অনলাইন প্রকাশনা
প্রেতাত্মার প্রত্যাবর্তন – পর্ব ১

প্রেতাত্মার প্রত্যাবর্তন – পর্ব ১

প্রেতাত্মার প্রত্যাবর্তন – পর্ব ১
———— ড. রমিত আজাদ

উত্তরের দুই রূপ, শীতে একরূপ আর গ্রীস্মে আরেক। পুরো শীতকালটা ঢেকে থাকে বরফে, গাছগুলোতে একটাও পাতা নেই, ওদের দেখলে অসহায় ন্যাড়া মাথা কিশোরদের কথা মনে হয়। সূয্যিমামা মাথার উপরে থেকেও নেই, কেননা কজ্জল অম্বুদ তিমিরাচ্ছন্ন করে রেখেছে সখের নীলাম্বর। সেই অভ্রকে কিছুতেই জলদ বলা যাবেনা, কারণ তা কেবল আচ্ছাদনেই সক্ষম জল দানে নয়। মোটা মেঘের প্রলেপ ব্যাক-রেডিয়েশন ঠেকিয়ে মরুৎের উষ্ণতা কেমন কি বাড়ায় জানিনা, তবে, প্রবল শৈত্যে বাইরে বেরোন দায়। তুহিন শীতে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যায়। কান দুটো মনে হয় যেন থেকেও নাই অথবা না থাকলেই ভালো হতো, অন্ততপক্ষে বিবশতার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়া যেত। তার উপরে রয়েছে পায়ের নীচে জমাট বাধা বরফের পিচ্ছিল ফুটপাথ। একটু অসাবধান হলেই ধপাস! ছোট বেলায় রুশ দেশের উপকথায় ইভান গর্দভের কাহিনী পড়েছিলাম, যেই অলস কিনা শীতের ভয়ে বাইরেই বের হতে চাইতো না, গরম চুল্লীর উপর শুয়ে শুয়ে পুরো শীতটা কাটাতে চাইতো। স্বচক্ষে সেই হিমশীতল দেশ দেখার পর আমাদের মনে হয়েছে ইভান খুব একটা ভুল চায়নি। এই ডীপ-ফ্রীজ পরিবেশে পিয়াঁজের খোসার মত একটার উপর একটা পোষাক পরে বাইরে বেরিয়ে এতদসত্ত্বেও শরীরটাকে হিমায়িত করতে কে চায়? নেহাত প্রয়োজনে ক্লাসে, বাজারে, দোকানে যেতে হয়। এর বাইরে জীবনটা ডরমিটরিতেই বন্দী হয়ে থাকে। আর গ্রীস্মের রূপ ১৮০ ডিগ্রী বিপরীত। উষ্ণতা প্রকৃতি ছু্ঁয়ে যেতেই কার্টুন ছবির মত রিক্ত ডালপালার ভিতর থেকে সহসা উঁকি দিয়ে পলকে বেড়ে উঠে, চোখের সামনে দুদিনেই ন্যাড়া মাথা গাছগুলো সব ঝাকড়া চুলো পত্র-পল্লব শোভিত বৃক্ষে পরিণত হয়। তমসাবৃত জীমূত উবে গিয়ে প্রফুল্ল অংশুমালী নীলাকাশ জুড়ে ঝলমল করে উঠে আমাদের জীবনোত্ফুল্ল করে তোলে। একাধিক মাহিনার শীতের এত এত প্রকোপের পর প্রকৃতির এহেন অনুরাগ আমাদের উদাস করে তোলে। তখন ভাবালু তরুণ-তরুণীদের অচেনা ভূবনে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।

