নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব ৫)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব ৫)
———————————-রমিত আজাদ

আনিতা ডরমিটরিতে ওর রুমেই থাকে, তবে ছুটির দিনগুলি মানে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত আমার সাথেই ৬০ ঘন্টা কাটায়। আর ওয়ার্কিং ডে তে মাঝে মাঝে আসে, সেটা যখন ওর মন চায় বা সুযোগ হয়। তবে ওর সাথে পরিচয়ের পর থেকে ছুটির দিন আমরা একসাথে কাটাইনি এরকম হয়নি। আজ শুক্রবার সন্ধ্যার পর অনেকক্ষণ হয়ে গেলো এখনো আনিতা আসেনি। আমি কিছুটা ওরিড হলাম। ওর বিল্ডিং-এ যাওয়া প্রয়োজন।

ওর রুমে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। প্রচন্ড জ্বর এসেছে আনিতার।
আমি: কি হলো তোমার?
আনিতা: হঠাৎ জ্বর এলো।
আমি: এম্নি এম্নিই?
আনিতা: না। আসলে কাল রাতে গোছল করার পর আমি হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল না শুকিয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। আজ আবার আধা ভিজা চুলে ফ্যাকাল্টিতে গেলাম, ব্যাস ঠান্ডা লেগে গেলো।
আমি: কি যে করো না! চুলটা তো শুকানো উচিৎ ছিলো। মস্কোর ঠান্ডা কি তুমি চেন না?
আনিতা: থাক আর রাগ করোনা। আমার এখন অসুখ। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।
আমি: ওষুধ-পত্র কিছু খেয়েছি?

“আমি দিয়েছি ওষুধ। প্রথমে খেতে চায় নি।” বললো আনিতার রুমমেট ক্যারোলিনা। ভাগ্য ভালো রুমমেট ক্যারোলিনা ডাক্তারি পড়ছে। এখন ফাইনাল ইয়ারে। বলিভিয়ার মেয়ে ক্যারোলিনা খুব ভালো। বলিভিয়ার মেয়েগুলা কেন জানি খুব ভালো হয়!

আমি: ভালো হলো যে তুমি ওর রুমমেট। একটা ডাক্তারী কেয়ার ও পাবে।
ক্যারোলিনা: (হেসে বললো) আরে এটা তো আমার দায়িত্ব। এখানে আমরা যারা বিদেশী ছাত্র-ছাত্রী আছি, আমাদের কারো কি আর বাবা-মা আছে? আমরাই একজন আরেকজনার আত্মীয় এখানে। আনিতা কি শুধু তোমার বান্ধবী? আমারও তো রুমমেট।
আমি: হ্যাঁ। তাতো অবশ্যই।
ক্যারোলিনা: তা আনিতা যেহেতু বায়োলজির ছাত্রী, তা ও-ও কিন্তু হাফ ডাক্তার।
আমি: হু, সব কিছুর পিছনেই তো বেসিক সায়েন্স।
ক্যারোলিনা: আজ রাতটা তুমি বরং আমাদের রুমে থেকে যাও।
আমি: নাহ, থাক তোমাদের ডিস্টার্ব হবে। তার চাইতে ডাক্তার রুমমেইট-এর সেবার মধ্যে থাক সেই ভালো।
ক্যারোলিনা: আমি থাকতে সেবার অভাব হবে না। তবে ডাক্তারী শাস্ত্র কি বলে জানো?
আমি: কি?
ক্যারোলিনা: দ্রুত আরোগ্য হওয়ার জন্যে সেবার পাশাপাশি ভালোবাসারও প্রয়োজন আছে। তুমি থাকলে ওর মনের জোর ও সুখ দুটাই বেড়ে যাবে।
আনিতা: নাহ, থাক। ও থাকলে আবার যদি ওর গায়ে ভাইরাস সংক্রমণ হয়!
ক্যারোলিনা: (হা হা করে হেসে ফেললো) হোক না, একের ভাইরাস অপরের গায়ে যাক না। তারপর ওর আলিঙ্গন তোমার গায়ের সব তাপ শুষে নেবে।
আমরা তিনজনই হেসে ফেললাম।
সেই রাতটা আমি ওদের রুমে রয়ে গেলাম।

