অনলাইন প্রকাশনা
নিরাপদ যৌনজীবন ও আমরা

নিরাপদ যৌনজীবন ও আমরা

ডা. মোঃ জাহিদুল ইসলাম

এই সংসার রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়ে মানুষ রচনা করতে চায় ছোট একটা সুখের নীড়। সুখের নীড় রচনায় যারা সার্থক, জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা তাদের জন্য অনেক সহজ, সমান্তরাল এবং ছন্দময়। ছন্দময় জীবনে তাদের চলার পথে ছড়ানো থাকে রাশি রাশি গোলাপ। একই দৃষ্টিভঙ্গিতে যারা ব্যর্থ, তাদের জীবন চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস। নিয়তির এই নিষ্ঠুর পরিহাস দলিতা কালভূজঙ্গিনীর ন্যায় প্রবেশ করে মানুষের আজন্ম বাসনায় সাজানো নন্দন কাননে। এই ব্যর্থ মানুষগুলোর জীবনের পথচলা সংগ্রামী। এরা পরিণতির সমাপ্তে এসে, শোক বৃশ্চিক বিষে জর্জরিত ও ক্ষতবিক্ষত হয়ে দাঁড়ায় মরণ সমুদ্রের বেলাভূমিতে।

জীবনের এই পথচলার ভিন্নতর মূলে অনেক কারণের মধ্যে যৌনতাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ধরা যায়। এবার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুখ নীড় রচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিরাপদ, সার্থক ও সফল যৌন জীবনের গুরুত্ব কতটা সেদিকে দৃষ্টি প্রদান করি। প্রতিটি মানুষকে সৃষ্টিকর্তা প্রদান করেছেন যৌন ক্ষমতা। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এই ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতনতা, জ্ঞান এবং এর ব্যবহার ও অপব্যবহারের ওপর নির্ভর করছে নিরাপদ, সার্থক ও সফল যৌন জীবন। কিভাবে একটা সুন্দর সাজানো আলোকবর্তিকাময় জীবন নষ্ট হয়, কেন একজন মানুষ সুখের বাসর সাজাতে গিয়ে উপবিষ্ট হয় মরণ সমুদ্রের বেলাভূমিতে, কেন স্বপ্নীল সাজানো জীবন এলোমেলো হয় এসব প্রশ্নের বাস্তবভিত্তিক কিছু যুক্তি এই লেখার মধ্যে খুঁজে পাবেন। ‘নিরাপদ যৌন জীবন ও আমরা’ হেডলাইনে এ লেখার মধ্যে আমরা চেষ্টা করব আপনার বিবেককে নাড়া দিতে এবং সাথে সংকলিত করব আপনার সমস্যার সমাধান দিতে, যে সমাধানের মধ্যে খুঁজে পাবেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত নির্দেশনা।

যৌন অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ কৈশোর থেকেই শুরু হয়। কৈশোরের শুরু থেকে যৌবনে পদার্পণের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত একটা সীমাহীন দুরন্তপনা ছেলেমেয়েদের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে। এ সময় চারদিকে ছড়ানো যৌন অনুভূতিমূলক যা কিছু সামনে উপস্থিত হয়, তা অধীর আগ্রহে গ্রহণ করে ছেলেমেয়েরা। নগ্ন ছবি ও নগ্ন কাহিনীমূলক ম্যাগাজিন, ইন্টারনেটে নগ্ন ছবি উপভোগ করা থেকে শুরু করে বর্তমানে বিজ্ঞাপনগুলো পর্যন্ত যৌন অনুভূতিসম্পন্ন। ফলে কৈশোরের শুরু থেকেই যৌনতার মধ্যে নিজেকে জড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ‘মৈথুন’ প্রক্রিয়ায় যৌন স্বাদ গ্রহণ শুরু হয় সেই সুদূর কৈশোর থেকে। কেউ ইচড়ে পাকা খারাপ বন্ধুর সহযোগিতায় অন্ধকার গলি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এভাবে জীবনের পথচলা থেকে কৈশোরের সোনালী সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়ে, পূর্ব দিগন্তে উদিত হয় সম্ভাবনাময় যৌবন। কৈশোরের যৌন অনুভূতি থেকে যারা ভালো কিছু গ্রহণ করেছিল যৌবনে এসে তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক কম। প্রতিপক্ষরা যৌবনে পদার্পণের সাথে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিরাপদ যৌন জীবনের পথ থেকে তারা নিক্ষিপ্ত হয়ে পৌঁছে যায় সেই অন্ধ গলিতে। আর যারা নিজেকে সংযত রাখতে সক্ষম হয়, তারা অন্তত ওই অন্ধ গলির সঙ্গী হয় না। যারা ওই অন্ধ গলিতে ডুব দেয়, তাদের অনেকেই সিফিলিস ও গনোরিয়ার মতো যৌন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং কোনো এক সময় তারা যৌন অক্ষমতার শিকারও হয়।

