নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব চার)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব চার)
———————————-রমিত আজাদ

পার্কের পথ ফুরালে আমরা মস্কোর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ‘লেনিন এ্যাভিনিউ’-তে উঠে এলাম। এটাকে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ধরা হয় এই কারণে যে, এর এক মাথায় রয়েছে ‘এয়ারপোর্ট ভ্নুকোভা’, এবং আরেক মাথায় রয়েছে ‘ক্রেমলিন’। জার-এর আমলের রাজপ্রাসাদ ‘ক্রেমলিন’ যার অর্থ দুর্গ। তা এখন রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের দফতর। বাইরের দেশে থেকে কোন গুরুত্বপূর্ণ গেস্ট এলে তারা ‘এয়ারপোর্ট ভ্নুকোভা’-তেই ল্যান্ড করেন (যদিও এই এয়ারপোর্ট মস্কোর দ্বিতীয় বৃহত্তম)। তারপর তাদেরকে এই এ্যাভিনিউ দিয়েই ক্রেমলিন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিরাও এই সড়ক দিয়েই বেশি যাতায়াত করেন।

মস্কোর পথ-ঘাটগুলো খুবই প্রসস্ত এবং পরিচ্ছন্ন। এখানকার ফুটপাতগুলো এতই চওড়া ও পরিচ্ছন্ন যে ফুটপাত ধরে হাটতে ভীষণ ভালো লাগে। ফুটপাতগুলো চওড়া হওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও কম হয়। যাহোক আমি লেনার সাথে আরো কিছু পথ হাটলাম। তারপর একটি আন্ডারপাস দিয়ে এ্যাভিনিউ পার হয়ে, রাস্তার ওপাশে উঠলাম। একটু পরেই লেনা হাতের ডানে একটা দালান দেখালো। বুঝলাম এর ভিতরেই বইয়ের দোকান। একটা সিঁড়ি বেয়ে আমরা দোতলায় উঠে গেলাম। ভিতরে ঢুকে দেখলাম সত্যিই খুব বড় বইয়ের দোকান! অনেকগুলো ভাগ, একেক ভাগে এক এক রকম বই কোথাও শেলফ এর পর শেলফ জুড়ে ফিজিক্সের বই, কোথাও শেলফ এর পর শেলফ জুড়ে কেমিস্ট্রীর বই, কোথাও বা সমাজবিদ্যার বই, ইত্যাদি। রাশিয়াতে পড়ালেখার বইয়ের দাম সস্তা। আমি ফিজিক্সের কয়েকটা বই কিনলাম। অতি প্রয়োজনীয় ‘আইনস্টাইনস ড্রীম’ বইটাও কিনলাম।

বই কেনা শেষ হলে কাউন্টারে গেলাম। টাকা নেয়ার পর তারা বললো বইগুলো এখানে দিন। আমি ভাবলাম, কেন ওখানে বই দেব কি ব্যাপার? তারপর দেখলাম এক মহিলা, বইগুলো একটা যন্ত্রে ঘষে দিচ্ছে। বুঝলাম বইগুলোতে সিকিউরিটি কোড লাগানো ছিলো। যাতে কেউ দাম না দিয়ে বই নিয়ে সটকে পড়তে না পারে। ঘষে ঘষে তাকে ডিম্যাগনেটাইজড করা হলো সম্ভবত।

বই কিনে আমরা দুজন নিচে নেমে এলাম।
লেনা: এখন কোথায় যাবে?
আমি: ডরমিটরিতে চলে যাবো। তুমি?
লেনা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকালো। ভাবলাম ওর চোখ কি কিছু বলতে চায়?
তারপর লেনা বললো, “চলো তোমাকে বাসস্ট্যান্ডে দিয়ে আসি। তারপর আমিও বাসায় চলে যাবো।”

সেদিনটা আমি খুব ভেবেছিলাম। মেয়েটা আমার সাথে এতটা পথ কেন আসলো? ওর ঐদিকে কোন প্রয়োজনই ছিলো না। তারপরেও এলো। আমার কি ওর সাথে সেদিন কোথাও লাঞ্চ করা উচিৎ ছিলো? না থাক, এতটা ঘনিষ্টতা দরকার নেই হয়তো। কেন যেন ইদানিং মন কোন বন্ধনে জড়াতে চায় না। লেনার সাথেও না, আনিতার সাথেও না।

