বাংলাদেশের নৈশ অর্থনীতি (পর্ব -২)(Night Economy of Bangladesh)

বাংলাদেশের নৈশ অর্থনীতি (পর্ব -২)
(Night Economy of Bangladesh)
———————————————– রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বাস-টাস না পেয়ে গেলাম স্কুটার স্ট্যান্ডে। এখানে হৈচৈ খুব বেশি। চিপা রাস্তায় প্রচুর পরিমানে সিএনজি, অটোরিকশা, মাহেন্দ্র, ইত্যাদি দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তিন রাস্তার মোড়ে তারা এমনভাবে জটলা পাকিয়ে থাকে যে, অন্যান্য যান-বাহন তো দূরের কথা, পথচারীও ঠিকমত হাটতে পারে না! আমি এই বিরক্তিকর জায়গা রেখে হাইওয়ে ধরে কিছুটা সামনে এগিয়ে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ালাম। মাহেন্দ্র নামক বাহনগুলা ভারত থেকে আমদানী করা। প্রচন্ড শব্দ করে, এতে চড়লে কানে তালা লেগে যায়, খুব কাঁপে! আমি সাধারণত এগুলোয় চড়ি না। তবে এই রাতে আমার সামনে এসে একটা মাহেন্দ্র দাঁড়ালো। চালকের পাশের সিট-টা খালি ছিলো। আমাকে বললো, “ময়মনসিংহ যাবো। যাবেন।” আমি ভাড়া জানতে চাইলাম। তারা সাধারণত রাতে ভাড়া বেশি চায়। তবে এই চালক স্বাভাবিক ভাড়াই চাইলো। আমি উঠে পড়লাম। কোন জ্যাম বা ঝামেলা ছাড়াই খুব স্মুথলি গাড়ী চালিয়ে সে আমাদেরকে ময়মনসিংহ শহরের প্রান্তে পৌঁছে দিলো। জায়গাটার নাম ব্রীজমোড়। ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর উপরে এই ব্রীজটি অবস্থিত। রাত তখন বাজে ১১টা ১১মিনিট।

এখানে সাধারণত প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে থাকে, যারা দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ময়মনসিংহের উপর দিয়ে ঢাকা যায়। বাংলাদেশে ‘বাইপাস রোড’ জনিত সমস্যাটা দূরই হচ্ছে না। বেশিরভাগ শহরেই কোন বাইপাস রোড নাই। আবার কোন শহরে বাইপাস রোড তৈরী করলেও সেটা বেশিদিন আর বাইপাস থাকে না, ধনীরা ঐ রোডের দুইপাশে বড় বড় দালান নির্মান করে সেই রোডটিকেও জ্যামের রোড বানিয়ে ফেলে।

আজ রাতে ব্রীজমোড় বাসস্ট্যান্ডে এসে আমি হতবাক হলাম! পুরোই খালি জায়গা। কোন বাসই নাই। আমার মতই কয়েকজন যাত্রী অপেক্ষমান। তারাও তীর্থের কাকের মতন দাঁড়িয়ে। আমি একজনার কাছে জানতে চাইলাম, “কি ব্যাপার বাস নাই কেন?” তিনি বললেন, “এখন নাই। তবে, রাত বারোটার পর আবার বাস আসা শুরু হবে।” আরেকজন বললেন, “দেখি আর কিছুক্ষণ। বাস না পেলে রাত দুইটায় একটা ট্রেন আছে ঢাকাগামী। ওটায় উঠে যাবো।” আমি ভাবলাম আইডিয়া মন্দ না। ট্রেনে চলা আরামদায়ক। বললাম, “ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়?” তিনি বললেন, “আরে না। টিকিট পাওয়া যায় না। জায়গাও পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়ে যেতে হবে।” বুঝলাম ওখানেও সংকট। আমাদের দেশে ট্রেনের লাইন ভালোই আছে। তবে ট্রেন সার্ভিসের কোন উন্নয়ন হয় নাই। শোনা যায় যে বাস-ট্রাকের লবি এতটাই শক্তিশালী যে, তারাই ট্রেন সার্ভিসের উন্নতি হতে দেয় না।

