নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২৫)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২৫)

————————————- রমিত আজাদ

আনিতাকে এয়ারপোর্টে সি-অফ করে এসেছিলাম অত্যন্ত শীতল অনুভূতিতে। বিশাল বড় শেরমিতোভা এয়ারপোর্টের কাস্টমস চেকিং পার হয়ে আমার দিকে একনজর তাকিয়ে, হতাশা, কষ্ট, নিরাশা ও গোপন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আনিতা যখন ধীরে ধীরে ইমিগ্রেশন বুথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো; আমার মধ্যে তখন কোনই তোলপাড় হয়নি। বুকের ভিতর যদি কোন সরোবর থাকে সেখানে কোন ঢেউ ওঠা তো দূরের কথা, সামান্য ফ্লাকচুয়েশনও হয়নি। যার সাথে এতগুলো বছরের দৈহিক অন্তরঙ্গতা, তার বিদায়ে এতটা নির্লিপ্ত থাকাটা থিওরেটিকালি অস্বাভাবিক। তবে পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে আমি জানি, জীবনে থিওরীই সব নয়। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস বলে, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের দেয়া থিওরীও ফেইল করেছে। নিউটনের মত মহাজ্ঞানীর প্রদত্ত থিওরীও ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্টে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিলো, যা ‘আলট্রাভায়োলেট ক্যাটাসট্রোফ’ নামে বহুল পরিচিত।! দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন যে, ‘বিশুদ্ধ চিন্তা থেকে থিওরী তৈরী করা যায়’। আর মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাইয়াম বলেছিলেন যে, থিওরী ইজ নট অল, যতক্ষণ না তা পরীক্ষার দ্বারা ইমপিরিকালি প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ থিওরী স্বীকৃত নয়। হ্যাঁ, প্রাকটিকালটাই চরম সত্য। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই এ্যাবসোলুট ট্রুথ। জীবন যদি এমন কোন নতুন ঘটনার সম্মুখীন হয়, যা প্রচলিত থিওরীর সাথে কনফ্লিকটিং; তাহলে বিজ্ঞানের দায়িত্ব হলো ঐ প্রতিভাস ব্যাখ্যার নিমিত্তে নতুন থিওরী নির্মান করা। প্রয়োজনে এই পর্যায়ে বিজ্ঞানের নতুন শাখারও জন্ম হতে পারে। এছাড়াও প্রকৃতি জগতে রয়েছে ‘কূটাভাস’ – মানে হলো আমাদের সাধারণ ধারণায় যা ঘটবে না বলে মনে হয়, বাস্তবে সেটাই ঘটে; বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘প্যারাডক্স’! আনিতার বিদায়ে আমার হৃদয়বৃত্তিক অনুভূতিতে যেটা ঘটেছিলো সেটা নিঃসন্দেহে ‘প্যারাডক্স’!

দুদিন পরে আমার খুব খারাপ লেগেছিলো! আনিতার কথা বারবারই মনে পড়ছিলো। ঘুমানোর ঠিক আগে আগে আনিতার জন্য আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। আমার ভীষণ কান্না পেলো। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছিলো, ‘আমি এত একা কেন?’ এটা কি নৈশক্রীড়ায় কোন শয্যাসঙ্গী নাই বলে এমনটা ঘটছিলো? না, খুব সম্ভবত না। কোনরূপ দুঃখবিলাসও নয়, একেবারে ন্যাচারালিই বুকের গভীর থেকে দুঃখটা উথলে উঠেছিলো! আমার এই আনএক্সপেকটেড অনুভূতিটা দেখে নিজের কাছে নিজেই বিস্মিত হয়েছিলাম!

নিজের বিবাহ নিয়ে আপাতত কিছু ভাবিনা। এই জীবনে কোনদিন বিয়ে করবো না বলেই ঠিক করেছি। একটা প্রশ্ন বা বিষয় আমার মনে শুধুই ঘুরপাক খায়।

