নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -১৭)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -১৭)
———————————- রমিত আজাদ

আনিতা: আচ্ছা তোমাদের ধর্মে তো কোরবানী ঈদে পশু সেক্রিফাইস করার একটা রিতুয়াল আছে তাই না?
আমি: হ্যাঁ, আছে। তোমাদের ধর্মেও তো পশু সেক্রিফাইস করার রিতুয়াল আছে। মন্দিরে পাঠা বলি দেয়া হয় না?
আনিতা: তা হয়। যাহোক, এম্নিই জানতে চাইলাম। আমাদের দেশে কোরবানী ঈদ-কে ‘বকরীওয়ালা ঈদ’ বলে।
আমি: আমাদের দেশেও অনেকে ‘বকরী ঈদ’ বলে।
আনিতা: রাজনীতি ও ধর্ম, এই দুইটায় আমার আসলে কোন আগ্রহ নাই। লক্ষ্য করেছ নিশ্চয়ই, আমি কোন পূজা-উৎসব-রিতুয়াল কিছুই করিনা।
আমি: সেটা আমি লক্ষ্য করেছি। তোমার কিসে আগ্রহ আছে?
আনিতা: লেখাপড়া আর তুমি।

আমার প্রতি আনিতার অনুভূতি ক্রমশঃ গাঢ় হচ্ছে। আমি সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু কিছুই করার নেই। আমি কোন বন্ধন চাইনা। তবে আমাদের বিদায়ের সময় যখন আসন্ন, তাই এই নিয়ে কোন আলোচনাও করতে চাই না। বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

আমি: আগামী পরশু মস্কোতে কোরবাণীর ঈদ। তুমি জানো বোধহয়।
আনিতা: হ্যাঁ। তুমি বলোনি, কিন্তু আমি শুনেছি। তুমি তো আমাকে এইসব বিষয়ে কিছু বলো না। তা তুমি কিছু করবে?
আমি: এখানে আমার এক কাজিন আছে ফিরোজ ভাই। তিনি ব্যবসা করেন। উনাকে বলে রেখেছি।
আনিতা: কি বলে রেখেছ?
আমি: উনি কোরবাণী করবেন। মস্কো থেকে দূরে কোন একটা ফার্মে। তারপর মাংসগুলো মস্কোতে নিয়ে আসবেন। সেখান থেকে আমি আমার ভাগটা নিয়ে নেব।
আনিতা: খুব ভালো ভাই তো তোমার। সব কাজ করে দেবেন, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না।
আমি: আমাদের দেশে কোরবাণী ঈদ একটা টোটাল ফেস্টিভাল। হাটে গিয়ে গরু কেনা থেকে শুরু করে গরুর মাংস কেটে ভাগ করা পর্যন্ত। এখানে সেই আনন্দটা পাওয়া যায় না। তাই ওরকমই ডিসিশন নিলাম। উনি তো ফার্ম হাউজে যাবেনই। আমি সকালে এ্যাম্বেসিতে গিয়ে ঈদের নামাজটা পড়বো। সন্ধ্যার দিকে ফিরোজ ভাই মাংস নিয়ে আসবেন।
আনিতা: ওকে। মাংস আসলে খাবো।

আমি: আচ্ছা তুমি টিকেটের খোঁজ নিয়েছ?
আনিতা: কিসের টিকেট?
আমি: প্লেনের টিকেট।
আনিতা: আমার দেশে যাওয়ার?
আমি: হ্যাঁ।
আনিতা: একটা সংস্থা ওটা দেয়। মিনিস্ট্রি থেকে নিতে হবে।
আমি: সেটা সম্পর্কেই বলছি। একসময় আমিও ওটা পেয়েছিলাম। ঐ টিকেটে দেশে গিয়েছিলাম।
আনিতা: পিএইচডি-র স্কলারশিপটা পুরোপুরিই হয়ে গেলো। আমি চিঠি হাতে পেয়ে গিয়েছি।
আমি: ভালো কথা। কনগ্রাচুলেশনস। কিন্তু দেশে তো তোমাকে যেতেই হবে এ্যাট এনি কেইস।
আনিতা: আমার স্কলারশিপ ফাইনালী হয়ে গেলো, তোমার মধ্যে কোন উচ্ছাস নেই দেখছি!
আমি: বললাম তো, কনগ্রাচুলেশনস।
আনিতা: এত শীতলতায়?

