নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ৯)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ৯)
—————————- রমিত আজাদ

“পরের বার যখন কফি খেতে আসবেন, তখন ভাবীকে সাথে নিয়ে আসবেন।”
আর্টস বিল্ডিং-এর বাংলাদেশীদের আড্ডায় নাসিম ভাই বললো হাসমত ভাইকে। হাসমত ভাই রীতিমত আকাশ থেকে পড়লেন!
হাসমত ভাই: ভাবী কই পাবো? আমিতো একা।
রসিক নাসিম ভাই হাসতে হাসতে বললেন,
নাসিম ভাই: এই জন্যই তো বললাম। বিয়া না করলে ভাবীর অভাব থাকে না। যতদিন অবিবাহিত ততদিন অনেক ভাবী। আর যেই না বিয়ে করবেন, তখন তো শুধু একজনই!
আমরা সবাই হো হো করে হেসে ফেললাম। হাসমত ভাই কি বুঝলেন জানি না। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন। আসলে নতুন বাংলাদেশী ছাত্রী মলি-র প্রতি উনার দুর্বলতার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। এই নিয়ে তিনি একটু টেনশনে আছেন। তাই হয়তো বিব্রত হয়ে চলে গেলেন।

হাসমত ভাই যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পার হওয়ার পর মলি এসে উপস্থিত। মলিকে দেখে কয়েকজন হাসি চাপতে পারলো না। মলি একটু অবাক হয়ে বললো, “আপনারা কি আমাকে দেখে হাসছেন।”
আমি দেখলাম বিষয়টা ভালো হচ্ছে না। মলি আমাদের মধ্যে সব চাইতে ছোট, মাত্র রাশান ল্যাংগুয়েজ কোর্স করছে, ওকে বিব্রত করা একদম ঠিক নয়। আমি বললাম,
“না মলি, তোমাকে নিয়ে কিছু না। নাসিম ভাই একটা রাশিয়ান জোক বলেছিলো তো, তাই মনে করে ওরা হাসছে।”
মলি: কি জোক নাসিম ভাই?
আমি: ওটা রাশিয়ান ভাষায় না বললে হাসির হবে না। তুমি তো এখনো রাশিয়ান ভাষা ভালো বোঝ না। যখন ল্যাংগুয়েজ কোর্স শেষ করবে তখন বললে তুমি হাসতে পারবে।
মলি: রাশিয়ান ভাষা বোধহয় আর শেখা হবে না!
নাসিম ভাই: কেন?
মলি: খুবই বিদঘুটে। গ্রামারও বিদঘুটে বাংলা, ইংলিশ কোনটার সাথে মিল নাই। আমি দেশেই চলে যাবো।
টিটো: আরে কি বলো? সবেধন নীলমণি আমাদের আছেই তো তিন-চারটা বাঙালী মেয়ে। তা তোমরা চলে গেলে তো মস্কো অন্ধকার হয়ে যাবে!
নাসিম ভাই: মলি-কে এখানে একটা জামাই খুঁজে দিতে হবে তাহলে আর ও যেতে পারবে না। তা কেমন জামাই চাই? বাঙালী না রাশিয়ান?
এবার সবাই জোরে হেসে ফেললো।
মলি লজ্জ্বা পয়ে বললো, “কি যে বলেন না নাসিম ভাই!”
আমি বললাম, “আসলে ভাষা শেখায় প্রথম প্রথম সবার অনুভূতিই তোমার মতই হয়। তারপর আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই দেখো, আমরা এখন রাশান ভাষায় কঠিন কঠিন জোকও বলতে পারি!”
নাসিম ভাই: ভাষা শেখার জন্য একটা ভালো বুদ্ধি হলো ডিকশনারী জোগাড় করা।
মলি: ডিকশনারী তো জোগাড় করেছিই।
নাসিম ভাই: (রহস্য করে) আরে ঐ ডিকশনারী না।
মলি: কোন ডিকশনারী তাহলে?
নাসিম ভাই: জ্যান্ত ডিকশনারী লাগবে। চলাফেরা করে এমন।
মলি: মানে কি? (অবাক হয়ে বললো)
নাসিম ভাই: এই যেমন ধরো বাঙালী ছেলেরা। ভাষা শিখতে গিয়ে যখন বিপাকে পড়ে, তখন তারা একজন রাশান বান্ধবী জোগাড় করে। ঐ বান্ধবিটাই হলো জ্যান্ত ডিকশনারী। তোমাকেও ওরকম একটা ডিকশনারী তো জোগাড় করতে হবে।
সবাই আরো জোড়ে হেসে উঠলো!
মলি ভীষণ লজ্জ্বা পেয়ে বললো, “নাসিম ভাই যে কি বলেন না।”