ডরমিটরিতে দুপুরের দিকে ফিরলাম। আমি রুমে ঢুকতে না ঢুকতেই, আনিতা উপস্থিত।
আমি: তুমি আজ দুপুরেই চলে এলে?
আনিতা: বারে, আমিতো জানি। তুমি আজ ফ্যাকাল্টিতে গিয়েছে। আজ আর অফিসে যাবে না, আজ তোমার ছুটি। তাই আমি তোমার সাথে আজকে লাঞ্চ করতে চলে এসেছি। এই নাও।
আমি: কি ওটা?
আনিতা: বড় চিংড়ি মাছ।
আমি হাসলাম।
আনিতা: আমি জানি তুমি বড় চিংড়ি মাছ পছন্দ করো। তাই সুপার শপে গিয়ে কিনে এনেছি। চিংড়ি মাছ তুমি রান্নাও করো ভালো। আমি সব কিছু গুছিয়ে দেবো আর তুমি শুধু রান্নাটা করবে।

আমার একটা পুরানো ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমাদের এক চালু সিনিয়র ভাই ছিলেন। বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর বাংলাদেশী ছেলেরা যেটাকে খুব বেশী ভয় পায় সেটা হলো রান্না। তা ঐ চালু সিনিয়র ভাইটি তার দুজন সহপাঠীকে বললেন, “দেহো মিঞারা, তোমরা তো আর রান্দা-বারা পারোনা। এহন কি আর করা। ঠিকআছে, রান্দা আমি করমুহানে, তোমরা খালি গুছাইয়া দিও।” ঐ দুজন খুশিই হলেন, যাক রান্না করার ঝামেলা থেকে বাঁচা গেলো! এরপর পরবর্তি তিনমাস, তারা দুজন, সবজি কাটা থেকে শুরু করে মাছ ধোঁয়া পর্যন্ত সবই করেন। আর চালু সহপঠীটি শুধু রান্নাই করে। আর তাদেরকে এটাওটা ফরমায়েশ দেয়, “যাও মরিচ লইয়া আও, যাও পিঁয়াজ লইয়া আও, ইত্যাদি।” তারা দুজন একসময় লক্ষ্য করলেন যে, রান্না করা মোটেও কঠিন কাজ না। একটু নাড়াচাড়া করা আরকি। মূল কাজ তো ঐ কেটে-ধুয়ে গুছিয়ে দেয়া। তারমানে কষ্ট যা করার উনারা দুজনই করছেন আর চালু ভাইটি আরামের কাজ করছেন। ফাকে আবার কমোন রান্নাঘরের সুবাদে অন্যদেশী মেয়েদের সাথে ফিল্ডিং-ও মারেন! তা একদিন চালু ভাইটি পাতিলে একটা নারা দিয়ে বললেন, “যাও গরম মশল্লা লইয়া আও।” এবার উনারা দুজন ক্ষেপে বললেন, “এই তুমি কি পাইছো? শুধু পাতিল নাড়াচারা করো, আর আমাদেরকে দিয়ে কষ্টের কাজ করাও। যাও এখন থেকে আমরা রান্না করবো আর তুমি কেটে-ধুয়ে গুছিয়ে দিবা।” চালু ভাইটি কিছু না বলে আস্তে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে করিডোরে দেখা হলো আরেক ক্লাসমেটের সাথে, তাদেরকে হাসতে হাসতে বললেন, “হালারা চালাক হইয়া গ্যাছে!”

বড় চিংড়ি আমার সত্যিই প্রিয়। আমি বেশ মন লাগিয়ে রান্নাটা করলাম। আরো কিছু আগেই রান্না করে ফ্রিজে রাখা ছিলো। সেগুলোও গরম করে, আমি আর আনিতা মিলে একটা মজার লাঞ্চ করলাম। লাঞ্চ শেষে আমার আরেকবার লেনার কথা মনে পড়লো। লেনা আমার সাথে আজ অনেকটা পথ হেটেছে!

আমি: আনিতা।
আনিতা: হু।
আমি: আজ রাতে থাকবে?
আনিতা: থাকতেই তো এসেছি।

(চলবে)

এখনো স্বপন জাগে,
চাঁদ হেরি চাঁদের মাঝে,
কেন তুমি ফিরো বারে বারে?
মাঝে মাঝে মনে হয়,
তুমি বুঝি তুমি নও।
স্বর্গ হতে এলে ফিরে ফিরে!


রচনাতারিখ: ২৩শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনা সময়: রাত ১১টা ৫৭ মিনিট

Lonely Carnation
————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.