যাকে ভালোবাসিনা, তাকে নিয়ে কি ঘর করা যায়? কথা হতে পারে যে, এমন তো লক্ষ লক্ষ ঘর রয়েছে, যেখানে নর-নারী পরস্পরকে ভালো না বেসেই পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। তারা তো ঠিকই ঘর করছে। আপত্তি জানাবো না যে, এমন হচ্ছে না। হতে পারে যে আমাদের পিতামাতারাই সেই ভালোবাসাহীন পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তদুপরী তারা ঘর, সংসার, সন্তান লালন-পালন সবই করেছিলেন। তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, তারা হয়তো সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই এইসব করেছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে হৃদয়ের বন্ধন কতটুকু ছিলো। হৃদয়ের মধ্যে এক নারীকে ধরে রেখে, আরেক নারীর সাথে রাতের পর রাত কাটিয়ে দেয়া যায়; অথবা হৃদয়ের মধ্যে এক পুরুষকে ধরে রেখে, আরেক পুরুষের সাথে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। তারপরেও মন অস্থির করা কোন এক দুর্বল মুহূর্তে ঐ হৃদয়ের মানুষটার জন্য মন কি উন্মনা হয়ে ওঠেনা? সুদীর্ঘ বৈবাহিক জীবনের অভ্যস্ততার পরেও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঐ একটা দেয়াল বারংবার বাধা সৃষ্টি করে না?

——————————————————-

ক্রেস্তের আড্ডা:

আনিতা দেশে চলে যাওয়ার পর আমার ঘরের প্রতি টান কমে গেছে। তাই ইদানিং একটু বেশী সময়ই ক্যাফেতে বসে থাকি।

ক্রেস্তের কাঁচের প্রদর্শ গবাক্ষ দিয়ে দেখলাম, দূরের মাঠে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের প্রিপারেটরি কোর্সের ছাত্রছাত্রীরা টেনিস বল দিয়ে সাতচারা খেলছে। ঐ দেখে আমি খুব কৌতুক অনুভব করলাম। আমি নিজেও প্রিপারেটরি কোর্সে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা মিলে সাতচারা খেলেছিলাম। হা হা হা, পাত্রপাত্রী বদলায়; কিন্তু কাহিনী বদলায় না।

আতিক তার রুশ বান্ধবীকে সাথে নিয়ে ক্যাফেতে ঢুকলো। ইউলিয়া নামের এই মেয়েটি বেশ ফ্রাংক। আমাদের সাথে বসে খোলামেলা আলোচনাই করে। কোন বাঙালী মেয়ের উপস্থিতিতে যে আলোচনা করতে সংকোচ হয়, ওর সামনে সেই আলোচনা অকপটেই করা যায়।

প্রসঙ্গ উঠলো বিল ক্লিন্টনকে নিয়ে। সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। এদিকে আয়ুব খান আর জ্যাকুলিন কেনেডিকে নিয়ে এটাওটা কথা প্রচলিত আছে। তবে জ্যাকুলিন যে একা পাকিস্তানে এসেছিলেন, এবং দীর্ঘদেহী সুদর্শন পাঠান আয়ুব তাকে নিয়ে খোলা জীপে চড়ে শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন এটা সর্বজনবিদিত। একজন বললো, আমাদের এরশাদ কাকুও তো কম যেতেন না। তা এইসব লোকদের মেয়েবাজ জেনেও কেন কিছু নারী তাদের সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়? উত্তরে ইউলিয়া বলেছিলো, “তোমরা পুরুষ মানুষদের অনেকেই জানো না, “বাবনিকি পাখনিয়াৎ সেক্সোম!” (কথাটার মোদ্দা অর্থ হলো, মেয়েবাজ পুরুষদের শরীর থেকে যৌনতার গন্ধ ভেসে আসে, আর যৌনতাপ্রিয় মেয়েরা ঐ গন্ধে ব্যকুল হয়ে ওঠে!)

আতিক: লক্ষ্য করেছেন যে, ঐখানে বাংলাদেশী আর ইন্ডিয়ান ছেলেমেয়ারা মিলে সাতচারা খেলছে?

আমি: হুম, আমি আগেই দেখেছি।

আতিক: ইন্ডিয়ানরাও সাতচারা খেলে?

আমি: হুম খেলে। আমি নিজেই প্রিপারেটরি কোর্সে থাকতে ওদের সাথে মিলে সাতচারা খেলেছি। খেলাটা দুই দেশেই প্রচলিত আছে।

আতিক: ওদের সাথে আমাদের অনেক মিলই আছে। তবে একটা বড় অমিল আছে।

আমি: কি সেই অমিলটা?

