নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২৭)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২৭)
————————————- রমিত আজাদ

স্ট্রিপটিজ নামক নাচটি এখন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে মস্কোর নাইটক্লাব ও ডিসকোগুলোতে। কম্যুনিস্ট আমলে ঐ সুযোগ ছিলো না। তবে, একেবারেই যে ছিলো না, তা নয়। বলা যায় বৈধভাবে ছিলো না। অবৈধভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে সব আয়োজনই ছিলো!

স্ট্রিপটিজ বা কাপড় খোলা হচ্ছে মানুষের মধ্যে যৌন-উত্তেজনা জাগানোর জন্য এক প্রকারের আয়োজন যেটাতে একজন সুন্দরী নারী বা একজন সুদর্শন পুরুষ নাচতে নাচতে একে একে তার সব কাপড় খুলে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যায়। স্ট্রিপটিজের মূল উদ্দেশ্য মানুষের শরীর দেখিয়ে অন্য মানুষকে যৌন-উত্তেজনা দেওয়া, যৌনমিলন করতে দেওয়া নয়। এরূপ কর্মে নিয়োজিত নারী বা পুরুষকে স্ট্রিপার ড্যান্সার বলা হয়। এই ধরনের অনুষ্ঠান বা আয়োজন সাধারণত কোনো বিলাস-বহুল হোটেলে বা স্ট্রিপক্লাবে হয়।

কবে কোথায় এই নাচ প্রথম শুরু হয়েছিলো, এটা সুস্পষ্ট নয়। তবে বেবিলনীয় থেকে শুরু করে রোমান পর্যন্ত সব সভ্যতায়ই যে এই আয়োজন ছিলো তা সুবিদিত। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো গ্রীক গণতন্ত্রের জনক ও আইনপ্রণেতা সোলন সেই আড়াই হাজার বছর আগে কয়েক শ্রেণীর গণিকা তৈরী করেছিলেন, যাদের মধ্যে পুরুষের মনোরঞ্জনকারী নারী স্ট্রিপার ড্যান্সার-ও ছিলো। পুরুষদের উপস্থিতিতে সিডাক্টিভ নৃত্যানুষ্ঠানে স্ট্রিপ নেচে রূপসী নারীরা মঞ্চ মাতাতো।

কম্যুনিস্ট রেজিম উঠে যাওয়ার পর বড় বেশী লাগামহীন হয়ে গিয়েছে রুশ সমাজ! এটা অনেকটা খাঁচায় বন্দী কাউকে হঠাৎ ছেড়ে দিলে যেমন বেপরোয়া হয়ে ওঠে তেমনটা। এই কয়েকবছর আগেই যেই দেশে নাইটক্লাব-স্ট্রিপক্লাব বলে তেমন কিছু ভাবাই যেত না, সেখানে এখন নগরীর অলিতে-গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে উঠেছে স্ট্রিপক্লাব, ক্যাসিনো ইত্যাদি। সেই সাথে বেড়েছে সংশ্লিষ্ট অপরাধ।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছিই এরকম দুএকটা স্ট্রিপক্লাব ছিলো। তা ছাত্ররা মাঝেমধ্যে সেখানে যেত। তবে বেশীরভাগ সময়ই ধনীরাই কেবল যেত, যেহেতু পয়সা-কড়ির একটা ব্যাপার আছে!

একবার বাংলাদেশ থেকে মাঝবয়সী একজন ব্যবসায়ী এলেন মস্কোতে। ব্যবসার কাজে ছয়-সাতদিন ছিলেন। তিনি হঠাৎ আমাকে বললেন, “ভাই আপনাদের মস্কোতে স্ট্রিপটিজ শো কোথায় হয়?” আমি উনার দিকে শীতল চোখে তাকালাম। তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “বুঝলেন না, এই দেশে কাজেই এসেছি, তবে ফাকে একটু বিনোদনও তো দরকার। এই দেশে আসলাম আর এই দেশী দুই-একটা নগ্নিকাকে না দেখলে কি চলে? আমি অবশ্য যে দেশে যাই, সেই দেশেই স্ট্রিপ বারে ঢুকি।” বুঝলাম, বাংলাদেশীরা দেশের রক্ষণশীল বদ্ধ সমাজে যা যা করতে পারেনা, বিদেশের মাটিতে গিয়ে তাই করতে হন্যে হয়ে ওঠে!

