নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২২)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২২)

———————————- রমিত আজাদ

তানিয়া মেয়েটি বিবাহিতা হলেও যথেষ্ট সুন্দরী! অবশ্য ওর বয়স বেশি নয়। ইউনিভার্সিটিতে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। ওর জামাই ওরই ক্লাসমেইট। আলেকসান্দার পারানঝা তার পুরো নাম। ছেলেটা ডরমিটরির স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সভাপতি। কিছুটা মাস্তানি স্বভাব আছে। তবে আমার সাথে কেন জানি সব সময়ই ও খুব নরম! ওর কাছে একবার একটা ফেভার চেয়েছিলাম, বিনা বাক্যব্যয়ে কাজটা করে দিয়েছিলো। তারপর বলেছিলো, “তুমি এই ডরমিটরিতে কয়েক বছর ধরে আছো, তোমার নিঃসন্দেহে এখানে একটা রাইট আছে।” কথাটা আমার মনে ধরেছিলো। যদিও কম্যুনিস্ট দেশে রাইট বা অধিকার কথাটার কোন বালাই নেই। একদলীয় শাসনতন্ত্রে সরকারের ইচ্ছাই সব! জনতার কোন অধিকার নেই, যদিও জনতার অধিকারের নামেই যত সাপ্রেশন চলে। পারানঝা  ইদানিং একটা ব্যবসা শুরু করেছে, দুতিনজন পার্টনার সাথে নিয়ে। পাশাপাশি একটা পিৎসা-র ক্যাফে খুলেছে। ওর বৌ তানিয়া সেখানে ম্যানেজার। আবারো বলছি, তানিয়া খুব সুন্দরী। সুন্দর করে কথা বলে, চেহারা সুন্দর, ফিগার সুন্দর। আর সেইসাথে নারীর যে অঙ্গে পুরুষের দুর্বলতা, মানে নিতম্ব; সেখানে তানিয়ার বিশেষত্ব, তানিয়ার নিতম্ব অনেক স্ফিত।  অনেক পুরুষই হা করে ঐ দিকে তাকিয়ে থাকে। সব পুরুষরাই ওর নিতম্ব দেখে অভিভূত হয়!

আজ সন্ধ্যার দিকে আমি যাচ্ছিলাম মেট্রো স্টেশনের দিকে। হঠাৎ কি একটা চোখে পড়লো! খটকা কাটাতে আরেকবার ভালো করে তাকালাম। নাহ্‌, মোটেও ভুল দেখছি না। মেয়েটা তানিয়াই, তবে সাথের ছেলেটি ওর জামাই আলেকসান্দার নয়! ছেলেটি বিদেশী। তানিয়া ওকে মোটামুটি জড়িয়ে ধরেই হাটছে। আমি ছেলেটির দিকে ভালো করে তাকালাম, হ্যাঁ, এটা কিউবার গঞ্জালেস। গঞ্জালেস-এর সাথে তানিয়ার সম্পর্কের কথা আমি আগেও এর-ওর মুখে শুনেছি। একজন বলেছিলো, ‘এত আকর্ষণীয় নিতম্ব যে তরুণীর সে কি আর এক পুরুষ নিয়ে থাকতে পারে?’ আজ সেটা নিজ চোখেই দেখলাম! তাহলে তানিয়া দ্বিচারিনী!

