নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ১৩)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ১৩)
———————————- রমিত আজাদ

সকালে ঘুম ভেঙে চোখ খুলে দেখলাম আনিতা কম্পিটারের সামনে বসে আছে, ওর চোখ মনিটরের দিকে, কানে হেডফোন। বুঝলাম গভীর মনযোগ দিয়ে কোন একটা গান শুনছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই আনিতাও ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। এটাই সিক্সথ সেন্স, আমি বিন্দুমাত্রও শব্দ করিনি, শুধু ওর দিকে তাকিয়েছি; কিন্তু তাতেই ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বুঝে নিয়েছে যে, আমি জেগে গিয়েছি। ওর চুল আধো ভেজা, বুঝলাম প্রাত-অবগাহন করেছে। পড়নে শাড়ি নয় ঘরের স্বচ্ছন্দ পোষাক। ওর ঠোটের কোনে ধরা মিষ্টি হাসি আর ওর অতল গভীর কালো জোড়া চোখের দৃষ্টিতে ছড়ানো অদ্ভুত এক্সপ্রেশনটির অনেকগুলো অর্থ করা যেতে পারে!

আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। দুপা হেটে আনিতার পিছনে গিয়ে দাঁড়ানোর মূল উদ্দেশ্যে ছিলো ওর প্রস্ফুটিত ম্যাগনোলিয়া সম গ্রীবায় একটা উষ্ণ চুম্বন আঁকা, যেমনটা জুলিয়াস সিজার করেছিলো তার স্ত্রী কালপূর্ণিয়ার সাথে। এই কালপূর্ণিয়া সিজারকে ভীষণ ভালোবাসতো, কিন্তু সিজার তার প্রতি একরকম উদাসীনই ছিলো! আমি ভাবছিলাম, আনিতা কি আমার কালপূর্ণিয়া, যার আবেগ-অনুভূতির প্রতি আমি একান্তই উদাসীন? ততক্ষণে আনিতা গান পাউজ-এ দিয়ে তার হেডফোনটা খুলে ফেলেছে। একটু ঝুঁকতেই হঠাৎ কম্পিটারের মনিটরের দিকে আমার চোখ পড়লো। ও যে গানটা শুনছে সেটা একটা বাংলা গান, ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার,……..।’
আমি: তুমি বাংলা গান শুনছো?
আনিতা: হ্যাঁ, আমি বাংলা তো কিছু কিছু বুঝিই। তাছাড়া সুর ও সঙ্গীত তো তোমাদের আর আমাদের একই!
ঠিক! সুর ও সঙ্গীত তো ওদের আর আমাদের একই! দুটা ভাষার মধ্যেও অনেক মিল রয়েছে। আসলে ওদের সাথে আমাদের অমিল যেমন রয়েছে, মিলও তেমনি অনেক। আমি অবশ্য ওর ভাষা, কালচার, ঐতিহ্য, ইত্যাদি নিয়ে কোনদিনও মাথা ঘামাইনি। সব কিছুই খুব হালকা ভাবেই নিয়েছিলাম, যেহেতু ওকে নিয়ে আমার কোন সিরিয়াস ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিলোই না। যা ছিলো সেটাকে সিলিনেস-ই বলা যায়!
হঠাৎ আমার মধ্যে একটা তরঙ্গ খেলে গেলো! ও এই গানটা কেন শুনছে? তবে কি আমার মত আনিতাও আসন্ন বিরহ-বেদনার আশংকায় কাতর?