আমার এক প্রবাসী বন্ধু একবার বলেছিলো যে ঢাকাতে সে একটা অত্যাধুনিক ক্যাফে খুলতে চায়। খাবার-দাবার ও অন্যান্য সেবা হবে একেবারে পাশ্চাত্য মানের। তারপর হাসতে হাসতে বলেছিলো, “সেখানে নৈশ অনুষ্ঠানে স্ট্রিপটিজ-এর আয়োজন থাকলে কেমন হয়?”
আমিও কৌতুক করে বলেছিলাম, “হুম, শাড়ী স্ট্রিপিং হলে আরো জমজমাট হবে! চিরকাল তো সবাই পাশ্চাত্য পোষাকের স্ট্রিপিং দেখে অভ্যস্ত!” এবার বন্ধু সব কয়টা দাঁত বের করে হেসে বলেছিলো, “দ্যা আইডিয়া ইজ ব্র্যান্ড-নিউ এ্যান্ড গ্রেইট!”

স্ট্রিপবার একে তো ব্যায়বহুল, তার উপর পরিবেশও ভিন্ন, তাই ছাত্রছাত্রীদের সেখানে খুব একটা যাওয়া হয় না। তবে ছাত্রছাত্রীদের বিনোদনের জন্য রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা, যার নাম ডিসকোটেকা। সেখানকার মূল আকর্ষণ হলো ‘নাচ’। যারা ওখানে যায় তারা সকলেই নাচে। নানান ধরনের মিউজিকের তালে তালে নাচ। দ্রুত লয়ের নাচগুলোতে সবাই ইন্ডিভুজুয়ালী যে যার মত নাচে। আর ধীর লয়ের নাচগুলোতে নাচ হয় জোড়ায় জোড়ায়। মেয়েরা অপেক্ষা করে, আর ছেলেরা যে কোন মেয়েকে হাত বাড়িয়ে আমন্ত্রণ জানায়, সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মেয়েটি তাঁর কাধ ও কোমর জড়িয়ে গায়ে গা ঘেষে খুব কাছাকাছি হয়ে ঘুরে ঘুরে ধীর লয়ে নাচে। কেউ কেউ ওখানে যায়ই জোড়া বেধে, মানে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড একসাথে। তারা আর অন্যদের দিকে তেমন তাকায় না। ধীর লয়ের মিউজিক শুরু হলেই পরস্পরের বাহুলগ্ন হয়ে, এমনকি আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েই নাচে।

এই ডিসকো নিয়ে আমার দুটি ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা রয়েছে। একটা প্রীতিকর, আরেকটা হাস্যকর। একেবারে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র আমি, কোন এক ডিনারের অনুষ্ঠানের মধ্যে নাচের আয়োজন হয়েছে। তা সেখানে উপস্থিত ছিলো খুবই অল্প বয়স্কা (ষোল কি সতেরো বছর বয়স হবে মেয়েটির) এক রূপসী রুশ তরুণী। একেবারে সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপ! তা ধীর লয়ের গান শুরু হলেই ছেলেরা ছুটছিলো ওকে আমন্ত্রণ জানাতে। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে মেয়েটা কারো আমন্ত্রণই গ্রহণ করছিলো না। যদিও এরকম হয় কম, এখানে সাধারণত সব মেয়েই নাচের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়, এটাই কালচার। যাহোক, আমি হঠাৎ ভাবলাম, যাই না মেয়েটার কাছে, অন্যেরা ব্যর্থ হলেও আমি দেখি সফল হই কিনা। দেখি না কতটা সুদর্শন বা এ্যাট্রাকটিভ আমি? সেদিন কালো রঙের একটা স্যুট পড়েছিলাম আমি। অনুষ্ঠানে আসার আগে আয়নার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিলো, আজ আমাকে দেখতে ভালোই লাগছে! তা একটা ধীর লয়ী গান শুরু হতেই আমি তরুণীটির দিকে এগিয়ে গেলাম, কয়েক সেকেন্ড আগেই ও দুজনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমি গিয়ে ওর দিকে হাত বাড়ালাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে সংকোচে চোখ নামিয়ে ফেললো। তারপর আবার চোখ তুলে তাকালো, আমি ওর মন জয় করা যায় এমন একটি নির্মল হাসি হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে। সেই হাসির মধ্যে কি লেখা সে পড়েছিলো তা আমি জানিনা; তবে এবার মেয়েটিও হাত বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। ওর নরম পেলব হাত ধরে আমি ওকে ডান্স ফ্লোরের দিকে নিয়ে গেলাম। তারপর একটা গানের টাইমলেংথ কত সময় হবে আমি জানি না, হয়তো পাঁচ মিনিট হবে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো জয় করা কোন এক স্বর্গের অপ্সরার সাথে আমি দীর্ঘ সময় নৃত্যছন্দে দোলায়িত!

