নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২)

—————————- রমিত আজাদ

পরের মঙ্গলবার সকাল এগারোটার দিকে ডিপার্টমেন্টে গেলাম। এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের যেমন অভাব নাই, অধ্যাপকেরও তেমন অভাব নাই! তাই দালান বিশাল বড় হওয়ার পরও সব অধ্যাপককে পৃথক পৃথক কক্ষ দিতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়। স্থান সংকুলান হয় না। আমাদের থিওরেটিকাল ফিজিক্স ডিপার্টেমেন্টের চারটার মত রুম আছে। এর মধ্যে একটা রুমে ডিপার্টেমেন্ট চেয়ারম্যান স্যার বসেন, ঐ রুমেই আবার কনফারেন্স টেবিলটা আছে। আর আছে একটা গ্রীন বোর্ড, কোন সেমিনার, লেকচার বা ওপেন ডিফেন্স এক্সাম এখানেই হয়। তার পাশের রুমটায় বেশ কিছু টেবিল রাখা আছে, ওগুলোতে অধ্যাপকরা বসেন। আমরা যারা পিএইচডি গবেষক আছি, তারাও ঐ রুমটাতেই স্যারদের জন্য অপেক্ষা করি।

আমি রুমটাতে ঢোকার সাথে সাথে লেনার দিকে নজর পড়লো। ও আমার আগেই এসেছে তাহলে।

আমি: ইউরি গেরামানোভিচ ইরমালয়েভ (আমাদের সুপারভাইজারের পুরো নাম) আসেননি?

লেনা: না এখনো আসেননি। মানে এই রুমে আসেননি। কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে এসেছেন। উনার ক্লাস আছে তো, তাই ক্লাস শেষে হয়তো আমাদের সাথে কথা বলবেন।

আমি: ও আচ্ছা। তাহলে তো হাতে আরো ঘন্টাখানেক সময় আছে।

লেনা: হ্যাঁ, তাই।

আমি: চলো তাহলে।

লেনা: কোথায়?

আমি: কফি খেয়ে আসি চলো।

লেনা: কোথায়?

আমি: এই বিল্ডিংয়েই নীচের তলাতে, একটা ক্যাফে আছে।

লেনা: আমি জানতাম না তো। চোখে পড়েনি কখনো।

আমি: না আমাদের ঢোকার পথে পড়েনা। ওপাশ থেকে ঘুরে যেতে হয়। পিছন দিকে একটা সিঁড়ি আছে, ঐ সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়।

লেনা: তাই?

আমি: চলো তোমাকে চিনিয়ে দেই।

লেনা: আমার ব্যাগটা?

আমি: ও ব্যাগ! ওখানে দামী কিছু থাকলে সাথে নিয়ে নাও। আমি ব্রীফকেস সাথে এনেছি। ওটা আমি এই রুমেই রেখে যাই। কেই ধরবে না।

লেনা: চলো।

মেয়েটিকে বেশ ফ্রী-ফ্রাংক মনে হলো। আমি কফির দাওয়াত দিলাম, অনায়াসেই রাজি হয়ে গেলো, ‘না আজ না’ ইত্যাদি বলে নিজের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলো না। আই লাইক দিস টাইপ অফ গার্ল!

আমি এবার ওকে উত্তর দিকের করিডোরটা দিয়ে নিয়ে গেলাম। করিডোর শেষ হলে একটা কাঁচের বড় দরজা, সেটা ঠেলে ওপাশে বের হতে হয়। দরজাটার অটো লক, কারণ এর পরে একটা স্মোকিং রুম আছে। এখানে ওপেন স্পেসে সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ। এদিকে ধূমপায়ীর  সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। আগে তারা সিগারেট খেত ওয়াশরুমে। পরে পুরো দালানে কয়েকটা স্মোকিং রুম তৈরী করা হয়েছে। এখন আর ধূমপায়ীদের সমস্যা হয় না। আবার অধূমপায়ীরাও নিরাপদে থাকে।

লেনা: এটা স্মোকিং রুম?

আমি: হ্যাঁ। কেন কিছু বলবে?

লেনা: নাহ্‌।

আরেকটা অটো লক কাঁচের দরজা পেরুলে প্যাঁচানো একটা চওড়া সিঁড়ি। পুরনো আমলের প্রাসাদের মত!

