নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ছয়)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ছয়)
—————————- রমিত আজাদ

আনিতাকে নিয়ে কখনোই বসা হয়নি সায়েন্স বিল্ডিং-এর ক্যাফেটাতে। এটা একটা ইন্টারেস্টিং বিষয়ই বটে! লেনার সাথে পরিচয় আনিতার পরে, অথচ লেনাকে নিয়েই সায়েন্স বিল্ডিং-এর ক্যাফেতে বসা হয় রেগুলার, আর আনিতাকে নিয়ে একটা বারও বসা হয়নি। অবশ্য তার কারণ রয়েছে, আনিতার ফ্যাকাল্টি ভিন্ন, ও আমার ফ্যাকাল্টিতে আসেও না। আবার ওর নিজের ফ্যাকাল্টি সেরকম যুৎসই কোন ক্যাফে নেই, যেটা আছে তা হলো একটা স্টুডেন্ট ক্যান্টিন। তবে পাশেই বিশাল আর্টস বিল্ডিং, যদিও এখানে আর্টস-এর সাবজেক্টগুলোর ডিপার্টমেন্টগুলো আছে। কিন্তু তারপরেও এটাকেই সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন বলে ধরে। কারণ এখানে বসেন স্বয়ং ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্ট এবং রেক্টর মহোদয়গণ। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাডমিশন অফিসসহ আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দফতর এই বিল্ডিং-এই আছে। ইউনিভার্সিটির মূল বিষালাকৃতির অডিটোরিয়ামটাও এখানে আছে। বিল্ডিংটাকে উপর থেকে দেখলে একটা ক্রুশ-এর মত মনে হয়। রুশ ভাষায় ক্রুশকে ‘ক্রেস্ত’ বলে। তাই বিল্ডিংটার নাম ‘ক্রেস্ত’। বিল্ডিংটা সোভিয়েত কম্যুনিস্ট শাসনামলে নির্মিত হয়েছিলো। কম্যুনিস্ট-রা ধর্মবিশ্বাসের চরম শত্রু, তারপরেও সেই আমলে ক্রুশ-এর আদলে দালান তৈরী করা হলো কেন সেটা আমার বোধগম্য নয়! আনিতাকে নিয়ে আমি সাধারণত: এই ‘ক্রেস্ত’-এর ক্যাফেতেই বসি। এখানেও কয়েকটি ক্যাফে রয়েছে। এর মধ্যে একটা বড়, আর মোটামুটি সস্তা। আমরা বাঙালী ছাত্রছাত্রীরা ঐ ক্যাফেটায় বসে ধুমসে আড্ডা দেই। প্রতিদিনই বাংলাদেশীদের আট-দশজন ওখানে দুইটা টেবিল একসাথে জোড়া লাগিয়ে বসে আড্ডা দিতে থাকে। আলোচনার বিষয় বেশীরভাগ সময়ই থাকে বাংলাদেশের রাজনীতি অথবা বর্তমান পরিস্থিতি। আবার ক্যাফেটার দেয়াল কাঁচের হওয়ায় বিল্ডিংটার সামনের বিশাল চত্বর ও বাগানের পুরোটাই দেখা যায় ভিতর থেকে। তাই চত্বরে যদি কোন চোখ ধাঁধানো সুন্দরী দেখা যায় তাহলে সবাই মিলে তাকে গিলে দেখে ও তার রূপ-সৌন্দর্য্য নিয়েও আলোচনা করে। আর যদি তরুনীটি হট ড্রেসে থাকে তাহলে তো কথাই নাই! সবার চোখের ব্যায়াম যেমন হয়, আলোচনারও তেমন তুবরী ছোটে!