আতিক: ভারতীয়রা আমাদের চাইতে বেশী দেশপ্রেমিক।

আমি: (আমি মৃদু ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম) বাংলাদেশীদের অনেকেই ভারতীয়দের আমাদের চেয়ে বেশী দেশপ্রেমিক মনে করে।, “এটা একটা অত্যন্ত অবমাননাকর কথা, যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়া আছে। আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য এটা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরাই বেশী দেশপ্রেমিক। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের মানুষ তথা বাঙালীরা যতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসেই তা বিরল!”

আতিক: জ্বী?

আমি: তোমাকে তাহলে সীপাহী বিপ্লবের কথা বলি। বাঙালী সৈনিকদের সৃষ্ট সীপাহী বিপ্লবের দাবানল দিল্লী পর্যন্ত পৌঁছালো। নির্যাতিত সৈনিকদের বিদ্রোহ ততদিনে স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। তখনো জীবিত ছিলেন দিল্লীর মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। উনার শিশুকালেই উপমহাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে ডানা মেলেছিলো দখলদার দস্যু ইংরেজ শকুন। উনার একজীবনেই তিনি ঐ শকুনদের অশুভ বিস্তৃতি দেখেছিলেন। সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী ও কবি বৃদ্ধ সম্রাটকেই এই স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছিলো মুক্তিকামী জনতা। উনার নেতৃত্বে ভারতীয় জনগনের স্বাধীনতার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা সফলতার মুখ দেখতে সফল হতে হতে ব্যার্থ হয়। সে এক করুণ ইতিহাস, তবে তার পিছনের কারণ ছিলো কিছু ভারতীয় ব্রহ্মণ্যবাদীদের বেঈমানি। মোহন লাল গোবিন্দ দাস, আগারজানদের বিশ্বাস ঘাতকতা; ভারতীয় ব্রাহ্মণ রাজন্যবর্গের অসহযোগীতা সর্ব ভারতীয় স্বাধীনতার প্রচেষ্টাকে সফল হতে দেয়নি। মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক বাহাদুর শাহ জাফর নিজের অনেক কিছু বিক্রি করে বিপ্লবী সৈনিকদের ৬ মাসের অগ্রিম বেতন দিলেন। যখন আর পেরে উঠলেন না, তখন

মুক্তিসংগ্রামের অধিনায়ক মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ ভিক্ষুকের মত ধনী ব্যবসাদার রামজীমলকে বললেন “আমি আপনার কাছে অর্থ ঋণ হিসাবে চাচ্ছি, কর হিসাবে নয়”। কিন্তু রামজীমল ঋণ দিতেও অস্বীকার করল। অথচ আগ্রার ধনী- ঠিকাদার জ্যোতিপ্রসাদ ইংরেজদের ত্রিশ হাজার টাকা যুদ্ধকালীন তহবিলে সাহায্য করে। এ দিকে হঠাৎ বাজার থেকে রসদ ও বারুদ উধাও হয়ে গেল, যামিনী দাসের মত অর্থলোভীরা গড়ে তুলল আটার মজুদ। বারুদ লুকিয়ে সংকট সৃষ্টি করল দেবীলাল। ঐ বারুদ দিয়ে সে ইংরেজদের সহযোগিতা করল ফলে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেল। দিল্লী দখলের পর ইংরেজরা নগরীর প্রতিটি রাজপথে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো; দোষী-নির্দোষ কাউকেই তারা ছেড়ে কথা বলেনি, দিল্লীর পথেঘাটে আনাচে-কানাচে যাকেই পেয়েছে বিনা বাক্য ব্যায়েই তাকে হত্যা করেছে।

টিটো: আপনি এইসব তথ্য কোথায় পেলেন?

আমি: সূত্র: ভারতবর্ষের ইতিহাস-কোকা আন্তোনভা। তিনি রুশ ইতিহাসবিদ। বইটা মস্কো থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। বইটার বাংলা অনুবাদও রয়েছে। অনুবাদক: মঙ্গলাচরণ চট্রোপাধ্যায়

নাসিম ভাই: রিয়েলী স্যাড। এতটাই নিষ্ঠুর ছিলো এই ইংরেজরা!

