নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -১৯)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -১৯)
———————————- রমিত আজাদ

মোনালিসার চিঠিতে ওর ই-মেইল এ্যাড্রেস ও ল্যান্ড ফোন নাম্বারটা ছিলো।
চিঠি পেয়ে আমি একটা মোবাইল টেলিফোন কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। ধারনা করা হয়েছিলো যে একবিংশ শতাব্দীতে গাড়ীগুলো আকাশে উড়বে, সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। মার্কিনীরা সত্তরের দশকে একটা টিভি সিরিয়াল বানিয়েছিলো Space 1999 নামে সেটাও বাস্তবায়িত হয় নি। তারপরেও একবিংশ শতাব্দীতে মানবজাতি নবযুগে পেয়েছে। পৃথিবী ধীরে ধীরে মোবাইল টেলিফোন ও ইন্টারনেটের যুগে প্রবেশ করছে।

মস্কোর বাংলাদেশী কম্যুনিটি একটা পিকনিক করার সিদ্ধান্ত নিলো। পরিকল্পনা হলো পিকনিকটা বড় করে করা হবে, তাই জাঁকজমকও বেশী হবে। ধনী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসলেন, মেজর ডোনেশনটা উনারা করবেন। ঠিক করা হলো যে, একটা জাহাজ ভাড়া করা হবে, সেই জাহাজে চড়ে যাওয়া হবে একটা নদী দ্বীপে সেখানকার পিকনিক স্পটেই পিকনিক হবে। নির্দিষ্ট দিনে সবাই জাহাজে চড়বে সদরঘাট থেকে। মস্কো শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে মস্কো নদী। এই নদীর নামেই শহরের নাম। গ্রীস্ম ও শরতে যতদিন নদী জাহাজ চলাচলের উপযোগী থাকে (কেননা শীতকালে বরফ জমে নদী আর জাহাজ চলাচলের উপযোগী থাকেনা) ততদিন নানা কাজে জাহাজ চলে। সেই নদীর এক জায়গায় রয়েছে বড় ঘাট যেখান থেকে জাহাজগুলো ছাড়ে, রুশ ভাষায় তাকে বলে ‘রিচনোই ভাকজাল’ মানে ‘নদী স্টেশন’। বিষয়টা শুনে আমার বেশ ভালো লাগলো, মজার আয়োজন! আনিতাকে নিয়ে যেতে হবে ঐ পিকনিকে। আনিতাতো ওর দেশে চলে যাবে, এরপর ও আবার ফেরত আসবে কিনা সেটা তো অনিশ্চিত। সেই হিসাবে ওর সাথে এটা শেষ পিকনিকও হতে পারে! আমি দুজনার জন্য চাঁদা দিলাম।

আজ সকাল দশটার দিকে ক্রেস্তের কাফের আড্ডাটায় গেলাম। গিয়ে দেখলাম অজানা একজন বাংলাদেশী ওখানে বসে আছে। আমি কানে কানে টিটোকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই কে?” টিটো বললো, “আজব মাল! পরে বলতেছি।” ছেলেটি অবশ্য আমি যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই উঠে গেলো। তারপর টিটো বললো,