সেই সিঁড়ি বেয়ে আমরা একতলা নীচে নেমে এলাম। এখানে বিশাল বড় একটা ক্যান্টিন আছে, করিডোরের দুইপাশে দুইটা বড় হল। আর আছে ছোট সাইজের একটা ক্যাফে। ক্যাফেটা একটু বেশী সাজানো গোছানো। এখানে চা, কফি, কেক পেস্ট্রি, বান, ইত্যাদি পাওয়া যায়।

যেতে যেতে আমি কয়েকবার ওর দিকে তাকাচ্ছিলাম। ওর উচ্চতা আমার চাইতে সামান্য কম। পড়নে এ্যাশ কালারের খুব সুন্দর একটা লং স্কার্ট, আর লাইট এ্যাশ কালারের একটা টপস্‌। মাথার মাঝারী দৈর্ঘ্যের চুল খুব যত্ন করে বাঁধা। চুলের রঙ সোনালী আর কালোর মাঝামাঝি। অদ্ভুত সুন্দর চোখের রঙ কালো। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র জীবনে আমি যে মেয়েটাকে ভালো লাগে, সেই মেয়েটির দেহের বাঁকের দিকে তাকাতাম না। আমার এখন বয়স কিছুটা বেড়েছে। এখন আমি মেয়েদের দেহের বাঁকের দিকে তাকাই। লেনা যদিও টল ফিগারের মেয়ে না, তার পরেও ওর ফিগারটা চমৎকার। সবচাইতে মিষ্টি ওর মুখমন্ডল! ঠোট দুটা একদম টীন এজড মেয়ের মত পাতলা ও সরু।  

ক্যাফেতে গোল গোল টেবিলগুলোর চারপাশে চারটা চেয়ার। এক কর্ণারে একটা খালি টেবিল পেলাম, ওর দুপাশে দুইটা চেয়ার। ব্যাস, আমাদের জন্য পারফেক্ট হলো। আমি আর লেনা ওখানে গিয়ে বসলাম। তারপর লেনাকে বললাম, “কি খাবে বলো?”

লেনা: কি পাওয়া যায় এখানে?

আমি: কফি আছে, সাথে পপি সীডের বান খেতে পারো।

লেনা আবারো মিষ্টি হেসে ফেললো।

লেনা: পপি সীডের বান আমার খুব প্রিয়।

আমি: ওক্কে। নিয়ে আসছি বসো।

সেলফ সার্ভিস ক্যাফের কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। এখআনে যে দৃশ্যটা দেখলাম সেটা আমার একদম ভালো লাগলো না। শিশুশ্রম বিষয়টা আমি বাংলাদেশে ব হু দেখেছি। কিন্তু ইউরোপে কখনো দেখিনি। আবার ষাটের দশকের আমেরিকান ম্যুভিগুলোয় দেখি। তখন ওখানে ডিপ্রেশন চলছিলো, তাই হয়তো শিশুশ্রম বেড়েছিলো। এই দেশেও আমি আগে কখনো শিশুশ্রম দেখিনি। আজ দেখলাম ১২/১৩ বছর বয়সের একটা শিশু কাউন্টারের ওপাশে ধোয়ামোছার কাজ করছে। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো, কেমন ক্রাইসিস নেমেছে এদেশে, যে শিশুশ্রম এ্যালাউ করতে হচ্ছে!?

আমি কাউন্টারে দাঁড়ানো মহিলার কাছ থেকে কফি ও বান নিয়ে আসলাম। টেবিলে বসে লেনার দিকে কফি ও বান এগিয়ে দিলাম।

লেনা: এই ক্যাফেটা তো সুন্দর!

আমি: এখানে বসতে তোমার ভালো লাগছে?

লেনা: হু। ভালো লাগছে। আসলে এই ইউনিভার্সিটিটা বেশ বড় ও সুন্দর!

আমি: এর আগে তুমি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছো?

লেনা: পিডাগজি ইউনিভার্সিটি। ওটাও ভালো, তবে এই ইউনিভার্সিটিটা বেশ বড় ও আন্তর্জাতিক।

আমি: হ্যাঁ। এটাতো মূলত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। ইদানিং দেশীয় স্টুডেন্ট-এর সংখ্যা বেড়েছে।

আমাদের কফি ও বান শেষ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু কথা ফুরাচ্ছিলো না। এখানে আবার খাওয়া শেষ হলে উঠে যাওয়ার নিয়ম। শুধু শুধু বসে আড্ডা দেয়াটা এ্যালাউড না।

আমি: আরেক কাপ কফি নিয়ে আসি।

লেনা আবারো মিষ্টি করে হেসে, হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

আমরা আরো দু’কাপ কফি নিয়ে আলাপন চালিয়ে গেলাম। ঠিক কতক্ষণ সেইদিন ওখানে বসেছিলাম, আমার ঠিক মনে নাই। তবে মনে হয়েছিলো সময় দীর্ঘ সময়ও যেন খুব দ্রুত ফুরিয়ে গেলো।

এর পরদিন দেখা হলো আবারো সেই ফিলোসফি ক্লাসে। আমি সেদিন কালো প্যান্ট ও কালো শার্ট পড়ে এসেছিলাম। গলায় ছিলো একটা ঘিয়া রঙের প্রিন্টেড টাই। আমি নিজেই জানতাম যে এই পোষাকে আমাকে মানায়। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আমরা কিছুক্ষণ করিডোরে অপেক্ষা করেছিলাম। আড়চোখে দেখলাম লেনা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওর দিকে তাকাতেও ও চোখ সরিয়ে নিলো। মেয়েদের এই এক্সপ্রেশনটার সাথে আমি পরিচিত! আমার মনে একটা খুশীর ভাব এলো। লেনা আজ পড়েছিলো একটা হাটু পর্যন্ত টাইট স্কার্ট, আর ইন্ডিগো কালারের টপস। ওর ফিগারটা আজ বেশি ফুটেছিলো! দেখতেও দারুণ লাগছিলো!