আনিতা কি বলতে চায় আমি বুঝতে পারছি। ও বলতে চাইছে যে, ওর স্কলারশিপ ফাইনালী হয়ে গেলো, তার মানে আনিতা আরো তিন-চার বৎসর এই দেশে থাকার অনুমতি ও সুযোগ পেয়েছে; আমি আরো তিন-চার বৎসর ওর সাথে মেলামেশা করতে পারবো এতে আমি আনন্দিত নই কেন? আসলে আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম ওর কাছ থেকে বিদায় নেবার, আর আমার ধারণা এটাই দু’জনার জন্য মঙ্গল হবে। তাই আমার মধ্যে কোন উচ্ছাস নেই। তবে কথাটা আমি ওকে মুখ ফুটে বলতে চাইনা। আমি চাই সব কিছু ন্যাচারালি হোক।

আমি: তুমি কাল মিনিস্ট্রিতে যাও। টিকেটের খোঁজ নাও।
আনিতা: তারপর?
আমি: তুমি মেয়ে মানুষ। পুরুষের মত তুমি জীবন নিয়ে ড্যাম কেয়ার হতে পারো না। তোমাকে জীবনে প্ল্যান করে এগুতে হবে। দেশে যাও। কয়েকমাস থাকো। তোমার দেশের পরিস্থিতি-টা স্টাডি করো। যদি মনে করো এখন তোমার ওখানে থেকে যাওয়াটাই ভালো, তাহলে থেকে যাবে। আর যদি দেখো না, মস্কো এসে পিএইচডি করাটা তোমার জন্য লাভজনক, তাহলে তাই করো। বাট নিজ চোখে দেখা-বোঝার বিকল্প কিছু নাই। থিওরেটিকাল ডিসিশন সব সময় ঠিক হয় না। আর সায়েন্স-এর স্টুডেন্ট হিসাবে তুমি তো জানোই, আগে প্রাকটিকাল তারপর থিওরী।
আনিতা: জীবনটাকে সায়েন্স বানিয়ে ফেলতে চাও? জীবনটা কিন্তু আসলে একটা আর্ট!
আমি: এনিওয়ে, ইওর ডিসিশন! আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসছি।
আনিতা: কোথায় যাবে? ক্রেস্ত ক্যাফের আড্ডায়?
আমি: হু।
আনিতা: কি আছে ওখানে? আমার সাথে ভালো লাগে না?
আমি: ভালো লাগে। তবে মাঝে-মধ্যে একটু বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা না দিলে চলে না।
আনিতা: আচ্ছা, ঐ মোনালিসা-টা কে আমাকে বললে না যে?

আমি: বলবো। তবে সে তেমন কেউ না।

ওস্তাদের মাইর হইলো শেষ রাতে। নাসিম ভাই-কে বললো নাসির ভাই।
নাসিম ভাই: খালি কি শ্যাষ রাইতেই মারে নাকি?
এজাজ: দুপুর রাইতে মারে না? মাঝ রাইতে মারে না?
(মুচকি মুচকি হাসছে সবাই। মলি মনে হলো একটু বিব্রত হচ্ছে। তবে কস্তুরী আপা দাঁত বের করেই হাসছেন। আজ অনেকেই এসেছে। একেবারে ষোলকলা পূর্ণ হওয়ার মত।)
টিটো: মারে সব রাইতেই, তবে ওস্তাদি মাইর-টা মারে শ্যাষ রাইতে!
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
কস্তুরী আপা: মলি ছোড মানুষ তার সামনে এইগুলা বলিও না। লজ্জ্বা পাই যাবে।
মলি দেখলাম আরো কুঁকড়ে গেলো।
এজাজ: এই আড্ডায় ছোট বড় নাই। এইখানে আলাপ হয় লাগামহীন!