টিটো: বুঝলেন ভাই। এ এক আজব মাল! এদের জন্যই আমাদের বদনাম হয়!
আমি: কে ভাই? কি নাম? কি পরিচয়?
টিটো: ব্যাটা হলো টো টো কোম্পানীর ম্যানেজার। নাম টোহেল।
আমি: ডাব্বী?
এজাজ: আরে ভাই সোহেল, টো টো করে তো তাই সবাই টোহেল কইয়া ডাকে!
আমি: ও।
টিটো: এখানে লেখাপড়া কিছুই করে না। ধান্দাবাজী করে বেড়ায়। দু’এক জায়গায় আবার বলে বেড়ায় দেশে নাকি সে কোন নেতার ছেলে। আবার দেশে গিয়ে সে বলে বেড়ায় যে, সে মস্কোতে লেখাপড়া করে।
এজাজ: দেখেন তো অবস্থা! ও যখন দেশে গিয়ে নিজেকে মস্কোর ছাত্র বলে পরিচয় দেয় তখন আমাদের সম্পর্কে দেশের লোকের ধারণাটা কি হয়? সবাই ভাবে মস্কোর ছাত্রগুলা মনে হয় এই রকমই!
আমি: তাহলে তোমাদের একটা কাহিনী বলি। ইউক্রেইনে ছিলো এক রাব্বী। সে লেখাপড়া করতেই এসেছিলো, তবে ফেলটেল মেরে আর পড়ালেখা হয় নাই। ইন্টারেস্টিং হলো, সেই রাব্বী দেশে গিয়ে পরিচয় দেয় যে রাশিয়া থেকে পাশ করে আসা একজন ইঞ্জিনিয়ার!
নাসিম ভাই: আমি তাহলে একটা ঘটনা বলি। আমাদের এক সিনিয়র ভাই ও আপু, উনারা হাসবেন্ড ওয়াইফ দুজনই পাশ করেছেন এই ইউনিভার্সিটি থেকে। তা বাংলাদেশে এখন উনারা থাকেন। দুজনাই ভালো চাকুরী করেন। উনাদের ছেলেটাকে দিয়েছেন ঢাকার গুলশানের একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। তা একদিন স্কুলে এলো স্পোর্টস-এর এক নতুন টিচার। এসে ছাত্রদের সামনে নিজের পরিচয় দেয় যে, “আমি লেখাপড়া করেছি মস্কোর ‘পিওপলস ফ্রেন্ডশীপ ইউনিভার্সিটি’-তে।” বাচ্চাটা সাথে সাথে বলে উঠলো, “মাই মাদার অলসো”। স্পোর্টস টিচার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর দিকে তাকালো। তা ছেলে এসে বাবা-মাকে বললো ঘটনাটা। তার মা বলে ঠিকআছে কাল তুমি স্পোর্টস টিচার-কে জিজ্ঞাসা করো যে, ‘পিওপলস ফ্রেন্ডশীপ ইউনিভার্সিটি’-তে সে কত সাল থাকে কত সাল পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, কোন সাবজেক্টে পড়েছে, ইত্যাদি। তা বাচ্চাটা পরদিন গিয়ে স্পোর্টস টিচার-কে সেই প্রশ্নই করলো, তো টিচার ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, “যাও যাও, আমি ওখানে পড়ি নাই”। দেখেন তো কেমনটা লাগ!
টিটো: এই হলো অবস্থা! আমেরিকাতেও একই ঘটনা শুনেছি। একজনার আত্মীয়-স্বজনরা পরিচয় দিতো যে, তাদের ভাই আমেরিকায় ‘মিসাইল ইঞ্জিনিয়ার’ পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো যে, সে লেখাপড়াই করে নাই। ওখানে কোন একটা শ্রমিকের কাজ করে!
নাসির ভাই: ভাইরে এই রকম চাঁপাবাজী কত যে দেখলাম!
আমি: তা উনারা স্বামী-স্ত্রী দুজন লেখাপড়া শেষ করে দেশে গিয়ে তো ভালোই করেছেন বোধহয়; এখন ঢাকায় ভালো আছেন নিশ্চয়ই?
নাসির ভাই: ভালোভাবে লেখাপড়া করে যারা দেশে ব্যাক করেছেন তারা তো ভালো-ই আছেন।
টিটো: আমার এক কাজিন বুঝলেন? তার এইম ইন লাইফ-ই ছিলো কানাডা-য় যাওয়া। এজাজ তোমার মনে আছে?
এজাজ: ঐ যে ঢাকায় একবার দেখা হয়েছিলো? কথায় কথায় কানাডা কানাডা করতো?
টিটো: হ্যাঁ, ঐই। তা শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্ন সফল হয়। সে কানাডায় ইমিগ্রেশন পায়, অনেক বছর হয়ে গেছে কানাডায় আছে। তা ঐদিন টেলোফোনে কথা হলো, সে এখন কাঁদে!
আমি: কেন? কাঁদে কেন?
টিটো: আমাকে বলে, “কানাডায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। এখানে আমি আর থাকবো না। দেশে চলে আসবো। আর কত বিদেশে থাকা যায়?!”
মারুফ ভাই: আপনারা তো জানেন যে, আমি আগে ইউক্রেণে ছিলাম। তা ওখানে ছিলেন এক মশিয়ুর ভাই। অনেক বয়স, সম্ভবত ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছিলেন। বিয়ে করেছিলেন ইউক্রেণের এক মেয়েকে। পরে ডিভোর্স হয়ে যায়। তা উনাদের একটা কন্যাসন্তান আছে। মশিয়ুর ভাইয়ের আবার ভালো দিকটা হলো, তিনি উনার মেয়েটার প্রতি ভীষণ যত্নবান! মেয়েটার জন্যই ঐ দেশে রয়ে গেলন। তা একদিন উনার সাথে দেখা, আমার সাথে ছিলো মুহিত নামের একজন। মুহিত তখন ওখানকার পড়ালেখা শেষ করে দেশে চলে যাচ্ছে। মুহিতের মুখে দেশে যাওয়ার কথা শুনে মশিয়ুর ভাই-এর সে কি কান্না! ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “তোমরা তো দেশে চলে যাও, আমি তো কোনদিনও পারবো না!!!!!!!!!!”