আজ শনিবার অফিসে যাওয়ার বালাই নেই। তাই একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠলাম। তাছাড়া আমি এম্নিতেই কিছুটা ঘুমকাতুরে! আমি হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলাম।
আমি: আনিতা, ব্রেকফাস্ট করেছ?
আনিতা: তোমাকে ছাড়া একা একা ব্রেকফাস্ট করি কি করে?
আমি: ফ্রীজে কিছু খাবার রাখা আছে। এসো ব্রেকফাস্ট করি।
আনিতা কফি বানাতে শুরু করলো।

ব্রেকফাস্ট করতে করতে আনিতার সাথে আলোচনা করতে শুরু করলাম।
আমি: ইউনিভার্সিটি লাইফ তো শেষ হয়ে গেলো। উচ্চশিক্ষা পেয়ে গেলে, এখন প্ল্যান কি?
আনিতা: কি আর? কয়েকদিন পর কনভোকেশন হবে। ডিপ্লোমা পেয়ে যাবো। তারপর এরা তো আর এখানে থাকতে দেবে না, আর মস্কোতে থেকেও তো কোন লাভ নাই। অতএব, নিজের দেশেই চলে যাবো।
আমি: তারপর?
আনিতা: তার আর পর কি? গতানুগতিক! দেশে কোথাও জব হবে, তারপর বাবা-মা একটা বিয়ে দিয়ে দেবে, তারপর ঘর-সংসার রুটিন লাইফ।
আমি: তোমার কি আপাতত এই দেশ ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না?
আনিতা: আই এ্যাম কনফিউজড! একদিকে এটা আমার দেশ না। তাই আমি যে অত বেশী এ্যাটাচড এই দেশের সাথে তা নয়। আবার অন্যদিকে, এতগুলো বছর এখানে কাটালাম যে, ভীষণ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। চোখ বন্ধ করলেই দেখি মিখলুকো-মাকলাইয়া সড়ক, মেট্রো ইউগো-জাপাদনাইয়া, ফ্যাকাল্টি, ক্রেস্ত, ক্যাম্পাস, রেড-স্কয়ার, ক্রেমলিন, মস্কো রিভার, ইত্যাদি। দেশে গিয়ে প্রথম প্রথম হয়তো মন খারাপ হবে। তবে সবচাইতে বেশি যে জন্য মন পুড়বে, তা হলো …………।
বাক্যটা শেষ করলো না, আনিতা।
আমি: কি জন্যে মন পুড়বে?
আনিতা: থাক।

আমি আর ঐ বিষয়ে কোন প্রশ্ন করলাম না। তবে একটা বিষয় ওকে বলতে চাচ্ছিলাম সেটা বললাম,

আমি: আনিতা তুমি তো মেধাবী ছাত্রী। তোমার রেজাল্টও অনেক ভালো। তুমি এক কাজ করো।
আনিতা: কি কাজ?
আমি: তুমি পিএইচডি-র কাগজপত্র জমা দাও আনিতা।
আনিতা: পিএইচডি-র জন্য এ্যাপ্লাই করবো?
আমি: হ্যাঁ। কেন করবে না বলো। তোমার মেধার স্ফুরণ হতে হবে না?
আনিতা: নেবে আমাকে?
আমি: ইউনিভার্সিটির বাজেট তো আছেই। প্রতিবছরই তো কিছু স্টুডেন্টকে নিচ্ছে। এটা আসলে ফ্যাকাল্টির উপর নির্ভর করে, ফ্যাকাল্টির স্যাররা চাইলেই হবে। ফ্যাকাল্টি মিটিং-এ ডীন মূল সিদ্ধান্তটা নেবেন। স্যাররা তো তোমাকে ভীষণ পছন্দ করেন। যে চমৎকার ডিফেন্স করেছ! এভরিওয়ান ওয়াজ ইমপ্রেসড! এখন তুমি তোমার সুপারভাইজারের সাথে কথা বলো, উনাকে রাজী করাও। আমার তো মনে হয় তিনি সানন্দেই রাজী হবেন।
আনিতা: এতগুলো বছর লেখাপড়া করে ভীষণ টায়ার্ড হয়ে গিয়েছি। এখন আর দোকানের সাইনবোর্ডও পড়তে ইচ্ছা হয় না। আবারো পড়ালেখার মধ্যে ঢুকতে বলছো?
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “নাও,গরম কফির কাপে একটা চুমুক দাও।”
আনিতা তাই করলো, আবার বললাম, “চোখ বন্ধ করো।” আনিতা তাই করলো। বললাম, “এবার উল্টা দিক থেকে বিশ থেকে শূণ্য পর্যন্ত কাউন্ট করো।”
আনিতা গুনতে শুরু করলো, “বিশ, উনিশ, আঠারো, ……….।”
কাউন্টিং শেষ হওয়ার পর বললাম, “এখন চোখ খোল।”
চোখ খুলে আনিতা বললো, “বাহ! বেশ শান্তি শান্তি লাগছে তো!”
আমি: গুড! এখন শোন আমার কথা। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর আমারও তোমার মত মনে হয়েছিলো, অনেক পড়া হয়েছে, আর পড়বো না। পরে বুঝতে পারলাম যে, না আরো পড়ার প্রয়োজন আছে। তবে এটা বুঝতে আমার এক বছর সময় লেগেছিলো। তোমাকে সাথে সাথেই বোঝাচ্ছি।
আনিতা: বলো।
আমি: আমি যখন পিএইচডি-তে রিসার্চ ও ক্লাস করতে শুরু করলাম, আমার সামনে একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো! আমি তখন কেবলই ভাবছিলাম; হায় রে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যা পড়েছি তাতো নিতান্তই জ্ঞান-বিজ্ঞানের অ আ ক খ! এমনকি এই দেশটাকেও নতুন করে জানতে শুরু করলাম একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। যদি আমি পিএইচডি-তে এ্যাডমিশন না নিতাম তাহলে আমার জীবনটা অপূর্ণই থেকে যেত।