আর হাস্যকর অভিজ্ঞতাটি সংক্ষিপ্ত। কোন এক নাচের ফ্লোরে আমি, তাকিয়ে আছি এক রূপসীর দিকে ভাবছি ওকে আমন্ত্রণ জানাবো কোন গানে কখন। ফট করে ইয়া মোটা এক বয়স্কা নারী এসে আমার হাতে একরকম জোর করেই টেনে নিয়ে নাচতে শুরু করলো। আমি ভদ্রতার খাতিরে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সাথে নাচতে বাধ্য হয়েছিলাম। অবশ্য পরে ঐ রূপসীরা সাথে নেচে ঐ ক্ষতিটা পুষিয়ে নিয়েছিলাম।

এই ডিসকো নিয়ে আমার একবার কথা হয়েছিলো পানামার তেরসি-র সাথে। তেরসি আনিতার বান্ধবী।
তেরসি: আমি কাল সন্ধ্যায় ডিসকোতে যাবো, তুমি যাবে?
আমি: নাহ।
তেরসি: না, কেন?
আমি: ভাল্লাগে না।
তেরসি: ভালো না লাগার কি আছে? তুমি কি ইয়াং ছেলে নও?
আমি: আনিতা নাই।
তেরসি: আনিতা না থাকলে যাওয়া নিষেধ?
আমি: না, এমন কোন আইন নাই। তবে আমার মন ভালো নেই।
তেরসি: আমার সাথে চলো, মন ভালো হয়ে যাবে।
আমি: ওখানে গেলে তোমার মন কি খুব ভালো হয়ে যায়?
তেরসি: আমি তো রেগুলার ডিসকোতে যাই। ওখানে ছেলেদের সাথে স্পর্শানুভূতি উপভোগ করি।
আমি: মানে?
তেরসি: আরে এরকম তো অনেকেই করে। তুমি আকাশ থেকে পড়লে মনে হয়।
আমি: কি বিষয়?
তেরসি: নাচের ফাকে ছেলেরা আমার ভারী নিতম্ব, উত্তুঙ্গ স্তন ইত্যাদি স্পর্শ করে। আমি আবার ওদের উদ্ধত পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করি।
আমি: তাই?
তেরসি: এটা জাস্ট একটা ফান বা এ্যামিউজমেন্ট। অত সিরিয়াস কিছু না।
আমি: তোমার একজন বয়ফ্রেন্ড আছে না?
তেরসি: আছে। কিন্তু ও আমাকে ডিসকোতে যেতে এ্যালাউ করেছে।
আমি: কেন?
তেরসি: ও বয়সে আমার চাইতে অনেক বড়। প্রায় দশ বছরের বড়। ও হয়তো বুঝতে পেরেছে যে আমার এই বয়সে আমার একটু আনন্দ করার প্রয়োজন আছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, ও বিষয়টাকে পাত্তাই দেয় না।
আমি: কেন পাত্তা দেয় না? বয়ফ্রেন্ড হিসাবে ওর তো আপত্তি করারই কথা!
তেরসি: তার মানে দুইটা হতে পারে। ও হয়তো বেশ বুঝদার, অথবা ও আমাকে আদৌ ভালোবাসে না।
আমি: ঐ সময়ে কেউ কি তোমাকে প্রস্তাব দেয়?
তেরসি: তা তো দেয়ই। তবে আমি প্রস্তাবে কান দেই না।
আমি: কেন?
তেরসি: আবারো বলছি এটা জাস্ট একটা ফান। আমি নাচের সময় যা করি ঐটুকুই। এর বেশি আমি আগাতে চাই না। আর তাছাড়া সবার সাথে তো আর এরকম করি না।
আমি: কার সাথে করো।
তেরসি: যদি ওদের মধ্যে কোন একটা ছেলেকে পছন্দ হয় তখন। তাছাড়া……
আমি: তাছাড়া কি?
তেরসি: ঐ নাচ আর ছোঁয়াছুয়ি পর্যন্তই; এর বেশি কিছু না। ঐ ছেলের সাথে আমার ঐদিনই প্রথম দেখা, আর ঐদিনই শেষ দেখা।

