অনলাইন প্রকাশনা
নারীর আট কলা হেকমত

নারীর আট কলা হেকমত

নারীর আট কলা হেকমত

—pantha_nazrul

কয়েকদিন পূর্বে এক সন্ধ্যায় জরুরী কথা আছে বলে আমার আবাল্য বন্ধু রনি আমাকে ডেকে নিয়ে যায় মতিঝিলের একটি রেস্তোরায়। রনির চোখে-মুখে চিন্তার রেখা। মলিন চেহারা। মুখোমুখি বসে জানতে চাইলাম ‘‘কি হয়েছে তোর?’’

কষ্টের দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে সে বললো, ‘‘দোস্ত হেরে গেছি! সেই মেয়েটির কাছে হেরে গেছি!’’ মৃদু হেসে বললাম, ‘‘এতে লজ্জার কিছু নেই। নারীর কাছে হারাতেই গৌরব!’’ সে রেগে বললো, ‘‘মারুফ শয়তানি করবি না। তুই সবকিছুতেই শয়তানি করিস।’’

এদিক সেদিক পর্যবেক্ষণ করে রনি বললো, ‘‘মারুফ এখানে মাঝখানটায় না বসে চল আমরা ঐ ‘এসি রুমটায় গিয়ে বসি।’’ মারুফ বললো, ‘‘না, যারা লেডিস নিয়ে আসে তারা সাধারণত ঐখানে বসে। ঐটার ভিতরে আবার ছোট ছোট কেবিন আছে।’’ ‘‘তাইলে চল ঐ কর্নারে গিয়ে বসি’’ বললো রনি।

বাচ্চা বয়সের এক ওয়েটার মারুফের মুখের দিকে চেয়ে বলে, ‘‘মামা কী খাবেন।’’ রনি বলে, ‘‘এই বেটা, ‘নান’ নিয়ে আয়, যা।’’ এবার রনির মুখে দিকে চেয়ে ওয়েটার বলে, ‘‘মামা সাথে কি গ্রীল দিবো না শিক?’’ হালকা রেগে রনি বলে, ‘‘এই বেটা ‘বস’ দিছে বাঁশ আর তুই দিবি শিক?’’ রনির কথা শুনে বেচারা ওয়েটার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। মারুফ হাসতে হাসতে বলে, ‘‘মামা হাফ গ্রীল নিয়ে এসো।’’

‘নান’ খেতে খেতে রনি বললো, ‘‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ব্যাংক শিফ্ট করবো। কাজের প্রতি আমার ডিভোশন, ডেডিকেশন, সিন্সিয়ারিটি সবই গেল বৃথা। মেয়েটি সারাদিন থাকে ইজি মুডে তারপরও সে-ই পেল কনফার্মেশন লেটার!

তাছাড়া সে তো আমার পরে জয়েন করেছে। যেখানে বস প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল আমার পারফর্মেন্সে তিনি ওভার সেটিসফাইড সেখানে তিনি চূড়ান্ত কাজটি করলেন মেয়েটির ফেভারে। আমার মন খারাপ দেখে বস ডেকে নিয়ে বললেন, মেয়েটি একজন ডাইরেক্টরের আত্মীয় তাই আমার কিছুই করার ছিল না।’’

মারুফ ঝলসানো মাংশখন্ড মুখের কাছে নিয়েও মুখে না দিয়ে হাত নীচে নামিয়ে ইষত রেগে তীক্ষ কণ্ঠে বলে, ‘‘শালা তুই আসলেই একটা গাধা। মেয়েটি কারোরই আত্মীয় নয়। নিশ্চয় সে আট কলার যে কোন এক কলা দিয়ে কাজ বাগিয়েছে!’’

মারুফের কথা শুনে রনি যেন আকাশ থেকে পড়ে! বিস্ফারিত নয়নে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো, ‘‘আট কলা মানে?’’ বড়ো বড়ো চোখে রনির মুখের দিকে চেয়ে মারুফ বললো, ‘‘বেটা বলদ ইউনিভার্সিটি লাইফে তো শুধু সবরি কলা খেয়েছিস আর হলে বসে বসে অঙ্ক কষেছিস কোন দিন কি সন্ধ্যার পর টিএসসিতে গিয়েছিস? তুই নারীর আট কলা বুঝবি কিভাবে?’’