আনিতার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন আর আমি ওর সাথে দেখা করিনা। আনিতাও সময় পায়না। এখন অবসর সময়গুলো কাটে এই আড্ডাতেই।

খোঁজ নিয়ে জেনেছি পরীক্ষা ওর ভালোই হচ্ছে। মেধাবী মেয়ে পরীক্ষা ওর ভালো হওয়ারই কথা। হঠাৎ বিল্ডিংয়ের সামনের চত্বরের দিকে চোখ পড়লো আমার। কে ওটা? আনিতা না? আমি আরেকটু তীক্ষ্ণ চোখে তাকালাম।
নাসিম ভাই: তুষার ভাই, ঐ যে ভাবী।
আমি: কোন ভাবী?
নাসিম ভাই: আনিতা ভাবী।
আমি: দূরো! ভাবীতো না। আমার বান্ধবী।
নাসিম ভাই: এই দেশে ঐটাই ভাবী।
নাসিম ভাই খুব ভালো মানুষ, আবার বেজায় রসিক। উনার উপর কেউ কখনো রাগ করতে পারে না।
আমি ভাবছিলাম আনিতা ওর ফ্যাকাল্টি ছেড়ে এই দিকে আসছে কেন?
একটু পরে ও দরজা ঠেলে ক্যাফেতে ঢুকলো, তারপর সোজা আমার দিকে।

আনিতা: আমি জানতাম যে, তোমাকে এখানে পাওয়া যাবে!
আমি: তুমি আজ হঠাৎ এখানে কেন?
আনিতা: বারে, আমার কি এখানে আসতে মানা?
আমি: না, তা নয়। কিন্তু তোমার তো পরীক্ষা চলছে!
আনিতা: পরীক্ষা পরীক্ষা পরীক্ষা!!! এই এতগুলো বছর ধরে শুধু পরীক্ষাই দিয়ে যাচ্ছি!
নাসিম ভাই: ছাত্রজীবন সুন্দর জীবন, যদি না থাকে পরীক্ষা।
নাসিম ভাই নির্মল বাংলায় বললেন কথাগুলো। কিন্তু, আনিতা ফিক করে হেসে ফেললো। আসলে ও বাংলা অনেকটাই বোঝে। যদিও আমরা দুজন কথা বলি রাশিয়ান ভাষায়। তা এখানে বিদেশীরা পরস্পরের সাথে রাশিয়ান ভাষায়ই কথা বলে, ওভাবেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।
আনিতা: কাল শনিবার সে খেয়াল আছে?
আমি: ও হ্যাঁ, কাল তো শনিবার।
আনিতা: তার পরদিন রবিবার।
আমি: শনিবারের পরদিন রবিবার না হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে?
আনিতা: তুমি বুঝতে পারোনি তাই না?
আমি: কি বুঝবো?
আনিতা: এই ফিজিক্সে পড়া লোকগুলা ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’-এর মত কঠিন সাবজেক্ট বোঝে, কিন্তু মামুলি কথা বোঝে না!
আমি: ব্যাপারটা কি?
আনিতা: আরে বেকুব! কাল ও পরশু দুদিন ছুটি, মানে কোন পরীক্ষা নেই।
আমি: ও আচ্ছা। আসলে আমি তো এখন পিএইচডি করছি। ঐভাবে তো আর কোন পরীক্ষা দেই না!
আনিতা: চলো।
আমি: কোথায়?
আনিতা: কোথায় সেটা পরে দেখা যাবে। আপাততঃ আমার সাথে চলো।
নাসিম ভাই: তুষার ভাই যান। আর কথা বাড়াবেন না, রবি ঠাকুর বলেছেন।
আমি: এখানে রবি ঠাকুর এলো কোথা থেকে?
নাসিম ভাই: ঐ যে, মেয়েদের সাথে তর্কে যেতে নেই।
সবাই কোরাসে হাসলো। আনিতাও হাসলো।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে আনিতার সাথে বাইরে চলে এলাম। আর্টস বিল্ডিংয়ের বাইরের বিশাল ফোয়ারাটার সামনে এসে আনিতাকে বললাম, “এবার তো বলবে?”
আনিতা: তুমি বোঝ না?
আমি: কি?
আনিতা: টানা পনেরো দিন তোমাকে দেখিনা। আমার মন কেমন পোড়ে তুমি বুঝবে না! পরীক্ষা হয়েছে তো ছাই হয়েছে! কাল পরশু ছুটি, আমি কাল পর্যন্ত তোমার সাথে থাকতে চাই।
এতক্ষণে বুঝলাম। বললাম, “চলো তাহলে রুমে যাই।”