এই ক্যাফেটার পাশেই আবার সম্পূর্ণ কাঁচে ঘেরা গর্জিয়াস একটি ছোট অথচ দামী ক্যাফে রয়েছে। এখানে সবকিছুর দামই প্রায় দ্বিগুন। আমি আনিতাকে নিয়ে ঐ ক্যাফেটাতেই বসি বেশি। এবার আমার মাথায় একটা জিনিস এলো, আমি আনিতাকে নিয়ে খুব দামী ক্যাফেতে বসি, লেনা-কে নিয়ে অপেক্ষাকৃত কমদামী ক্যাফেতে বসি কেন? কিছুদিন আগে একটা উৎসবে আমি আনিতাকে দিলাম একটা দামী উপহার, আর লেনা-কে দিলাম সামান্য একটা চকলেট বক্স। তার উপর অবশ্য কয়েকটি কার্নেশন ফুল র‍্যাপ করেছিলাম। ফুলটা দেখে লেনা খুব খুশী হয়েছিলো। বলেছিলো, “এত সুন্দর ফুল? আচ্ছা ফুলটা তো চকলেট বক্স-এর সাথে ছিলো না, তুমি আলাদাভাবে পেস্ট করেছ, তাই না?”
আমি: হ্যাঁ।
লেনা: এত ফুল আর চকলেট বক্স এত সুন্দর ম্যাচ করেছে যে আমার আর খুলতে ইচ্ছা করছে না। গিফট-টা ভাঙতে মায়া লাগছে!
লেনা সব কথা মন থেকেই বলছিলো। আমার তখন একটু খারাপই লাগলো, এই ভেবে যে, ঐ একই উৎসবে আমি আনিতাকে একটা দামী উপহার দিয়েছিলাম। আহারে! লেনাকেও দামী কিছু দেয়া উচিৎ ছিলো।

আজ আনিতাকে নিয়ে ক্রেস্ত-এর দামী ক্যাফেটায় গেলাম। ন্যাচারাল বীন-এর কফি আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে বসলাম।
আমি: দেখলাম অনেকেই অডিটোরিয়ামের দিকে যাচ্ছে।
আনিতা: হ্যাঁ। কি একটা প্রোগ্রাম আছে।
আমি: কি প্রোগ্রাম জানো?
আনিতা: না। তবে কয়েকদিন আগে ‘মিস ইউনিভার্সিটি’ সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়েছিলো।
আমি: হ্যাঁ। শুনেছি আমি। তবে যাইনি। আসলে আমার ভালো লাগেনি।
আনিতা: কি ভালো লাগেনি?
আমি: কি একটা মেয়ে সেরা সুন্দরী নির্বাচিত হলো! তোমাদের ইন্ডিয়ান একটা মেয়ে। তার সৌন্দর্য্যের কোন ছিরিই তো দেখলাম না!
আনিতা হেসে ফেললো।
আনিতা: বারে, তুমি অবাক হচ্ছো কেন?
আমি: অবাক হবো না? এত রূপসী রূপসী মেয়ে আছে ইউনিভার্সিটি-তে অথচ ‘মিস ইউনিভার্সিটি’ হলো কিনা একটা আগলি মেয়ে!
আনিতা: তোমার কি ধারণা, ঐ প্রতিযোগিতায় সুন্দরী মেয়েরা যায়?
আমি: যায় না?
আনিতা: কখনোই না। এই ধরো কয়েকবছর আগে প্রথমবার যখন ঐ প্রতিযোগিতা শুরু হলো, আমাদের ব্যাচের ইংরিত-কে তো চেন?
আমি: হ্যাঁ, ইংরিত ভেনিজুয়েলার মেয়ে। ওকে সবাই-ই চেনে। দারুণ সুন্দরী!
আনিতা: রাইট। ওর মা রাশান বাবা ভেনিজুয়েলার। দুইয়ে মিলে সুপার ম্যাচিং হয়েছে। মেয়েটা দেখতে হয়েছে প্রাচীন গ্রীসের সুন্দরীদের মতো। আমরা সবাই মিলে ওকে ধরলাম, ‘যাও না ইংরিত সুন্দরী প্রতিযোগিতায়, তুমিই তো ক্রাউন জিতবে।’ তা ও রাজিই হলো না।
আমি: কেন?
আনিতা: ইংরিত বলে, ‘হু! সুন্দরী প্রতিযোগিতা না ছাই! ওখানে কি আমি সবাইকে আমার নিতম্ব আর স্তন দেখাতে যাবো?’
এবার আমি বুঝলাম ওর কথায় যুক্তি আছে। সুন্দরী প্রতিযোগিতা মানে তো আসলে দেহ প্রদর্শন!
আনিতা: এই কারণেই ওখানে অসুন্দরীরাই যায়, আর অসুন্দরী কেউই সেরা সুন্দরীর মুকুট পায়।

