নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২৩)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২৩)
———————————- রমিত আজাদ

আনিতা যখন ওর বই খাতাগুলো গোছাচ্ছিলো হঠাৎ আমার নজরে পড়লো একটা খাতার উপর লেখা ‘সেইন্ট জ্যাভিয়ার্স কলেজ’

আমি: ‘ইনকুইজিশন’ বলে একটা বিষয় ছিলো। ফিলোসফি ক্লাসে বিষয়টা আমাদেরকে পড়ানো হয়েছিলো। মধ্য যুগে খ্রীষ্টান ক্যাথলিক চার্চের পাদ্রীরা জীবন্ত মানুষদেরকে পুড়িয়ে হত্যা করতো। খ্রীষ্টান যাজকরা যদি কাউকে মনে করতো যে, সে এমন কোন কথা বলছে যা খ্রীষ্টান ধর্ম বা বাইবেল বিরোধী হচ্ছে, তবে সেই ব্যাক্তিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো, ও জনসম্মুখে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হতো। একই ডিক্রি অনুযায়ী প্যাগান বা অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে হত্যা করাও যায়েজ আছে।

আনিতা: হ্যাঁ, ইনকুইজিশন সম্পর্কে আমারও সামান্য জানা আছে। তুমি তো জানো যে ভারতের গোয়া পর্তুগীজ খ্রীষ্টানদের শাসিত ছিলো। আমি একটা চিত্রকর্ম দেখেছিলাম, ‘গোয়া ইনকুইজিশন’-এর একটি চিত্রকর্ম, পর্তুগিজ শাসিত গোয়ায় খ্রিস্টান মিশনারিরা যে ভাবে প্রকাশ্যে “ধর্মবিরোধী” আখ্যা দিয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পুড়িয়ে হত্যা করে, তার উপর ভিত্তি করে এই দুর্লভ চিত্রকর্মটি তৈরি করা হয়

আমি: এর মূলে কে ছিল বলতে পারো?

আনিতা: কে?

আমি: The Great Saint Francis Xavier.

আনিতা: অবাকই তো।

আমি: ইতিহাসে অনেক নির্মম। Great Saint Francis Xavier খুনী হয়েও সেইন্টহুড পেয়েছিলেন।

আনিতা: আশ্চর্য্য! তার পরও এত স্কুল, কলেজ জেভিয়ার্স এর নামে ? যারা প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা কী এই ঘটনার কথা জেনেই করেন! 

আমি:: আর দেখো ঐ নাম পরিবর্তনের কথা যদি কেউ বলে, তাহলে কি হবে?

আনিতা: দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমি সেইন্ট জ্যাভিয়ার্স কলেজে পড়েছিলাম। আমি আসলে তখন জানতামই না যে, সেইন্ট জ্যাভিয়ার্স এই ধরনের অপকর্মের হোতা ছিলো!