আমি এই প্রসঙ্গে ঠিক কি মন্তব্য করবো জানি না। অল্প বয়সে ভাবতাম ইউরোপীয়ান মেয়েরা এমন নিলাজ বেহায়া হয়! পরবর্তিতে কালে জেনেছি যে, এই দ্বিচারিতা বা পরকীয়া বাঙালীদের মধ্যেও আছে। একটা অল্প বয়সী বাংলাদেশী মেয়ের কথা জানি, যে সদ্য বিবাহিতা ছিলো, বিয়েও করেছিলো প্রেম করে। সে হঠাৎই এমন একজনার সাথে পরিচিতা হয়েছিলো, যাকে দেখে তার স্বপ্নের পুরুষ মনে হয়েছিলো; সেই সাথে আফসোস হয়েছিলো যে, কেন সে বিয়ে করতে এত তাড়াহুড়ো করলো। কেন তার নতুন পুরুষটির সাথে কদিন আগে দেখা হলো না? নতুন পুরুষটি দৈহিক সৌন্দর্য্যে এভারেজ তবে তার নলেজ ছিলো অসাধারণ, সেই সাথে বাচনভঙ্গি ও অন্যান্য গুণ ছিলো মনোমুগ্ধকর! আরও আশ্চর্য্য হলো যে, নতুন পুরুষটিও সদ্য বিবাহিত ছিলো। মেয়েটি যখন অনেক সাহস তার নতুন পুরুষের কাছে গিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিলো, নতুন পুরুষটি তখন অবাক হয়ে বলেছিলো, “তুমি না বিবাহিতা?” মেয়েটি উত্তরে বলেছিলো, “কি করে যে কি হয়ে গেলো, আমি নিজেও বুঝলাম না! বিশ্বাস করেন, আমি আমার মনকে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারছি না!”

কি বলবো? কলি যুগের নিদর্শন? তাই কি? প্রাচীন যুগে কি এগুলো হয়নি? চিরকালই তো রাধারা ভালোবেসে কলঙ্কিনী হয়েছিলো!

————————————

আনিতা এখনও তার দেশে ফিরে যায় নি। তবে যাবো যাবো করছে। ডিসেম্বরের শুরুতেই যাবে। গোছগাছ করছে। তার বইপত্র, জিনিসপাতি সব আমার রুমেই রাখলো।

আনিতা: আমার শাড়ীর সংখ্যা বেশী নয়। ওগুলো তোমার কাছেই রেখে গেলাম। মস্কোতে যদি আবার ফিরে আসা হয়, ওগুলো পড়বো এখানে।

আমি: ঠিকআছে, তোমার যা ইচ্ছা। তুমি তো ইউরোপীয়ান ড্রেসই বেশী পড়ো।

আনিতা: সালোয়ার-কামিজে আমার তেমন আপত্তি নেই। কমফোর্টেবল পোষাক। তবে ওড়নাটা আমার একদম পছন্দ নয়! ম্যানেজ করতে ভীষণ সমস্যা হয়।

আমি: লম্বা ওড়নার কাজ হলো সামনে থেকে স্তন ঢাকা, আর পিছন থেকে নিতম্ব ঢাকা। আমাদের উপমহাদেশের কালচারে এটা আছে, সে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান সব মেয়েরাই তো মানে।

আনিতা: বাংলাদেশে কড়াকাড়িটা বেশী হতে পারে। তবে ভারতে কড়াকাড়ি কমে গিয়েছে। আর মজার ব্যাপার কি জানো?

আমি: কি?

আনিতা: উপমহাদেশীয় মেয়েরা সালোয়ার-কামিজ পড়া অবস্থায় ওড়না দিয়ে স্তন ঢাকা থাকে। কিন্তু শাড়ী পড়া অবস্থায় ঠিক উল্টা! আঁচল ফুঁড়ে স্তন ফুটে ওঠে!

আমি ওর কথা শুনে না হেসে পারলাম না।

আমি: আরও ইন্টারেস্টিং হলো, রূপসীরা শাড়ী পড়া অবস্থায় নিজের খোলা পেট দেখাতে ভোলে না! আবার শাড়ী এতটাই টাইট করে পড়া হয় যে, নিতম্বও স্পষ্ট হয়!

এবার আনিতাও হেসে ফেললো।

আনিতা: ক্রাইম এ্যান্ড পানিশমেন্ট এই দুইয়ের মধ্যে যেমন প্যারাডক্স রয়েছে, পোষাক পরিধানে শালীনতা ও অশালীনতা এই দুইয়ের মধ্যেও তেমনি প্যারাডক্স রয়েছে!

আনিতা যে আপাততঃ দেশে চলে যাচ্ছে, এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। তবে দেশে গিয়ে ও ফিরে আসবে কি না আসবে, সেটা নিশ্চিত নয়। দেশে গিয়ে ওর যদি মনে হয় যে, দেশে থেকে যাওয়াই ভালো তাহলে সে থেকে যাবে। আর যদি মনে হয় যে, না দেশে পরিস্থিতি অনুকূল নয় পিএইচডি-টা করা দরকার তাহলে ফিরে আসবে।

আমি: আনিতা তুমি তো মেয়ে মানুষ।

আনিতা: (একটু রেগে গিয়ে) তাতে কি হয়েছে?

