নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – সাত)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – সাত)
—————————- রমিত আজাদ

আনিতাকে নিয়ে আজ একটু বেড়াতে বের হলাম । সামনে ওর মাস্টার্স-এর ফাইনাল পরীক্ষা। তখন ওকে নাকমুখ বন্ধ করে শুধু পড়তে হবে, কোনদিকে খেয়াল করলে চলবে না। পরীক্ষা চলবে একমাস, তারপর থিসিস পেপার ডিফেন্স। ভয়াবহ সময় যাবে ওর। আমি ঠিক করেছি যে, পরীক্ষার ঐ এক মাস এবং ডিফেন্স-এর আগ পর্যন্ত ওর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করবো না। নইলে ওর পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এই কারণে ভাবলাম আজ ওকে নিয়ে সারাদিন একটু বেড়াবো। সকালে নাস্তা করে বের হলাম, প্রথমে গেলাম মস্কোর সবচাইতে বড় মিউজিয়ামটাতে (মস্কোতে অনেকগুলো মিউজিয়াম আছে)। একটা মিউজিয়াম এত বড় হতে পারে, আর সেখানে এত কিছু থাকতে পারে, আমার আইডিয়া ছিলো না। আমার খুব দুর্বলতা ছিলো মিশরের পিরামিড ও মমির প্রতি। এই মিউজিয়ামে দেখলাম মমি রাখা আছে। পিরামিডের অভ্যন্তরে পাওয়া কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও রাখা আছে। আমি ওগুলো দেখে খুবই চমৎকৃত হলাম। বললাম, “আনিতা কেমন দেখছ?”
আনিতা: খুব সুন্দর মিউজিয়াম। আমি জীবনে প্রথম মমি দেখলাম।
আমি: আমিও।
পেইন্টিং সেকশনটাও দারুণ। রাশান আর্টিস্টরা যে এত সুন্দর সুন্দর আর্ট করতো এবং এখনো করে তা এখানে আসলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়। একটা বাগানের সিনারী দেখে আমি নিস্তদ্ধ হয়ে গেলাম। বড় একটা অয়েল পেইন্টিং গত শতাব্দীর হবে। এত জীবন্ত যে বলার মত না, আমার মনে হলো যে আমি বাস্তবেই বাগানটির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রান্সের মত রাশান আর্টেও ইমপ্রেশনিজম আছে। সেই পেইন্টিংগুলোও বেশ! এখানে দুপুর পর্যন্ত কাটিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করলাম। তারপর আরো দুই একটা জায়গায় বেড়িয়ে, গেলাম রেড স্কোয়ারের দিকে ।