পিএইচডি করার পাশাপাশি একটা পার্ট টাইম জব করি আমি। পিএইচডি করছি সরকারী স্কলারশীপে, কোন খরচাপাতি নাই, উপরন্তু স্টাইপেন্ড পাই। তবে স্টাইপেন্ড-এর পরিমান বেশি না। তাই ঐ পার্ট টাইম জব-টা করতে হয়। এখানে অফিসের চাকরী, পেপার ওয়ার্কস, হোয়াইট কলার জব যাকে বলে। বেতনও খারাপ না। তবে আমার প্লান আছে পিএইচডি-র লাস্ট ইয়ারটাতে কোন চাকরি-বাকরি না করে টানা পড়ালেখা করবো, যাতে ডিসারটেশনটা ভালো হয়। একটা ভালো ইমপ্রেশন নিয়ে ডিফেন্স করতে পারি।

আমার অফিসের দালানটা আসলে একটা হোটেল, তবে এর কয়েকটি তলায় রুম ভাড়া নিয়ে অনেকেই কোম্পানীর অফিস চালায়। হোটেলটা একেবারে সিটি সেন্টারে, এখান থেকে ক্রেমলিন খুব কাছেই হাটা পথে যাওয়া যায়। মেট্রোর নাম তিভেরস্কায়া। মেট্রো স্টেশনের পাশেই রয়েছে মস্কোর প্রথম ম্যাগডোনাল্ডস। মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র জীবনে ওখানে বিশাল লাইন ধরে ভিতরে ঢুকতে হতো, কারণ সারা মস্কোতে তখন ঐ একটাই ম্যাগডোনাল্ডস ছিলো। এখন প্রায় প্রতিটি মেট্রো স্টেশনের পাশেই একটা করে ম্যাগডোনাল্ডস রয়েছে। যাই হোক ঐ যে বলে প্রথম প্রেমই প্রথম প্রেম, তাই তিভেরস্কায়া মেট্রোর পাশের ম্যাগডোনাল্ডস-টাই আমার প্রথম প্রেম। মাঝে মাঝে লাঞ্চ টাইমে আমি ওখানে চলে যাই লাঞ্চ করতে। সবচাইতে ভালো লাগে ওদের আইসক্রীমটা। খুব হাই কোয়ালিটি আইসক্রীম, ন্যাচারাল মিল্ক আর ন্যাচারাল ফ্রুটস দিয়ে তৈরী, নো আর্টিফিশিয়াল ফ্লেভার।

আজ আমি অফিসে বসে ছিলাম। আমি যে রুমটায় বসি ওখানে কোম্পানীর বসের দুজন সেক্রেটারীও বসেন। দুজনাই সুন্দরী তবে একজনা বয়স্কা, আর অপরজন কম বয়স্কা। তবে দুজনাই বিবাহিত। কম বয়স্ক জনা বেশ উচ্ছল
অনেক কথাটথা বলে। তার নাম ভিকা (‘ভিক্টোরিয়া’-র শর্ট ফর্ম)। ক্লায়েন্টরাও আসলে, অপেক্ষমান সময়ে ওর সাথে কথা বলে কাটায়। তরুণী সুন্দরীর সাথে আলাপচারিতা করতে সব পুরুষেরই ভালো লাগে। আমার কেন জানি না তাকে খুব একটা এ্যাট্রাকটিভ মনে হয় না। মেয়েটা সুন্দরী, স্লিম ফিগার, তারপরেও আমার কাছে এ্যাট্রাকটিভ মনে হয় না। এই একটা বিষয়, মানুষের টেস্টের কোন লজিক নাই!

আজ সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ দেখলাম মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক এসে উপস্থিত। হাতে বিশাল এক ফুলের তোড়া। অফিস কক্ষের দরজায় এসে সে দাঁড়াতেই ভিক্টোরিয়া ছুটে গেলো। ভদ্রলোক পরম আবেগে ফুলের তোড়াটি ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দিলো। তারপর শুরু হলো দুজনার লটর-পটর। এই দেশের কালচারে প্রকাশ্য নারী-পুরুষ অন্তরঙ্গতাকে কেউ খারাপ চোখে দেখে না। ওরা দুজন করিডোরের একপাশে গিয়ে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলো। তারপর শুরু করলো চুম্বনসুধা, আদর-সোহাগ, ইত্যাদি। বেশ অনেকক্ষণ চললো এই প্রেমলীলা। লীলা শেষ হওয়ার পর ভদ্রলোক চলে গেলেন। আমি জানতাম ভিক্টোরিয়া বিবাহিতা, ছোট একটি মেয়ে আছে তার। তাই আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,