আমার কথাগুলো খুব মনযোগ দিয়ে শুনছিলো আনিতা। তারপর বললো, “এই প্রথম তুমি আমাকে খুব সিরিয়াসলি কিছু বলছো! তুমি আমার প্রতি কখনো-ই রুক্ষ ছিলে না বটে, তবে সিরিয়াসও ছিলে না। আমাদের সম্পর্কটাকে তুমি বরাবরই হালকা ভাবেই নিয়েছ!” ওর কথা বলার এই বিষন্ন রূপমূর্তিটা আমি আগেও দেখেছি।
আনিতার এই অভিযোগের জবাবে আমার কিছুই বলার ছিলো না। আমি জানি ও সত্যি কথাই বলছে!

                                                                     -----------------------------

বিকালের দিকে ক্রেস্ত-এর ক্যাফেতে গেলাম একা। সেখানে বাংলাদেশীদের আড্ডা তখন তুঙ্গে উঠেছে। টপিক হলো রাজনীতি – ‘বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক’। কেউ বলছে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছে, এটা আমাদের মনে রাখা উচিৎ। আবার কেউ বলছে যে, ওটা তারা তাদের আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বার্থেই করেছিলো। আবার বাংলাদেশের মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ ভারত ১৯৭১ সালেই নির্মান করেছিলো।
ক্যাফের প্রসস্ত কাঁচের দেয়াল ভেদ করে সামনের যে চত্বরটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে নানা গড়নের নানা রঙের মানুষ হাটছে। বিশ্বের ১৩৫টা দেশের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের রঙ, গড়ন বাদ দিলে মানুষে মানুষে পার্থক্য কতটুকু? তারপরেও রাজনৈতিক বিশ্ব শতধা বিভক্ত। কিন্তু কেন?

আমি ব্যাক্তিগতভাবে রাজনীতিতে প্রবল আগ্রহী হলেও আনিতার সাথে রাজনীতি নিয়ে কখনোই আলাপ করিনি। আমি লক্ষ্য করেছি যে, রাজনীতিতে আনিতার বিন্দুমাত্রও আগ্রহ বা জ্ঞান কোনটাই নেই। তাই আমার আর ওকে কোনদিনই বলা হয়নি যে, ভারত আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ নির্মান প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের প্রতি কত বড় অবিচারটা করেছে!
নদীর পানি সমবন্টনের কোন নীতি যে ভারত কখনো-ই মানতে চায়নি। শুকনো মৌসুমে তারা আমাদের ন্যায্য পরিমান পানি না দিয়ে বাংলাদেশকে কারবালা করে এবং বর্ষা মৌসুমে অবাধে ভাসিয়ে দেয়। এরকম আরো অনেক পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারত আমাদের প্রতি কখনো-ই সুবিচার করেনি, অথচ ইংরেজদের হাত থেকে ঐ ভারতের স্বাধীনতায় আমাদের বাঙালীদের অবদানই ছিলো সবচাইতে বেশী।