আমি এই নিয়ে তেরসির সাথে আর কথা বাড়ালাম না। একেক জনের সাইকোলজি এক একরকম। ঐ যে আমার দাদীমা বলতেন, ‘পাগোলের সুখ মনে, আর আর্জিনার সুখ বেতের বনে!’

ক্রেস্তের আড্ডা:

এজাজ: আজ ভাই মেজাজটাই গরম হয়ে গেলো।
আমি: কেন?
এজাজ: এক শালায় ফোন করছে কানাডা থেকে।
আমি: কেন টাকা চায়?
এজাজ: আরে ধুর টাকা! টাকা চাওয়া তো ভালো। শালায় চায় বৌ।
আমি: বুঝলাম না!
এজাজ: শোনেন তাইলে। শালায় কানাডায় থাকে আজ বহু বছর। ওখানেই তার সংসার, বৌ ছেলেমেয়ে। সবসময় বাংলাদেশকে ঠেস দিয়ে কথা বলে। কথায় কথায় বাংলাদেশীদের অমানুষ বলতো। এখন নিজের ছেলের বিয়ের বয়স হইছে, তো বিয়ের জন্য একটা বাংলাদেশী কনে খুঁজতেছে।
আমি: সারা জীবন বাংলাদেশ আর বাংলাদেশীরা খারাপ! আর বিয়ের সময় ভিন্ন কথা?
এজাজ: আমি বললাম, বাংলাদেশীরা তো খারাপ। তা আপনি ছেলের বিয়ের জন্য বাংলাদেশী মেয়ে খুজেন কেন? একটা কানাডিয়ান মেয়ের সাথে বিয়া দিলেই তো পারেন, ওরা তো মহা ভালো!
আমি: তা মশাই কি বলেন?
এজাজ: সরাসরি অস্বীকার করলো। বলে, “না, আমি আবার কবে বাংলাদেশীদের খারাপ বললাম? বাংলাদেশী মেয়েরা তো খুব লক্ষী!”
আমি: আজব তো!
এজাজ: আমি বললাম। তা মেয়ের বিয়ে কোন দেশী ছেলের সাথে দিবেন? তো সেই লোক বলে, “অবশ্যই বাংলাদেশী ছেলের সাথে বিয়ে দেব। বাংলাদেশী ছেলেরা তো খুব সুবোধ হয়। শ্বশুড়-শাশুড়ীকে সম্মান করে। এরকম কি আর বিদেশী ছেলের কাছ থেকে পাবো?”
নাসিম ভাই: এই হলো হিপোক্রেসী! সারা জীবন বাংলাদেশ খারাপ, বাংলাদেশীরা খারাপ, বাঙালী কালচার যাচ্ছেতাই; আর মোক্ষম সময়ে বাংলাদেশীদেরকেই চাই! আমিতো অনেককেই জানি কানাডা-আমেরিকায় সেটল করে বিয়ে করার সময় যায় বাংলাদেশে ।
টিটো: তার আবার আরেক জ্বালা আছে।
এজাজ: কি জ্বালা?
টিটো: অনেক বাঙালী মেয়ের বিয়া হইয়া আমেরিকা যাওয়ার পর পাখনা গজায়। এরপর একদিন দেখা যায় পাখী উড়াল দিছে! তারপর ঐ ব্যাটার বৌ তো যায়ই, সাথে অর্ধেক সম্পত্তিও যায়।
নাসির ভাই: আরো অনেক রকম কারণই আছে ভাই। আমি একটা ঘটনা বলি।
টিটো: বলেন।
নাসির ভাই: আমরা যখন প্রিপারেটরি কোর্সের ছাত্র ছিলাম তখনকার কথা। তা আমাদের সাথে পড়তো একটা ইন্ডিয়ান মেয়ে। বোম্বের মেয়ে, কিন্তু বাঙালী। মেয়েটি এখন আর সেই সময়কার বন্ধুবান্ধব সহপাঠী কারো সাথেই যোগাযোগ করে না।
আমি: কারণ কি?
নাসির ভাই: সেটাই তো বলছি। কারণ হলো, প্রিপারেটরি কোর্সে থাকতে ওর ফ্রেন্ডশীপ হয় আরেক ইন্ডিয়ান সিনিয়রের সাথে। তা মেয়েটা একবার তার প্রেমিকের দ্বারা গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলো, তারপর বাধ্য হয়েছিলো গর্ভপাত করতে। তাই পরবর্তি জীবনে মেয়েটি ঐ ফ্রেন্ড সার্কেলের কারো সাথে আর যোগাযোগ রাখেনাই।