আমি:  এডওয়ার্ড সাইদ-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে, ‘পাশ্চাত্য কেবলই মানুষ মানুষ করে, আর বাস্তবে পৃথিবীর এখানে-সেখানে, অলিতে-গলিতে আনাচে-কানাচে যেখানেই মানুষ পায় প্রথম সুযোগেই তাকে হত্যা করে।’

নাসিম ভাই: রুশরা তো সব সাবজেক্টেই পন্ডিত। ইতিহাসও ভালোই লেখে। তাছাড়া, ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপর রুশদের লেখা ইতিহাস বই-ই অধিক গ্রহনযোগ্য। কারণ ইংরেজরা তো তাদের স্বার্থে আমাদের বিরুদ্ধে হাবিজাবিই লিখবে!

আমি: শুধু তাই না। তারা কিছু দেশীয় অনুগতদের দ্বারাও ফরমাশি ইতিহাস লিখিয়েছিলো, আর পুরো দুশো বছর ঐসব আবর্জনা আমাদের গিলিয়েছিলো। যার অনেক কিছু এখনো প্রচলিত আছে।

টিটো: রুশীরা সাহিত্যেও তো দুর্দান্ত!

আমি: হ্যাঁ। প্রাক সোভিয়েত রুশ লেখকদের লেখা তুলনাহীন, তারা সবাই-ই রোমান্টিকতা নিয়ে লিখেছিলেন। ফরাসী, ইংরেজ ও মার্কিনী সাহিত্যিকরাও শক্তিশালী রোমান্টিক সাহিত্য রচনা করেছেন।

নাসির ভাই: সোভিয়েত আমলের সাহিত্য কেমন ছিলো?

আমি: অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো। সাহিত্যে অনেকগুলো নোবেল পুরষ্কারও সোভিয়েত রুশীদের আছে। তবে তারপরেও, সোভিয়েত আমলের সাহিত্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিলো।

টিটো: কেন দুর্বল ছিলো?

আমি: এটা সম্ভবত বাক-স্বাধীনতাহীনতার কারণে হয়েছিলো। বাক-স্বাধীনতার অভাব থাকলে খোলামেলা আর কিছু লেখা যায় না। প্রকৃত সত্য তুলে ধরা যায় না। আর একপেশে লেখা খোঁড়া তো হবেই।

এজাজ: সাহিত্যে যৌনতা কি ভেজাল না প্রয়োজনীয় উপাদান?

আমি: হা হা হা। এই নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। আমি কৈশোরের শেষ দিকে সাহিত্যের যৌনতাগুলো মজা পাওয়ার বা সুরসুরি পাওয়ার জন্যই পড়তাম। তখনই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলাম ………..।

এজাজ: কি ‘মাসুদ রানা?’

আমি: দুরো ব্যাটা! ‘মাসুদ রানা’ তো নস্যি! আমি পড়েছিলাম নাবোকভের ‘লোলিতা’, আরও পড়েছিলাম হেনরি মিলারের ‘কর্কট ক্রান্তি’, ইত্যাদি।

নাসির ভাই: পড়ে কি বুঝলেন?

আমি: আরে ঐ বয়সে বোঝাবুঝির কিছু ছিলো না। বললাম, জাস্ট মজা পাওয়ার জন্য পড়তাম। তবে ইউরোপে এসে এখন তো চোখের সামনেই ‘লোলিতা’ বা ”কর্কট ক্রান্তি’-র কাহিনী দেখছি। আসলে ঐ লেখকরা খুব সাহসী ছিলেন। তারা অকপটে তাদের সমাজের লুক্কায়িত সত্যগুলোকে তুলে ধরেছিলেন।

নাসিম ভাই: হুম ভুল কিছু বলেন নাই।

আমি: তারপর আমার বয়স আঠারো প্লাস হওয়ার পর, আমার বড়বোনই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ইয়া মোটা বিশাল বড় এক বই, ওজন কয়েক কেজি হবে। নাম তার ‘সহস্র এক আরব্য রজনীর গল্প’। বইটার পাতায় পাতায় গল্পের পাশাপাশি ছিলো যৌন-উত্তেজক সব হাতে আঁকা ছবি। ছবিগুলো সাদাকালো ও রঙিন দুই ফর্মেই ছিলো। আর গল্পগুলি সবই তো ছিলো যৌনতায় ভরপুর।

টিটো: তাহলে এই দাঁড়ালো যে, সেই অতীতকাল থেকেই সাহিত্যে যৌনতা রয়েছে অন্যতম উপাদান হিসাবে?