লেনাকে দেখে আইভরি কোস্টের সিকা এগিয়ে এলো। এলোমেলো অনেক কথা বললো ওর সাথে। বুঝলাম, লেনাকে ওর মনে ধরেছে। আবার নাও হতে পারে। সিকা হয়তো ওর সাথে জাস্ট মেলামেশা করতে চাইছে। সিকা আমার ভালো বন্ধু, তাই আমি ওদের কথায় বাঁধা দিলাম না। তবে লেনাকে লক্ষ্য করলাম বিব্রত হচ্ছে, কোনরকমে হু হা করে ওর কথার জবাব দিচ্ছে। বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলো লেনা।

তারপর ক্লাস শুরু হলে, লেনা সিকাকে পাশ কাটিয়ে আস্তে করে আমার পাশেই বসে পড়লো। সিকা বেচারা বসলো পিছনের সিটে। ক্লাস নিতে শুরু করলেন দুর্দান্ত জ্ঞানী অধ্যাপক ফিওদরোভ। আমাদের পড়াতে শুরু করলেন স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে সত্তর হাজার দাসদের বিদ্রোহের কাহিনী। স্পার্টাকাসের পরাজয় হলো কিন্তু মানবতার জয় হলো। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উনার বক্তৃতা শুনছিলাম।

বিরতির সময় আমি লেনাকে নিয়ে গেলাম আর্টস বিল্ডিংয়ের ক্যাফেতে। একতলায় অবস্থিত এই ক্যাফেটা আরো বেশী সুন্দর! একপাশে পুরো কাঁচের দেয়াল। ঐ দেয়াল গলে ওপাশের মনোহর বাগানের পুরোটাই দেখা যায়। আরো দেখা যায়, বিল্ডিংয়ের সামনের চত্বর, ও এ্যাভিনিউয়ের একাংশ। নগরী ও নিসর্গের সন্মিলনে একটা অপরূপ দৃশ্যপট। এখানে খাবার আইটেমও বেশী। আমি লেনার জন্য ন্যাচারাল বীন কফির সাথে পপি সীডের বান ও একটা পেস্ট্রী নিয়ে এলাম।

লেনা হয়তো ভাবছে ছেলেটার টাকা-পয়সা আছে। আমি আসলে গবেষণার পাশপাশি একটা পার্ট টাইম জব করতাম। স্টাইপেন্ড-এর পাশাপাশি ওখান থেকেও একটা বেতন পেতাম। তাই ছাত্র হিসাবে আমার দিন ভালোই যাচ্ছিলো।

বিরতি শেষে আবারো ক্লাসরুম। আবারো জ্ঞানী ফিওদরোভের বক্তৃতা। এ পর্যায়ে তিনি রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজারের উত্থান পতন নিয়ে বললেন।

ক্লাস শেষে লেনাকে বাস স্টপেজে পৌঁছে দিলাম। তারপর আমি আর সিকা একসাথে এগুলাম ডরমিটরির দিকে। যেতে যেতে সিকা আমাকে বলে,

সিকা: বুঝলি, মেয়েদের কোন বিশ্বাস নাই!

আমি: কেন?

সিকা: আর বলিস না! আমার একটা গার্লফ্রেন্ড ছিলো। রাশান না, আমার দেশেরই মেয়ে। আমি ছুটিতে গেলাম দেশে। যাওয়ার আগে মেয়েটাকে আমার রুমের চাবি দিয়ে গেলাম। ওকে এতটাই বিশ্বাস করলাম। আর ও কি করেছে জানিস?

আমি: কি করেছে?

সিকা: কি আর বলবো দুঃখের কথা! এত বিশ্বাস করলাম, আর মেয়েটা কিনা আমারই রুমে অন্য ছেলের সাথে রাত কাটালো। একবার ভেবে দেখ, পাশ্চাত্যের মেয়ে না! সে আমারই দেশী মেয়ে!

ওর কথা শুনে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ওকে কি বলে শান্তনা দেব বুঝতেই পারছিলাম না।

(চলবে)

—————————————————————————————————-

রচনাতারিখ: ২৩শে জুলাই, ২০২০ সাল

রচনাসময়: রাত ১২টা ৫৯ মিনিট

Lonely Carnation

———————– Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.