নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ১২)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ১২)
———————————- রমিত আজাদ

এগিয়ে এলো আনিতার ক্লাসমেটরা।
“আপনাদের হলো?” আনিতার পেরুর ক্লাসমেট কার্লা প্রশ্ন করলো।
আমি: কেন?
কার্লা: আমরা এখন আনিতাকে নিয়ে যাবো।
আমি: (অবাক হয়ে) কোথায় নিয়ে যাবে?
কার্লা: (হাসতে হাসতে) না আপনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবো না। ভয় পাবেন না। আসলে আমাদের ফ্যাকাল্টির ট্রেডিশন হলো, ডিফেন্স শেষ হওয়ার পর আমরা সবাই মিলে মস্কো শহরে বেড়াই, বাইরে খাওয়া-দাওয়া করি।
আমি: ও আচ্ছা।
আনিতা: আমি এখন কাগজপত্রগুলো রুমে রেখে দিয়ে ওদের সাথে বেরিয়ে যাবো।
আমি: আচ্ছা। পরে দেখা হবে তাহলে।
তারপর আমার খেয়াল হলো, বাইরে খাওয়া-দাওয়া করলে ঘুরলে বেড়ালে তো কিছু খরচ আছে। আনিতার হাতে কিছু টাকা দেয়া দরকার। আমি আনিতাকে ডেকে একপাশে নিয়ে গেলাম, ওর হাতে বেশ কিছু টাকা দিলাম।
আনিতা: এতগুলা টাকা! কেন?
আমি: বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাবে, তোমার লাগবে তো!
আমি এই প্রথম ওর হাতে এতগুলা টাকা দিলাম। আনিতা আমার কাছে কোনদিনও টাকা চায় নি।
আমি: আনিতা।
আনিতা: কি?
আমি: তুমি শাড়ী পড়েছ!
আনিতা: বারে, আমি তো ইন্ডিয়ান, আমি শাড়ী পড়বো না?
আমি: তাইতো।
আনিতা: আমি ইউরোপিয়ান পোষাকেই অভ্যস্ত। তবে এত বড় একটা ইভেন্টে শাড়ী পড়া উচিৎ ছিলো, তাই পড়েছি।
আমি: শাড়ীতে তোমাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে! কোন কিছুর সাথেই তুলনা চলবে না। তুমিই তোমার তুলনা!
আনিতা: শুকরিয়া!
আমি: আজ ফিরতে রাত হবে নিশ্চয়ই?
আনিতা: সবাই মিলে বেড়াবো। দেরী হতে পারে।
আমি: আচ্ছা, তোমার ব্যাপার। আজ হয়তো তোমার সাথে আর দেখা হচ্ছে না। কাল দেখা হবে তাহলে।
আমার খুব ইচ্ছা করছিলো আনিতাকে বলতে, নেক্সট টাইম যেন এই শাড়ীটা পড়েই আমার কাছে আসে। কিন্তু শেষমেশ কিছুই বলা হলো না। ওরা চলে গেলো।

আমি এখন কি করবো? আপাতত কাজ নাই। ফ্যাকাল্টিতে যাবো? নাহ্‌, আজ আর লেনার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করছে না। তাহলে? যাই, ক্রেস্ত-এর ক্যাফের আড্ডায় যাই, বাঙালীদের সাথে জমবে ভালো। আজ মনটা কেমন যেন আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত মনে হলো। আনন্দটা হলো, আনিতা ভালো-ভালাই মত ডিফেন্স করেছে, তাহলে বেদনাটা কিসের? আনিতার লেখাপড়া শেষ, ও মস্কো ছেড়ে দেশে চলে যাবে, এই রকম কোন আশংকা? আসন্ন বিরহ-বেদনা কি আমার মন ছাইতে শুরু করেছে?

ক্রেস্তের ক্যাফেতে গিয়ে দেখলাম আসর বেশ জমেছে। আমাকে দেখে সবাই কনগ্রাচুলেট করা শুরু করলো। আমি বললাম, “ধন্যবাদ ভাই, ধন্যবাদ। তবে আমাকে কনগ্রাচুলেট করার কি আছে? কনগ্রাচুলেট করবেন তো আনিতাকে। “ভাবী এখানে নাই, থাকলে অবশ্যই কনগ্রাচুলেট করতাম, আপাতত আপনাকে কনগ্রাচুলেট করছি”, একজন বললো। কেউ বললো, “নাসির ভাই, নাসিম ভাইরা ডিফেন্সে গেলো, আমাদেরকে জানালেন না কেন? আমরাও যেতাম।” আমি বললাম, “ভাই যে ঝড়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম, উনারাই তো বাঁচালেন! যাহোক সামনের উইক এন্ডে সেলিব্রেশন হবে, আপনাদের সবার দাওয়াত।”
সবাই হুররে বলে আনন্দ প্রকাশ করলো। এরপর শুরু হলো বাশার ভাইকে নিয়ে আলাপ।