সবাই হাসছে অথচ শঙ্কু ভাইকে দেখলাম মনমরা হয়ে বসে আছেন। শঙ্কু ভাই আমার সিনিয়র। এখানে পড়ালেখা শেষ করে এখানেই বিয়েশাদী করে স্থায়ী হয়েছেন। কিছুদিন ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসা করেছিলেন। এখন ইলেক্ট্রনিক্সের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। তিনি এখন কোন একটা কোম্পানীতে চাকুরী করছেন।
কস্তুরী আপা: শঙ্কু-র আবার কি হইলো? মনমরা হই বসি আছো ক্যান?
শঙ্কু ভাই: বুঝলেন আপা, রাশান মেয়ে বিয়ে করাটা ঠিক হয় নাই।
এবার আমরা সবাই চুপ মেরে গেলাম। বুঝলাম ঘরে কোন সমস্যা হয়েছে তাই তিনি মনমরা। বিষয়টা সেন্সেটিভ।
কস্তুরী আপা: কি হইলো আবার?
শঙ্কু ভাই: আমার শ্বশুড় আমাকে বলে, “রাশিয়াতে থাকলে রাশিয়ানদের মতই থাকতে হবে। ভালো না লাগলে চলে যাও।” এত বড় কথা! বুঝলেন, আমার একটা বাঙালী মেয়ের সাথে প্রেম ছিলো। এই ধরেন, ইউনিভার্সিটি লাইফের শেষ পর্যন্তও যোগাযোগ ছিলো। ছুটিছাটায় দেশে গেলে তার সাথে দেখাও হতো। মেয়েটা আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলোও। তা আমি শেষ পর্যন্ত রাশান বান্ধবীটাকেই বিয়ে করলাম। এখন বুঝতেছি কাজটা ঠিক হয় নাই!
উনার এইসব কথার জবাবে কেউ কোন কথা বলছিলো না। কারণ বিষয়টা সেন্সেটিভ! বরং হাসিখুশি পরিবেশটা গুমোট হয়ে গেলো!
আমি কেন জানি ফট করে বলে বসলাম,
আমি: জ্বীনা। তখন আবার উল্টাটা হতো। ঐ বাঙালী মেয়েকে বিয়ে করতেন, তারপর পারিবারিক তিক্ততা তো হয়ই। তখন আবার আফসোস করে ভাবতেন, ‘হায়রে! পরীর মতন ফুটফুটে একটা রাশান মেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো, তাকে রেখে আমি কি একটা সখিনা-রে বিয়া করলাম। ঐ মেয়েকে বিয়ে করলে আজ আমি মস্কো শহরে কি গর্জিয়াস লাইফ লীভ করতে পারতাম! আর তা ছেড়ে আমি ঢাকা নামক ডাস্টবিনে পঁচতেছি! এত বড় বেকুবিটা আমি করলাম কিভাবে?”

শঙ্কু ভাই আমার দিকে তাকালেন। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। বুঝলাম দোলাচলের প্রচন্ড মানসিক ঝড় হচ্ছে উনার মনে।

শঙ্কু ভাইয়ের কারণে ক্রেস্তের ক্যাফের আড্ডাটা গুমোট হয়ে যাওয়ায়, সবাই আজ তাড়াতাড়িই উঠে এলো। আমি ওখান থেকে উঠে ইউনিভার্সিটির পিছনে বনের মধ্যে হাটতে লাগলাম। এই বনটা আমার ভালো লাগে যদিও বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায়, এটা রিস্কিও, কখন যে কোন স্কিনহেড বা হোলিগানের পাল্লায় পড়ি কে জানে? তারপরেও গাছপালার মধ্যে এলে মন শান্ত হয়। গাছপালা মানুষের হাইপার এ্যাকটিভিটি কমিয়ে দেয়। ছোট ঐ বনের পথে হাটতে হাটতে আমার অতীতের কিছু কথা মনে পড়ছিলো।

ঢাকাতে আমাদের বাড়ী যেই এলাকায়, সেখানেই অনতি দূরে মোনালিসাদের বাড়ী। বলতে গেলে একরকম ছোটবেলা থেকেই ওকে চিনি। ছোটবেলায় একসাথে ছুটোছুটি করেছি লুকোচুরী খেলেছি ওর সাথে। পরে যখন একদিন আমরা বুঝতে পারলাম যে ছেলে আর মেয়ে আলাদ, তখন থেকেই দুজনা দুজনার প্রতি ভিন্ন অনুভূতি বোধ করলাম। তবে সেটার গভীরতা কতটুকু ছিলো তা আমি বলতে পারবো না। এক শবে বরাতের সন্ধ্যায় ও তাদের বুয়ার সাথে আমাদের বাড়ীতে এলো হালুয়া-রুটি নিয়ে। কলিং বেলের শব্দে আমিই দরজা খুলেছিলাম। ওর পরনে ছিলো পিংক কালারের রেশমী একটা জামা। ওড়নাটা বুক ঢাকেনি, তবে শবে বরাত হিসাবে মোনালিসা ওড়নার একাংশ দিয়ে মাথা ঢেকেছিলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটা কম্পন অনুভব করলাম, মোনালিসার শরীরে যৌবনের ডাক এসেছে। আমার মনে হয় সেদিন আমার দৃষ্টিলেখা ও পড়তে পড়েছিলো। মনে মনে মোনালিসাও হয়তো, আমার সরু গোফের রেখা দেখে একই কথা ভাবছিলো।

(চলবে)

The life is different there
——————— Ramit Azad
The life is different there,
The Life is different here.
There falls snow,
Here falls rain.
There is cold,
Here is hot!
There blossom dandelions,
Here we see Krishnochura blossom!
But,
The love is not different there,
The love is not different here!
Only the love does not change it’s colour.


রচনাতারিখ: ০২রা আগষ্ট, ২০২০সাল
রচনা সময়: রাত ১২টা ২৯মিনিট

The Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.