Categories
অনলাইন প্রকাশনা

প্রকাশ্য চুম্বন – পর্ব ২

প্রকাশ্য চুম্বন – পর্ব ২
————- রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশের পর থেকে)

গভীর দৃষ্টিতে কার্লা তাকিয়ে আছে তানভীরের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আবাসিক ডরমিটরির একপাশে অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় অবস্থান এই ক্যাফেটির। এখানে সচরাচর ক্লায়েন্ট কমই থাকে। তাছাড়া এখন সামারের বিকেল। মস্কোতে প্রায় সারা বছরই শীত, তাই মাত্র তিনমাস সামারের এই অসম্ভব সুন্দর উষ্ণতার সময়টিতে কেউ আর দালানের ভিতর থাকতে চায়না। এই সময় খোলা আকাশের নীচের ক্যাফেগুলোতেই সবাই বসে। অথবা জোড়ায় জোড়ায় হাত ধরে চলে যায় ফরেস্ট পার্কে, নদীতীরে, লেকের ধারে অথবা আরো কোন খোলা অথচ নির্জন জায়গায় যেখানে কপোত-কপোতি অন্তরঙ্গ সময় কাটাতে পারবে নিশ্চিন্তে। তানভীর ইচ্ছে করেই কার্লাকে এই ক্যাফেটিতে নিয়ে এসেছে। সে চায় না, কেউ কার্লার সাথে তাকে এখানে দেখুক।

দুই পিস কেক আর দুই কাপ চা নিয়ে বসে আছে ওরা দুজন। চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে কার্লা। এই রকম একটি রোমান্টিক সময়ের কথা অনেকবারই কার্লা-কে নিয়ে ভেবেছিলো তানভীর। তবে সাহস করে এগুয়নি কখনো, কারণ, একটা বাধা ছিলো। আজ কার্লা নিজে থেকেই ধরা দিলো। তাহলে কি তানভীরের মনে যা, কার্লার মনেও তাই ছিলো? ক্যাফের এই টেবিলে সীট-টি অনেকটা বেঞ্চির মত। সেই সুযোগে তানভীর একটু সরে এসে কার্লার শরীরের অনেক কাছ ঘেষে বসলো।
কার্লা: কি চাও তুমি?
তানভীর কোন কথা না বলে কার্লার কপোলে আলতো করে একটি চুমু খেলো। কার্লা আরেকটু আবেগ নিয়ে তাকালো। তানভীর এবার ভাবছে, কার্লাকে কি আরেকটু অন্তরঙ্গভাবে স্পর্শ করবে? ওর পেলব মোলায়েম শরীরের স্পর্শকাতর কোন জায়গায়? কিন্তু এবার সে একটু দ্বিধান্বিত হলো। যদি কার্লা আর এগুতে না দেয়? যদি সে কিছু বলে বসে। নিজেকে কিছুটা সংযত করলো সে। ক্যাফের টিভি-তে তখন রাশিয়ার লিজেন্ডারি গায়িকা পুগাচোভা-র গান চলছে

Call me go with you
I will come in spite of evil nights
I will go after you
And doesn’t matter what road predicts me
I will come in place where you are
Will paint sun in heaven
Where broken dreams
Get power of hight again।

বিদেশী গানের প্রতি তানভীরের তেমন আগ্রহ না থাকলেও এই গানটি তানভীরের বেশ ভালো লাগে। এত রোমান্টিক গান খুব কমই আছে!
কার্লা ওর কেক পিস দ্রুতই শেষ করলো। তানভীর তার কেকের সামান্যই খেয়েছে।
কার্লা: তুমি কেক শেষ করছো না কেন?
তানভীর: আমি চকলেট কেক খুব একটা পছন্দ করি না।
কার্লা: খাবার নষ্ট করা ঠিক না। তুমি সত্যিই কি খাবে না।
তানভীর: না।
কার্লা: ওকে। তাহলে আমিই খাই।
এই বলে কার্লা তানভীরের কেকপিস-টি নিয়ে তানভীরের মুখের চামচ-টি দিয়েই খেতে লাগলো।
তানভীর ব্যাপারটা দেখে অবাক হয়ে ভাবলো। এটা সম্ভবত কার্লার দিক থেকে একটা গ্রীন সিগনাল। খাওয়া শেষ করে কার্লা বললো, “চলো যাই।”
এবার মন খারাপ হলো তানভীরের। এত তাড়াতাড়ি যেতে মন চায়নি তানভীরের। সে আরো কিছু সময় কাটাতে চেয়েছিলো রূপ ঝলাকানো কার্লার সাথে। কিন্তু কি আর করা!