ভেংচি কেটে রনি বললো, ‘‘তুই মনে হয় খুব জ্ঞানী হয়ে গেছিস?’’ ‘‘না তা নয় তবে আমি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে-ফিরে নারীর আট কলা হেকমতের তাণ্ডব দেখে পাকা হয়ে গেছি!’’ বললো মারুফ।

ওয়েটারকে ডেকে চা’র অর্ডার দিয়ে, মরুফ বললো, ‘‘দোস্ত, কয়েকটি ফার্মে কাজ করার সুবাদে লক্ষ্য করেছি, ছেলেরা প্রচুর পরিশ্রম করে, খাটুনি করে, দৌড়া-দৌড়ি করে কাজ করে। যখন-তখন অর্থাত ঝড়-বৃষ্টি, রোদ-খরা, শীত-গরম যাই থাকুক না কেন অফিসের কাজে বাইরে ছুটাছুটি করে। তারপরও দেখতাম ছেলেরা বসের মন পেতো না। ছেলেদের প্রতি বসের চোখ সবসময় রাঙ্গানোই থাকতো! অপর দিকে নারী সহকর্মীরা সৌন্দর্য চর্চা আর পর চর্চায় ব্যস্ত থেকেও বসের সদয় কৃপায় থাকতো দুধে-ভাতে। ওদের প্রতি বসের ভাবখানা এমন যে, ‘তোর বদনখানি মলিন হলে . . . . আমি নয়ন জলে ভাসি’!’’

রনি নড়েচড়ে বসে খুশীভাব নিয়ে বললো, ‘‘তুই একেবারে সত্যি কথা বলেছিস।’’ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মারুফ বললো, ‘‘দেখ দোস্ত. মাজার ব্যাপার হলো, কিছুদিন হলো একটি কর্পোরেট অফিসে জয়েন করেছি। কাজের চাপ প্রচুর। দম বন্ধ হয়ে আসে। ছেলেরা রীতিমত গলদঘর্ম। এ অবস্থায়ও মেয়েরা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়!

দ্বিতীয় স্তরের কয়েকজন বস সুযোগ পেলেই বলাবলি করে, ‘কেন যে কর্তৃপক্ষ মেয়েদেরকে নিয়োগ দেয়! আসে সবার পরে আবার যায় সবার আগে। কাজের লোড নিতে চায় না।’ মনে মনে ভাবি যাক্ বাবা তাহলে এখানকার বসেরা বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। হায় খোদা! এন্ড অব ইয়ারে যখন এই বসেরা এসিআর দিলো তখন দেখা গেলো বেশ কয়েকজন ছেলে ফেল! আর মেয়েরা সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে ফার্স্ট পজিশনে থেকে পূর্ণিমার চাঁদের মতো হাসছে! রবিন্দ্রনাথের ‘আমি কী দেখেছি মধুর হাসি’র মতই প্রাণ জুড়ানো হাসি! এই হাসিও কি নারীর আট কলার এক কলা যা দেখে পুরুষদের প্রাণ জুড়িয়ে যায়?

প্রথম স্তরের একজন বস যাকে সিংহের সাথে তুলনা করা যায়। তাঁর শাসন গাদ্দাফির মতই লৌহ-কঠিন। বিন্দু পরিমাণ দয়া মায়া নেই। ছেলেদের কোন কাজে য্তকিঞ্চিত ত্রুটি কিংবা কোন একটি অফিস নোটে সামান্য ভুল পেলেই ডেকে নিয়ে কর্কশ ভাষায় চেচামেচি করেন এবং বলদ, গাধা, অকর্মা ইত্যকার কান গরম করা শব্দে বকা-ঝকা করেন।

কিন্ত সেই বসের সামনে যখন সম অপরাধে কোন নারী অফিসারকে হাজিরা দিতে হয় তখন তিনি মুনালিসার সেই বিখ্যাত হাসি দিয়ে, মোমের মতো গলে, মোলায়েম কন্ঠে বলেন, ‘এই ভুলগুলো কারেকশান করে ফাইনাল প্রিন্ট নিয়ে আসুন।’

এদিকে সামান্য ভুলের জন্য বসের ধমক আর বকা-ঝকা খেয়ে গোমড়া মুখে বসে থাকা ছেলেরা অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখে, নারীর প্রতি বসের ‘কী স্নেহ, কী মায়া গো – !’ কেউ কেউ মনে মনে নিজের উপর রাগ করে বলে, ‘শালা কেন যে নারী হয়ে জন্ম নেই নি’!