বাশার ভাইয়ের বৌ হলো রাশান। বাশার ভাই মস্কোতে পিএইচডি করছেন, আর উনার বৌ ওলগা একটা চাকরী করেন মস্কোর কাছাকাছি একটা ছোট শহরে। তাই দুজনা একসাথে থাকতে পারছেননা। তবে প্রতি উইকএন্ড-এ ভাবী চলে আসেন মস্কোতে। বাশার ভাইয়ের ডরমিটরির রুমে উনারা ৪৮ ঘন্টা একসাথে কাটান। তারপর ওয়ার্কি ডে গুলোতে উনারা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এছাড়া উনাদের যোগাযোগের মাধ্যম হলো বাশার ভাইয়ের রুমের ল্যান্ড ফোনটি (মোবাইলের তখনও খুব বেশি প্রচলন হয় নি)। জুনিয়র ছেলেপুলেরা খুব দুষ্টু, ওরা খেয়ার রাখে উইক এন্ডে কখন বাশার ভাইয়ের বৌ এলো। তারপর খেয়াল রাখে কখন তারা ডরমিটরির রুমের দরজা বন্ধ করলেন। এরপর মোক্ষম সময়ে তারা বাশার ভাইয়ের রুমের ল্যান্ড ফোনটাতে উপর্যুপরী ফোন করতেই থাকে, উদ্দেশ্য মোহিত সুখের সময়ে বাশার ভাই জুটিকে ডিস্টার্ব করা। বাশার ভাই প্রথম প্রথম বিষয়টা ধরতে পারেননি, তারপর যখন ধরতে পারলেন, ভীষণ বিরক্ত হলেন। এরপর থেকে তিনি ঐ সময়ে ল্যান্ড ফোনটাকে ডিসকানেক্ট করে রাখতেন।

ক্রেস্তের ক্যাফের আড্ডাটা আজ ভীষণ জমলো। আমি সবাইকে কফি-স্ন্যাকস ইত্যাদি খাওয়ালাম। প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিলাম সবাই। তারপর আমি একটা কাজে একটু দূরে গেলাম। ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা বেজে গেল। ডরমিটরির সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় আমার ফ্লোরে উঠলাম। রুমের দরজা খোলার সময় চোখের কোনা দিয়ে হঠাৎ আমার বা পাঁশের করিডোরের জানালায় একটা মুভমেন্ট দেখলাম। এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম।

দেখলাম সেই দিনের শাড়িটি পড়ে অপরূপ সাজে আনিতা করিডোরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা কোকা-কোলার কেইন ধরা। আমাকে দেখে ধীর গতিতে এগিয়ে এলো, বোঝা গেলো যে, ও খুব টায়ার্ড!
আমি: তুমি এখানে?
আনিতা: পারলাম না।
আমি: কি?
আনিতা: তোমার কাছে না এসে পারলাম না। আজ আমার জীবনে এত বড় একটা খুশীর দিন, আর দিনশেষে আমি তোমার সাথে সময় কাটাবো না?
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “এসো।”
আনিতা: আমি প্রায় আধঘন্টা এখানে দাঁড়িয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।
আমি: ও, বুঝেছি, বাইরে থেকে এসেছো, তাই রুমের চাবি সাথে আনতে পারোনি।
আনিতা: আমি যখন এখানে অপেক্ষা করছি, এই সময়ে একটা তরুণ আমার কাছে এলো। বলে, “ইয়াং ইন্ডিয়ান গার্ল, কারো জন্য কি অপেক্ষা করছো?” আমি চুপ করে রইলাম। সে বলে, “চলো আমার সাথে। খুব ফান হবে।” দেখতো কেমন বেহায়া! আমি ওকে বললাম, “দূর হ গর্দভ!” তারপর ও পালালো।
আমি: চলো এখন রুমে ঢুকি।

আমাদের সেই বিশেষ যামিনীর মধুময় স্মৃতির কোন বর্ণনা এখানে আর পৃ্থকভাবে দিতে চাইনা। তবে শাড়ী পরিহিতা কোন তরুণীর সাথে সুখময় সময় কাটানোর স্বপ্নটা আমি দেখেছিলাম বহুকাল। সেই রজনীতে আনিতা কেবলই এক তরুণী ছিলো না, ছিলো স্বর্গের অপ্সরা! আমরা পুরো নিশি শুনেছিলাম পাহাড়ী ঝর্ণার গান। যেই ঝর্ণার উপর ঝরে পড়েছিলো অজস্র রূপালী তারার ফুল!

(চলবে)

‘যেদিন থেকে তোমার ছবি আমার হৃদয়ে স্থান নিয়েছে,
সেদিন থেকেই তোমাকে সাথে নিয়ে,
নতুন নতুন রঙ মাখিয়ে মাখিয়ে,
আমরা আছি স্বপ্নের মাহফিলে।

তুমিই আমার কপালের টিপ।
তুমিই আমার নয়নের কাজল।
তোমার চোখের ঠিক নিচে নিচে,
আমি চলবো তোমার পিছে পিছে,
এভাবে পৌছে যাব আমাদের মঞ্জিলে।

(Tasveer teri dil me গানের অনুবাদ)

Tasveer teri dil me, jis din se utari hai

Tasveer teri dil me, jis din se utari hai
Phiru tujhe sang leke, naye naye rang leke
Sapnon ki mehfil me

Mathe ki bindiya tu hai sanam, nainon ka kajra piya tera gum
Mathe ki bindiya tu hai sanam, nainon ka kajra piya tera gum
Nain kiye neeche neeche, rahun tere peeche peeche, chalun kisi manzil me


রচনাতারিখ: ২৯ জুলাই, ২০২০সাল
রচনা সময়: দুপুর ০২টা ৫৭মিনিট

Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.