যৌবনের প্রারম্ভ থেকে এমনকি কৈশোর থেকেও শুরু হয় কর্মজীবনের। তবে কর্মজীবনের শুরুটা নির্ভর করে পারিবারিক, অর্থনৈতিক সচ্ছলতার ওপর। যৌবনের প্রারম্ভ থেকে এবং কর্মজীবনের ঠিক উর্বর মুহূর্তে বিয়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে। পুরুষের জীবনের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে আসে এক নারী, আর বিয়ের মাধ্যমেই নারী খুঁজে পায় তার আরাধনার বস্তু, নারী জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পর্কটা। বিয়ের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নিরাপদ যৌন জীবনভিত্তিক যতটুকু শিক্ষা একটা ছেলে বা মেয়ে গ্রহণ করে থাকে, ওই সময় পর্যন্ত যৌনভিত্তিক মূল্যবোধের অনুভূতি তাদের মধ্যে যেভাবে করায়ত্ত হয় তার বহিঃপ্রকাশ শুরু হয় বিয়ের দিন থেকে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের যৌন বিজ্ঞানীগণ মানব জীবনের বাসর রাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এই রাত। বাসর রাত থেকে তার পরবর্তী জীবন কেমন কাটবে, জীবন ধারা কোন গতিতে প্রবাহিত হবে- এ ধরনের অনেক বিষয় এই রাত থেকেই পরিবর্তিত রূপ নেয়। সুখের নীড় রচনার সূচনার রাত, এই বাসর রাত আবার মরণ সমুদ্রের বেলাভূমিতে উপনীত হওয়ার রাতও। তাই বিয়ে এবং বাসর রাত দুটি বিষয়ে প্রয়োজন পূর্ব প্রস্তুতি। নিরাপদ যৌন জীবন গঠনে এ দুটি বিষয়কে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা ঠিক নয়। পাত্র-পাত্রী নির্বাচন থেকে বাসর রাত পর্যন্ত নানাবিধ পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়, যা পরবর্তী জীবনের স্বপ্নীল সম্ভাবনাগুলোর রূপায়নে এক অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করে। পাত্র-পাত্রী নির্বাচন থেকে বাসর রাত পর্যন্ত পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, তবে নিম্নলিখিত দিকগুলোর প্রতি গুরুত্বারোপে অবশ্যই কিছু সুফল পাওয়া যাবে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন থেকে।

বাসর রাত পর্যন্ত করণীয় বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন এবং আপনার সমস্যাবলী অনুযায়ী প্রদেয় সমাধান আপনি নিজেই খুঁজে বের করুন এবং সমমুখে শক্তিশালী মানসিকতা এবং সচেতনতার সাথে অগ্রসর হোন।