রুমে রান্না করাই ছিলো। দুজনা একসাথে লাঞ্চ করে নিলাম।
আনিতা আমার কাঁধে মাথা রেখে বললো, “তোমার জন্য মনটা খুব পুড়েছিলো। তাই আর থাকতে না পরে চলে এলাম!”
আমি: ইটস ওকে। আমারও তোমার জন্য মন পুড়ছিলো। শুধু পরীক্ষার কারণে তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি।
আনিতা: আজ একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটলো।
আমি: কার? তোমার? (আমি ওরিড হলাম)
আনিতা: না না, আমার না।
আমি: তাহলে কার? তাকে আমি চিনি?
আনিতা: ঐ যে তেরেসা নামে একটা মেয়েকে দেখেছিলে না ঐ দিন, আমার ফ্যাকাল্টিতে?
আমি: হ্যাঁ। তোমার সাথেই লাঞ্চ করছিলো। সুন্দরী মেয়ে!
এবার আনিতা ঘাড় ঘুরালো,
আনিতা: কে সুন্দরী, তেরেসা? আমি সুন্দরী না?
আমি: (মুচকি হাসলাম) জেলাস ফীল করছো?
আনিতা: করবো না?
আমি: তুমি বেশী সুন্দরী! এনিওয়ে কি হয়েছে?
আনিতা: ঐ যে ওর একটা আফ্রিকান বয়ফ্রেন্ড আছে বলেছিলাম। ধনী ছেলে, রেস্টুরেন্টের মালিক।
আমি: হ্যাঁ। মনে আছে।
আনিতা: আজ তেরেসা গিয়েছে, রেস্টুরেন্টে। তা ছেলেটা একটা এ্যালবাম এনেছে, সেটা ভর্তি ছেলেটা আর ওর রুশ বৌয়ের ছবি। ঐ এ্যালবাম ও দেখাচ্ছিলো তেরেসাকে। এক পর্যায়ে তেরেসা গেলো ক্ষেপে!
আমি: কি বললে? ঐ ছেলেটা বিবাহিত নাকি? ওর রাশান বৌ আছে? তেরেসা জানতো না?
আনিতা: তেরেসা জানতো। বিবাহিত লোকের সাথেই প্রেম করেছে, জেনেশুনেই।
আমি: তা তোমরা ওর বান্ধবীরাও জানতে যে ছেলেটা বিবাহিত?
আনিতা: না আমরা কিছু জানতাম না। তেরেসা কখনো বলেনি। আজ জানলাম।
আমি: মানে কি?
আনিতা: ছেলেটা যখন তেরেসাকে ওর বৌয়ের সাথে ছবিগুলা দেখাচ্ছিলো। তেরেসা রেগেমেগে অস্থির! বলে, “তোমার কান্ডজ্ঞান নাই? তুমি আমাকে তোমার বৌয়ের ছবি দেখাচ্ছে!”
আমি: আহারে, আমি ভেবেছিলাম, মেয়েটার ভাগ্যটা কত ভালো, একটা ধনী বয়ফ্রেন্ড পেয়েছে!
আনিতা: আমরাও তাই ভেবেছিলাম। এদিকে তেরেসা রেগেমেগে ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকআপ করে চলে এসেছে।
আমি: ভালো করেছে। ব্রেকআপই ভালো।
আনিতা: আরে শুধু এটা হলে তো ভালোই ছিলো। কিন্তু ঘটনা তো অন্যখানে।
আমি: আবার কি ঘটনা?
আনিতা: তেরেসা প্রেগনান্ট! ঐ ছেলের কাছ থেকেই।
এবার আমি নিস্তদ্ধ হয়ে গেলাম। ভাবলাম, ‘হায়রে! জীবন এত জটিল কেন?’