তারা দুজনে বেরিয়ে পড়লো ক্যাফে থেকে। বাইরে তখনও অনেক আলো। পৃথিবী নামক গোলাকৃতি গ্রহটির উত্তর গোলার্ধে গ্রীস্মের দিনগুলোতে দিনের দৈর্ঘ্য অনেক বড় হয়। সামারে সব শিক্ষায়াতনেই চলে গ্রীস্মকালীন ছুটি। সেই দীর্ঘ দিনের আলোতে অনুরাগে ছোঁয়া তরুণ-তরুণীরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলে! সে শারীরিক সংবেদনে হোক, আর অনুরক্ত মনের চাঞ্চল্যে হোক।

কার্লাকে নিয়ে ক্যাম্পাসের বাগানের ভিতর দিয়ে হেটে মূল রাস্তায় যাওয়ার পথে একটা বেঞ্চি দেখিয়ে তানভীর কার্লা-কে বললো, “চলো ওখানে বসি।” কার্লা বললো, “চলো বসি”। তার মুখের এক্সপ্রেশনে যেটা দেখা গেলো, সেটা মৃদু হাসি নাকি অন্য কিছু সেটা ঠিক ধরতে পারলো না তানভীর। ম্যাপেল গাছের নীচে রাখা নিঃসঙ্গ রিক্ত বেঞ্চিটিকে পূর্ণ করলো ওরা দুজন। যাদের মধ্যে এতকাল শুধু সামান্য কূশল বিনিময় ছাড়া আর কিছুই হয় নাই। আজ যা ঘটছে তা কি পূর্বরাগের পূর্বক্ষণ? আজ কি তাহলে সেই পুরাতন কাহিনীর নতুন কোন উপখ্যান নতুন করে রচিত হবে এই ধরায়? তানভীর আবারও খুব কাছ ঘেঁষে বসলো কার্লার। এবার আর সংকোচ না করে ডান হাত দিয়ে কার্লার ক্ষীণ তনুর সরু কটিদেশ আলিঙ্গন করলো। আরেকবার গভীর দৃষ্টিতে তানভীরের দিকে তাকালো কার্লা। এবার আর কোন দ্বিধা না করে একটি প্রকাশ্য চুম্বন তাকে করলো তানভীর। চুম্বনে কোন বাধা দিলো না কার্লা। রবি ঠাকুরের কবিতা মনে পড়লো তানভীরের, ‘যখন তোমার কাছে চুম্বন মাগিব, গ্রীবা বাঁকাইয়ো না, মুখ ফিরাইয়ো না, উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ মুখ ওষ্ঠাধরপুটে রাখিয়ো …।’ চুম্বনে কোন বাধা না দিলেও হঠাৎ তানভীরকে ভারী স্বরে প্রশ্ন করলো সে,

কার্লা: তোমাদের মধ্যে কি কোন সমস্যা চলছে?
তানভীর ঠিক কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিলো না। এতদূর পৌছানোর পর কার্লা এমন একটা প্রশ্ন করবে এটা ভাবে নি তানভীর।
কার্লা আবারো বললো। “আমার পক্ষে সম্ভব না তানভীর।”
তানভীর: কি সম্ভব না?
কার্লা: তুমি তো আমার না। তুমি আমার বান্ধবীর।
এবার একটু ধাক্কা খেলো তানভীর। এতদূর এসে এই প্রসঙ্গ কেন তুললো কার্লা তা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না তার। এদিকে কার্লা কিন্তু তখন তানভীরের বাহুবন্ধনে আছে। তানভীর আলতো চোখে সেদিকে তাকালো। কার্লার হালকা অধোদেশ-এর একটু উপরেই তানভীরের দক্ষিণহস্ত তখনও ঘিরে রেখেছে কার্লার কটিদেশ। এমন অন্তরঙ্গতার মধ্যেও কার্লা না-সূচক কথা বলছে!
ভাবতে একটু সময় নিলো তানভীর। তারপর বললো, “আচ্ছা ঠিক আছে। চলো তাহলে যাই।”
বেঞ্চি থেকে উঠলো ওরা দু’জন। কয়েক কদম ম্যাপল বাগানের মেঠো পথে তারা হাটলো ক্যাম্পাসের মূল সড়কের দিকে।