আমি: না, ঐভাবে বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, তোমার জন্য কি এই ভালো হয় না যে, দেশে গিয়ে কোন চাকরি-বাকরি যোগার করলে, তারপর পেশাগত জীবনে একটু থিতু হওয়ার পর, পছন্দমত একটা ছেলে খুঁজে পেয়ে তাকে বিয়ে-শাদী করে সংসারী হলে। এভাবে তোমার লাইফটা স্টেবল হয়ে যাবে।

আনিতা: জানি না। দেশে গেলে বোঝা যাবে। আমি অনেকগুলো বছরই তো দেশের বাইরে। আর আমাদের দেশের ছেলেদেরকে তুমি যদি খুব আদর্শবান মনে করে থাকো, তাহলে ভুল করবে। বহুগামীতায় আমাদের দেশের ছেলেরা কম যায় না!

আমি: আচ্ছা আনিতা, তোমার কি আগে কোন বয়ফ্রেন্ড ছিলো?

আনিতা: হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?

আমি: যদিও এটা তোমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। তারপরেও জানতে চাইলাম।

আনিতা: শোন তাহলে, তোমাকে খাস করে বলি। ছেলেরা, অতীতে কেউ না থাকলেও মিথ্যে গর্ব করে বলে আমার অনেক অনেক গার্লফ্রেন্ড ছিলো! আর মেয়েদের কখনো জিজ্ঞাসা করতে নেই যে, তার আগে কোন বয়ফ্রেন্ড ছিলো কিনা। কারণ সে সবসময়ই বলবে, তার আগে কেউই ছিলো না।

আমি আর এই নিয়ে কোন কথা বাড়ালাম না।

———————————————————————————

ক্রেস্তের আড্ডা যথারীতি জমজমাট।

নাসিম ভাই: আজ ভাই গেলাম তৃতীয় রিং রোডে। আলীশান রিং রোড বানিয়েছে মস্কো সরকার। মাঝখানে আবার অনেকখানি জায়গা লম্বা টানেল!

আমি: ‘টানেল’ শব্দটা শুনলেই একটা কৌতুক মনে পড়ে।

নাসির ভাই: কি কৌতুক?

টিটো: আপনি তো ভাই কৌতুকের জাহাজ। বলেন কৌতুকটা।

আমি: কোন এক দিনে, ট্রেন যাচ্ছে ককেশাসের পাহাড়ী পথে। জার্নি, মস্কো টু তিবিলিসি। মাঝে মাঝে পাহাড়ী টানেলের মধ্যে ঢুকছে ট্রেন। টানেলের ভিতরে ঢোকার সাথে সাথে পুরো ট্রেনটা অন্ধকার হয়ে যায়, পাশের মানুষটাকেও তখন দেখা যায় না। তবে কিছু টানেল শর্ট, এই দুই-তিন মিনিটের পথ; আবার কিছু টানেল লং দশ-পনের মিনটেও শেষ হয় না! তা সেই ট্রেন যাত্রায় দুজন তরুন-তরুণী প্রেমিক-প্রেমিকা যাত্রী ছিলো। একবার ট্রেন অন্ধকার টানেল থেকে বের হওয়ার পর, প্রেমিক আফসোস করে বললো, “আহ্হারে! টানেলটা এত লম্বা হবে জানলে, আমি তোমাকে পরম আবেগে জড়িয়ে ধরে গভীর একটা চুমু খেতাম!” এবার প্রেমিকা বিস্মিত হয়ে বললো, “তুমি নও? তাহলে কে ছিলো ঐটা?!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো!

টিটো: ভাই, চান্সটা যে নিয়েছে, সে কিন্তু জব্বর ওস্তাদ!

এজাজ:  অয়ন।

অয়ন: কি?

এজাজ: ঐ যে দেখ।

অয়ন: কি দেখবো?