সেই শীতে আমরা ঠিক করলাম, এবারের গ্রীস্মের ছুটিতে আমরা অচেনা ভূবনে সত্যিই হারিয়ে যাবো। তারপর সেই ভূবন ঠিক করার পালা। এত বড় ভূবনে সব চাইতে বড় দেশ রাশিয়া। শ্বেত ভল্লুকের মতই বিশালবপু রাশিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার যায়গার কোন অভাব নেই। সে হতে পারে ঘন বনে ঢাকা তাইগায়, হতে পারে ভূস্বর্গ কামচাটকায়, মিঠা পানির বৈকাল হৃদের তীরও হতে পারে। নাকি ঝাঁউবনের পাশে ছোট ছোট ঢেউয়ের কৃষ্ণসাগরের সৈকতে গা এলিয়ে দিয়ে সংক্ষিপ্ত বসনা তরুণীদের কূহকী সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে হয়ে সুর্যস্নান করে করে কাটিয়ে দেব দ্বিমাসি অবকাশ? নানা আলোচনা-সমালোচনা, সহমত-ভিন্নমত, জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ঠিক হলো যে, গাছ-নদী-পূর্ণিমা প্রকৃতির মায়ায় নয়, ঝলমলে নগরীর অতিকায় অট্টালিকারাজীর ছায়ায় কাটাবো এবারের গ্রীস্ম-অবসর।

ঝলমলে অতিকায় নগরী মানেই দোলগারুকীর মস্কো। জারের প্রাসাদ ক্রেমলিনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্ত সরু নদীর নামে যেই শহরের নাম। আটশত বছরের ঐতিহ্যে মন্ডিত নগরী বুকে ধরে আছে কয়েক শতাব্দির হাসি-কান্না। কামচাটকা, তাইগা, কাস্পিয়ান, মুরমানস্কের মত মস্কোরও এক কূহকীনি ডাক আছে। সেই মাঝরাতে নিশির ঘোর লাগায় মনে। যে একবার সেই ডাকিনী ডাক শুনেছে, সে বারবার ফিরে ফিরে চায়।

সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ হবার পর আমরা পাঁচ যুবক গোছগাছ শুরু করলাম মস্কো যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রথমে চারজন ছিলাম, কিন্তু আমাদের সাথে এসে যোগ দিলো ভারতীয় অরিন্দম। নাগরিকত্বে ভারতীয় কিন্তু জাতিতে বাঙালী, বাঙালও বলা যায়, কারণ ওদের রুট চিটাগাং, দেশবিভাগের পর ওর দাদা-বাবা আসামে চলে গিয়েছিলো, তারপর গৌহাট্টিতে সেটেল করে। অরিন্দম খুব সহজ-সরল তাই ওর প্রতি আমাদের সবারই ভালোবাসা ছিলো। আরো একটা কারণ আছে, ও মোটেও কৃপণ নয়। একবার আমাদের একজন বলেছিলো, “কিরে তুই দেখছি, ওদের মত নস, একেবারে দিল-দরিয়া!” ও উত্তরে বলেছিলো, “ভুলে যাসনা, আমি বাঙাল। ওরা যখন সব্জী খায়, আমাদের বাড়ীতে তখন জোড়া ইলিশ ঢোকে।” যাহোক দিন-তারিখ ঠিক করে ট্রেনের টিকিট কেটে ফেললাম আমরা। প্লেনেও যাওয়া যেত, মাত্র এক ঘন্টার জার্নি। কিন্তু সেটাতে মজা পাওয়া যাবেনা। ঐ যে দৃষ্টিপাতে যাযাবর লিখেছিলেন, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’ (যদিও যাযাবর বিবেচনা করেননি যে, ট্রেনও বিজ্ঞানের অবদান)। তাই বেগের চাইতে আমরা আবেগটাই বেছে নিলাম।

টিকিট কেটেছিলাম সকালের ট্রেনের। রাতের ট্রেনেও যাওয়া যেত, ট্রেনে উঠে ঘুম দাও, রাত ফুরালেই মস্কো, এক অর্থে ঝামেলাহীন। কিন্তু তাতে জানালার বাইরে মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার মজা নাই, বন্ধুরা বন্ধুরা মিলে ঠাট্টা-মস্করা করে সময় পার করার আনন্দ নাই, দফায় দফায় চা পান করে সেই কাপে ঝড় তুলে গর্বাচেভ-ইয়েলৎসিনের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করে সদ্যপ্রাপ্ত বাক-স্বাধীনতার রসাস্বাদন করার আমেজ নাই। তাই আমরা সকালের ট্রেনেটিকেই বেছে নিয়েছিলাম।