ক্রেস্তের আড্ডায় ঢুকলাম বই-খাতা নিয়েই। এখান থেকে যেতে হবে ফ্যাকাল্টিতে, সুপারভাইজারের সাথে কথা আছে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কথা শুনছি
নাসির ভাই: এক বড় ভাই আছেন মস্কোতে। উনি বাংলাদেশের গ্রামের ছেলে। ভালো ছাত্র ছিলেন, সেই সুবাদে স্কলারশীপ নিয়ে এই দেশে এসেছিলেন লেখাপড়া করতে। তারপর যথারীতি লেখাপড়া শেষ করে ইঞ্জিনিয়ার হলেন, কিন্তু ঘটনা ঘটলো একটা।
টিটো: কি ঘটনা।
নাসির ভাই: প্রেমে পড়ে গেলেন এক রুশ ললনার।
এজাজ: এরকম তো কতই!
নাসির ভাই: না মানে তিনি তো গ্রামের ছেলে ছিলেন। উনার বাবা আবার ছিলেন পুরাণ আমলের মানুষ, ছেলে বিয়ে করতে চায় শ্বেতাঙ্গিনী তাও আবার নন-মুসলিম; এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই ছেলেকে বিয়ের অনুমতি দিলেন না তিনি।
টিটো: তা বাবাটি কি এটা বুঝলেন না যে, বিদেশে ছেলেকে পাঠাচ্ছেন, সেখানে কত কিছুই তো ঘটতে পারে?
নাসির ভাই: আরে সেকেলে বাবা কি আর অতশত ভেবেছিলেন নাকি? বাবা কি চেয়েছিলেন? তিনি ভেবেছিলেন যে, ছেলে বিদেশে যাবে, ব্যাপারটা হাই-ফাই! সেখানে পড়ে সে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে, আরো হাই-ফাই! তারপর বিদেশ সুবাদে টাকাও কামাবে, সেটাও চমৎকার! কিন্তু ছেলেটা যে ওখানে মেয়ে মানুষের পাল্লায়ও পড়তে পারে এটা তো আর উনার এক্সপেকটেশনের মধ্যে ছিলো না।
এজাজ: হুম! ফুলটাই কেবল চাই, ফুলের সাথে যে কাটা ও কীটও থাকে সেটা হিসেবে আনি না!
আমি: তা শেষমেশ কি হয়েছিলো?
নাসির ভাই: মৃত্যুর আগে আগে বাবাটা ছেলেকে শ্বেতাঙ্গিনী বিয়ের পারমিশন দিয়েছিলো। বলেছিলো, “ছেলে যখন এতটাই সেই মেয়ের জন্য পাগোল, ঠিক আছে তাহলে, ও বিয়ে করুক।”
আমি: এখনো কি মস্কোতেই আছেন উনারা?
নাসির ভাই: মাঝখানে কিছুদিন বাংলাদেশে ছিলেন। এখন আবার মস্কোতেই আছেন।
আমি: আসলে দেশ-বিদেশের মিশ্রণে কিছু জটিলতা তৈরীই হয়। উপায় নাই!
নাসিম ভাই: আরে রাখেন তো আপনাদের ফিলোসফিকাল কথাবার্তা। একটা কৌতুক হোক।
এজাজ : আমি বলি কৌতুক ?
টিটো: বলো।
এজাজ: সসেজ কৌতুক: আমাদের ইউনিভার্সিটির মেডিকেল ফ্যাকাল্টির ঘটনা। একটা প্রাকটিকাল পরীক্ষা আছে এরকম, বড় একটা ব্যাগের ভিতর রাখা থাকে মৃত মানুষের বিভিন্ন অর্গান। তা ছাত্রছাত্রীদেরকে চোখ বন্ধ করে লটারীর মত তুলে নিতে হয় একটা অর্গান, এরপর প্রফেসর-কে বলতে হয় কি অর্গান তার হাতে পড়লো। তদানুযায়ী প্রফেসর ঐ অঙ্গটির উপরই নানাবিধ প্রশ্ন করেন স্টুডেন্ট-কে। তা, একবার এক ছাত্রী ব্যাগে হাত দিয়ে কোন একটা অর্গান তুললো।
প্রফেসর: কি অঙ্গ উঠলো?
ছাত্রী: সসেজ।
প্রফেসর: (কিঞ্চিত লাজুক হয়ে) আহ্হা, যা পড়েছে তাই খোলাখুলি বলো, ইনডায়রেক্টলি বলার কিছু নাই।
ছাত্রী: আমি ডায়রেক্টলিই বলছি, আমার হাতে পড়েছে একটা মাঝারি সাইজ সসেজ।
প্রফেসর: মেডিকেল ছাত্রীর এতটা লাজুক হলে চলে? মানব দেহের সব অর্গান নিয়েই পড়ালেখা করতে হবে। তুমি সরাসরিই বলো যে, তোমার হাতে কি।
ছাত্রী: আমি সিরিয়াসলি বলছি, এইটা একটা সসেজ।
এতক্ষণ প্রফেসর সাহেব ঐ দিকে না তাকিয়ে কথা বলছিলেন। এবার মেয়েটির হাতের দিকে তাকালেন তিনি। দেখলেন যে মেয়েটির হাতে সত্যিই সত্যিই একটা সসেজ। প্রফেসরের চোখ উঠে গেলো কপালে, তিনি নিজ থেকেই চিন্তিত মুখে বললেন, “সত্যিই তো সসেজ! এটা যদি সসেজই হয় তাহলে সকালে আমি নাস্তা করলাম কি দিয়ে?”

