নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – আট)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – আট)
—————————- রমিত আজাদ

লেনা ও সিকা একসাথে হেটে যাচ্ছে!
সেদিন দুপুরের দিকে ইউনিভার্সিটির সামনের এ্যাভিনিউ -এর ফুটপাত ধরে হাটছিলাম। হঠাৎ ওদেরকে দেখলাম। ওরা আসছিলো উত্তর দিক থেকে, আমি যাচ্ছিলাম দক্ষিণ দিকে। একেবারে মুখোমুখী হলাম।

লেনা: তুষার, কেমন আছো?
আমি: ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
লেনা: ভালো।
এরপর আইভরি কোস্টের সিকাকে বললাম
আমি: কি বন্ধু কেমন আছো? এখানে কি মনে করে তোমরা?
সিকা আমাকে দেখে একটু বিব্রত হলো মনে হয়। লেনাকে আবার অতটা বিব্রত মনে হলো না। বরং আমাকে দেখে একগাল মিষ্টি হেসে বললো,
লেনা: আমি ইউনিভার্সিটির অফিসে একটা কাজে এসেছিলাম। ওখানে সিকার সাথে দেখা। এখন আমি বাস স্টপেজের দিকে যাচ্ছি। সিকা আমাকে এগিয়ে দিচ্ছে।
আমি মনে মনে ভাবলাম, তাও ভালো! তবে সিকা যে লেনার পিছনে লেগেছে, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
বললাম, “যাও তাহলে। পরে দেখা হবে।”

লেনা কিছুদূর গিয়ে উল্টা ফিরে তাকালো। আমিও ওর দিকে তাকালাম। ওর চোখ যেন বলতে চাইছে, ‘কিছু হয়নি। তুমি মনে কোন কষ্ট নিওনা।’ তবে আমার মনটা কেন যেন খারাপ হয়ে গেলো! আবার ভাবলাম, যার যার তার তার ব্যাপার, আমার কি!? আমি হাটতে হাটতে আনিতার ফ্যাকাল্টির দিকে গেলাম।

আনিতা ফ্যাকাল্টিতেই ছিলো। ক্যান্টিনে গিয়ে ওকে পেলাম। দেখলাম লাঞ্চ করছে। ওর সাথে আরেকটি মেয়ে ছিলো। আনিতা পরিচয় করিয়ে দিলো। মেয়েটির নাম ‘তেরেসা’, পানামার মেয়ে। বেশ সুন্দরী মেয়েটা। আমিও ওদের সাথে সামান্য লাঞ্চ করে নিলাম। ঐদিনের জন্য আনিতার ক্লাস শেষ হয়ে গিয়েছিলো। ফ্যাকাল্টি থেকে একসাথে ফিরলাম।
আনিতা বললো, তেরেসা মেয়েটার ভাগ্যটা ভালো, একটা ধনী বয়ফ্রেন্ড পেয়েছে, নাইজেরিয়ার ছেলে। মস্কোতে ছেলেটার একটা রেস্টুরেন্ট আছে। তেরেসা গিয়েছিলো ঐ রেস্টুরেন্ট পার্ট টাইম কাজ করতে, সেখানেই পরিচয়, এখন ওদের মধ্যে গভীর প্রেম। আমি বললাম, “ভালোই তো। সুন্দরী মেয়ে দ্রুত পুরুষের নজরে পড়েছে, তাও আবার ধনী ব্যাক্তির!”

সেদিন বুধবার ছিলো। আমার জন্য ওয়ার্কিং ডে, ফ্যাকাল্টিতে যাইনি। অফিসেই ছিলাম। হঠাৎ কোম্পানী সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া বললো, “এই নিন, আপনার ফোন।”
আমি: কে ফোন করেছে? নাম বলেছে?
ভিকা: কোন এক লেনা।