আমি: ভিক্টোরিয়া উনি আপনার হাজবেন্ড, তাই না?
ভিকা: হ্যাঁ। আমার হাজবেন্ড।
আমি: আপনাদের তো একটা মেয়ে আছে তাই না।
ভিকা: ইয়ে মানে। এটা আমার ‘সেকেন্ড স্বামী’।

কথাটা বাঙালী আমার মাথায় চট করে ধরলো না। কি বলতে চাইছে ভিকা? ‘সেকেন্ড স্বামী’ মানে কি? নারীদের বিয়ে হয় তারপর ডিভোর্স হয়ে গেলে যদি আরেকটা বিয়ে হয়, তো ‘বর্তমান স্বামী’ ‘প্রাক্তন স্বামী’ ইত্যাদি বলা যায়। আবার কোন পুরুষের যদি একাধিক স্ত্রী থাকে তাহলে প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী ইত্যাদি হতে পারে (বাংলাদেশে অবশ্য ইদানিং বহুবিবাহের প্রচলন উঠে গেছে, অন্যান্য মুসলিম দেশে এখনও বহুবিবাহের প্রচলন আছে)। কিন্তু ভিকার ‘সেকেন্ড স্বামী’ বিষয়টি আমি ধরতে পারলাম না।

আমি: (কিছুটা ইতস্তত করে বললাম) জ্বী, ঠিক বুঝলাম না। ‘সেকেন্ড স্বামী’ মানে কি?
ভিকা: মানে হলো, আমার এখন একজন স্বামী আছে। তার ঐরষেই আমার মেয়েটা। কিন্তু পাশাপাশি এই ভদ্রলোকও আমার রয়েছে।
আমি মনে মনে বললাম, ‘লে হালুয়া! কত কিছুই না আছে এই দুনিয়ায়!’

এবার ভিকা একটু ইতস্তত করে বললো, “আসলে আমার বর্তমান হাজবেন্ডের সাথে বনিবনা হয় না। তাই উনার সাথে সম্পর্ক করেছি। প্লান আছে বর্তমান হাজবেন্ডেকে ডিভোর্স করে উনাকে বিয়ে করবো।”

আমি আবারও মনে মনে বললাম, “তাও ভালো। বিয়ে করার প্লান আছে। প্যারালালি দুইটা চললে কাজটা খুবই অনৈতিক!” এরপর আমার লেনার কথা মনে পড়লো। ভাবলাম, আমি নিজে কি করছি? আনিতা লেনা, লেনা আনিতা। নৈতিক কিছু করছি কি? আবার মনে হলো, তাতে কি? ওরা কেউই তো আর আমার বিয়ে করা বৌ নয়। যৌবনটাতো মধুবনই হবে!

ভিকা আমাকে প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা আপনার কি কোন বান্ধবী আছে?”
আমি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগেই অফিসের তিনটি ল্যান্ডফোনের একটি শব্দ করে বেজে উঠলো। তাতিয়ানা (অপর সেক্রেটারী) ফোনটি ধরে দু’কথা বলে ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, “আপনার ফোন।”
আমি: আমার ফোন? কে কল করেছে?
তাতিয়ানা: কোন এক লেনা। আপনার ফ্যাকাল্টি থেকে।

আমি ফোনটা কানে ধরলাম।
আমি: কে লেনা?
লেনা: হ্যাঁ, আমি।
আমি: ফোন করেছ কেন? (এই প্রথম ও আমাকে ফোন করলো)
লেনা: (বোধহয় আমার প্রশ্নে একটু ধাক্কা খেলো) মানে তুমি একটা বইয়ের কথা বলেছিলে না, আমি ঐ বইটা লাইব্রেরীতে পেয়েছি, ভাবলাম তোমাকে জানানো দরকার।
আমি: ও আচ্ছা। ঠিকআছে। আমি দেখবো বইটা। পারলে তুমি তুলে রেখো।

ফোনটা রেখে দেখলাম, ভিকা ও তাতিয়ানা দুজনই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওদের কিছু বললাম না। ভাবলাম দিন দশেক লেনার সাথে দেখা হচ্ছে না। বেচারীর মন হয়তো পুড়েছে আমার জন্য, তাই আমার কনন্ঠস্বর শোনার জন্য ফোন করেছে!

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৫শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনা সময়: সকাল ০৮টা ২৩মিনিট

Lonely Carnation
————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.