ওখানে বেকার দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিলো না। ভাবলাম যাই মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ডে, ওখান থেকে ডায়রেক্ট বাস ঢাকা যায়। তবে রাত সাড়ে দশটার পর আর কোন বাস ঐ স্ট্যান্ড থেকে ছাড়ে না। তবুও গেলাম ঐদিকে, যদি লাইগ্যা যায়! একটা অটোরিকশায় চড়ে ওখানে গেলাম, ভাড়া নর্মাল। শহরের ভিতর রাতের কোন ছাপ নেই, কোলাহলমুখর পুরো শহর! তবে রাত বলে জ্যাম নাই কোন। মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ডে নেমেও দেখলাম, দোকানপাট সবই খোলা। লোকচলাচল অনেক। আমিও কোন তাড়াহুড়ো না করে, একটা দোকানে গিয়ে এক কাপ কফি খেলাম, নিজেকে চাঙা করার জন্য। কফিটা শেষ করে বাসের খোঁজে গেলাম। গিয়ে দেখলাম স্ট্যান্ডে প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে আছে। তবে সবই ক্লোজড। বাসের কিছু স্টাফ-কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাদের কাছে জানতে চাইলাম, “বাস ছাড়া শেষ? আর কোন বাস কি ঢাকা যাবে না?” একজন উত্তর দিলো, “নাহ। লাস্ট বাস ছেড়ে গেছে। আপনি বাই পাস রোডের মোড়ে চলে যান। ওখানে অন্য বাস পাবেন।”

আমি একজন দোকানীকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বাই পাস রোডের মোড়টা কোন দিকে?” তিনি বললেন, “এই রাস্তা বরাবর, দূর না। অটোরিকশায় দশ টাকা নিবে।” আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালাম। একটা সিএনজি স্কুটার এসে আমার সামনে দাঁড়ালো, জানতে চাইলো যে কোথায় যেতে চাই। আমি বললাম যে, বাই পাস রোডের মোড়। সে বললো, “একশো টাকা ভাড়া দিয়েন।” আমি মনে মনে একটা গালি দিলাম, এই সুযোগ-সন্ধানীকে। তারপর একটা অটোরিকশা এসে দাঁড়ালো। দশ টাকা ভাড়ায় সে যাত্রী নিচ্ছে বাই পাস রোডের মোড় পর্যন্ত। আমি উঠে গেলাম ঐ বাহনে।

বাই পাস রোডের মোড়ে এসে, ব্রীজমোড়ের মত একই দৃশ্য পেলাম। ঢাকাগামী যাত্রী আছে, কিন্তু বাস নাই। একটা বাস শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম ঠায়। বুঝলাম যে ওটার বড় অংশ খালি এবং পুরোটা না ভরা পর্যন্ত বাসটা ওখান থেকে নড়বে না, তাতে এক ঘন্টাও লেগে যেতে পারে। ভাবলাম, কি করণীয়।

হঠাৎ একটা সিএনজি চালক এসে বললো, “কোথায় যাবেন?” আমি বললাম, “ঢাকা।” তিনি বললেন আমি যাবো স্কয়ারব্রীজ পর্যন্ত। চলেন, ঐখানে ঢাকার গাড়ী পাইবেন।” আমি বললাম, “স্কয়ারব্রীজ-টা তো চিনলাম না। কোথায়?” সে বললো, “ভালুকা চেনেন?” আমি বললাম, “ভালুকা ভালোভাবেই চিনি।” সে বললো, “তাইলে আপনারে ভালুকা বাজারে নামাইয়া দেই?” আমি বললাম, “ওকে। ভাড়া কত?” সে বললো, “একশো টাকা দিয়েন।” আমি ঠিকআছে বলে উঠে গেলাম সিএনজি স্কুটারে। চালকের পাশের সীটে বসলাম। পিছনে একটা পরিবার বসেছে। চালকের অপর পাশে আরেকজন আছে। সিএনজি চলা শুরু করলো। আমি মনে মনে বললাম। এলাহী ভরসা।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৮ই অক্টোবর, ২০২২ সাল
রচনাসময়: দুপুর ১২টা ২৭ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.