আমি: এরকম হওয়ারই কথা। আচ্ছা, যদি কখনো ওর সাথে দেখা হয়, তোমরা ওকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিও না, মনে রেখো ওটা ছিলো কাঁচা বয়সের একটা ভুল মাত্র! এই দেশে যাকে বলে ‘যৌবনের ভুল’।
নাসির ভাই: এইসব ভেবেই বোধহয় বাংলাদেশী ইমিগ্রান্টরা বিয়ের সময় বাংলাদেশী ছেলে বা মেয়ে খোঁজে।
টিটো” ইন্ডিয়ার ব্যাপার আলাদা ভাই। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’-তে পড়েছিলাম ব্রাহ্মণ কুলিনদের বহুবিবাহের কথা। কেউ কেউ নাকি শতাধিক বিবাহও করতো!
আমি: শরৎচন্দ্রের কিছু উপন্যাসেও এই কুলিনদের বহুবিবাহের কথা উল্লেখিত হয়েছে।
টিটো: তাহলে মুসলমানদের চার বিয়ে নিয়ে ওদের গা-জ্বালা করে কেন?
আমি: এটা তো ঐ গা-জ্বালাই। আর অজ্ঞতা থেকেও অনেক কিছু হয়। অনেকেই কুলিনদের এই গন্ডায় গন্ডায় বিয়ের রীতির কথা আদৌ জানে না।
নাসির ভাই: এদিকে খ্রীষ্টধর্মে তো বহুবিবাহ নিষিদ্ধ।
আমি: না। বাইবেলে এমন সুস্পষ্ট কিছু লেখা নাই। এমনকি ওল্ড-টেস্টামেন্টে উল্লেখ্য চল্লিশজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির একইসাথে একাধিক স্ত্রী থাকার কথাই লেখা আছে।
টিটো: তাহলে? এরা একটার বেশী বিয়ে করতে পারে না কেন?
আমি: ওটা চার্চের অনুশাসনে হয়েছে। কোন এক সময়ে চার্চ আদেশ দিয়ে বহুবিবাহ বন্ধ করেছিলো, যতদূর জানি। আর রাশিয়ায় একটা মজার ঘটন আছে এই নিয়ে।
নাসিম ভাই: কি ঘটনা?
আমি: রসায়ন-এর পর্যায় সারণী-টা তো সবাই-ই পড়েছেন। সেটার জনক তো রুশ বিজ্ঞানী ‘দিমিত্রি মেন্ডেলিভ’। তা একবার প্রকাশিত হয়ে গেলো যে মেন্ডেলিভ-এর বৌ দুইজন। তা রাশান অর্থোডক্স চার্চের দৃষ্টিকোন থেকে এটা অপরাধ। বিচার গেলো রাশিয়ার দন্ডমুন্ডের কর্তা জার-এর কাছে। সব শুনে জার বললেন, “মেন্ডেলিভের দুই বৌ থাকতে পারে, কিন্তু আমাদেরতো মাত্র একটাই মেন্ডেলিভ রয়েছে!”
সবাই হেসে উঠলো!
এজাজ: ইনারা বিয়া নাইলে একটা করে, কিন্তু ফ্যাক্ট হইলো, সারা ইউরোপ-আমেরিকায় ঘরে বৌ থাকে একটা, আর বাইরে গার্লফ্রেন্ড থাকে দশটা।
সবাই হো হো করে হাসতে লাগলো!
আমি: রিসেন্টলি রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা ভ্লাদিমির ঝিরিনোভ্‌স্কি তো এই ব্যাপারে ডায়রেক্ট-ই বলে বসলেন!
নাসিম ভাই: কি বললো?
আমি: ঝিরিনোভ্‌স্কি বললেন, “দেখেন ভাই রাশিয়াতে বহুবিবাহটা কম্যুনিস্ট-রা নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু ফল কি? আজকে একজন রুশ পুরুষের ঘরে বৌ থাকে একটা, আর বাইরে গার্লফ্রেন্ড থাকে তিনটা। তাদের একজন আবার সিঙ্গল মাদার, আরেকজন গণিকা। সেইদিক থেকে মুসলাম-রা তো ভালো-ই, অনেস্টলি তিন-চারটা পরিবার রাখে।”
সবাই আরেক দফা কোরাসে হাসলো।

