিতেই অন্য একটা টেলিফোন কল এলো। আমার বন্ধু, অত্যন্ত ধনী ব্যাক্তি, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক।

বন্ধু: দোস্ত কেমন আছিস?
আমি: আছিরে ভাই। এই করোনাকালে যেমন থাকে আরকি! তোর খবর কি?
বন্ধু: আমিও আছি। বাড়ীর দরজা-জানালা সব বন্ধ করে বসে আছি। কাউকে ঢুকতে দিচ্ছি না।
আমি: অত বাড়ী বাড়ীতে একা বসে আছিস? (তার পরিবার বিদেশে থাকে)
বন্ধু: উপায় কি? এখন এই সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে।
আমি: তা রান্নাবান্না?
বন্ধু: কেন? আমি কি রান্না করতে পারিনা?
আমি: ও হ্যাঁ! তোর রান্না তো খুবই সুস্বাদু। আমার মনে আছে। ছাত্র জীবনে যখন তোর রান্না খেতাম, সেই স্বাদ এখনও জিভে লেগে আছে!
বন্ধু: আসিস একদিন, সব ঠিক হয়ে গেলে। আবার রান্না করে খাওয়াবো। তুই এখন কোথায়?
আমি: বাইরে। রাস্তায়। এক জায়গায় যাচ্ছি।
বন্ধু: বলিস কি? এই সময়ে কেউ বাইরে বের হয়?
আমি: আমার অত ভয় লাগে না। আমি ভেষজ চিকিৎসা জানি।
বন্ধু: তোর স্টান্টবাজী চিরকালই ছিলো! যাহোক, তোর ফেইসবুক স্ট্যাটাস-টা দেখলাম, দিনমজুরদের উপর লিখেছিস।
আমি: হ্যাঁ। ওদের কষ্টের কথা কিছু তো বলা দরকার।
বন্ধু: তা ওদের জন্য কিছু করছিস?
আমি: আমার সামর্থ তো তোর চাইতে অনেক কম। এনিওয়ে, আমাদের কলেজের এক বড়ভাই ফোন দিয়েছিলেন ঐ স্ট্যাটাস পড়ে। তিনি কিছু আয়োজন করছেন, উনার সাথে আমি শরীক হবো।
বন্ধু: কি করেন ঐ বড় ভাই?
আমি: একটা মাঝারি ধরনের ব্যবসা আছে। তবে সেটা বড় কথা না। তিনি খুব পরহেজগার ও হৃদয়বান মানুষ। তিনি ইতিমধ্যেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছু সাহায্য করে যাচ্ছেন
বন্ধু: আমি এখন কোন সাহায্য দেব না। আরো কিছুদিন যাক। আমি বিশ্বাস করি না যে, গ্রামে একটা পরিবার ক্ষুধার্ত থাকলে বাকিরা তাকে খাওয়াবে না। যাহোক, কিছুদিন পরে অভাব প্রকট হলে, আমি সাহায্য দেয়া শুরু করবো, তবে আমি চালের বেশী কিছু দেব না। গ্রামে চাল হলে বাকিটা এম্নিই ম্যানেজ করা যায়। গ্রামে একটু ঘোরাঘুরি করলেই তো, শাক-পাতা-সব্জি এটা-সেটা পাওয়াই যায়।

বন্ধুর কথা শুনে আমার ভাষাণী হুজুরের কথাটা মনে পড়লো। কেউ একজন উনাকে প্রশ্ন করেছিলো, “হুজুর আপনার কাছে কেউ আসলেই আগে তাকে খেতে দেন, তারপর কথা বলেন, এটা করেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে, “আমার কাছে মানুষ অনেক দূর-দূরান্তর থেকে দেখা করতে আসে। কোন সময় কি খাইয়া বাইর হইছে কে জানে। তাই আগে খাইতে দেই। তোরা তো কষ্টের দিন দেখছ নাই, আমি দেখছি। মানুষেরে কচু-ঘেচু-জোয়ার-বাজরা খাইয়া থাকতে দেখছি।” ভাষাণী হুজুর সম্ভবত চার্চিল সৃষ্ট সেই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষটির কথা বলেছিলেন যেখানে বাংলায় নিহত হয়েছিলো চল্লিশ লক্ষ মানুষ। চার্চিল সেই দুর্ভিক্ষ নিয়ে তামাশা করেছিলো ও বাঙালী-ভারতীয়দেরকে ইতর বলেছিলো! ঐ দুর্ভিক্ষ নিয়েই ছবি একেছিলেন কিংবদন্তি চিত্রকর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন।
আমার বুকটা হঠাৎ ধড়াস করে উঠলো! সামনে কি তেমন কোন দিন আসছে?

রিকশাটা ডানে মোড় নিতেই একটা মসজিদের সামনে এলাম, দেখলাম কেউ একজন পিকআপ ভরে রান্না খাবার নিয়ে এসেছে, তাই গরীবের মধ্যে বিলাচ্ছে। কয়েকজন তরুণ সাহায্য করছে, মসজিদ থেকে দুজন হুজুরও বেরিয়ে এসে কাজে সাহায্য করতে শুরু করলেন। এভাবেই একদল হৃদয়বান মানুষ ও সাহসী তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ১৯৭১ সালে। তারা নিজেদের জীবন বা অন্য কোন কিছুর তোয়াক্কা করে নাই, তাদের কাছে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমই ছিলো বড়! অথচ পরবর্তিতে অন্যেরা তার ক্রেডিট নেয়ার চেষ্টা করেছে!

রিকশাওয়ালা আমাকে বললো, “স্যার, আমারে একটু সময় দিবেন? আমি ঐখান থেইকা একটা প্যাকেট নিয়া আসি?” আমি বললাম, “অবশ্যই, যাও তুমি, আমি দাঁড়ালাম।” কয়েকদিন আগেও এরকম দেখেছিলাম, কেউ একজন লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে একশত টাকা করে বিলি করছে।

রিকশাওয়ালা খাবারের প্যাকেট নিয়ে ফিরে আসলো। আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কি বাকি পথটা চেনো?” রিকশাওয়ালা বললো, “জ্বিনা, এইদিকে চিনি না। আপনি চিনাইয়া দিয়েন।”
আমি: তুমি কি এইদিকে রিকশা চালাও না?
রিকশাওয়ালা: আমি আসলে রিকশাই চালাই না।
আমি: মানে কি?
রিকশাওয়ালা: আমি ‘ব’ সোসাইটিতে পিয়নের চাকরী করি। আমাগো এখন ছুটি, আটজন রাখছে, আটজনেরে ছুটি দিছে। বইসা থাকার চাইতে কাম করা ভালো। তাই আমি রিকশা চালাইতাছি।
দুইএকদিন আগে বাজারে এরকম একজনকে দেখেছিলাম, যে আসলে কাঠমিস্ত্রী কিন্তু এখন সে বাজারে বসে লেবু বিক্রি করছে।

এতসব ভাবতে ভাবতে ঐ বাড়ীর সামনে চলে এলাম। একজন মুরুব্বী বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, আরে আসো আসো, তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। চলো ভিতরে যাই।

আমি মনে মনে ভাবছিলাম। মিটিংটা কতক্ষণ চলতে পারে? নওরিন তো অপেক্ষা করবে!

(চলবে)

রচনতারিখ: ০১লা জুলাই, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১২টা ৫৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.