রেড স্কোয়ার মস্কোর সবচাইতে আকর্ষণীয় জায়গা। এম্নিতেই সিটি সেন্টার তার উপর বিশাল প্রাসাদ। নদীতীরে থাকায় তার সৌন্দর্য্য আরো বেড়েছে। রুশ জারদের প্রাসাদ ছিলো ‘ক্রেমলিন’। সেটা এখন রুশ রাষ্ট্রপতির দফতর। পুরোটা লাল রঙের উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ভিতরে চমৎকার একটা বাগান আছে। দিনের একটা সময় ক্রেমলিন-এর ভিতরে ঢোকা ও বাগানে বেড়ানো সর্বসাধারণের জন্য এ্যালাউড। এর লজিক-টা হলো দেশ জনতার, ক্রেমলিন বা রাষ্ট্রপতির দফতরও জনতার। তাই সাধারণ মানুষের অধিকার আছে, ঐ প্রাসাদ ও বাগান দেখার। এতে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি ওউননেস বাড়ে এবং দেশপ্রেমও গাঢ় হয়। ক্রেমলিন-এর বাইরে রয়েছে বিশাল বড় একটা পাথুরে চত্বর, নাম তার ‘রেড স্কয়ার’। লম্বায় পাঁচশত মিটার হবে চওড়া অনেক। এখানেই বিভিন্ন সময়ে জাতীয় প্যারেড হয়। জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোও এখানেই হয়। নিউ ইয়ারও অনেকে এখানেই পালন করে। গভীর রাত পর্যন্ত বেশ হৈ চৈ হয় রেড স্কয়ারে। আমরা রেড স্কয়ারে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর, গেলাম আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট ‘আখোত্‌নি রিয়াদ’-এ। এখানে অনেক দামী দোকানপাট আছে। কয়েকটা জুয়েলারী শপও আছে। রাশান পান্না পৃথিবী বিখ্যাত। আমার ইচ্ছে আছে, এখানকার কোন শপ থেকে রাশান পান্নার আংটি কিনে প্রিয় মানুষটিকে উপহার দেব। ঘোরাঘুরি করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো খিদেও লেগেছে বেশ। দুজনে মিলে ঢুকে পড়লাম শপিং মলের অভ্যন্তরস্থ ম্যাকডোনাল্ডসে। আনিতা আর আমি একটা টেবিল দখল করে বসলাম। তারপর আমি গেলাম কাউন্টারে খাবার আনতে। খাবার এনে টেবিলের দিকে যখন যাচ্ছি, হঠাৎ অপরূপা সুন্দরী এক রুশ ললনাকে দেখলাম ক্যাফের ভিতরে ঢুকতে। প্রথম দেখায় ধাক্কা খেলাম, লেনা নাকি? মেয়েটার হাইট-টা লেনার মতই। তারপর খেয়াল করলাম না ও লেনা নয়। মেয়েটার পোষাক ছিলো খুবই হট! আমি একটু ভালো করে তাকিয়েই দেখলাম। তারপর খাবার নিয়ে টেবিলে গিয়ে আনিতার সামনে বসলাম।
আনিতা: বাংলাদেশে ম্যাকডোনাল্ডস আছে?
আমি: না নাই।
আনিতা: কেন নাই?
আমি: জানি না। খুললেও চলবে না বোধহয়। আমাদের নিজস্ব ক্যাঁফে আছে। খাবারের মান খারাপ না, কিন্তু তুলনামুলক সস্তা। তাহলে অত দাম দিয়ে আর কে ম্যাকডোনাল্ডসে খেতে যাবে?
আনিতা: দিল্লীতে ম্যাকডোনাল্ডস আছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম। দিল্লী ঢাকায় আর পার্থক্য কতটুকু? দিল্লীতে থাকলে ঢাকায়ও থাকার কথা!
আমি: তাই? ও হ্যাঁ আমি একবার খবরে দেখেছিলাম যে, তোমাদের দেশেও ম্যাকডোনাল্ডস তার শাখা খুলেছে।
আনিতা: তোমাকে একটা কথা বলি?
আনিতার কন্ঠস্বরে এরকম সুর আমি আগে কখনো শুনিনি। একটু ভয়ভয় লাগলো, ও কি তেমন কিছু বলতে চায় যা আমার জন্য প্রীতিকর হবে না?
আমি: বলো।
আনিতা: খাবার নিয়ে আসার সময়, তুমি ঐ রুশ মেয়েটির দিকে হা করে তাকিয়েছিলে কেন?
আমি: (অপ্রস্তুত হয়ে) কোথায়? কোন মেয়ে? কার দিকে তাকালাম আবার?
আনিতা: আমার সাথে অভিনয় করো না। মেয়েরা অভিনয় বোঝে। আর আমি তোমার দূরের কেউ না। তোমার অভিনয় আমি আরো ভালো বুঝবো।
আমার এখন আর চুপ করে না থেকে কোন উপায় ছিলো না।
আনিতা বললো, “একটা কথা খুব ধ্রুব সত্য”
আমি: কি সেটা?
আনিতা: পুরুষ মানুষ এক নারীতে তুষ্ট থাকে না!
আমি চুপ করে রইলাম। আনিতা ভুল কিছু বলে নাই। পুরুষ সম্ভবত প্রকৃতিগতভাবেই বহুগামী।

কিছুক্ষণ পর খাওয়া শেষ হলে আমি বললাম, “কফি নিয়ে আসি?”
আনিতা: যাও।
কাউন্টার থেকে কফি নিয়ে উল্টা ঘুরতেই দেখি নাসির।

নাসির: তুষার ভাই আপনি?
আমি: আরে নাসির যে!