আমি: সেরকমই তো মনে হয়। পরবর্তিকালীন লেখকরাও যৌনতাকে বাদ দিয়ে কিছু লেখেননি। যেমন, কয়েকদিন আগে একজন মুরুব্বী বললেন যে তিনি একটা বই অনুবাদ করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন। সেটা হলো জোনাথন সুইফট-এর উপন্যাস। উপন্যাসে কিছু কিছু বর্ণনা একেবারেই পর্ণোগ্রাফি!

আমরা আলাপ করতে করতে ক্যাফেতে ঢুকলেন হিমেল ভাই। হাতে একটা বাংলা জার্নাল, বাংলাদেশী কোন সিনে পত্রিকা হবে হয়তো। এসে সটান আমার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। ফট করে হাতের পত্রিকাটা খুলে বললেন,

হিমেল ভাই: দেখোতো ছবিতে কি সুন্দর সুন্দর বাংলাদেশী মেয়ে। স্তন, নিতম্ব, ফিগার, সবই কত সুন্দর!

আমি: (কৌতুক করে বললাম) ভালো-ই তো দেখেন বসে বসে পত্রিকার পাতায় বাঙালী মেয়েদের সৌন্দর্য!

হিমেল ভাই: হ্যাঁ সৌন্দর্য! ঐ পত্রিকার পাতায়ই! এদিকে বিয়ে করতে গেলে আর কোন সুন্দর মেয়ে পাওয়া যায় না!

সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো!

টিটো: দেশে গিয়া ট্রাই দিছিলেন নাকি?

হিমেল ভাই: শুনো মিঞারা। তোমাদের একটা কথা কই। তোমরাও লক্ষ্য করছো জিনিসটা। এই যে মস্কো বা বিদেশে থাকা বাঙালী ছেলেগুলা, একশোটা বিদেশী মেয়ের সাথে শুইয়াও তৃপ্তি পায় না, যতক্ষণ না একটা বাঙালী মেয়ের সাথে শুইছে!

উনার কথাটা শুনে কেউ কোন কথা না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। কারণ সবাই-ই জানে হিমেল ভাই কথা বলছেন একশো পার্সেন্ট খাঁটি।

এটা একটা আশ্চর্য সাইকোলজিও বটে! একটা বাঙালী ছেলে ইউরোপের ওপেননেস-এর সুযোগ নিয়ে অনেক বিদেশীনীর সাথেই দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, অথচ কোন বাঙালী মেয়ের সাথে ওটা না হলে সে অতৃপ্তই থেকে যায়। কোন বাঙালী মেয়ের সাথে ঐ সম্পর্কটা কেমন হবে এটা জানা-বোঝার জন্য তার মন থাকে ব্যাকুল!

একটু পরে রিংকু ভাই আসলেন। তিনি মূল লেখাপড়া করেছেন দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শোনা যায় সেখানে তিনি বামপন্থী রাজনীতি-ফাজনীতিও নাকি করেছেন। অন্ততপক্ষে তিনি সেরকমই প্রচার করেন। মস্কোতে এসেছেন কেবল পিএইচডি করতে। উনাদের মত লোকদের নিয়ে একটা কমোন প্রবলেম হলো, উনারা একেতো লেখাপড়ায় দুর্বল থাকেন, তার উপর রুশ ভাষায় একেবারেই কাঁচা থাকেন।  রাশিয়া দেশটাকেও তারা জানতে পারেন কম। তাই পড়ালেখা করতে গিয়ে বারবার হোচট খান। উনাদের সুপারভাইজার দয়াশীল না হলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদেরকে ডিগ্রীবিহীন খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়।

রিংকু ভাই: এই বিল্ডিংয়েই ক্লাস ছিলো। ফিলোসফির ক্লাস হলো। ভাষাগত কারণে কিছুই বুঝলাম না; বুঝলাম শুধু দুইটা ওয়ার্ড প্লেটো আর এরিস্টটল। (তারপর হতাশার সাথে বললেন) উপরওয়ালা জানেন, আমার পিএইচডি করা আদৌ হবে কিনা!