আমি: কি ভাই সজল, তুমি তো অনেকদিন পরে আসলা। তা এত চুপচাপ কেন?
সজল: না, চুপচাপ না। আপনাদের আলোচনা শুনতেছি। আমার আবার ঐদিন হইছে একটা ঘটনা।
নাসিম ভাই: কি ঘটনা আবার? বলো শুনি।
সজল: ভাইজান কাছের স্ট্রিপক্লাবে গেছিলাম একবার। বুঝেনই তো ভাই, আমি ছাত্র মানুষ টাকা-পয়সা কিছু নাই। অনেক কষ্টে কিছু টাকা যোগাড় কইরা টিকিট কাইটা ভিতরে ঢুকলাম। চোখ জুড়াইয়া নাচ দেখতাছি হঠাৎ খেয়াল করলাম, টিকিটের টাকাই সব না। রূপসী ডান্সার নাচতে নাচতে বিভিন্ন জনের কাছে যাইতাছে আর টাকা চাইতাছে। ডায়রেক্ট মুখে বইলা চায় না, তবে কোমর দুলাইয়া ভাব-ভঙ্গিতে চায়। তা লোকে দিতাছেও। আমি মনে মনে বলি, আমার কাছে আইসো না সুন্দরী, আমার পাকেট ফাঁকা। তা যেইখানে বাঘের ভয়, সেইখানেই সন্ধ্যা হয়। আমার চেহারা তার কি দেইখা পছন্দ হইলো, বুঝলাম না। ফট কইরা আমার সামনে আইসা নাচ শুরু করছে। এখন আমি করি কি? তারে টাকা কেমনে দেই? তো পকেট থেইকা দশ টাকার একটা নোট বাইর কইরা ভাজটাজ কইরা, মানে ঐটা যে মাত্র দশ টাকার নোট তা জানি বোঝা না যায়, ঐভাবে ভাজ কইরা সুন্দরীর ব্রা-র ফিতার নীচে গুইজা দিলাম। সে খুশী হইয়া নাচতে নাচতে চইলা গেল!

আমরা সবাই মিটিমিটি হাসতে লাগলাম।

টিটো: (সাদা তুষারে ঢাকা বাইরের চত্বরের দিকে তাকিয়ে) নিউ ইয়ার তো ঘনাইয়া আসলো, কি প্লান করলেন? সেলিব্রেট করবেন কিভাবে?
নাসিম ভাই: চলো সবাই মিলে গতবারের মতন রেড স্কয়ারে যাই। ওখানে মজা-টজা করে ডর্মে এসে খানা-পিনা করলাম।
আমি: হ্যাঁ, এটাই ভালো প্রস্তাব। চলেন তাই করি সবাই।
এজাজ: তাইলে চান্দা কালেক্ট করা শুরু করি?
নাসির ভাই: দাবাই (চলেন), শুরু করেন; এই নেন আমি দিলাম এক হাজার রুবল।

হুররা, সকলে একসাথে হাততালি দিলো।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ৪ঠা অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: ভোর ৪টা ০১ মিনিট

The Lonely Carnation

——————————— Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.