সশব্দে হেসে উঠলো সবাই।

ডিপার্টমেন্টে আজ বেশী সময় লাগলো না। আমাদের সুপারভাইজারও ব্যাস্ত ছিলেন বোধহয়। আমাকে আর লেনাকে কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। এরপর আমি আর লেনা গেলাম আমাদের ফেভারিট ক্যাফেটাতে। কফি নিয়ে বসলাম মুখোমুখি। আমি তাকালাম লেনার দিকে, আমি অনেকবারই লক্ষ্য করেছি যে, লেনা ঝড়ের মত নয়; বরং প্রবল ঝড়-ঝাপটা শেষে একটা মদির স্নিগ্ধতা সম্পন্ন! এতদিন আমি যেদিকে খুব একটা তাকাই নি, আজ সেদিকে তাকালাম। লেনা নিঃশ্বাস ফেলছে, সেই নিঃশ্বাসের তালে তালে ওর স্বল্পন্নোত বুক ছন্দতালে ওঠানামা করছে। আর সেই ছন্দময় ওঠানামাটা আমার কাছে খুবই মধুর মনে হলো। কবিরা নারীদের তুলনা করেছিলেন গতিশীল নদীর সাথে। লেনা একটি নদীর নাম। আমার সামনের লেনা নামক জীবন্ত নদীটির কায়ার গতিবেগে সহজেই মধুমিত হওয়া যায়। লেনার গোলাপী ঠোট ভরা মধু, গাল ভরা লালিত্য! তারপরেও ওর চারপাশে কেন কোন ভ্রমর নেই?

আমি: লেনা।
লেনা: কি?
আমি: কিছু না।
লেনা: মানে কি? কিছু বলতে চাও?
আমি: নাহ। তোমার ছেলেটা কেমন আছে?
লেনা: ভালো। আমি বেশি সময় দিতে পারিনা। আমার মা-ই ওকে সময় দেয় বেশি।
আমি: আর তোমার চাকরি?
লেনা: আহামরি কোন চাকরি তো না। আপাতত জাস্ট পেট চালানোর জন্য। চলছে গতানুগতিক। (লেনা হঠাৎ হেসে ফেলে) আজ সকালে ইন্ডাস্ট্রীতে হয়েছে কি জানো?
আমি: কি হয়েছে?
লেনা: এখানে আসার আগে কিছু অংক করছিলাম। তা অদ্ভুত সব সংকেত ফর্মূলা দেখে আমার কলিগ এক মাঝবয়সী মহিলা আমাকে বলে,
“লেনা তুমি যা লেখো, তা কি সব তুমি বুঝতে পারো?”

এই কথা শুনে ওর সাথে আমিও হেসে ফেললাম। আসলেই ফিজিক্সের এইসব দুরুহ সংকেত অন্যদের কাছে দুর্বোধ্য হায়রোগ্লিফ-এর মতই।

