নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -১)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -১)
—————————- রমিত আজাদ

রুশ মেয়েরা সাধারণত বেশ লম্বা চওড়া হয়। তবে এই মেয়েটির হাইট বেশী নয়। পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির বেশি হবে না। তবে সে খুব কিউট!

ওর সাথে আমার পরিচয় নিজে থেকে হয় নি। মানে আমি এগিয়ে গিয়ে ওর সাথে পরিচিত হয়েছি বা ও এগিয়ে এসে আমার সাথে পরিচিত হয়েছে এমনটি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনর সাবজেক্ট ফিলোসফির ক্লাস হতো আমাদের সায়েন্স ফ্যাকাল্টির বাইরে, আর্টস ফ্যাকাল্টিতে। ফিলোসফির তুখোড় অধ্যাপক ফিওদরোভ-এর অফিসকক্ষ ছিলো ঐ বিল্ডিং-এ, তাই তিনি ওখানেই ক্লাস নিতে মনস্থ করেছিলেন। যদিও আমাদের অনেকেই নিমরাজি ছিলো, কিন্তু আমি আবার প্রথমেই রাজি হয়েছিলাম। কারণ আমার ডরমিটরি ঐ বিল্ডিং-এর কাছেই ছিলো।

ক্লাসের দ্বিতীয় দিনে, সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে ক্লাস শেষ হলো। মস্কোতে সামারে দিন গুলি খুব লম্বা হয়, রাতগুলি হয় ছোট। আবার শীতকালে ঠিক উল্টোটা, দিন গুলি হয় ছোটছোট, রাতগুলি হয় লম্বা। শরতকালকে মডারেট বলা যেতে পারে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য প্রায় একইরকম। আমাদের তখন ফল সেমিস্টার চলছিলো। ফল মানে ফল! সব গাছের পাতা প্রথমে সবুজ থেকে লাল বা কমলা রঙ ধারন করে, তারপর তার বৃন্ত ছিঁড়ে বাতাসে ভাসতে ভাসতে মাটিতে নেমে আসে। একসময় দেখা যায় যে, গাছে আর কোন পাতাই নেই, সব পাতা মাটিতে লুটিপুটি যাচ্ছে, আর পথিকেরা না চাইলেও মারিয়ে চলছে, সব বাহারী রঙিন পাতাগুলোকে। সেদিন, আমরা যখন ক্লাস শেষে আর্টস বিল্ডিংয়ের বাইরে নেমে এলাম তখনও আকাশে আলো ছিলো। আমি আর আমার আইভরি কোস্টের ক্লাসমেইট ‘সিকা’, বিল্ডি-এর সামনের চত্বরে হেটে ডরমিটরির দিকে এগুচ্ছিলাম। হঠাৎ করে পিছনে তাকিয়ে ‘সিকা’ বললো, “আরে তুমি। তুমি তো আমাদের সাথেই ক্লাস করলে!” আমিও পিছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম মাঝারী গড়নের কিউট একটি রুশ মেয়ে।
সিকা: কি নাম তোমার?
মেয়েটি: (খুব মিষ্টি হেসে) লেনা। আমার নাম লেনা।
সিকা: আমি সিকা। আর ও আমার বন্ধু তুষার।
আমি: আমার নাম তুষার। তুমি কোথায় যাচ্ছ?
লেনা: আমি বাস স্টপেজের দিকে যাচ্ছি। বাসায় যাবো।
আমি: ও। আমরাই ডরমিটরির দিকে যাচ্ছি।
লেনা: তোমরা ডরমিটরিতে থাকে? কোথায়?
আমি: ঐ যে, এ্যাভিনিউয়ের ওপারে সারি সারি যে দালানগুলো দেখা যাচ্ছে।