হ্যাঁ, এই দোলাচলটা বেশিরভাগের মধ্যেই আছে, দেশে থাকলে মন উড়াল উড়াল করে, আর যারা বিদেশে থাকে তাদের আবার দেশের জন্য মন আনচাঁন আনচাঁন করে!

মঙ্গলবার যথারীতি লেনার সাথে দেখা হলো। আমরা সুপারভাইজারের সাথে আলোচনা শেষে, যথারীতি ক্যাফেতে বসলাম কফি খেতে।
আমি: গতরাতে একটা ফিল্ম দেখলাম।
লেনা: তুমি বেশ ফিল্ম-টিল্ম দেখো তাই না?
আমি: রাতে তো তেমন কাজ থাকে না। তাছাড়া টেলিভিশনে প্রচুর চ্যানেল, নব চাপলেই এটাসেটা কত কি দেখা যায়! টক-শোগুলা দেখতে আর ভালো লাগে না। সব কেমন যেন একপেশে।
লেনা: আমার রাজনীতিতে তেমন আগ্রহ নেই। তবে যা জানি যে, উপর থেকে নির্দেশ আছে যেন টক-শোগুলোতে তাদের বিরোধী কথাবার্তা খুব বেশি না হয়। তাই বক্তা ও টপিক সিলেকশনও ওভাবেই হয়! এনিওয়ে, ফিল্ম কি নিয়ে ছিলো?
আমি: এক নায়ক, দুই নায়িকা। একটা লোক ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো, তারপর তার জীবনে ইয়াং আরেকটা মেয়ে এলো। লোকটা মনের অজান্তেই দ্বিতীয় মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেললো। তারপর পরিবারে জানাজানি হলে, তার স্ত্রীর সাথে এই নিয়ে টানাপোড়ন!
লেনা: এ তো আমার জীবনের কাহিনী হয়ে গেলো!
আমি: মানে?
লেনা: আমরাও তো ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম। আমাদের একটা ছেলেসন্তান হলো। ধনাঢ্য না হলেও মোটামুটি সুখের ঘরই ছিলো, হঠাৎআমার স্বামীর জীবনে এলো আরেকটি মেয়ে। এক সময় তার মনে হলো ঐ মেয়েটিকে ছাড়া সে আর বাঁচবে না। তারপর …………..।
লেনা কথা শেষ না করে থেমে গেলো।
আমিও আর কোন কিছু জানতে চাইলাম না। দুঃখের ছবি দেখা এক, আর বাস্তবে কোন একজন পোড় খাওয়া দুঃখী নারীর কাছ থেকে সেই কাহিনী শোনা আরেক। তার মনের বাস্তব দুঃখটা দেখতে আমার ভালো লাগে না।