আজ বিকালের দিকটা ভাবলাম একাই কাটাবো। তাই ক্রেস্তের ক্যাফে বা ডরমিটরি কোথাও না গিয়ে, ইউনিভার্সিটির এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টির বাগানের একটা বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে রইলাম। এই ফ্যাকাল্টি-টা ক্যাম্পাসের একপাশে। তাই বিকালে এখানকার বাগানটাও নির্জন, প্রায় জনশূন্যই থাকে। অতীতের কিছু স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম। আমি আর মোনালিসা তখন কিশোর-কিশোরী। কোথায় যেন গিয়ে নৌকায় উঠেছি। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, ঢাকার রমনা পার্কের লেকটায় তখন নৌকা চলতো। তা আমি মাঝিকে বললাম, “আমি একটু বৈঠা বাই?” বয়স্ক মাঝি হেসে আমার হাতে বৈঠা দিলো। আমি যেই না বৈঠা পানিতে ফেলেছি, অমনি ছলাৎ করে পানি ছিটে লাগলো মোনালিসার জামায়। আর যায় কোথায়? ও ভেবেছিলো, আমি ইচ্ছে করেই এটা করেছি। অমনি ও দুই হাতে লেকের পানি নিয়ে আমার গায়ে মারতে শুরু করলো। মোনালিসার সাথে আমার ছোট ছোট এরকম অনেক নোনা-মিঠা স্মৃতি রয়েছে। যদিও ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে জানি তারপরেও আমাদের মধ্যে কোন অনুভূতিই পরিনতি পায়নি। দেশে ও কোন প্রেম-ট্রেম করছে কিনা সেটাও আমি জানি না। হতে পারে যে, এতদিনে কারো না কারো নজরে হয়তো পড়েছে।

এই জনশূন্য জায়গায় হঠাৎ করে একটি অল্প বয়সী মেয়েকে হেটে যেতে দেখলাম। কোনদিকে যাচ্ছে ঠিক বুঝলাম না। অবশ্য তা নিয়ে আমার কোন আগ্রহও নাই। আমি দেখছি মেয়েটাকে। বয়স আঠারোর বেশি হবে না। ফার্স্ট বা সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী হতে পারে। পরনে বেশ আটসাট পোষাক। তাও এই ঠান্ডায়ও মিনিস্কার্ট পড়া। অবশ্য লেগিস রয়েছে নীচে। মেয়েটার ফিগারটা ভালো করে দেখলে মনে হয় ‘এ বিউটিফুল অবজেক্ট অব সেক্স!’ একটা কথা এই দেশে প্রচলিত রয়েছে, ‘মেয়েরা পছন্দ করে কানে শুনে, আর ছেলেরা পছন্দ করে চোখে দেখে’। হ্যাঁ, সুন্দরী দেখে পুরুষরা অনুভূত হয়। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে কোন মেয়েই পুরুষের কাছে ‘Object of sex’। হ্যাঁ, পুরুষরা মেয়েদেরকে ‘অবজেক্ট অব সেক্স’-ই মনে করে। কিন্তু সে যে জ্বলজ্যান্ত একজন মানুষ, তারও যে জীবন আছে, মন আছে, হৃদয় আছে, আত্মা আছে, এটা নিয়ে ভাবেই না। মেয়েটা কি অন্যের ‘অবজেক্ট অব সেক্স’ হতে চায়? নাকি সে চায় ভালোবাসার মানুষটার হাত ধরে একটা সুস্থ সংসার করতে? একটি সহজ-সরল কুমারী নারী নানাবিধ কারণে একসময় ‘অবজেক্ট অব সেক্স’-এ পরিণত হয়, যা আসলে সে কোনদিনও কামনা করেনি! তার মনপ্রাণ চিরকাল ভালোবাসার হাতছানিই দেখেছিলো, দেখেছিলো সুস্থ জীবনের স্বপ্ন।

আনিতার দেশে যাওয়ার দিন ক্রমশঃই ঘনিয়ে আসছে। প্লেনের টিকিট পেয়ে গেছে ও। দেশে যাওয়ার দিন, তারিখ, ক্ষণ সবই ঠিক হয়ে গেছে। এখন শুধু ঐ কয়টা দিনের অপেক্ষা। ও নিজের রুমও ছেড়ে দিয়েছে। আপাততঃ আমার রুমেই থাকছে।