আমি: (কৌতুক করে বললাম) আরে আপনি হলেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ। এই দেশ তো আপনাদের জন্যই।

রিংকুভাই: আরে রাখেন ভাই বামপন্থী রাজনীতি। ঐসব কবে তলাইয়া গেছে। এখন এই দেশেও আর কম্যুনিজম নাই, আর বাংলাদেশের বামপন্থী-রাও ধান্দাবাজ হইয়া গেছে। আমি যে স্কলারশীপটা পাইছি এইটাই আমার রাজনীতির একমাত্র প্রাপ্তি।

আমি: মানে কি?

রিংকু ভাই: আরে এতগুলা বছর যে এদের দালালী করলাম, তার একটা পুরষ্কার হিসাবে রুশীরা আমাকে এই স্কলারশীপটা দিয়েছে আরকি!

একটা দারুন ফিগারের এশিয়ান-রুশ তরুণী বেশ হট ড্রেসে আমাদের পাশ দিয়ে হেটে গেলো।  অনেকেই আড়চোখে ঐ দিকে তাকালো। এটা একটা নর্মাল ম্যাসকুলিন রিএ্যাকশন। আর হটড্রেসে যেরকম টাইট মিনি-স্কার্ট তারা পড়ে, যে চলার পথে তাদের নিতম্বের দিকে না তাকিয়ে পারা যায় না।

আমি: টিটো, আড়চোখে কি দেখলেন?

টিটো: (লজ্জ্বা পেয়ে) না মানে, ঐ আর কি! বড় ভাই, কবি হতে গেলে, একটু আড় চোখে তাকানো লাগে।

আমি: টিটো কি ইদানিং কবিতা লিখতে শুরু করেছেন নাকি?

টিটো: না। এখনো শুরু করিনি। তবে প্লান আছে। তাই প্রথম ধাপ হিসাবে আড় চোখে তাকানো শুরু করেছি।

আমরা আলাপ করতে কারতে এক আফ্রিকান এসে আমাদের সাথে বসলো। আমি প্রশ্ন করলাম, “তোমার নাম কি ভাই?” উত্তরে সে আমাকে বললো, “কালু।” আমি একটা থতমত খেলাম! মস্কোতে আমরা বাংলাদেশীরা আফ্রিকানদেরকে ‘কালু’ ফান নেইমে ডাকি। এখন ব্যাটা বলছে যে, ওর নামই ‘কালু’! আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দফা প্রশ্ন করলাম, “ভাই তোমার পুরো নাম কি?” সে উত্তর দিলো, “এজি কালু ইমো।” এবার নিশ্চিত হলাম ওর নাম আসলেই ‘কালু’। ক্যাফেতে বসা বাকী বাংলাদেশীরা মিটিমিটি হাসতে লাগলো।

————————————————–

ইন্টারনেটে ঢুকলাম, ই-মেইল চেক করার জন্য। এই ই-মেইলের কল্যাণে এখন স্কুল জীবনের বন্ধু-বান্ধবের সাথে রেগুলার যোগাযোগ হচ্ছে। ঐ যে গান আছে,

‘হায় মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি,

গেলেম কে কোথায়!

আবার দেখা যদি হলো সখা,

প্রাণের মাঝে আয়!’

সত্যিই ই-মেইলের কল্যাণে আবার তাদেরকে প্রাণের মাঝে নিয়ে আসতে পারছি। বন্ধুবান্ধবরা যেহেতু আমার বয়সীই তাই বেশীরভাগই অবিবাহিত (দুইএকজন আর্মীর বন্ধুবান্ধব ব্যাতীত), তাই ই-মেইলে নারীপ্রসঙ্গ ও আদিরসাত্মক গল্পগুজবও হয়।

একজন বন্ধু লিখেছেন যে, ‘তোমাদের কারো যদি চাইনিজ মেয়ে পছন্দ হয় তো ঢাকাতে আমার অফিসেই চারজন চিংকি আছে।’ সাথে সাথে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে লিখেছে যে, তারা আগামীকালই ঐ অফিস ভিজিট করতে যাবে।

যাহোক, আমি খুঁজলাম মোনালিসা কোন ই-মেইল পাঠিয়েছে কিনা। হ্যাঁ, পাঠিয়েছে।

তবে তেমন কিছু সেখানে নেই। ওর ইংল্যান্ডে গোছানো শুরু করছে, এই জাতীয় মামুলি ইনফর্মেশন। তবে ই-মেইলের শেষে লেখা ছিলো, ‘কিস ইউ, এ্যান্ড হাগ ইউ’।