নাসির চমৎকার একজন মানুষ। তার সাথে আমার আবার বেশ দহরম-মহরম। তিনি বয়সে আমার চাইতে সামান্য ছোট। তবে আমার মতন তিনিও পিএইচডি করছেন, কম্পিউটার সায়েন্সে। আমরা আবার একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী তাই আমাদের বন্ধনটা দৃঢ়।
আমি: তা এখানে কি মনে করে? বেড়াতে এসেছেন নিশ্চয়ই?
নাসির এবার আমাকে একজনকে দেখিয়ে দিলো। নাসিরকে সাথে নিয়ে আমি ঐ টেবিলের দিকে গেলাম। আনিতাকে ইশারা করলাম ঐ দিকে চলে আসতে। টেবিলে বসা বয়ষ্ক ভদ্রলোককে খুব চেনা চেনা লাগলো। নাসির পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রফেসর ড. শ. আলী। এবার আমি উনাকে চিনলাম।
আমি: স্যার সালাম।
ড. শ. আলী: ওয়ালাইকুম সালাম।
আমি: মস্কোতে কি মনে করে এলেন?
ড. শ. আলী: এখানে একটা সন্মেলন আছে। রুশ সরকার ডেকেছে, বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এসেছে।

আমি মনে মনে মুচকি হাসলাম। আমার মনে পড়ে কয়েকমাস আগে ঢাকাতে এক রুশ ডিপ্লোম্যাট-কে আমি বলেছিলাম, চিচিনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া যে বিপাকে পড়েছে তাতে মুসলিম ওয়ার্লডে রাশিয়ার বদনাম হচ্ছে। অথচ ঐ মুসলিম ওয়ার্লডেই রাশিয়ার একসময় অনেক সুনাম ছিলো। আপনাদের উচিৎ নিজেদের ইমেজ পুনরূদ্ধারে কোন একটা উদ্যোগ নেয়া। এবার আমার মনে হলো রাশিয়া ঐ পথেই যাচ্ছে।

টেবিলে বসে কিছুক্ষণ আলাপচারিতা হলো আমাদের চারজনার। সামান্য কথাবার্তা বললাম, ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স ও ফিজিক্স নিয়ে। আনিতার সাবজেক্ট বায়োলজি তাই ও আর আমাদের আলোচনায় অংশ নিতে পারলো না, আর পলিটিক্সে ওর কোন আগ্রহই নেই। ধার্মিক প্রফেসর সাহেব আমাদের দুজনকে দেখলেন কিন্তু এই নিয়ে কোন কথা বললেন না। আমি জানি প্রফেসর সাহেব ইংল্যান্ডে পিএইচডি করেছিলেন, তাই এই পাশ্চাত্য কালচার উনার জানা আছে।

প্রফেসর সাহেব: আমি নাসিরকে একটা স্টোন কেনার কথা বললাম। তা ও তো নাম বুঝতেই পারলো না।
আমি: কি নাম স্টোনের?
প্রফেসর সাহেব: গার্নেট।
আমি: নাসির উনি ‘গ্রানাত’ কিনতে চাইছেন। নিয়ে যান জুয়েলারী শপে ওখানে পাওয়া যাবে। মস্কোতে গ্রানাত বা গার্নেট-এর দাম সস্তা। স্যার আপনি চিন্তা করবেন কম দামে ভালো গার্নেট এখানে পাবেন।
নাসির: কেমন দেখতে স্টোনটা? কি রঙ হয়?
আমি: কয়েকটা রঙ হয়। তবে বেশী পরিচিত মেরুন কালারের-টা। ট্রান্সপারেন্ট হয় স্টোনটা। গার্নেটের মালা পাওয়া যায় বেশ।
নাসির: কোথায় পাওয়া যাবে?
আমি: এই মার্কেটেই আছে। তবে এখানে দাম বেশী নেবে। সবচাইতে ভালো হয় ‘ভেদেএনখা’-তে। ওখানে মূল গেটের পাশেই একটা দোকান আছে। সেখানে পাওয়া যাবে ভালো এবং কম দামে।
প্রফেসর সাহেব: আপনি দেখছি সবই জানেন।
আমি: জ্বী, মানে মাঝে মাঝে কিনে দিতে হয়তো বান্ধবীকে তাই।
এরপর বললাম। স্যার আমি এখন উঠি, আপনি নাসিরের সাথে বেড়ান। আবার দেখা হবে।
প্রফেসর সাহেব: ঢাকাতে গেলে আমার সাথে দেখা করবেন। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। দেখি আপনার জন্য কিছু করা যায় কিনা।
আমি: স্যার কি মন থেকে বলছেন, নাকি শুধুই বলার জন্যে বলা? এখানে অনেক ডেলিগেটই এসে নানান আশ্বাস দিয়ে যান। আর দেশে গেলে আর আমাদেরকে চিনেনই না!
এবার প্রফেসর সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেলো। তিনি আর কিছু বললেন না।
আমি মনে মনে হাসলাম। বেয়াদবী হয়ে গেছে জানি, তারপরেও ইচ্ছে করেই ঠেসটা দিলাম। যাতে দেশে দেখা হলে এ্যাটলিস্ট মনে করতে পারেন।