কার্লা: কোথায় যাবে তুমি?
তানভীর: জানি না।
মেজাজটা একটু দমেই আছে তার। এ যেন নজরুলের সেই গান, ‘মোর না মিটিতে আশা ভাঙিলো খেলা’!
কার্লা: তুমি তো আমার রুমে যাওনি কখনো, তাই না?
তানভীর আবারো ভাবতে সময় নিলো। কি বলতে চায় কার্লা?
কার্লা: সময় আছে অনেক। চলো ডরমিটরিতে আমার রুমে যাই।
কার্লাকে বুঝতে সমস্যা হচ্ছে তানভীরের, এ যেন দার্জিলিং-এর আবহাওয়া, এই রোদ এই বৃষ্টি! এইমাত্র প্রসঙ্গ তুলে বললো সম্ভব না, এখন আবার বলছে চলো রুমে যাই! বড় বড় ঝড়গুলোর নাম দেয়া হয়, মেয়েদের নামে যেমন, কাটরিনা, রিটা, স্যান্ডি, ইরমা, ইত্যাদি। এর মূল কারণ নাকি মেয়েদের মনের মত ঝড়েরও মতিগতি কিছু ঠিক নেই!

আচ্ছা পুরুষ মানুষেরা কেমন? সবাই-ই কি তানভীরের মত? তানভীর কিন্তু একসময় মেয়েদের সাথে কথা বলতেই লজ্জ্বা পেত! অবশ্য সেই তানভীর এখন আর নেই। অভিজ্ঞতার ছাপে সে এখন সপ্রতিভ। এই নিয়ে দোদুল্যমানতা তার মধ্যে রয়েছে অবশ্য। তবে একটা বিষয় সে খেয়াল করেছে, হাই লেভেলের পুরুষ-রা বেশীরভাগই কিন্তু একাধিক বিয়ে করে। কেউ অফিসিয়ালী আর কেউ আনঅফিসিয়ালী। ক্রিকেটার ইমরান খান-এর মত বাদক রবিশংকরও কিন্তু কম প্লেবয় ছিলেন না! জুলিয়াস সীজার থেকে শুরু করে সম্রাট অশোক পর্যন্ত। এমনকি হালের লেনিন ও মাওসেতুং-ও এই লাইনে তুখোড় খেলোয়ার ছিলেন। কেনেডি-ক্লিনটনের কথা তো এখন মুখে মুখে। জ্ঞানী সক্রেটিস-এর ছিলো দুই স্ত্রী। এমনকি বাঙালী জ্ঞানতাপস অতীশ দীপংকরেরও ছয়জন স্ত্রী ছিলো। এমনটাই বোধ হয় স্বাভাবিক, ‘বাগানে ক্রিসেনথিমাম-ই কি একমাত্র ফুল?’

এবার উল্টোপথে পাঁচ মিনিট হেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর ডরমিটরিতে ঢুকলো ওরা। পাঁচতলা উঁচু ডর্মের একতলায় থাকে কার্লা। হেটে হেটে করিডোরের শেষমাথার আগের রূমটিতে দরজার তালায় চাবি লাগালো ও। রুমের দরজা খুলে সামনে এগিয়ে কার্লা বললো, “নাহ! কেউ নেই।”
তানভীরঃ মানে?
কার্লাঃ মানে আমার রূমমেট-রা কেউ নেই। আমার দুজন রূমমেট আছে, তারা কেউই এখন নেই।

মনে মনে খুশী হলো তানভীর। বদ্ধ কামরা, সে আর কার্লা আর কেউ নেই। এটাই সে চেয়েছিলো!

(চলবে)

———————————————————————————–

সময়: সন্ধ্যা সাতটা চৌত্রিশ মিনিট
তারিখ: ২৬শে জুলাই, ২০১৮

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.