জোসের সাথে রনি বলে উঠে, ‘‘আরে দোস্ত আমিই তো মনে মনে নারী না হওয়ার জন্য নিজের উপর রাগ করতে ছিলাম! তবে সত্য বলতে কি আমার বস আবার একটু অন্যরকম মানুষ। খুব কঠিন প্রকৃতির লোক। তার মাঝে রসবোধ বলতে কিছু নেই। কাজ ছাড়া কিচ্ছু বুঝেন না। মেয়েদের প্রতি তার দূর্বলতা আছে এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।’’

মারুফ বলে, ‘‘আমার লৌহ কঠিন বস, যার দাপটে ছেলেরা বিড়ালের মতো ঘাড় নুয়ে মাটির সাথে মিশে চলে অথচ সেই বসই কিনা একজন নারী কর্মী সামনে গেলে বরফের মতো গলে যায়! বিশাল সরোবরের নীল শান্ত পানির মতো ঠান্ডা হয়ে যায়!

পল্লী কবির গল্পের বই ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্পে’ পড়ে ছিলাম, নারীর নাকি আট কলা হেকমত আছে। সাপুড়েরা মন্ত্রবলে যেভাবে বিষধর সাপকে পোষ মানিয়ে রাখে তেমনি নারীরা এই আট কলা হেকমত দিয়ে পুরুষকে কাবু করে রাখে! সিংহপুরুষ তুল্য বস কি তাহলে নারীর আট কলা হেকমতের প্রভাবে এমনভাবে বিগলিত হয়ে পড়েন?’’

রনির চোখের দিকে চেয়ে মারুফ বলে, ‘‘নাকি ময়মনসিংহের বাউল কবি জালালের নিম্নোক্ত গানের ‘চুলা’র তাপে বিগলিত হয়ে পড়েন? ‘’চুলা বানাইলে কি কৌশলে/কলের চুলায় জল দিয়ে আগুণ জ্বলে/যেখানে ঐ কলের চুলা, দুনিয়ার সব ওলামেলা/ধনী-মানীর পান্থশালা, আসে যায় দলে দলে/ . . . . . সেই চুলাতে সবই রান্ধা, এই দুনিয়ার যত বান্দা!’’

গানটা বলার সাথে সাথে তারা দু’জনে একসাথে হেসে উঠে। রনি বলে, ‘‘দোস্ত তুই তো দেখি পুরোদস্তর নারী বিদ্বেষী!’’ ‘‘আরে না, পাবনা কলোনীর রিদওয়ানাকে পাবার আশায় ক্যারিয়ার গঠনের পিছনে ছুটতে ছুটতে জীবনটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি! আর তুই আমাকে বলিস নারী বিদ্বেষী!’’ বললো মারুফ। রনি বললো, ‘‘দোস্ত আমারও তো একই অবস্থা, চাকুরীটা পাকাপোক্ত না হলে তানিয়াকে তো ওর ‘কর্তৃপক্ষ’ বিয়েই দিবে না। কতো সিরিয়াস হয়ে যে, অফিসে কাজ করি, তারপরও বসের মন পেলাম না।’’

মারুফ মুচকি হেসে বলে, ‘‘এক কাজ কর ঐ মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেল। তাহলে তোর ভাগ্যও ফিরে যাবে।’’ রনি বলে, ‘‘শালা, তানিয়া জানতে পারলে, এ পরামর্শের জন্য তোর আক্কেল দাঁত তুলে ফেলবে!’’

হঠাত রনির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠে। হোটেলের প্রবেশ পথের দিকে নির্বাক চেয়ে আছে সে। রনির চোখের সামনে হাত নেড়ে মারুফ বলে, ‘‘কীরে কী হয়েছে?’’ কিছুটা তুতলিয়ে তুতলিয়ে রনি বলে, ‘‘দোস্ত পিছনে চেয়ে দেখ আমার বস, সাথে ঐ মেয়েটা!’’

রনির বস মেয়েটার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাসতে হাসতে হোটেলে প্রবেশ করে সোজা ‘এসি রুম লেখা’ দরজা দিয়ে ভিতের চলে যায়। মারুফ রনির দিকে কঠিন চোখে চেয়ে বলে, ‘‘কীরে তুই না বললে, তোর বসের রসবোধ বলতে কিছু নেই। এখন তো দেখি, রস উপচে পড়ছে!’’

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.