ভালোবাসার ইমারত (১১)

ভালোবাসার ইমারত (১১)
——————– রমিত আজাদ

আমার জীবনে অনেক শিক্ষক ছিলেন, এবং জীবনের এক পর্যায়ে আমি নিজেই শিক্ষকতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তবে আমি সবসময়ই অনুভব করি যে আমার আরও শিক্ষকের প্রয়োজন।

আমাকে কোন শিক্ষক কি শিখিয়েছিলেন, আমি কার কাছ থেকে কি শিখেছিলাম। যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমি অধ্যায়ন করেছিলাম, তারা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সামগ্রিকভাবে কি শিখিয়েছিলো, তা পরবর্তিতে কোন এক সময় লিখবো। এই লেখায় তার কিছু কিছু লিখবো। তবে একটা কথা বলে রাখি, ক্যাডেট কলেজে দেশপ্রেম যে সেখানো হতো সেটা সত্যি, সেই দেশপ্রেমটা ছিলো মূলতঃ জাতীয়তাবাদভিত্তিক। জাতীয়তাবাদ-এর বাইরে আরো যে দর্শন আছে সেটা আমাদের শিক্ষকরা কেমন জানতেন তা আমি ঠিক বলতে পারবো না। এমন হতে পারে যে, উনারা তা জানলেও, আমরা ঐ বয়সে এত জটিল কিছু বুঝতে পারবো না ভেবে, হয়তো উনারা অত কিছু আর বলতেন না। একবার এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় এই জাতীয়তাবাদ নিয়ে একটা টপিক ছিলো। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক শ্রদ্ধেয় শফিকুল আজম স্যার আমাকে ডাকলেন, এই বিতর্কে হাউজের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে, ইনসিডেন্টালি তার কয়েকদিন আগে আমি কোন এক সাপ্তাহিক পত্রিকায় একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম, যা ছিলো মূলত জাতীয়তাবাদবিরোধী! আর্টিকেলটা পড়ে আমার মনে খটকা লেগেছিলো! এতকাল তো জাতীয়তাবাদ-এর পক্ষেই কথা শুনে এসেছি, এই আর্টিকেলে আবার কি পড়ছি?! যাহোক, শফিকুল আজম স্যার যখন জানতে চাইলেন যে, আমি টপিক-টির পক্ষে বলতে চাই, না কি বিপক্ষে বলতে চাই; আমি বললাম, “বিপক্ষে বলতে চাই”। স্যার চমকে আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “ওকে, এটা বিতর্ক, কাউকে তো বিপক্ষে বলতেই হবে”। এরপর কয়েকদিন রিহার্সাল হলো। আমি ফার্দার পড়ালেখা করে জানলাম যে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতীয়তাবাদ’ বিরোধী ছিলেন, এমনকি এই জাতীয়তাবাদবিরোধীতা নিয়ে উনার লেখা একটি বইও আছে, যার নাম ‘জাতীয়তাবাদ’। যেই রবীন্দ্রনাথ-কে আমরা বাঙালী জাতির প্রাণের কবি মনে করি, সেই তিনিই জাতীয়তাবাদবিরোধী ছিলেন! বিষয়টা কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না! তারপর আরো পড়েছিলাম যে ‘জাতীয়তাবাদ’ জাতিতে জাতিতে সংঘাত সৃষ্টি করে। জাতীয়তাবাদ পৃথিবীর মানচিত্র-কে বারবার পরিবর্তিত করেছে! বিতর্কের স্ক্রিপ্ট তৈরী করতে গিয়ে আমার মনে অনেক খটকা অনেক প্রশ্নের উর্দ্রেক হয়েছিলো, যার উত্তর স্যারদের কাছ থেকেও যথাযথভাবে পাচ্ছিলাম না। মনে হলো প্রশ্নগুলো উনাদের মনেও খটকা সৃষ্টি করছে! উল্লেখ করতে চাই যে, সেই সময়ে বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা, ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দিতেন মূলত: সাহিত্যের শিক্ষকরা। অন্যান্য শিক্ষকদের অংশগ্রহণ ছিলো না যে, তা নয়, তবে সেটা নগণ্য ছিলো। বিষয়ভিত্তিক নলেজের চাইতে বাচনভঙ্গী, উচ্চারণের শুদ্ধতা, স্মার্টনেস, এগুলোর দিকেই বেশী মনযোগ দেয়া হতো। বিতর্কে বিষয়ভিত্তিক নলেজের গুরুত্ব সবচাইতে বেশি এটা আমাকে প্রথম শিখিয়েছিলেন আমার জাস্ট এক ব্যাচ সিনিয়র মাসুদ হাসান ভাই। তবে বিতর্কের বিষয় যদি রাজনীতি বা সমাজবিদ্যা-র কিছু হতো তাহলে আমি আমাদের সমাজবিদ্যার কিংবদন্তী শিক্ষক জনাব দেলোয়ার হোসেন স্যারের কাছ থেকে পরামর্শ নিতাম। উনার কাছেই আমাদের প্রথম হাতে খড়ি হয়েছিলো সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, মেকিয়েভেলী-র দর্শনের সাথে। উল্লেখ্য যে ফিলোসফির মত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পৃথক কোন শিক্ষক তখন ক্যাডেট কলেজে ছিলো না। এখন আছে কিনা জানি না। সেই দফা বিতর্ক প্রতিযোগিতা-য় আমি প্রথমবারের মত বক্তৃতা দিয়েছিলাম আমার মন টানে না এমন বিষয়ের পক্ষে (মানে জাতীয়তাবাদ-এর বিপক্ষে)। বক্তৃতার একটি লাইন আমার এখনো মনে আছে, “জাতীয়তাবাদ-এর উদ্দেশ্য হলো একটি আবেগকে পূঁজি করে জনগণের মধ্যে তার বিষাক্ত লালা ঢুকিয়ে দেয়া, যা বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিলো দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে”। আমার মনে আছে প্রতিযোগিতায় যখন বক্তা হিসাবে আমার নাম ঘোষণা করে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমাকে মঞ্চে আহবান জানানো হলো, আমাদের জ্ঞানী
অধ্যক্ষ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যার নড়েচড়ে বসেছিলেন, এবং পুরো বক্তৃতাটি মনযোগ দিয়ে শুনেছিলেন। তারপর প্রতিযোগিতা শেষে মাননীয় অধ্যক্ষ-এর ভাষণে স্যার আমাদের একটি উপদেশ দিয়েছিলেন যে, এর-ওর কাছ থেকে শুনে বিশ্বাস না করে, মনযোগ দিয়ে বইপত্র পড়তে। স্যারের উপদেশটি আমি সারাজীবন মনে রেখেছি। যাহোক, যতদূর মনে পড়ে ঐ প্রতিযোগিতায় আমি শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়েছিলাম। তবে আমার মধ্যে রয়ে গিয়েছিলো, কেবল প্রতিযোগিতার খাতিরে মনের বিরুদ্ধে দেয়া একটি বক্তৃতা, আবার কিছু প্রশ্ন ও একটি দর্শনের যথাযথতা সম্পর্কে কিছু খটকা!