পরদিন আনিতার অবস্থা কাল রাতের চাইতে ভালো মনে হলো। আমি সকালে ওদের
আনিতার কাছে জানতে চাইলাম। আচ্ছা ঐ নিকাহ ছবিটা দেখে মারিতা অমন ঝরঝর করে কেঁদেছিলো কেন?
আনিতা: তুমি কিছু জানো না?
আমি: না।
আনিতা: ওর তো ওর বয়ফ্রেন্ড-এর সাথে ব্রেক আপ হয়ে গেছে।
আমি: মানে?
আনিতা: ওর একটা আরব বয়ফ্রেন্ড ছিলো। বয়ফ্রেন্ডটা তার দেশে গিয়ে একটা আরব মেয়ের সাথে একগেজমেন্ট করে এসেছে।
আমি: কি বলো?
তারপর মনে হলো। বিষয়টা অস্বাভাবিক কিছু না। এরকমই ঘটে ৯০% প্লাস ক্ষেত্রে। বিদেশী ছেলে বিদেশী মেয়ের যদি তৃতীয় কোন দেশে পরিচয় হয়, তাহলে সেটা ঐ ভালোবাসাবাসি, দৈহিক সম্পর্ক ঐ পর্যন্তই রয়ে যায়। বিয়ে পর্যন্ত খুব একটা গড়ায় না।
আমি: কি আর করা। মুসলিম ছেলে, দেশে গিয়েছে, বাবা-মা এনগেইজমেন্ট করিয়ে দিয়েছে, অস্বাভাবিক কিছু তো আর না!
আনিতা, কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইলো। বুঝলাম না, ও চোখের ভাষায় কি বলতে চাইছে!
আনিতা: কিন্তু মারিতা ওকে খুবই ভালোবাসে। তাই ও একটা কাজ করেছে।
আমি: কি কাজ?
আনিতা: কাউকে বলবে না কিন্তু! প্রমিজ!
আমি: ওকে, প্রমিজ!
আনিতা: মারিতা ইচ্ছে করে ওর কাছ থেকে প্রেগনান্ট হয়েছে।
আমি: কি?
আনিতা: হ্যাঁ। অলরেডি তিনমাস ও প্রেগনান্ট।
আমি: কি বলো?
আনিতা: এখন আর এ্যাবোরশন-ও করাতে পারবে না।
আমি: ইয়াসির (মারিতার বয়ফ্রেন্ড) জানে?
আনিতা: হ্যাঁ। মারিতা কয়েকদিন আগে ওকে জানিয়েছে।
আমি: ইয়াসিরের প্রতিক্রিয়া কি ছিলো?
আনিতা: ও ভীষণ ক্ষেপেছে। বলেছে, ‘এটা তুমি কি করলে মারিতা? আমি তোমাকে কোনদিনও ক্ষমা করবো না।”
আমি: ঠিকই তো। মারিতা কাজটা ভালো করেনি। ওর রিয়েলিটি বোঝা উচিৎ ছিলো।
আনিতা: (উচ্চকন্ঠে) হ্যাঁ। তুমি এরকম বলতেই পারো। তুমি তো পুরুষ মানুষ। তোমরা কেবল আনন্দ করতে পারলেই খুশী হও। সম্পর্কের সিরিয়াসনেস বিষয়ে কোন ভাবনা নেই।
আমি: বারে। দুজনার মধ্যে কি কোন কথা দেওয়া-দেওয়ি হয়েছিলো, যে সম্পর্কের সিরিয়াসনেস-এর কথা বলছো?
আনিতা: (উত্তপ্ত হয়ে) অত কথা দেওয়া-দেওয়ির কি আছে? সবকিছু কি মুখেই বলতে হবে? মন বলে কিছু নাই? মনের কোন ভাষা নাই। তুমি পুরুষ মানুষ, তুমি মারিতার মনের অনুভূতি বুঝবে না। আমি বুঝবো, আমি মেয়ে।
আমি: কি বিষয়ে?
আনিতা: যাকে ভালোবাসে তাকে তো পেলো না মারিতা। কিন্তু অন্ততঃপক্ষে তার কাছ থেকে একটা সন্তান তো থাকবে! এটাই তার প্রেমের নিশানা!

আমি কিছুক্ষণ নিস্তদ্ধ হয়ে গেলাম। আসলেই তো দেহ-মনের চাহিদাটা কোন ফাঁকে যে হৃদয় ছুঁয়ে ফেলে আমরা সে খবর রাখতেই চাইনা। তখন আর মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। অল ইজ ফেয়ার ইন ওয়ার এ্যান্ড লাভ! আমার মনে পড়লো অনেকগুলো বছর আগে পড়া একটা উপন্যাসের কথা, সেখআনে ঘটনা এরকমই ছিলো, উপন্যাসের নায়িকা যাকে ভালোবাসে তার কাছ থেকে গর্ভবতী হয়। কেউ প্রশ্ন করলে নায়িকা বলে, “ওকে না হয় না পেলাম, এ্যাট লিস্ট ওর সন্তানের মা তো হতে পারলাম।” ক্লাস টেনের ঐ কাঁচা বয়সে আমি আমি ঐ উপন্যাসের মোরাল বা ঐ নায়িকার অনুভূতিকে বুঝতে পারিনি। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিলো যে, নায়িকাটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কলংকিনী হয়েছে। আজ এতগুলো বছর পরে পরিণত বয়সে যখন চোখের সামনেই এমন একটা ঘটনা দেখলাম, তখন কিছটা হলেও বিষয়টা উপলদ্ধি করতে পারলাম। তবে মারিতার পরিণতি ভেবে আমার কেন যেন আশংকা হচ্ছে!