আজ হঠাৎ ও ভীষণ ইমোশনাল হয়ে গেলো।
আনিতা আমার হাত চেপে ধরে বললো, “আমার বেদনা তুমি বুঝবে না! কেউ আমাকে তোমার মত করে বোঝেনি! কেউ আমাকে তোমার মত করে ভালোবাসেনি। কেউ আমার জন্য এতটুকুও উৎকন্ঠিই হয় নি। হৃদয়ের উষ্ণতা বলে যে কিছু একটা আছে, এটা আমি তোমার কাছ থেকেই প্রথম পেয়েছি।”
আমি ওর কথায় কিছু বলছিলাম না। আনিতা আবার বলে চললো,
“কেন আমাকে তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে? কেন আমি চিরকাল তোমার সাথে থাকতে পারবো না? আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুষার।”
তারপর সে কি অঝোরে কান্না!
হায়রে অভিমানিনী নারী! আনিতার প্রতি আমি উদাসীন ঠিক নই। ওকে দেখে আমি কতবারই না মুগ্ধ ও সম্মোহিত হয়েছি! তবে কিনা, কোন এক সময় আমার মনটা ছিলো উদভ্রান্ত এক তরুণের মন, এখন আর অতটা উদভ্রান্ত নই আমি।

ঠিক কি বলবো বুঝতে পারলাম না। ঠিক কি করে সান্ত্বনা দেব তাও বুঝলাম না। আনিতাকে কাঁদতে দিলাম। কেঁদে কেঁদে হয়তো মনটা হালকা হয়ে যাবে। যাকে পেতে চাই তাকে পাইনে, যাকে পাই তাকে চাইনে; আবার যাকে পাই তাকে পেয়েও হারাই! আমার মন এক অব্যক্ত বেদনায় ভরে গেলো!

একটা সময় ছিলো, যখন ইন্টারনেট ছিলো না, ই-মেইল ছিলো না। যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ছিলো খুব দুর্বল, তাই তখন আমি মাঝে মাঝে মোনালিসার সাথে কথা বলতাম টেলিপ্যাথির মাধ্যমে। আমার সেই টেলিপ্যাথির সংকেত মোনালিসা ধরতে পারতো কিনা আমি জানি না!
আমার ছিলো অপরিপক্ক এক কিশোরের মন!

আজ হঠাৎ রাত নয়টার দিকে মোবাইলে মোনালিসার কল পেলাম।

আমি: হ্যালো, কে মোনালিসা?
মোনালিসা: হ্যাঁ। আমি।
আমি: কেমন আছো।
মোনালিসা: ভালো। তুমি কেমন আছো?
আমি: এই তো, ভালো-ই।
মোনালিসা: তোমাকে একটা বিষয় জানানোর জন্য ফোন করলাম।
আমি: কি বিষয় বলো।
মোনালিসা: আমি আগামীকাল ইংল্যান্ড চলে যাচ্ছি।
আমি: আগামীকালই?
মোনালিসা: হ্যাঁ।
আমি: ওকে গুড লাক। হ্যাভ এ গুড জার্নি।
মোনালিসা: পিএইচডি শেষ করার পর তুমি কোথায় যাবে?
আমি: দেশে ফিরে যাবো বলেই তো ঠিক করেছিলাম।
মোনালিসা: কি দরকার দেশে যাওয়ার? ইংল্যান্ডে চলে আসো।
আমি: তারপর?
মোনালিসা: তারপর আর কি? আমি আর একা থাকবো না। আমরা দু’জন হবো।
আমি: মানে কি?
মোনালিসা: আমি এর মধ্যে দেখি, ইংল্যান্ডে কি ব্যবস্থা করতে পারি। আমার জন্য ও তোমার জন্য।
আমি: তুমি কি বলতে চাও? সরাসরি বলবে কি?
মোনালিসা: সরাসরিই বলতে হবে?
আমি: হ্যাঁ।
মোনালিসা: আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।