ফ্যাকাল্টিতে লেনার সাথে দেখা হলো।

কফি খেতে খেতে ওর সাথে গণিতের দুই-একটা টপিক নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ওর গাণিতজ্ঞান খুব ভালো। অবশ্য এমনটিই হওয়ার কথা। গণিতজ্ঞান না থাকলে তো আর ফিজিক্সে পিএইচডি করার চান্স পেতো না। এদিকে আনিতা সায়েন্সের স্পেশালিস্ট হলেও ওর গণিতজ্ঞান কম। আমার কাছে মনে হয় যে, যে মেয়ের গণিতজ্ঞান ও সাহিত্যজ্ঞান নাই, এমন মেয়েকে বিয়ে করা উচিৎ না।

আমার এই কথাটা বোধহয় খুব চাঁচাছোলা হয়ে গেলো। আমি মনে করি গণিত যেহেতু লজিক শেখায়, তাই যার গণিতজ্ঞান আছে সে লজিকালি চিন্তাভাবনা করতে পারে। আর যার সেই জ্ঞান নাই তার চিন্তাভাবনা লজিকাল হয় না। এটা একটা সমস্যাই বটে। ঐ যে কে যেন বলেছিলো, ‘মেয়েরা লজিক বোঝে না, তাই তারা ডিবেট করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারা কেঁদে জিততে চায়।’

কফি খাওয়া শেষ করে বললাম,

আমি: লেনা, তুমি এখন কি করবে?

লেনা: বাসায় চলে যাবো।

আমি: আমিও ডরমিটরিতে যাবো। চলো তাহলে একসাথে নীচে নামি।

লেনা: চলো।

এখানকার বিল্ডিংগুলোতে সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম থাকে, তাই বিল্ডিং-এর ভিতরে বসে বাইরের তাপমাত্রা তেমন বোঝা যায় না। বিল্ডিং থেকে বের হওয়ার পর অনুভব করলাম, বাইরে তাপমাত্রা কম। লেনা বললো, “ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে”।

লেনা হাটু পর্যন্ত স্কার্টের নিচে লেগিস পড়া ছিলো। আমি বললাম, “তোমার তো লেগিস পড়া আছো তাহলে তো আর ঠান্ডা লাগার কথা না। ওয়ার্ম নিশ্চয়ই?”

লেনা: কিসের উষ্ণতা। লেগিস একটা স্ট্রেচি পোষাক, পড়ার পর আরো প্রসারিত হয়, তারপর ওর মধ্যে দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে। আমার পায়ে এখন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে।

আমি এই ব্যাপারে আর কোন কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইলাম। ওর মিনিস্কার্টের নীচে লেগিস কিভাবে পড়া, পড়ার পর তা প্রসারিত হয়ে কি রুপ ধারণ করে, কেনই বা ঠান্ডা বাতাস তার মধ্যে দিয়ে ঢুকে, এই নিয়ে আলাপ করাটা বোধহয় শালীন হবে না।

আমি: তুমি নিউ ইয়ার কোথায় করবে?

লেনা: কেন?

আমি: আমার সাথে নিউ ইয়ার করতে পারো। (এবার প্রস্তাবটা কনফিডেন্টলি দিলাম। কারণ এখন আনিতা আর মস্কোতে নাই)

মনে হলো লেনা কিছুটা বিরক্ত হলো। আমি এই প্রথম ওকে বিরক্ত হতে দেখলাম।

লেনা: (বেশ বিরক্তির সাথে) আমি অলরেডী, বন্ধুদের কথা দিয়ে ফেলেছি। ওদের সাথেই নিউ ইয়ার পালন করবো।

ওর কথার মধ্যে একটা ঠেস ছিলো। যার মানে হলো। ‘আগেতো তোমাকে কতবার ইনডায়েরক্টলি বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, তোমার সাথে আমি নিউ ইয়ার পালন করতে চাই; তা তখন তো এড়িয়ে গেলে; আর এখন দ্বারপ্রান্তে এসে প্রস্তাব দিচ্ছো! এদিকে আমার তো বন্ধুদেরকে কথা দেয়া হয়ে গিয়েছে।

—————————————————————————————–

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২রা  অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১২টা ৫২ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.