যথাদিনে ট্রেনে গিয়ে উঠালাম আমি (তুষার), আসিফ, মইনুল, মুহিত ও অরিন্দম। ট্রেনে একটি বার্থে চারজনের জায়গা হয়। পাঁচ নম্বর টিকিট-টি কেটেছি পাশের বার্থে। তবে ওখানে তো আর কেউ বসবে না, আমরা পাঁচজন একই বার্থে বসলাম।
অরিন্দম: তাহলে শেষ পর্যন্ত যাচ্ছি মস্কোতে!
মুহিত: হু যাচ্ছি। কেন তোর কি মন খারাপ হয়ে গেলো নাকি?
অরিন্দম: হাসতে হাসতে বললাম, এর মধ্যে তুই মন খারাপ কই পেলি?
মইনুল: না মানে, ‘যে আঁখিতে এতো হাসি লুকানো, কুলে কুলে কেন তার আঁখি-ধার, যে মনের আছে এত মাধুরী, সে কেন বয়েছে চলে ব্যথা ভার’।
অরিন্দম: মনের ব্যাথার কি কারণ আছে রে?
মুহিত: না মানে, একা একা যাচ্ছিস!
অরিন্দম: একা কই? তোরা সাথে আছিস না?
মইনুল: না মানে অনুরাধা তো আর সাথে যাচ্ছে না।
এতক্ষণ হয়তো ওদের কথা ধরতে পারেনি অরিন্দম। এবার একটু দমে গেলো। অনুরাধা ওর ক্লাসমেট একসাথে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। শ্যামবর্ণ অনুরাধার প্রতি অরিন্দমের কিছুটা দুর্বলতা আছে, কিন্তু অনুরাধা হয়তো বিষয়টি জানেনা, অথবা জেনেও জানেনা।
মুহিত: আরে বাদ দে তোর শ্যামাঙ্গিনী। মস্কো গেলে অনেক স্মার্ট শ্বেতাঙ্গিনী পাবি।
আমি: আরে বাদ দে ঐ প্রসঙ্গ। ট্রেন চলতে শুরু করেছে বাইরে কি অপরূপ দৃশ্য দেখ।
সবাই একযোগে তাকালো বাইরে। ইট-কাঠের শহরটিকে ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিয়ে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে ট্রেনটি। এই শহরটিতে আমরা দু’বছর আছি, আমাদের কাছে শহরটি অনেকটাই আপন হয়ে উঠেছে। অথচ এই মুহূর্তে তাকে ছেড়ে যেতেই বেশী ভালো লাগছে। আপনজনকে মাঝে মাঝে দূরে ঠেলে দিতেই ভালো লাগে হয়তো। অথবা আপনজন বড় বেশী আপন বলেই হয়তো একসময় একঘেঁয়ে হয়ে ওঠে!

একটু পরে চা নিয়ে হাজির হলো এ্যাটেনডেন্স। এখানকার ট্রেনে এই চা কালচারটা বেশ ভালো লাগে। ট্রেন চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পরই চা হাজির। বিকালের দিকে আবার চা আসবে অটোমেটিক। এই চায়ের কোন মূল্য দিতে হবে না, টিকিটের দামের সাথেই ধরা আছে। তবে ইন-বিটুইন খেতে চাইলে দাম দাম দাও।