আমি: হ্যালো লেনা, কি খবর?
লেনা: মোটামুটি। আমাকে একটু হেল্প করতে পারবে?
আমি: সামর্থের মধ্যে থাকলে অবশ্যই পারবো।
লেনা: আমার একটা ‘ট্রান্সপোর্ট মান্থলি কার্ড’ লাগবে। (মস্কোতে এমন কার্ড কিনতে পাওয়া যায়, যা দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো ও আপার গ্রাউন্ড পাবলিক ট্রান্সপোর্ট একমাস অনায়াসে চলাচল করা যায়। দাম খুব বেশি না। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের এই সুযোগ সুবিধাটা মস্কোতে বা পুরো রাশিয়াতেই চমৎকার।)
আমি: ওটা তো কাউন্টারে কিনতেই পাওয়া যায়।
লেনা: না ইউজুয়ালটার দাম বেশি। আমার স্টুডেন্ট কার্ড দরকার, ইউজুয়ালটার হাফ দামে পাবো।
আমি: হ্যাঁ, জানি। তুমি এক কাজ করো ইউনিভার্সিটি অফিসে যাও। ওখানে একজন আছে, ওর কাছে পাওয়া যাবে।
লেনা: হ্যাঁ, আমাকে সিকা বলেছে, যে ও দিতে পারবে।
আমি: তাহলে তো হয়েই গেলো।
লেনা: কিন্তু।
আমি: কিন্তু কি?
লেনা: সিকা চায়, ঐ কার্ড আনতে আমি ওর রুমে যাই।
আমি: তারপর?
লেনা: কিন্তু আমি ওর রুমে যেতে চাই না। (ওর কন্ঠে আকুতি ঝরে পড়লো)

এবার আমি বুঝলাম বিষয়টা। সিকা ভালোভাবেই লেনার পিছনে লেগেছে। যে কোন সুযোগই কাজে লাগাতে চাচ্ছে! অবশ্য ওকে দোষই বা দেই কি করে? বেশিরভাগ পুরুষ মানুষই এই ধান্দায় থাকে!

আমি: আচ্ছা ঠিক আছে। কাল সকাল দশটায় ইউনিভার্সিটি অফিসে আসো। আমি তোমাকে ‘ট্রান্সপোর্ট মান্থলি কার্ড’ যোগাড় করে দেব।
লেনা: ঠিকআছে।

আমি মনে মনে ভাবতে শুরু করলাম। এই সিকাই আমাকে লেনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। এখন সিকা লেগেছে লেনার পিছনে। লেনা রাজি নয়। আর লেনা আমার কাছেই হেল্প চাইলো। কৌশলে আমাকে সবকিছু অবগতও করলো। সবকিছু সাজাবো কিভাবে? এই সবকিছুর মিনিং কি করবো? একটা মানসিক অস্থিরতা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আমার ভিতর কাজ করতে লাগলো!

পরবর্তি দিন লেনার সাথে আমার দেখা হলো। ওর জন্য ‘ট্রান্সপোর্ট মান্থলি কার্ড’-এর ব্যবস্থা করে দিলাম। কার্ড হাতে পেয়ে ও আমার দিকে তাকালো। আমি ওর চোখের এক্সপ্রেশন বুঝতে পারলাম। ও সম্ভবত আমার রুমে যেতে চাইছে। কিন্তু আমার তখন সে ইচ্ছা করছিলো না। তাছাড়া ওখানে যদি আনিতা থাকে তাহলে সমস্যা আছে।
আমি: লেনা। কাজ তো হলো। চলো কোথাও বসে কফি খাই।
লেনা আরেকবার আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম।
লেনা: চলো।

ক্যাম্পাসে ক্যাফের কোন অভাব নাই। ডরমিটরির প্রত্যেকটা বিল্ডিংয়েই মিনিমাম দুইটা করে ক্যাফে। আমরা মেইন বিল্ডিং ক্রেস্ত-এ না গিয়ে ছোট একটা ক্যাফেতে গিয়ে বসলাম। কফি শেষ হলে আমি লেনাকে বাস স্টপেজ পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। ফিরতি পথে আমার মনে কিছু প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিলো। লেনা মেয়েটি সুন্দরী, খুব নম্র-ভদ্রও, আবার উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে। চাকরি-বাকরি করে নিজের সংসার চালাতে পারে। ওর তো একটা ভালো জামাই না পাওয়ার কথা না। তাহলে এমন নিঃসঙ্গ কেন ওর জীবন?