তারপর আমার সন্দেহ হলো। মেয়েটা বোধহয় মাস্টার্স এই ইউনিভার্সিটিতে করেনি। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে ডরমিটরিগুলো তার চেনার কথা। আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কি এই ইউনিভার্সিটির এলুমনি নও?”
লেনা: না। আমি অন্য ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া শেষ করেছি। এখানে শুধু পিএইচডি-টা করতে এসেছি।
আমি: ও আচ্ছা। তা কোন ফ্যাকাল্টি?
লেনা: ফিজিকাল এ্যান্ড ম্যাথমেটিকাল সায়েন্স।
আমি: বাহ! আমারও তো ঐ একই ফ্যাকাল্টি। তা তোমার ডিপার্টমেন্ট কোনটা?
লেনা: থিওরেটিকাল ফিজিক্স।
আমি: ওমা! আমারও তো একই ডিপার্টমেন্ট! তা তোমার সুপারভাইজার কে?
লেনা: ইরমালয়েভ।
এবার আমার আর বিস্মিত না হয়ে উপায় ছিলো না!
আমি: লেনা। তুমি তো অবাক করলে। আমার সুপারভাইজারও ইরমালয়েভ।
এবার লেনা আরো বেশী হাসলো। দেখলাম ওর মৃদু হাসি যেমন মিষ্টি, বেশি হাসিটা আরো বেশি মিষ্টি!!!
আমি: তুমি কবে এ্যাডমিশন নিয়েছ?
লেনা: এ বছরই।
আমি: ও আচ্ছা। কোন কারণে হয়তো ফ্যাকাল্টিতে আমার দেখা হয়নি।
লেনা: নেক্সট টাইম কি বারে তুমি ফ্যাকাল্টিতে যাবে?
আমি: নেক্সট মঙ্গলবার।
লেনা: মঙ্গলবার আমিও যাবো। সুপারভাইজার আমাকে যেতে বলেছে।
আমি: তাহলে ঐদিন হয়তো ফ্যাকাল্টিতে আমাদের দেখা হবে।

রুশ ভাষা-কালচারে একটা বিষয় রয়েছে, যে কারো নাম তারা সংক্ষেপে ডাকে ওটাই ডাক-নাম। যেমন নাতালিয়া-র সংক্ষিপ্ত রুপ ‘নাতাশা’, মিখাইল-এর সংক্ষিপ্ত রুপ ‘মিশা’, এলিজাবেথ-এর সংক্ষিপ্ত রুপ ‘লিজা’, ইত্যাদি। একইভাবে ইয়েলেনা-র সংক্ষিপ্ত রুপ ‘লেনা’। মেয়েটির পুরো নাম ‘ইয়েলেনা’। তার পাশাপাশি ওর একটা ফ্যামিলি নেম বা পদবী থাকার কথা। সেটা আজ আর জানতে চাইলাম না।

কিউট লেনা, মধুর ভঙ্গিতে হেটে হেটে বাস স্টপেজের দিকে চলে গেলো। আমরা এগুলাম, ডরমিটরির দিকে। যেতে যেতে সিকা আমাকে বললো,
সিকা: “বুঝলি? এই মেয়েটা খুব ভালো। দেখলেই বোঝা যায়! কেমন মিষ্টি হাসি! কি সুন্দর করে কথা বলে! আর ঐ যে লম্বা মেয়েটাকে দেখলি না? ঐ যে অনেক সাজগোজ করে, বেশি কথা বলে। ওর নাম নাতাশা। ওকে আমার একদম ভালো লাগেনি। আবার ওর জামাই হলো একটা ‘ঠোলা’।
আমি: মেয়েটি বিবাহিত? জামাই পুলিশ?
সিকা: হ্যাঁ! পুলিশ দেখলেই আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়!

ডরমিটরিতে ফিরে দেখলাম, রুমে আনিতা বসে আছে। ‘আনিতা’ কিছুদিন যাবৎ আমার স্টেডি গার্লফ্রেন্ড। মানে, গত একবছর যাবৎ আমার সাথে ওর মেলামেশা চলছে। মেলামেশা মানে শুধুই মেলামেশা; ওকে নিয়ে সিরিয়াস কোন চিন্তাভাবনা আমার নাই। সিরিয়াস মানে বিয়ে-শাদী ইত্যাদি আর কি। ইউরোপ বা পাশ্চাত্যে এই কালচার তো বহুকাল যাবৎই চলছে। ছেলেমেয়ে পরষ্পরকে পছন্দ হলে, মিলে যাও, যা খুশী করো, যতদিন ভালো লাগে একসাথে থাকো, তারপর সম্পর্কটা বোরিং হয়ে গেলে বিদায়। যতদূর জানি ভারতেও এই রীতি চালু হয়েছে। ‘আনিতা’ অমুসলিম ভারতীয়, তাই ওর মধ্যে এই অবাধ সম্পর্ক নিয়ে কোন স্পিরিচুয়াল রিজার্ভেশন নাই। তাই আমারও কোন মাথাব্যাথা নাই। তবে আমার মনে হয়, ও ক্রমশঃই আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে! এটা আমি চাইনা। আমার ওর প্রতি গভীর কোন অনুভূতি নাই। কি দরকার?
(চলবে)

Lonely Carnation

———————– Ramit Azad

রচনাতারিখ: ২২শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনাসময়: সন্ধ্যা ০৬টা ২৮ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.