চায়ের কাপ সামনে রেখে রাজনীতির আলাপের ঝড় না তুললে কি আর জমে?
আমি: গর্বাচভ তো পেরেস্ত্রয়কা-গ্লাসনস্ত এগিয়ে নিতে পারলো না।
মুহিত: দেশে আমাকে এক হুজুর বলেছিলো, ‘গর্বাচভ তো পেরেস্ত্রয়কা নীতি টিকবে না, তবে গ্লাসনস্ত রয়ে যাবে’।
আমি: হুজুর মানে? হুজুররা কি ইমামতি বাদ দিয়ে, রাজনীতির দিকে ঝুঁকলো নাকি?
মুহিত: না, মানে ঠিক হুজুর না। নামাজ-কালাম পড়ে আরকি। কম্যুনিজমের ঘোরতর বিরোধী।
মইনুল: এখন তো, ঐ হুজুরের কথাই ঠিক মনে হচ্ছে।
অনুরাধার চিন্তায় এতক্ষণ ঝিমিয়ে পড়া অরিন্দম চাঙা হয়ে উঠে বললো,
অরিন্দম: তোরা যাই বলিস, কম্যুনিজম ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, রাশিয়ানরা কিন্তু কাজটা ভালো করেনি।
আসিফ: তোরা ইন্ডিয়ান বাঙালীরা বড় বেশী কম্যুনিজম ভক্ত। জ্যোতি বসুর প্রভাবে হবে হয়তো। অথচ ভারতের সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট কিন্তু কম্যুনিজম আঁকড়ে ধরেনি। বরং তার উল্টো পথেই বরাবর হাটছে।
মুহিত: তাহলে সোভিয়েতের সাথে ভারতের এত দহরম-মহরমের কারণ কি? ওদের মতাদর্শ তো একশো আশি ডিগ্রী এডিক-ওদিক।
আমি: এটা আন্তর্জাতিক রাজনীতি। এর সাথে মতাদর্শের কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয়না। ধর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিস্ট জার্মানী ও জাপানের মধ্যে মাতাদর্শগত কোন মিল ছিলো কি? কেবল মিত্রতার প্রয়োজনেই কিন্তু তারা কোয়ালিশন করেছিলো। ঐ যে নেতাজী সুভাস বসু বলেছিলেন, ‘শত্রুর শত্রুই আমার মিত্র’।
মইনুল: ওহ নেতাজী! মাই হিরো। আচ্ছা অরিন্দম নেতাজীকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি? উনি কি সত্যি সত্যিই বিমান দুর্ঘটায় মারা গিয়েছিলেন?

অরিন্দম: নেতাজী, ভারতীয় বাঙালীদের একটা বিরাট অংশের কাছেই হিরো। (অনেকটাই আবেগ-আপ্লুত হয়ে গেলো সে) একটা মনুমেন্ট আছে বুঝলি, সেখানে লেখা আছে ‘এই জায়গাটি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মী মুক্ত করেছিলো’।
মুহিত: ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মী’? সেটা কি? আমি তো জানি উনার আর্মীর নাম ছিলো ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’।
আমি: একই কথা। নেতাজী বার্লিনে হিটলারের সাথে দেখা করেন। তারপর হিটলারের সাহায্য নিয়ে গঠন করেন ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’। এদিকে সিঙ্গাপুরে রাসবিহারি বসু গঠন করেন ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মী’। হিটলার বলেছিলেন যে, জার্মানী থেকে আর্মী নিয়ে ভারত পর্যন্ত যাওয়া মুশকিল হবে, তার চাইতে ভারতের কাছাকাছি কোথাও এই আর্মী নিয়ে অবস্থান নিতে হবে। তারপর সুযোগ বুঝে সেখান থেকে বৃটিশ শাসনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সেই উদ্দেশ্যে নেতাজী সিঙ্গাপুরে গিয়ে রাসবিহারি বসু-র সাথে যোগ দেন। সেখানে রাসবিহারি বসু নেতাজীর হাতে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মীর দায়িত্ব তুলে দেন।
মুহিত: কিন্তু হিরোশিমায় বোমা ফেলার পরতো আর জাপানীরা জিততে পারলো না। আর নেতাজী কোথায় গেলেন?
অরিন্দম: বলা হয়ে থাকে যে, নেতাজী তাইওয়ানে একটা বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। রেডিও মারফত এই সংবাদ শুনে উনার অস্ট্রিয়ান স্ত্রী ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তবে একটা রহস্য ঘেরা আছে।
মইনুল: কি রহস্য?
আমি: গুমনাম বাবা রহস্য?
অরিন্দম: হ্যাঁ, সেটাই। ধারণা করা নেতাজী মারা যাননি। ওটা একটা প্রচারনা ছিলো। বৃটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে ভারত থেকে পালিয়ে গিয়ে হিটলারের সাথে দেখা করতে পারার মত বুকের পাটা যার ছিলো, তিনি এতো সহজে মারা যাওয়ার মত লোক না। গুমনাম বাবা নামে এক সাধুর আবির্ভাব হয় পরবর্তিতে, যার সাথে নেতাজীর মিল ছিলো। অনেকে মনে করেন ঐ গুমনামী বাবাই ছদ্মবেশী নেতাজী। ১৯৮৫ সালে তিনি দেহ রাখেন।
মইনুল: কিন্তু নেতাজী আত্মপরিচয় গোপন রেখে, অমন ছদ্মবেশে থাকবেন কেন?
আমি: সেটা নানা কারণে হতে পারে। এক. নেতাজী যেহেতু হিটলার ও তোজোর মিত্র ছিলেন তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিতদের তালিকায় উনার নামও আসবে। সেটা এড়ানোর জন্য হতে পারে। দুই. রাজনৈতিক পট একেবারেই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিলো, নতুন পটের রাজনীতিতে তিনি হয়তো আর আসতে চাইছিলেন না, তিন. দেশতো স্বাধীন হয়েই গিয়েছিলো, অর্থাৎ নেতাজী যেই উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন সেটা সফল হয়েছিলো। তাই পরবর্তী রাজনীতিতে আর নেতাজীর আগ্রহ ছিলো না। চার. নেহরুর সাথে নেতাজীর বিরোধ ছিলো। যেমন বিরোধ ছিলো শেরে বাংলার সাথে জিন্নাহর। আসলে বাঙালীদের অন্যান্যদের দ্বারা চিরকাল নিগৃহিতই ছিলো।

সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ। হটাৎ ট্রেনের আওয়াজ পাল্টে গেলো। ঝমঝম-ধুমধুম আওয়াজ শুনেই বোঝা গেলো যে, কোন একটি লোহার ব্রিজের উপর দিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। একসাথে সবাই তাকালাম বাইরে, ছিমছাম একটি নদীর উপর দিয়ে যাচ্ছে ট্রেন, চমৎকার দৃশ্য।

:উ ভাস ইয়েস্ত সিগারেত” (আপনাদের কাছে কি সিগারেট হবে?)
বার্থের দরজা ফাক করে একজন বিশালদেহী রাশান সিগারেট চাইছে। রাশানদের এই চেয়ে সিগারেট খাওয়ার অভ্যাসটা দেখে প্রথম প্রথম াওবাক হতাম। পরে বুঝলাম, এটা ওদের কালচার, এটাকে ওরা স্বাভাবিকভাবেই নেয়।
আমি: আমার কাছে নেই।
মুহিত: আমার কাছে আছে, নিন।
লোকটা মুহিতের হাত থেকে সিগারেট নিলো। তারপর মুহিতের হাতের দিকে তাকিয়ে বললো।
লোকটা: তোমার বাবা বা মা কেউকি হার্টের পেশেন্ট?
আমি ভীমড়ি খেলাম তিনদিন আগে মুহিত আমাকে বলেছিলো যে ওর আম্মা হার্টের রুগী। মুহিত আমার দিকে তাকালো।
আমি: কি করে বুঝলেন?
লোকটা: আমি হাত দেখতে পারি।
আমি: এই কম্যুনিস্ট কান্ট্রিতে হাত দেখা জায়েজ?
লোকটা: নিষেধাজ্ঞাতো কোন ছিলো না। তবে কম্যুনিস্টরা অলৌকিকতায় তো বিশ্বাস করেনা। তাই সরকারের এইগুলোর প্রতি কোন সমর্থন ছিলোনা।
সাদামাটা চেহারার রাশান লোকটাকে আমাদের ইন্টারেস্টিং মনে হতে শুরু করলো।
আমি: আসুন ভিতরে এসে বসুন।
আমার কথায় আপত্তি না জানিয়ে, লোকটা ভিতরে এসে বসলো।
মুহিত: আর কি বলতে পারেন, আমার হাত দেখে?
এবার মুহিতের হাত হাতে নিয়ে লোকটা অনেক কিছু বলতে লাগলো। মুহিতের চোখে বেশ আগ্রহের ছায়া দেখলাম। হয়তো অনেক কিছু মিলে যাচ্ছে।
আমি, তোরা কফি খাবি? আমি কফি নিয়ে আসি। বলে আমি রেস্টুরেন্ট-এর দিকে গেলাম।
একটু পরে ছয়কাপ কফি নিয়ে ফিরলাম। এসে দেখি লোকটা ঘিরে ওরা অনেক কথা বলছে। সবাইই হাত দেখাতে আগ্রহী।
আমি কফি খেতে খেতে ওদের কথা শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম, লোকটা কি আসলেই হাত দেখতে পারে না, মজা করছে! কফির কাপ শেষ করার পর লোকটা হঠাৎ আমার কফির কাপটি হাতে নিলো। বীনের কফি তাই শেষ করার পর সেখানে কিছু দাগ পরে আছে।