মঙ্গলবার ফ্যাকাল্টিতে লেনার সাথে দেখা হলো ডিপার্টমেন্টের রুমে। তখনও কোন অধ্যাপক এসে পৌঁছাননি। আমরা দুজনই কেবল ছিলাম।
আমি: লেনা আজ তোমার ড্রেস-আপটা দারুণ হয়েছে।
লেনা: (মিষ্টি হেসে বললো) জানো আমার যখন জন্ম হয়, আমার মায়ের খুব কম বয়স ছিলো। তাই ধরো আমার বয়স যখন নয়-দশ বছর, মানে যখন আমি মোটামুটি বুঝতে শুরু করেছি। আমি দেখতাম আমার মা ভীষণ সুন্দর ড্রেস আপ করেন। মানে উনার অল্প বয়স ছিলো তো, তাই বেশ সাজগোজ করতেন। তখন আমার মনে সখ জাগলো। আমি যখন বড় হবো, আমিও আমার মায়ের মত দারুণ করে ড্রেস আপ করবো।
এরপর ওর মনটা বিষন্ন হয়ে এলো। বললো “কি পরিহাস দেখো! আমিও আমার মায়ের মত খুব অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলাম।”

আমি একদম চুপ রইলাম। কেউ যদি তার জীবনের কোন দুঃখের কথা বলতে চায় সেটা আমার ভালো লাগে না। মন খারাপ লাগে। তাই আমি তখন কিছু বলতে পারিনা। কখনো কিছু জিজ্ঞাসাও করিনা। সে নিজে থেকে কিছু বললে বলুক। আমার হাজবেন্ড-এর সাথে আমার প্রেম ছিলো খুব গভীর। তাও আবার স্কুল জীবন থেকে, অথচ কি হলো দেখো!
আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান স্যার ও অধ্যাপক পাপোভ স্যার রুমে ঢুকলেন। চেয়ারম্যান স্যার লক্ষ্য করলেন যে আমি আর লেনা খুব কাছাকাছি বসে কথা বলছি! আমরা একটু অপ্রস্তুত হলাম। তবে এই দেশে নারী-পুরুষ সম্পর্ক নিয়ে কেউ কোন কথা বলে না। এটাকে ব্যাক্তিগত বিষয় হিসাবেই সবাই নেয়।

লেনা: চলো, বাইরে যাই।
আমি: চলো।

করিডোর ধরে হাটতে হাটতে লেনা স্মোকিং রুমটাতে গেলো। সেখানে গিয়ে একটা সোফায় বসলো।

আমি: এখানে আবার বসলে কেন?
লেনা: একটা সিগারেট খাবো।
আমি: মানে?
লেনা: আমার আসলে সিগারেটের অভ্যাস নেই। কিন্তু যখন খুব অস্থির লাগে, তখন আমি সিগারেট খাই।
আমি: কি লাভ হয়?
লেনা: স্ট্রেস কমে।

লেনা ব্যাগ খুলে একটা সিগারেট বের করলো। তারপর ধরাতে গিয়ে দেখলো ওর কাছে কোন লাইটার নেই। আমি বললাম, “দাঁড়াও একটা লাইটার জোগাড় করছি।”
লেনা বসে বসে সিগারেট-টা টানতে লাগলো, একদম চুপচাপ। আমার সাথেও কোন কথা বললো না। বুঝলাম পুরনো দিনের কথা মনে করে ওর মনটা ভীষণ খারাপ হয়েছে, ঐভাবে স্ট্রেস কমাতে চাইছে। সুন্দরী ও বিনয়ী লেনার হাতে সিগারেট-টা একদম মানাচ্ছিলো না!

এই পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক মানুষই ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে করার মত লাকি হয়!
লেনা তো ঐ লাকি মানুষদেরই একজন ছিলো, যে কিনা স্কুল জীবন থেকে বন্ধুত্ব এমন একজনকে বিয়ে করতে পেরেছিলো। এমনকি এটা কোন অসম প্রেম-ও ছিলো না (মানে দুইটা ভিন্ন ধর্মের, বা দুইটা ভিন্ন দেশের, বা দুইটা ভিন্ন জাতির মানুষ)। তারপরেও ওদের ঘর ভাঙলো কেন?

