বাংলাদেশের নৈশ অর্থনীতি (পর্ব -১)(Night Economy of Bangladesh

বাংলাদেশের নৈশ অর্থনীতি (পর্ব -১)
(Night Economy of Bangladesh
———————————————– রমিত আজাদ

আমি কোন অর্থনীতিবিদ নই। তাই আমি অর্থশাস্ত্রবিষয়ক কোন তাত্ত্বিক আলোচনা করতে পারবো না এবং এই বিষয়ে গুছিয়ে লিখতেও পারবো না। আমি শুধু আমার পর্যবেক্ষণটাই লিখবো।

কয়েকদিন আগে ফেইসবুকে একটা স্ট্যা টাস দিয়েছিলাম, বাংলাদেশের নৈশ অর্থনীতি নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা লিখবো বলে। ফেবু-তে আশানুরুপ সাড়া পাইনি। তবে পরবর্তি কয়েকদিন সাক্ষাতে অনেকেই এই বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, এবং লিখতে অনুরোধ করেছেন। দুই-একজন মুরুব্বী টেলিফোন করেও এই বিষয়ে আলাপ করেছেন। উনাদের সকলকে ধন্যবাদ।

বিষয়টা ছিলো এমন:
এক রাতে ময়মনসিংহের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, কখনো পায়ে হেটে, কখনো সিএনজি স্কুটারে, কখনো রিকশায়, কখনো পিকআপে, কখনো লোকাল বাসে, ইত্যাদিতে চড়ে ঢাকা এসে পৌঁছেছিলাম খুব ভোরে।
সারা রাত জেগে জেগে ও ঘুরে ঘুরে দেখলাম নিজ জন্মভূমির নৈশ অর্থনীতি। গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার।

আমার স্ত্রী আমাকে রাতে একা একা বের না হতে অনুরোধ করেছিলেন। উনার দু’টি আশংকা ছিলো – ১. রাতে বাস পাওয়া যাবে না, যানবাহন সংকটে আমি পড়বো, ২. রাতে নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও হতে পারে। স্বামীর জন্য উনার উদ্বিগ্ন হওয়ারই কথা। ওদিক থেকে আমি আবার মোটামুটি এ্যাডভেঞ্চার প্রিয়! খুব ছোটবেলাতেই মানে ১১/১২ বছর বয়সেই আমি গভীর রাতে ঢাকার পথে পথে হাটতাম। সেই সময়ে দিনের ঢাকা ও রাতের ঢাকার পার্থক্য ছিলো অনেক। দিনে সে ছিলো সরগরম, আর রাতে ছিলো রহস্যময় এক ঘুমন্তপুরী। ঢাকার ভিতরেই তখন কোথাও কোথাও ছিলো পাট ও সরিষার ক্ষেত। আর ডোবা, নালা, ঝোপঝার তো ছিলোই। খাল ছিলো। কিছু কিছু জায়গায় যথেষ্ট ফাঁকা জায়গাও ছিলো।

বিদেশে থাকতেও একাধিকবার গভীর রাতে চলাচল করেছি। সাদাদের দেশে আমি এক কালো মানব যে, রাতে ঘোরাফেরা করছি, তাতে কিছুটা যে ভয় হয় নাই তা নয়, তবে যাইহোক বড় ধরনের কোন বিপদে কখনো পড়িনাই (আলহামদুলিল্লাহ্‌)।

এবার রাত আনুমানিক ৯টা ১৮মিনিটে গ্রামের ঘর থেকে বের হই। হেটে হেটে অনেকটা পথ গেলাম। দেখলাম গ্রামের একপাশের মার্কেটটি খোলা এবং বেশ সরগরমই। এখানে একাধিক চায়ের দোকান আছে। অনেকগুলো মুদির দোকান আছে। আছে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রিন্টিং-এর দোকান। বিকাশ এজেন্ট, ফার্মেসি, ঝালাই, ইলেকট্রিক গুডস, সেলুন, ও টেইলারের দোকান রয়েছে। ফুল সাউন্ডে মিউজিক বাজিয়ে চায়ের দোকান চলে। আছে মসজিদ, যেখানে রাত জেগে এবাদত বন্দেগী ও ওয়াজ হয়। আগে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ এশার নামাজের পরই ঘুমিয়ে যেত। কিন্তু এখন তারাও শহরের মানুষের মত রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত জেগে থাকে। আবার ওঠে খুব ভোরে। ক্ষেতে বা গৃহস্থালীর কাজ খুব ভোরেই শুরু করতে হয়।

গ্রাম থেকে সহজেই একটা অটোরিকশা পেয়ে গেলাম। আজকাল এই ইঞ্জিনচালিত বাহনটি গ্রামে খুব পপুলার এবং কার্যকরী। এইসব পথে বাস চলে না তাই। অটোরিকশাটি আমাকে পৌঁছে দিলো ইউনিয়নের মোড়ে। এখানেও এই রাতেই মার্কেট বেশ সরগরম। একটি শপে মেশিন চালিত কফিও বিক্রি হয়। এখানে খুব দ্রুতই উপজেলায় যাওয়ার সিএনজি স্কুটার পেয়ে গেলাম। আমার মতন যাত্রী আরো ছিলো। গ্রাম থেকে উপজেলা পর্যন্ত তেরো কিলোমিটার তক পথ। পাকা ও ভালো রাস্তা, তাই দ্রুতই পৌঁছে গেলাম।