বিকিতিন সাহেবকে একটা ফোন দিলাম। উনার সাথে আমার পরিচয় ঢাকায়। সেখানে একটা রুশ কর্পোরেশনে চাকুরী করতেন তিনি। তারপর আমিও মস্কো এলাম উনিও মস্কো এলেন। আসার আগে তিনি আমাকে উনার মস্কোর ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার দিয়েছিলেন। সেই থেকেই যোগাযোগ আছে। একবার উনার বাসায়ও বেড়াতে গিয়েছিলাম। কিছু কিছু রুশ মানুষ আছেন একেবারেই মাটির মানুষ। এই বিকিতিন সাহেব এমন একজন। আমার টেলিফোন ধরেই তিনি উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন।

বিকিতিন সাহেব: আরে তুষার যে! তোমার কথাই ভাবছিলাম এই কয়দিন। আসো দেখা করি।
আমি: ওকে। দেখা করবো। কবে কোথায় বলুন।
বিকিতিন সাহেব: উঁ, সামনের শনিবার, দুপুর দুইটায়। মেট্রো ‘তাগানস্কায়া’-তে দেখা করি। তারপর কোথাও বসলাম।
আমি: ওকে, অবশ্যই আসবো।
ভদ্রলোক একটা কোম্পানীতে চাকুরী করেন। কোম্পানীর কাজ হলো ‘মুশকিল আসান’। মানে ঐ কোম্পানীতে জড়ো হয়েছে পুলিশ থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিভিন্ন শাখা ও পেশার রিটায়ার্ড লোকজন। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে ঐ কোম্পানীতে আসে, তারা চ্যানেল ধরে সমস্যার সমাধান করে দেয় এবং ঐ বাবদ ফী নেয়। ভালোই বুদ্ধি! তবে এ ধরণের লবিং-এর কোম্পানী সব দেশেই আছে বোধহয়।

পরবর্তি শনিবার বিকিতিন সাহেবের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে মেট্রো ‘ইউগো জাপাদনাইয়া’-তে গেলাম। মেট্রো স্টেশনের কাছে গিয়ে দেখলাম এখনো অনেক সময় হাতে আছে। এখানকার মেট্রো ঘড়ি ধরে কাটায় কাটায় চলে। তাই ‘ইউগো জাপাদনাইয়া’ থেকে ‘তাগানস্কায়া’ যেতে খুব বেশী সময় লাগবে না। কিন্তু আমার হাতে এখনো অনেক সময় আছে। আমি ঠিক করলাম ওখানে গিয়ে অপেক্ষা না করে, এখানেই কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করি। ঢুকে গেলাম পাশের মার্কেটে। দোকানপাট দেখতে লাগলাম। হঠাৎ শুনি একটা কন্ঠস্বর, “মালাদোই চিলোভেক (ইয়াং ম্যান)”।
খুব পরিচিত কন্ঠস্বর একেবারে কানের পাশে বাজলো!