এরপর আরো দিন পনেরো পেরিয়ে গেলো। আনিতার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, সামনে আছে ডিফেন্স। ওর থিসিস পেপার হাতে লেখা শেষ। ভীষণ খাটাখাটি করেছে মেয়েটা। রিসার্চও ভালো হয়েছে, আমি যা দেখলাম। এখন ও ম্যানুস্ক্রিপ্ট-টা দিয়েছে ভিক্টর নামে পেরুর একটা ছেলেকে ঐ ছেলের রুমে কম্পিউটার ও প্রিন্টার আছে। কম্পিউটার আমার রুমেও আছে, তবে প্রিন্টার এখনো কিনিনি, প্রয়োজন হয়নি। প্রিন্ট কিছু করতে হলে অফিসেই সেরে ফেলি। তাছাড়া ভিক্টর রাশান ফন্ট দ্রুত কম্পোজ করতে পারে। তিনদিন সময় চেয়েছে। কম্পোজ কমপ্লিট করে দেবে, বিনিময়ে কিছু টাকা নেবে। ডিফেন্স হবে এক সপ্তাহ পরে। আনিতা মেধাবী, ‘এক্সিলেন্ট’ গ্রেড পেয়েই ডিফেন্স করবে আশা করি। তারপরে ওর মাস্টার্স কমপ্লিট হবে।

চারদিন পর হন্তদন্ত হয়ে আনিতা আমার কাছে ছুটে এলো। একেবারেই আলুথালু অবস্থা!
আমি: কি হয়েছে?
কাঁদোকাঁদো কন্ঠে আনিতা বললো, “সর্বনাশ হয়ে গেছে!”
আমিও অস্থির হলাম, “কি হয়েছে বলো?”
আনিতা: ভিক্টর নাই।
আমি: কে? কোন ভিক্টর? ঐ যে তোমার থিসিস পেপার কম্পোজ করছে?
আনিতা: হ্যাঁ।
আমি: কই গেলো ব্যাটা?
আনিতা: কই গেলো জানলে তো, আমিই ওকে খুঁজে বের করতাম। গতকাল থেকে বারবার ওর রুমে যাচ্ছি ও রুমে নাই। কোথায় আছে, কেউ বলতে পারে না!
আমি: এখন? আচ্ছা বাদ দাও চিন্তা করোনা, তুমি তোমার হাতে লেখা থিসিস পেপারের ফটোকপিগুলো নিয়ে আসো। আমিই কম্পোজ করে দেব। হয়তো একটু সময় লাগবে, অসুবিধা নাই আরো তো তিনদিন আছে। দুদিনেই চেষ্টা করবো, তারপর অফিস থেকে প্রিন্ট করে নিয়ে আসবো।
আনিতা: তাহলে তো কথাই ছিলো না। কিন্তু!
আমি: আবার কিন্তু কি?
আনিতা: আমার কাছে হাতে লেখা থিসিস পেপারের কোন ফটোকপি নাই। একটাই কপি ছিলো, ওটাই ভিক্টরের কাছে।
আমি নিস্তদ্ধ হয়ে গেলাম!
আমি: তুমি এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের একটা ফটোকপি রাখবে না? এটার গুরুত্ব তোমার কাছে যতখানি, ভিক্টরের কাছে তো ততখানি না। ওর তো আর কোন ঠ্যাকা নাই।
আনিতা: (কাঁদতে কাঁদতে বললো) আমি এখন কি করবো। ভিক্টরকে খুঁজে না পেলে, আমার আর ডিফেন্স হবে না, পাশ করা হবে না!!!!!!!!!!!

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৭শে জুলাই, ২০২০ সাল
রচনা সময়: রাত ১১টা ৩৬মিনিট

Lonely Carnation
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.