এজাজ: আরে মেইন দরজার কাছে দেখ, তোর ‘সোনালী বান্দর’ দাঁড়িয়ে আছে।

অয়ন ঐদিকে তাকিয়ে একটু লজ্জ্বা পেলো মনে হয়।

অয়ন: যা ব্যাটা! বান্দর কি? স্বর্ণকেশী রূপসী!

তারপর অয়ন উঠে ঐদিকে চলে গেলো।

নাসির ভাই: কি রে ব্যাটা? কি বিষয়?

এজাজ: অয়নটা লাজুক। তা কয়েকদিন হয় লেকচার ক্লাসে পরিচয় হয়েছে এক রুশ ললনার সাথে। মেয়েটা বেশী ফর্সা, আবার স্বর্ণকেশী। তা আমি নাম দিয়েছি ‘সোনালী বান্দর’!

আমরা সবাই হাসলাম। আবার উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম মেয়েটাকে।

অল্প বয়সী মেয়েটা তো সুন্দরীই। স্লিম ফিগারের মেয়েটির দীঘল চুলের রঙ সোনালী, এই দেশে এমন মেয়েকে ‘ব্লন্দিনকা’ বলে। ব্লন্দিনকা-দের জন্য সাধারণত পুরুষরা পাগোল থাকে। এজাজ কেন আবার তার নাম ‘সোনালী বান্দর’ দিলো বুঝলাম না। হয়তো ফ্রেন্ড-এর সাথে ফাজলামো করছে!

————————————————————-

ডিপার্টমেন্টে যথারীতি লেনার সাথে দেখা।

কফি খেতে খেতে লেনা জানতে চাইলো, “সামনে তো নিউ ইয়ার, তুমি নিউ ইয়ার কোথায় করবে?”

আমি জানতাম, নিউ ইয়ারের সময় আনিতা হয়তো আর মস্কোতে থাকবে না। তাই এই নিয়ে আমিও ভাবতে শুরু করলাম।

আমি: হু। নিউ ইয়ার। কোথায় করা যায়?

লেনা: আমি তো জানি না। তুমি বা তোমরা কোথায় নিউ ইয়ার করো?

আমি: আমরা তো ডরমিটরিতেই নিউ ইয়ার করি।

লেনা: (বিস্মিত হয়ে) মানে কি? ঘরের ভিতরে বসে নিউ ইয়ার করো?

আমি: (মোটামুটি অবাক হয়ে) ঘরের ভিতরে বসে নিউ ইয়ার করলে সমস্যা কি?

আমার কথা শুনে লেনা চুপ করে রইলো।

আমি: আচ্ছা। তুমি কোথায় নিউ ইয়ার করবে?

লেনা: এখনো জানিনা। আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব আছে। ওদের সাথেই নিউ ইয়ার পালন করবো হয়তো।

আমি: কোথায়? ভেন্যু কি হবে?

লেনা: রেড স্কয়ার হতে পারে।

আমি: ও আচ্ছা।

এরপর আমার মাথায় ঢুকলো। লেনা কেন বারবার আমাকে নিউ ইয়ার পালনের বিষয়ে জানতে চাইছে? ও কি আমার কাছ থেকে কোন দাওয়াত চায়? ও কি আমার সাথে নিউ ইয়ার পালন করতে চাইছে? এই দেশে তরুণ-তরুণীদের একসাথে থার্টি ফার্স্ট নাইট ও পহেলা জানুয়ারী পালন করার একটা বিশেষ মিনিং আছে! আবারো ভাবলাম। নাহ্‌, আনিতা এখনো দেশে যায় নি। নিউ ইয়ারের সময় ও মস্কোতে থাকবে নাকি দেশে থাকবে তা আমি নিশ্চিত করে জানি না। তাই লেনা-কে কোন কথা দেয়া ঠিক হবে না।

আকাশ তোমার রক্তক্ষরণ বৃষ্টি হয়ে ঝরে,

মেঘগুলো সব জমাট ব্যাথা, সাদা-কালোয় ওড়ে!

দরজা গলে বৃষ্টি ঢোকে, জানলা গলে মেঘ,

সূর্য বলে তোরা সবাই, আকাশ হতে শেখ্‌!

—————————- রমিত আজাদ

————————————————————————————————-

রচনাতারিখ: ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১২টা ৫৮ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.