আজ পিকনিক। সকাল সকাল বের হতে হবে। ঘুমকাতুরে আমি তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠলাম। আনিতাকে বললাম, “কুইকলি ঘুম থেকে ওঠো। পিকনিকে যেতে হবে। তোমাকে তো রাতেই বলেছি।” আনিতা ঘুমজড়ানো কন্ঠে বললো, “হুম!”
আমি হাতমুখ ধুয়ে এসে দেখি আনিতা তখনও ঘুমে। এবার আমি একটু জোর গলায় বললাম, “তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, জাহাজে চড়ে যাবো পিকনিকে। টাইমলি যেতে হবে, নয়তো জাহাজ ছেড়ে চলে যাবে।” আনিতা, ঘুমজড়ানো কন্ঠে বললো, “উঠছি”।
এরপর আমি ড্রেস-আপ করে চা রেডী করলাম, আনিতা তখনও ঘুমে! এবার আমি ধমকে উঠলাম, “কি ব্যাপার, তোমাকে কতবার ডাকলাম। তুমি এখনো ঘুমে? আমরা কি টাইমলি পৌঁছাতে পারবো না?” আনিতা, হাই তুলতে তুলতে বললো, “তুমি একাই যাও, আমি যাবো না।”
আমার মাথায় আগুন ধরে গেলো, “কি বললে? যাবে না? তাহলে আগে কেন বললে যে যাবে? কাল রাতে কেন বললে যে যাবে?”
আনিতা: কাল ইচ্ছা ছিলো। এখন আর যেতে ইচ্ছে করছে না।
আমি: তোমার ইচ্ছে মত নাকি? আমার ইচ্ছার দাম নাই? তাহলে আমি মানসিক প্রস্তুতি কেন নিলাম?
আনিতা: আরে আমি একবার না গেলে কি হয়?
আমার মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো!
আমি: আচ্ছা। তোমার ইচ্ছা! যা খুশি করো। জাহান্নামে যাও! তোমার ব্যাপার। তুমি এখন আমার রুম থেকে যাও। তোমার রুমে গিয়ে ঘুমাও।
আনিতা অবাক হয়ে গেলো! “তুমি এরকম করছি কেন?”
আমি: যা করছি ঠিকই করছি। তুমি আমার বিয়ে করা বৌ নাকি, যে তোয়াজ করতে হবে?
আনিতা: কি বলছো এসব?
আমি: ভুল বলছি না। যাও আমার রুম থেকে বের হও, তোমার রুমে গিয়ে ঘুমাও।

আনিতা কোন কথা না বলে চুপ হয়ে রইলো। আমি চায়ের কাপ ধম করে মেঝেতে ফেলে বের হয়ে গেলাম।

পিকনিকে গিয়ে মন-মেজাজ ভালো লাগলো না!
জাহাজ ভ্রমণ সুন্দর ছিলো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মস্কো নদী বেয়ে আধুনিক যাত্রীবাহি জাহাজ চলে গেলো অনেক দূর। নদী বেশি চওড়া না হওয়ায় দুপাশের নগরীর দৃশ্যও চমৎকার। যদিও আমি আগেও এই দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু কিছু দৃশ্য পুরাতন হয় না!
জাহাজ গিয়ে ভিড়লো ‘খোবোইনি বোর’ নামে এক জায়গায়। ‘বোর’ মানে ছোট বন। তা সেটা শুধু নামে বন না, কামেও বন-ই। নদীর পাশে ছোট বন, চমৎকার পিকনিক স্পট। অরন্যের পরশ পেয়ে ছেলেবুড়ো সবাই ছুটোছুটি করতে লাগলো। ঐ একই স্পটে আরো একটা রাশান গ্রুপ এসেছে, তাদের ইয়াং মেয়েরা আবার অতি সংক্ষিপ্ত পোষাকে ঘোরাঘুরি করছে! বাঙালী যুবকদের দৃষ্টি আবার চলে গেলো ঐ দিকে! রুশ দেশে সামার বা শরতে নদীতীরে গেলে পরীসম রূপসীদের তনু দেখে পুরুষের চোখের বিনোদন ভালো-ই হয়।

সকালের ঘটনায় আমার মনটা খারাপ ছিলো। তাই মনে কোন আনন্দ পাচ্ছিলাম না। মোবাইলটা হাতে নিলাম, মোনালিসাকে একটা কল দেব কিনা ভাবছি।

(চলবে)

আমি প্রতিদিনই তোমার কথা কয়েকবার মনে করি,
তুমি কি জানো?
ঐ অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো স্মৃতি হলেও হতে পারে,
কিন্তু তুমি কোনক্রমেই স্মৃতি নও,
আমার জীবনে তুমি আজকের দিনটির মতই বর্তমান।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া কোন এক কাক ডাকা ভোরে,
অথবা মন উদাস করা কোন এক পড়ন্ত বিকেলে
আমার কথা মনে করে তোমার মন কি উন্মনা হয় না?


রচনাতারিখ: ০৬ই আগষ্ট, ২০২০সাল
রচনা সময়: দুপুর ১২টা ২৫ মিনিট

The Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.