উপজেলা এই রাতে আরো বেশি সরগরম। দোকান-পাট বাজার সবই খোলা। জনমানুষের কোলাহলে রাতকে রাতই মনে হচ্ছিলো না। সাথে টাকা কম ছিলো, সমস্যা নাই, উপজেলায় এটিএম বুথ আছে, ওখান থেকে সহজেই টাকা তোলা যায়। আমি সেই বুথে গেলাম। আমাকে দেখে সিকিউরিটি গার্ড সালাম দিলো। তারপর বিনয়ের সাথে বললো, “স্যার, টাকা তুলবেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, টাকা তুলতে চাই।” এবার সে অনাকাঙ্খিত সুসংবাদটি দিলো, “স্যার, এটিএম তো কাজ করে না।” আমার মাথায় তো বাজ পড়লো! তাহলে আমি ঢাকা যাবো কি করে? হেটে যাবো? নাকি আবার গ্রামেই ফিরে যাবো?

যাহোক, প্রাইভেট খাতে ডিজিটাইলেজশনের সুবাদে আমাদের দেশে জীবন এখন অনেক ক্ষেত্রেই সহজ হয়ে এসেছে। আমি কাছেই পরিচিত একটি স্টেশনারী দোকানে গেলাম। একসময় এইরকম জমকালো দোকান কেবল বড় শহরগুলোতেই দেখা যেত, এখন উপজেলা পর্যায়েও এরকম বড় দোকান-পাট আছে। ওখানে যেতেই ইয়াং দোকানী, একগাল হেসে বললো, “স্যার কেমন আছেন?” আমি বললাম, ‘ঝামেলায় পড়েছি, আপনার দোকানে কি বিকাশ আছে?” তিনি হেসে বললেন, “কোন সমস্যা নাই স্যার, বিকাশ আছে। কত টাকা তুলবেন?” আমি টাকার এ্যামাউন্ট-টা বললাম। তারপর মোবাইল টিপে খুব দ্রুতই, টাকা ক্যাশ আউট করে নিলাম। যাক, মনে স্বস্তি ফিরলো। এই রাতেও কোন সমস্যা নেই!

ভাবলাম বাসে ওঠার আগে একটু কফি খেয়ে নেই। উল্টা দিকে আরেকটা দোকানে গিয়ে দেখলাম, বড় দোকান খোলা রেখে দোকানী গায়েব। মালের সিকিউরিটি নিয়ে তার কোনই মাথাব্যাথা নেই। থাকার কথাও না। আশেপাশে মানুষের উপস্থিতি ভালোই। তারাই পাহাড়াদার। দোকানের কাছে দাঁড়ানো একজন মুরুব্বী জানতে চাইলেন কি চাই। আমি বললাম, “কফি খাবো।” তিনি উচ্চস্বরে কাউকে ডাক দিলেন। দৌড়ে একজন তরুণ চলে এলো। আমাকে, মেশিন থেকে কফি বের করে হাতে দিলো। কফি খেতে খেতে সেই তরুণ জানতে চাইলো, আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? ইত্যাদি। এরপর বেরিয়ে গেলো যে, সামহাউ সে আমার ডিসটেন্ট রিলেটিভ। বাংলাদেশের এই একটা ব্যাপার, এক জাতি, এক ভাষা, এক রিলিজিওন হওয়ায়, খুব দ্রুতই আত্মীয়তার সম্পর্ক আবিষ্কার হয়। এই দেশে আমরা সবাই সবার আত্মীয়। তারপরেও কেন যে জাতি দুইভাগে বিভক্ত?

কফি খেয়ে ভাবলাম, আহারের পর একটু বাহার করতে হয়। কিন্তু, আমাদের দেশে এই সমস্যাটি প্রকট! আহারের ব্যবস্থার কোন অভাব না থাকলেও বাহারের ব্যবস্থার করুণ অবস্থা! আমার এক কোটিপতি বন্ধু একবার এক খেলার অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখে ওয়াশরুমের কোন ব্যবস্থা নাই! খোদ বিশেষ অতিথিদের জন্যই নাই! খোঁজখবর নিয়ে কিছুক্ষণ পর আমি তাকে গিয়ে বললাম, “ঐ বিল্ডিংটায় ব্যবস্থা আছে। চল যাই।” সে বললো, “থাক আর প্রয়োজন নাই, আমি মাঠের ঐ কোনায় গিয়ে লুকিয়ে পানি ছেড়ে এসেছি।” ওর কথা শুনে আমি হাসবো, না কাঁদবো? দেশে পাবলিক টয়লেট-এর নির্মান অনেক বাড়ানো প্রয়োজন।

উপজেলা লোকে লোকারণ্য। দেখে মনেই হয় না যে এত রাত! বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম বিপাকে। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান চলছে অনেক, কিছু কিছু প্রাইভেট কার, মাইক্রো, ইত্যাদিও চলছে, কিন্তু যাত্রীবাহী বাস একটাও নাই! তাহলে এখন আমি কিভাবে ঢাকা যাবো?

(তাত্ত্বিক রাজনীতির পাশাপাশি, মাঠে ময়দানের রাজনীতি-ও সমান জরুরী)

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৬ই অক্টোবর, ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৪টা ০৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.