পাত্র-পাত্রী নির্বাচন বিষয়ক
প্রেমঘটিত সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে যদি আপনি বিয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার প্রতি আমাদের অনুরোধ, আপনি আপনার সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনা এবং অনুভূতির প্রয়োগ করে, একে অপরকে যাচাই করবেন। যাচাই-বাছাইয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে আপনার হাতে, যেহেতু আপনাদের সম্পর্ক প্রেমঘটিত। যদি আপনার বহুগামিতার অভ্যাস থাকে সেটাকে এক পর্যায়ে পরিহার করবেন। তবে উক্ত বহুগামিতায় অভ্যস্ত থাকাকালীন সময়ে সবচেয়ে পছন্দের অনুভূতিগুলো আপনি আপনার আপনজনের ওপর প্রয়োগ করবেন। ইতিবাচক ফলাফল আপনাকে পেতেই হবে, তাহলে পরবর্তীকাল বা জীবন নিঃসন্দেহে গোলাপ ছড়ানো পথের মতো মনে হবে। ইতিবাচক ফলাফল না পেলে খুব কৌশলে কেটে পড়ুন, প্রেম ভালোবাসার শেষ পর্বটা কিন্তু দৈহিক কামনা-বাসনার পর্ব। তাই সব ভালো তার শেষ ভালো যার। নিরাপদ যৌন জীবন গঠনে মনঃ দৈহিক উভয় বিষয়েই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপনি যদি বহুগামী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ঘুমন্ত অনুভূতিগুলো আপনাকে স্মরণ করাবে সঙ্গী-সঙ্গিনীর সাথে মিল-অমিলের দিকগুলো। অবশেষে সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার ব্যক্তিগত। যৌন জীবনে আপনি যদি বাস্তব জ্ঞানহীন কোনো নতুন মানুষ হয়ে থাকেন। যদি আপনি সেই ভাগ্যবান/ভাগ্যবতী হয়ে থাকেন দুজনাই প্রথম। সেক্ষেত্রে আপনি আপনার সঙ্গিনীকে কতটুকু তৃপ্তি দিতে সক্ষম হয়েছেন সেটা সঠিকভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এবং সঙ্গিনী হিসেবে আপনার দেয়া আদর-সোহাগে আপনার সঙ্গীটি কতটুকু তৃপ্ত তা বিচার-বিশ্লেষণ করুন। একে অপরের এই আন্তরীণ বিশ্লেষণ থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন আপনাদের ত্রুটিজনিত দিকগুলো সম্পর্কে এবং পরিশেষে প্রয়োজনে সমস্যার সমাধানমূলক ব্যবস্থাটি বেছে নিন। ধরে নিন আপনাদের বাসর রাতের অভিজ্ঞতার বিচার-বিশ্লেষণে আপনি একজন পুরুষ হিসেবে আপনার একান্ত আপন এবং জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তুটিকে যতটুকু তৃপ্তি দিয়েছেন, সেটা যথেষ্ট নয়। আপনি বাসর রাতে চরমভাবে পুলকিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন, ব্যর্থ হয়েছেন আপনি চরম আনন্দ দিতে। এক্ষেত্রে বাসর রাতের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা আপনাকে ভেতরে যন্ত্রণা দেবে। প্লিজ ঘাবড়াবেন না। মনের যন্ত্রণা ঝেড়ে মুছে কয়েকদিন সঙ্গিনীর সাথে আরো নিবিড় হতে চেষ্টা করুন এবং তার সহযোগিতা আরো বেশি প্রার্থনা করুন। আপনার মানসিক শক্তি যদি সবল হয়, সেক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতি নিজেই উপলব্ধি করবেন। যদি আপনি ভাবাবেগের মানুষ হয়ে থাকেন এবং দুর্বল মানসিকতা আপনাকে যদি বেশি করে ব্যথাতুর করে তোলে তাহলে অবস্থার ক্রম অবনতি দেখবেন। এ অবস্থায় চিকিৎসা শাস্ত্রের দিকে নিজেকে এগিয়ে দিন। আপনি নিঃসন্দেহে ভালো ফল লাভ করবেন।

নিম্নের সমস্যাগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করলেই আপনার জন্য সমাধান গ্রহণ সঠিক হবে
(ক) আপনার লিঙ্গের আকার-আকৃতি নিয়ে বিশেষ ভাবনার কিছু নেই। কারণ আড়াই ইঞ্চির লিঙ্গের একজন পুরুষও ইচ্ছা করলে তার সঙ্গিনীকে চরম তৃপ্তি দিতে পারে।

(খ) আপনার লিঙ্গোত্থান হয় কি-না? যদি লিঙ্গোত্থানে সমস্যা থাকে এবং উত্থিত হলেও আবার লিঙ্গ ঢলে পড়ে এবং আপনার লিঙ্গ যদি মজবুত, শক্তিশালী আকার ধারণ না করে, তাহলে অবশ্যই আপনাকে ইরেকটাইল ডিসফাংশনজনিত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এতে আপনার সমস্যা দূর হবে এবং মনোবল সুদৃঢ় হবে। এছাড়া সঙ্গিনীর চরম তৃপ্তি দেয়ার পূর্বেই বীর্যপাত ঘটে যায়, কারো কারো যৌন আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত কম। অর্থাৎ মনের ভেতরে জাগ্রত ইচ্ছাশক্তিই আপনার দৈহিক উত্তেজনার উৎস। দুর্বল মানসিকতা এবং Hormonal insufficiency জনিত কারণে এই ইচ্ছাশক্তির অবনতি ঘটে থাকে। এক্ষেত্রেও যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়।

(গ) আপনি এমন একজন যৌন অক্ষম ব্যক্তি হতে পারেন, মূলত আপনার সবই ঠিক আছে কিন্তু কোনো অজানা আশঙ্কা, মানসিক ভীতি আপনার হার্টবিট বাড়িয়ে দেয়। মনস্তাত্ত্বিক এই অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে আপনার লিঙ্গোত্থানে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসা প্রয়োজন।

(ঘ) কৈশোরে এবং যৌবনে হস্তমৈথুন, স্বপ্নদোষ এবং বিপথগামিতাজনিত অনুশোচনাবোধও আপনার বর্তমান নিরাপদ যৌন জীবনের অন্তরায় হিসেবে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে উপদেশ হলো অতীত নিয়ে ভাবা যাবে না, অতীতে এ ধরনের ঘটনা সবার জীবনেই কমবেশি ঘটে থাকে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই মন থেকে এগুলো ঝেড়ে-মুছে পবিত্র মনে নতুন যাত্রা শুরু করুন।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.