মোনালিসা যখন বিয়ের প্রস্তাব দিলো, মনে হলো, যুগ যুগান্ত যেন আমি এই প্রস্তাবটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

আমি: আমার তো আরো এক বছর লাগবে, ততদিন কি তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে?
মোনালিসা: অবশ্যই।
আমি: প্রমিস?
মোনালিসা: প্রমিস।

একটা গান মনে পড়লো, ‘প্রেমও রঙে, রাঙিয়েছি মন, তোমারই দরশনে উতলা এ মন, প্রিয়তমা তুমি আসবে কখন? বলো তুমি আসবে কখন?’


মোনালিসার কলটা যখন আমি রিসিভ করেছিলাম তখন আনিতা রুমের বাইরে ছিলো। তার কিছুক্ষন পর আনিতা রুমে ঢোকে। আমি তার দিকে তাকালাম। আজ যেন সে অতিমাত্রায় সলাজ ও সৌন্দর্য্যময়ী হয়ে উঠেছে!

রাতের দিকে আনিতা আমার কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। কিন্তু আমি সুস্থির হতে পারছি না। মাথার মধ্যে তখন একটা বিষয়ই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে। আনিতার আমার বাহুডোরে কিন্তু ওকে আজ যোজন যোজন দূরে মনে হচ্ছে! এ যেন হাতের কাছে ভরা কলস তৃষ্ণা মেটেনা!

আমি: আনিতা।
আনিতা: হু।
আমি: তোমাকে একটা কথা বলার আছে।
আনিতা: কি?
আমি: মোনালিসা আমাকে বিয়ে করতে চায়।
আনিতা: মানে?
আমি: দেখো, আমাদের মধ্যে যেটা আছে সেটা তো সিরিয়াস কিছু না। তাছাড়া তুমিতো দেশেই চলে যাচ্ছো।
আনিতা চোখ তুলে আমার দিকে চাইলো। আমি আরো বলে চললাম। তুমি দেশে গিয়ে চাকরী-বাকরী শুরু করো, তারপর ওখানে কাউকে না কাউকে তো খুঁজে পাবেই। সে তো তোমার দেশী ছেলে হবে। তোমাদের ভাষা ও কালচারে মিল হবে। তাতে সংসার সুখেরও হবে।
আনিতা: মোনালিসাকে কেন বিয়ে করতে চাও?
আমি: ছেলেবেলা থেকেই ওকে চিনি, আমারই দেশী মেয়ে। ওকে বিয়ে করে ফেলাটাই ভালো হবে, বোধহয়।

আনিতা অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। নীরবে অনেকক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো! মুখে কোন কথা কথা ছিলো না, তবে আনিতার চোখ ধীরে ধীরে অশ্রুসজল হয়ে উঠলো!

(চলবে)

‘চঞ্চল ময়ূরী এ রাত
বঁধু যেতে দিও না,
কানায় কানায় ভরে যাওয়া রাত যেন
যেতে দিও না।।
চোখের পাতায় ধরে রাখা রাত, বঁধু যেতে দিও না।
রাত বঁধু যেতে দিও না।।
কেন ঘুম আসে না; কেন ঘুম আসে না
কত স্বপ্ন ঘিরে ঘিরে আসে,
মধুর আবেশ নিয়ে বঁধুয়া গো ফিরে ফিরে আসে।
পরশে পরশে এই থেমে থাকা রাত যেন
যেতে দিও না।।
চোখে চোখ রাখো না; চোখে চোখ রাখো না
মনে মন রাখো শীতল করিতে।
মরমী গো তুমি পথ ভুলে যাবে ফিরে যেতে
নয়নে নয়ন রেখে মরে যাওয়া রাত যেন

যেতে দিও না।।’

রচনাতারিখ: ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ১০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.