লোকটি বললো “এই দাগ দেখেও আমি অনেক কিছু বলতে পারি”।
আমি: বলুন কিছু আমার সম্পর্কে।
লোকটি: আপনারা মস্কো যাচ্ছেন তাইনা?
আমি: জ্বী।
লোকটা: সেখানে আপনাদের অপ্রিতীকর অভিজ্ঞতা হবে।
আমি: আপনি কি মজা করছেন? না আমাদের ভয় দেখানোর জন্য বলছেন?
লোকটি: (আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে) আপনারা কি ইন্ডিয়ান?
মুহিত: না, আমরা বাংলাদেশী।
লোকটা: আমিও তাই ভাবছিলাম।
আমি: (অবাক হয়ে) আপনি কি চেহারা দেখে বুঝতে পারেন ইন্ডিয়ান না বাংলাদেশী? না কি এটাও গণনা করে বললেন?
লোকটা: (হেসে ফেললো) না, আপনাদের চেহারা কাছাকাছিই, তবে ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন ভিন্ন। আমি তাই দেখে পৃথক করি।
আমি: আপনি অপ্রিতীকর কিসের কথা যেন বলছিলেন না? আমরা কি ওখানে হোলিগান-ডাকাত ইত্যাদির পাল্লায় পরবো নাকি?
লোকটা: (অনেকটা রহস্য করে বললো) আপনারা আত্মায় বিশ্বাস করেন?
মইনুল: আত্মায় তো বিশ্বাস করিই। আমাদের সবার দেহেই আত্মা আছে।
লোকটা: সে ঠিক আছে। তবে আমি সেই আত্মার কথা বলছি না, আমি বলছি ফ্রী আত্মার কথা।
অরিন্দম: ফ্রী আত্মা মানে?
লোকটা: মৃত মানুষের আত্মা।
আমি: আপনি কি প্লানচেট জাতীয় কিছুর কথা বলছেন নাকি?
লোকটা: আমি প্লানচেট করতে পারি।
আমি: থাক প্লানচেট করতে হবে না। আমরা ভাই একটু রিল্যাক্স করতে বেরিয়েছি।
লোকটা: ওকে, আপনাদের আর বিরক্ত করবো না। হ্যাভ এ সেফ জার্নি। তবে আরেকবার বলছি, মস্কোতে সাবধান থাকবেন।
‘আগন্তুক’ নামে একটা গল্প পড়েছিলাম ছোটবেলায়। গল্পের সেই আগন্তুক-এর সাথে এই লোকটির মিল খুঁজে পেলাম।

লোকটা চলে যাওয়ার পর সবাই কিছুক্ষণ চুপ রইলো। আমাদের আনন্দে সে যেনো এক মুঠো ছাই ছিটিয়ে দিলো।
মইনুল: ধুর শালা! শালায় আসছিলো ফাইজলামী করতে! ওর ঐরকম পাডার শরীর না হইলে দুইটা দিতাম।
মুহিত: নারে, ব্যাটার মধ্যে কুছু একটা আছে। আমার হাত দেখে যা বললো, তার তো অনেক কিছুই মিলেছে।
আসিফ: যাক, বাদ দে। মস্কো গিয়ে এম্নিতেই আমাদের সাবধান থাকা উচিৎ। আমাদের চেনা শহর না, তাছাড়া এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো না।
মইনুল: জাহান্নামে যাক ব্যাটা। ঐ দেখ।
আমরা ওর দেখানো ডিরেকশনে তাকালাম। সুন্দরী এক তরুনী করিডোর দিয়ে হেটে যাচ্ছে। তবে মইনুলের চোখ ছিলো অন্য দিকে। এখানকার সব মেয়েই খুব আঁটশাট পোষাক পড়ে, সেটা স্কার্ট হোক আর প্যান্ট হোক। মেয়েটির পড়নে ছিলো খাটো টাইট স্কার্ট তাও আবার সাদা রঙের। তাই সুন্দরীর ক্রীম কালারের প্যান্টিটা ফুটে উঠেছিলো। এবার সবার চোখ চলে গেলো তরুণীর আকর্ষণীয় নিতম্বের দিকে। ইউজুয়াল ম্যাসকুলিন রেসপন্স!
মুচকী হেসে একে অপরের দিকে তাকালাম। গুমোট ভাবটা অনেকটা কমে এলো।