                                                                          ----------------------------

পরবর্তি রবিবার সকালে আনিতা আমার রুমে এলো। ওর মসৃন পেলব বাহুতে ধরা একগাদা কাগজপত্র।
আমি: হাতে কি ওগুলো?
আনিতা: বারে তুমিই না বললে?
আমি: কি বিষয়ে?
আনিতা: আমাদের কনভোকেশন তো হয়ে গেলো।
আমি: জানি। অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি, সরি। ওয়ার্কিং ডে ছিলো, অফিস ছিলো।
আনিতা: থাক সরি বলার দরকার নাই। গত রবিবারে আমার অনারে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে এত বড় একটা ডিনারের আয়োজন করলে, এই তো অনেক কিছু! আর কত করবে তুমি?
আমি: না না ঠিক আছে। ওটা তো আমার দায়িত্ব ছিলো। তা তোমার এত কাগজপত্র কিসের বললে না তো?
আনিতা: সব কাগজপত্র রেডী করেছি, পিএইচডি-তে এ্যাপ্লাই করবো।
আমি মন ভরে হাসলাম। বললাম, “গুড, রাইট ডিসিশন!”
আনিতা: এখন আমার কাগজপত্রগুলো চেক করে দাও, সব ঠিক আছে কিনা।
আমি: কই দাও দেখি।
চেক করে দেখলাম। মোটামুটি সব ঠিকই আছে। তবে ওদের এ্যাম্বেসীর ‘লেটার অব রিকমেন্ডেশন’-টা নাই।
আনিতাকে বললাম যে, ঐ চিঠিটা লাগবে।
আনিতা: ঠিক আছে, এ্যাম্বেসীতে যাবো কাল। আর সব ঠিক আছে?
আমি: সব কাগজপত্রের ফটোকপি করেছ?
আনিতা: না তো। কি দরকার? আমি তো এগুলো পিএইচডি বিষয়ক অফিসে জমা দিয়ে দেব। ওদের কাছেই তো সব থাকবে।
আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো!
আমি: তুমি আবারও ঐ একই ভুল করতে যাচ্ছো! তোমার এখনো শিক্ষা হয় নি।
আনিতা: আরে ওটা তো একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ভিক্টর গর্দভ ছিলো। অফিসে কি আর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে?
আমি: হলে কি করবে? জমা দেয়ার পর ওরা যদি বলে তুমি কিছুই জমা দাওনি, তখন তুমি কিভাবে প্রমাণ করবে?
আনিতা: হা হা হা। তোমার এক্সামপলটা হলো, ‘জিরাফ কখনো কামড় দেয় না, কিন্তু যদি কামড় দিয়ে বসে তখন আপনি কি করবেন?’
আমি: তুমি বিষয়টা মোটেও সিরিয়াসলি নিচ্ছো না। দাও আমাকে কাগজগুলো, তুমি এখানে বসো। আমি সবগুলা কাগজের দুই সেট ফটোকপি করে আনছি। আমার সাথে এক সেট থাকবে, আর তোমার সাথে আরেকটা থাকবে।

আনিতাকে বসিয়ে রেখে আমি বাইরে চলে গেলাম ফটোকপি করতে। ফটোকপির দোকানে গিয়ে দেখি ওখানে লেনা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে লেনা এগিয়ে এসে আমার কপালে হাত বুলিয়ে বললো, “খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে! তুমি কেমন আছো?”

(চলবে)


রচনাতারিখ: ৩০শে জুলাই, ২০২০সাল
রচনা সময়: রাত ০১টা ১৮মিনিট

Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.