সোমবারের মধ্যে আনিতা সুস্থ হয়ে উঠলো। তারপর সোমবার সকালে আনিতা গেলো ফ্যাকাল্টিতে, আমি গেলাম চাকুরীতে।

মঙ্গলবার আমি গেলাম ফ্যাকাল্টিতে। সেখানে লেনার সাথে দেখা হলো। আজ ও একটু বেশি সাজগোজ করেছে মনে হলো। পরনে হাটু পর্যন্ত স্কার্ট, একটা টাইট টপস। স্টাইল করে চুল বাধা। ওর টিন-এজড পাতলা সরু ঠোঁটে আজ কড়া লালা লিপস্টিক মেখেছে। সব মিলিয়ে ফুটেছে দারুন! আমি কিছুক্ষণ অপলক ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
লেনা: কি দ্যাখো? চলো ক্যাফেতে গিয়ে কফি খেতে খেতে দেখো।
আমি: হু, তাই চলো।
লেনা: আজ কি কোথাও গিয়েছিলে?
আমি: কি করে বুঝলে?
লেনা: ইনটুইশন!
আমি: তোমার ইনটুইশন তো ভালোই কাজ করে। রাইট ইউ আর, আজ একটু আমাদের এ্যাম্বেসীতে গিয়েছিলাম।
লেনা: বাই দ্যা ওয়ে, আমি তো তোমার দেশের নামই জানি না। তোআমার দেশের নাম কি?
আমি: (জোর দিয়ে বললাম) বাংলাদেশ।
লেনা: (একটু লজ্জ্বা করে বললো) কোথায় এটা? সরি আমি জানিনা।
আমার মেজাজ গেলো গরম হয়ে! বিশ-ত্রিশ বছর আগে হলে না হয় একটা কথা ছিলো। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ সবাই চিনতো না। কিন্তু এখন এই প্রশ্ন!
তারপর আবার মেজাজ পানি হয়ে গেলো। এত সুন্দরী একটা মেয়ের উপর রাগ করা যায়?
আমি: ইন্ডিয়া চেনো?
লেনা: অবশ্যই চিনি।
আমি: ওর পাশেই বাংলাদেশ।
লেনা: ঠিকআছে ওয়ার্লড ম্যাপে দেখে নেবো।
আমি: দেখবে কিন্তু।
লেনা: তোমাদের এ্যাম্বেসীটা কোথায়?
আমি: মেট্রো ‘পার্ক কুলতুরি’-তে।
লেনা: ওহ ‘পার্ক কুলতুরি’ শুনে একটা ঘটনা মনে পড়লো।
আমি: কি ঘটনা?
লেনা: আমার ছেলেটা পার্কে খেলতে যেতে চেয়েছিলো। তা আমি বললাম, “এখন একটু নাস্তা করবো, তারপর যাবো।” তা ও আমার কথা বিশ্বাস না করে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগলো। ভেবেছিলো আমি ওকে ফাঁকি দিচ্ছি, পার্কে নিতে চাই না।

আমি অবাক হয়ে ওর দিকে ওর দিকে তাকালাম।
আমি: তোমার ছেলে আছে?
লেনা: হ্যাঁ। আছেতো একটা ছেলে।
আমি: কত বয়স?
লেনা: এখন পাঁচ বছর বয়স।
আমি: তোমার হাসবেন্ড?
এবার লেনার মুখটা অন্ধকার হয়ে এলো। ওর এত সুন্দর মুখটাকে আমি কখনোই এতটা মলিন দেখি নাই!
লেনা: ও আছে। কিন্তু, আমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে! অনেকগুলো বছরই হলো, আমরা আর একসাথে নেই।
আমি: আর ছেলেটা তোমার সাথে থাকে?
লেনার মনটা আবারও খারাপ দেখলাম।
লেনা: হ্যাঁ। আমার সাথেই, তবে পুরোপুরি আমার সাথে নয়।
আমি: মানে কি?
লেনা: ছেলেটা আমার মায়ের সাথে থাকে। আমার সাথে থাকা তো কঠিন, আমি তো সারাদিন চাকরিতেই থাকি। তবে ছুটির দিনগুলোতে আমি ওকে আমার কাছে নিয়ে আসি।
আমি: তুমি আর তোমার মা কি আলাদা থাকো?
লেনা: হ্যাঁ, আমার মা, আমার বোন আর আমার ছেলেটা একসাথে একটা এ্যাপার্টমেন্টে থাকে। আর আমি একা অন্য একটা এ্যাপার্টমেন্টে থাকি।
আমি: একটা এ্যাপার্টমেন্টে তুমি একাই থাকো, একাই খাও, একাই ঘুমাও?
লেনা: হ্যাঁ, আমিতো একাই!

আমি ওকে ঠিক কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। এত চমৎকার একটা মেয়ের জীবনে এত বড় একটা অন্ধকার থাকতে পারে আমি তা ভাবিই নি।
(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৪শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনা সময়: রাত ১০টা ০৩ মিনিট

Lonely Carnation
————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.