দিন গড়িয়ে বিকেল এলো। সূর্যটা এখনো অতটা হেলেনি। উত্তরে সামারে সন্ধ্যা হয় অনেক দেরীতে, রাত দশটার দিকে। অবশ্য তার আগেই আমরা মস্কো পৌঁছে যাবো।

মুহিত: তুষার, আমরা মস্কো গিয়ে কোথায় উঠবো ঠিক করেছিস?
আমি: প্যাট্রিস লুমুম্বা ইউনিভার্সিটির মোস্তাককে টেলিফোন করেছিলাম। ও মেট্রো ইউগো-জাপাদনায়ার কাছে কোথায় জানি একটা এ্যাপার্টমেন্ট ঠিক করেছে।
মইনুল: ঠিকমতো সব ব্যবস্থা করেছে তো ব্যটায়?
আমি: না করেছে আশা করি। ও সিনসিয়ার আছে।

নয়টা তিরিশের দিকে ট্রেনটা এসে মস্কোর অনেকগুলি স্টেশনের একটিতে এসে থামলো। আমরা তরিঘরি করে নেমে পড়লাম, ঝলমলে নগরীতে।
সবাই স্টেশনের বাইরে এসে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম, মোস্তাকের খোঁজে। কোথাও ওকে দেখতে পেলাম না। আরো আধঘন্টা অপেক্ষা করলাম। তারপরেও ওর দেখা মিললো না। অথচ গতকালকেও ওর সাথে টেলিফোনে কথা হয়েছে। সব ঠিক আছে বলেছে। আমাদেরকে রিসিভ করতে স্টেশনে আসবে বলেছে। দুশ্চিন্তা হতে লাগলো, ওর আবার কিছু হয়নি তো! এখন? এই অচেনা নগরীতে আমরা পাঁচটি প্রাণীই বা কি ব্যবস্থা করবো? আমি ক্ষীণ আশায় এদিক-ওদিক তাকাতে থাকলাম। হঠাৎ করে অস্বাভাবিক শব্দ পেলাম, এরপর মইনুলের কন্ঠস্বর। এক মাতাল মইনুলের উপর চড়াও হয়েছে। উল্টা-পাল্টা কিছু বলছে। মাঝারী গড়নের হলেও কারাতে জানা মইনুল ভীষণ সাহসী। দুম করে একটা ঘুসি কষিয়ে দিতে যাচ্ছিলো মাতালটিকে। আমি তাড়াতাড়ি দৌড়ে ওকে থামালাম।
“করছিস কি? মারামারি করিস না, আমরা এখানে আগন্তুক। সিরিয়াস কিছু হলে সামাল দিতে পারবো না। ইতিমধ্যে আরেকজন এসে মাতালটিকে নিয়ে গেলো। প্রায় অচেনা শহরে এসে শুরুতেই এমন অলুক্ষণে ঘটনায় মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এদিকে থাকারওতো কোন ব্যবস্থার ঠিক নাই।

একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। এখানে স্টেশনের ট্যাক্সি ড্রাইভারগুলো ভালো হয়না। ওদের একটি চক্র আছে। এর বাইরে কাউকে ওখানে দাঁড়াতে দেবেনা। ওরা নিজেরা চড়া ভাড়ায় প্যাসেঞ্জার নেবে। তাই ওদের এ্যাভয়েড করাই ভালো।
ট্যাক্সি ড্রাইভার: তোমাদের ট্যাক্সি লাগবে?
ভাবছিলাম ওকে না বলে দেবো। কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই মইনুল বললো
মইনুল: হ্যাঁ, লাগবে।
ট্যাক্সি ড্রাইভার: কোথায় যাবে তোমরা?
মইনুল: জানিনা।
ট্যাক্সি ড্রাইভার: জানিনা মানে?
মইনুল: জানিনা মানে, জানিনা। মস্কো এসেছি বেড়াতে। থাকার যায়গা ঠিক করা হয়নি।
এতো কথা একজন অপরিচিতকে বলা ঠিক হচ্ছেনা। কিন্তু মইনুলের মেজাজ এখন সপ্তমে, তাই কিছু বলতেও পারছিলাম না।
ট্যাক্সি ড্রাইভার: ও, বেড়াতে এসেছো। থাকার জায়গা ঠিক হয়নি। ঠিক আছে, আমি ঠিক করে দিচ্ছি। তবে আমাকে ভাড়ার পাশাপাশি আরো কিছু রুবল অতিরিক্ত দিতে হবে।
মইনুল: তাই সই। চলো।
আমি ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতে খুব মোলায়েম স্বরে মইনুলকে বললাম।
আমি: মইনুল, কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? একটা অচেনা লোকের সাথে যাচ্ছি।
মইনুল রাগতে গিয়েও সামলে নিলো। তারপর ঠান্ডা স্বরে বললো
মইনুল: আর কি পথ আছে বল? কোথাও না কোথাও তো থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি ভাবলাম ওর কথাই ঠিক। বাকীরাও চুপ করে রইলো।

ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ী চালাতে চালাতে আমাদের নিয়ে গেলো শহরের একপাশে। আমি জানতে চাইলাম জায়গাটা কোথায়?
সে বললো যে, এটা ইউগো-জাপাদনায়া। তবে প্যাট্রিস লুমুম্বা ইউনিভার্সিটি থেকে কিছুটা দূরে।
একটা পুরোনো ছয়তলা বাড়ীর সামনে এসে ট্যাক্সিটা থামলো। এই জাতীয় বিল্ডিংগুলোকে বলা হয় খ্রুশ্চোভকা। রাষ্ট্রপ্রধান নিকিতা খ্রুশ্চোভ-এর আমলে এগুলো তৈরী তাই ঐনামে লোকে ডাকে। আশে-পাশে আর কোন বিল্ডিং দেখলাম না। চারদিকে অনেক গাছ।

ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের সাথে নিয়ে বিল্ডিংয়ের ভিতরে ঢুকলো। সেখানে রিসিপশনে এক বৃদ্ধ বসা। ট্যাক্সি ড্রাইভার বললো, “এরা এখানে থাকবে কয়েকটা দিন। ঐ এ্যাপার্টমেন্টটা খালি আছে তো?
বৃদ্ধ: খালি আছে। এই নাও চাবি। ছয়তলায় উঠবে। এই ছেলেরা ওটার মালিক এখানে থাকেনা। তোমরা আমার মাধ্যমে সব করবে। ভাড়ার টাকাও আমাকে দেবে।
আমাদের কাছে অল দ্যা সেম, মালিককেও চিনি না বৃদ্ধকেও চিনিনা, ভাড়ার টাকা একজন নিলেই হলো। আমাদের থাকা দিয়ে কথা।
ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে হিসাব মিটিয়ে আমরা ছয়তলায় উঠে গেলাম। চাবি দিয়ে তালাটা খুলতে একটু বেগ পেতে হলো পুরনো সোভিয়েত তালা। কয়েকবার সাধনা করার পর খুললো। ভিতরে ঢুকে গুমোট একটা গন্ধ পেলাম। তামাক পুরোনো হলে যেমন গন্ধ হয়। অরিন্দম দরজা বন্ধ করার জন্য পাল্লায় ধাক্কা দিলো। হঠাৎ দরাম শব্দে দরজা বন্ধ হলো। আমরা চমকে উঠলাম। পুরনো সব আসবাব পত্র, রং ওঠা দেয়াল, তামাকের মত গুমোট গন্ধ। জানালার ওপাশে ঘর-বাড়ী কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। শুধু গাছ আর গাছ। সব মিলিয়ে অপ্রীতিকর-ভীতিকর পরিবেশ। আমাদের গা ছমছম করতে লাগলো। আমরা জানতাম না, আমাদের জন্য আরো ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছিলো।

(চলবে)

০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৫; ভোর ৪ টা ৫০ মিনিট; ঢাকা

মন্তব্য করুন..

২ thoughts on “প্রেতাত্মার প্রত্যাবর্তন – পর্ব ১

শাকিল আহমেদ শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.