আজ অফিস থেকে সন্ধ্যার দিকে ডরমিটরিতে ফিরলাম। খুব টায়ার্ড লাগছিলো। একটা ঘুম দিলাম। জানিনা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি। হয়তো ঘন্টাখানেক হবে। হাতমুখ ধুয়ে এক কাপ চা খেলাম। তারপর ভাবলাম লেনাকে একটা ফোন করি, কথা বলি ওর সাথে। নিচতলায় গিয়ে কয়েন দিয়ে ফোন করলাম।
লেনা: হ্যালো।
আমি: লেনা, আমি তুষার।
লেনা: বুঝতে পেরেছি।
আমি: কেমন আছো?
লেনা: ভালো।
আমি: আজ কাজে গিয়েছিলে?
লেনা: গিয়েছিলাম।
আমি: কাজে সব খবর ভালো?
লেনা: আচ্ছা শোন, তুমি এমন গভীর রাতে ফোন করেছ কেন? (স্বর একটু কড়া মনে হলো)
আমি: গভীর রাত?
লেনা: তোমার সাথে ঘড়ি আছে।
আমি: না।
লেনা: এখন রাত একটা বাজে।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আসলে ডরমিটরিতে গভীর রাতেও লোকের চলাচল থাকে চট করে সময় বোঝা যায় না। আর আমি রুমেও দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাই নি।
আমি: সরি লেনা। আমি আসলে অফিস থেকে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মনে হয় কয়েকঘন্টা ঘুমিয়েছি তাই সময় ঠাহর করতে পারিনি।
এবার লেনা হেসে ফেললো।
লেনা: আচ্ছা ঠিকআছে কোন সমস্যা নেই, তুমি কথা বলো।
আমি: না থাক বেশি রাত হয়ে গেছে। তুমি ঘুমাও। পরে দেখা হবে।

আনিতার ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে। আমি এখন ওকে বিরক্ত করি না, ওর পড়ার ক্ষতি হবে বলে। আনিতাও ইদানিং আমার সাথে দেখা করছে কম। কোন এক মঙ্গলবার আমি গেলাম ফ্যাকাল্টিতে। ডিপার্টমেন্টে আমার সুপারভাইজার ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আমি উনার সাথে কিছুক্ষণ পড়া ও কাজ বুঝলাম। তারপর রুমের বাইরে বের হলাম। দরজা খুলতেই দেখি, হঠাৎ আনিতা ফ্যাকাল্টিতে এসে উপস্থিত হলো।
আমি: তুমি এখানে?
আনিতা: “শোন রিসার্চের গুরুত্বপূর্ণ এই কাগজগুলো তুমি আমার রুমে ফেলে এসেছিলে। আজ হঠাৎ আমার চোখে পড়লো। ভাবলাম তোমাকে ওগুলো দেয়া দরকার তাই চলে এলাম। আমি বললাম, “ভালো-ই করেছে। কাগজগুলো আমার লাগবে। থ্যাংক ইউ। এদিকে তোমার তো সামনে পরীক্ষা, তা এখন কি তুমি চলে যাবে?
আনিতা: হ্যাঁ, সময় নষ্ট করতে চাই না। যাই।
হঠাৎ করেই করিডোরের বাঁকে লেনার আবির্ভাব হলো। লেনা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাবার্তা দেখলো। আমি কিছুটা বিব্রত হলাম। আনিতা কিছু লক্ষ্য করেনি। ও যেমন এসেছিলো, তেমনি দ্রুত চলে গেলো। তারপর লেনা আমার দিকে এগিয়ে এলো, তবে এই বিষয়ে লেনা আমাকে কোন প্রশ্ন করলো না। এমনকি জানতেও চাইলো না মেয়েটা কে? এই প্রথম ওরা দুজন দুজনকে দেখলো।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৬শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনা সময়: বিকাল ০৫টা ৫৪মিনিট

Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.