তাকিয়ে দেখি রূপসী লেনা। এই সময়ে ওকে এখানে দেখবো কল্পনাও করিনি। তাও আবার ইনসিডেন্টালি দেখা। একটু অবাকই হলাম। আজ শনিবার কোন ক্লাস-ট্লাসও নেই যে ফ্যাকাল্টির কাছাকাছি লেনা আসবে। আর ও থাকেও অনেক দূরে।

আমি: তুমি? তা এখানে কি মনে করে?
লেনা: (খুব হাসতে হাসতে বললো) আজ আমার ছুটি। তাই ঘুরতে বের হয়েছি।
আমার মনে হলো, আমাকে এখানে পেয়ে ও ভীষণ খুশী হয়েছে!
আমি: বুঝলাম, তা এই মার্কেটে কি? এখানে তো কেউ ঘুরতে আসে না।
লেনা: আজ আমি অনেক জায়গায় গিয়েছি। ঘুরতে ঘুরতে এখানেও চলে এলাম। তুমি কি করো এখানে? কিছু কিনতে এসেছে?
আমি একটু গলা খাকারি দিয়ে বললাম, “না মানে ঠিক কিছু কিনতে না। আমিও জাস্ট টাইম পাস করতে এখানে ঢুকলাম।”
লেনা” কোথাও যাবে?
আমি চুপ করে রইলাম। বিকিতিন সাহেবের বিষয়টা ওকে বলতে চাইলাম না।
লেনা: আজ কিন্তু আমি বাড়ীতেই আছি। একদম একা।
ওর কথার মধ্যে একটা ইঙ্গিত আছে। আমি সেটা ধরতে পারলাম। ও চাইছে আজ ওর সাথে আমি ওর এ্যাপার্টমেন্টে যাই। কিন্তু প্রস্তাবটা মোক্ষম সময়ে হলো না। বিকিতিন সাহেবের সাথে আজ দেখা করাটা খুবই জরুরী। এ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিকও করা আছে, ওটা আমি ক্যান্সেল করতে চাই না। মনে মনে ভাবলাম, এমন টু ইন ওয়ান হলো কেন? একেবারে আজই বাইরে কোথাও লেনার সাথে দেখা, আজই ও ওর বাড়ীতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলো, আর আজই কিনা আমার ইমপর্টেন্ট এ্যাপয়েন্টমেন্ট! একদিন আগে পরে হলে কি হতো? কপালটাই খারাপ!

আমরা দু’জন খুব উচ্ছলভাবে কথা বলছিলাম। হয়তো এটা দৃষ্টিকাড়া ছিলো। অনেকেই তাকাচ্ছিলো। এর মধ্যে হঠাৎ দুটা বদ লোকের আবির্ভাব হলো। ওদের দেখলেই বোঝা যায় গুন্ডা-বদমাশ টাইপ। আমাদের কথার মাঝখানে হঠাৎ ঢুকে পড়ে এক বদমাশ বলছে,
“আরে মেয়ে, আপনি তো ভীষণ সুন্দরী! এত সুন্দরী মেয়ে তো আমি জীবনেও দেখি নাই!”

আমি একটা ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম। বোঝার চেষ্টা করলাম ব্যাপার-স্যাপার কি? ওরা কি লেনার পরিচিত? জোক করছে নাকি ফাজলামো করছে? নাকি কোন একটা গোলযোগ সৃষ্টি করতে চায়? লেনার এক্সপ্রেশনটা বোঝার চেষ্টা করলাম। দেখলাম লেনা ভীষণ বিরক্ত ও বিব্রত। আমাদের মধুর আলোচনায় একটা কর্কশ ছন্দপতন হলো।
বদমাশটা আবার বললো, “ইয়াং গার্ল, চলুননা কোন ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে বসি। একটু শ্যাম্পেন পান করি।”
এবার আমি বুঝলাম ব্যাটা দুটা আসলেই বদমাশ এবং কোন না কোন কারণে একটা গোলযোগ পাকাতে চাইছে। কি করবো ভাবছিলাম, ভীনদেশে বিদেশীরা সবসময়ই দুর্বল! তাছাড়া এই দেশে আইন-শ্ঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে খুবই খারাপ! মাফিয়ারাই বুক ফুলিয়ে চলে, আর সাধারণ সৎ মানুষেরা চলে ভয়ে ভয়ে। লেনা কোন কথা না বলে তার জায়গা থেকে এক পাশে সরে দাঁড়ালো। এটা একটা জেশ্চার। মানে আমি তোমাদের সাথে কথা বলতে আগ্রহী নই। আমি একটা গোলযোগের জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, জানি না কি হয়। তবে এই মুহূর্তে লেনাকে ফেলে যাবো না। দেখলাম, বদমাশ দুটো আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেলো। হাফ ছেঁড়ে বাঁচলাম!

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৫শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনা সময়: রাত ১১টা ০৩মিনিট

Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.