দেশপ্রেম-এর পাশাপাশি আমাদের আরো যা শেখানো হতো তা হলো ‘ইন্ডিভিজুয়ালিজম’ (কেউ কেউ বলে স্বার্থপরতা, কেউ আবার বলে আত্মকেন্দ্রিকতা)। শিক্ষকরা বলতেন, “তোমরা ভালোভাবে লেখাপড়া করো, তাহলে তুমি বড় কেউ হতে পারবে। এই বড় হওয়া মানে ছিলো, নিজ নিজ পেশায় কেউকেটা কিছু একটা হওয়া। উনারা প্রেফার করতেন বড় আমলা বা সেনা জেনারেল হওয়া। মানে ঐ সময়ে বড় সামরিক-বেসামরিক আমলা হওয়াটাকেই এচিভমেন্ট মনে করা হতো। যেই আমলাতান্ত্রিকতা থেকে বাংলাদেশ এতগুলো বছরেও খুব বেশী দূরে আসতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আমার মনে আছে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে ফিরে আমি শ্রদ্ধেয় দেলোয়ার হোসেন স্যার (মরহুম)-কে মোবাইলে কল করেছিলাম। স্যার, পরিচয় পেয়ে আমাকে চিনতে পরেছিলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, “তা তুমি এখন কি? মেজর না এলটিকন?” আমি উত্তর দিলাম, “না, স্যার আমি ওগুলোর কোনটাই না। আমি ডক্টর”। স্যার আবারো প্রশ্ন করেছিলেন, “কোন ডক্টর? ডাক্তার?” আমি বললাম, “তাও না স্যার। আমি ডক্টরেট”। এবার স্যার বললেন, “ও বাবা! এতো সবার উপরে হয়ে গেলো!” ঐ প্রথম আমার মনে হয়েছিলো যে, দেশে আমলাদের উপরেও কোন কিছু গুরুত্ব পায়!

এই সকল কালচারাল ইভেন্টসমুহে আমাদের রিহার্সালের জায়গা ছিলো বিশাল ইমারতগুলির কয়েকটি জায়গা। যেমন, হাইজ রিডিংরুম, হাউজ টিভিরুম, হাউজ অফিস, বড় জায়গার প্রয়োজন হলে অডিটোরিয়াম। আমরা নিজ নিজ রুমে মাঝে মাঝে ব্যাক্তিগত রিহার্সাল করতাম। একবার তো একটা মজার ঘটনাই ঘটে গেলো। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। সে সময়ে হাসপাতালের পরিবেশ ছিলো চমৎকার! হসপিটালে এ্যাডমিশন পেলে আমরা খুশিই হতাম! একদিন দুপুরে লাঞ্চ শেষ করলাম মাত্র। তারপর হাসপাতালের ডাইনিং টেবিলে বসে সিনিয়র জুনিয়র সবাই মিলে মহাখোশগল্পে মসগুল! হটাৎ সুইপার দৌড়ে এলো, “ভাইজানরা দেখেন, উনি জানি কেমন করতাছে!” আমরা বলি, “কে কি করতাছে?” সুইপার বলে, “আসেন আসেন দেখাই, মাথা গরম হইয়া গেছে মনে হয়!” আমরা একটু উদ্বিগ্ন হলাম, ‘কার মাথা গরম হলো হঠাৎ!’ সুইপারের পিছনে পিছনে গিয়ে উঁকি মারলাম আমরা কয়েকজন। দেখি হসপিটালের করিডোরে রানা ভাই দাঁড়িয়ে। অত্যন্ত ভালো মানুষ, মেধাবী ও চমৎকার আবৃত্তিকার রানা ভাই আমাদের সকলের কাছে অতি প্রিয়। উনার আবার কি হলো? তারপর যা দেখলাম তাতে সবাই হেসে গড়িয়ে পড়লাম! সামনে কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, রানা ভাই হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে, পাহাড়ের দিকে মুখ করে, মনের আবেগ মিশিয়ে কবিতা আবৃত্তি করছেন, মানে প্রাকটিস করছেন, ‘তোমার পায়ের তলে আমিও অমর হবো, আমাকে কি মাল্য দেবে দাও,……………। তাই দেখে সুইপার ভেবেছে যে, তিনি আবোল-তাবোল বকছেন!!! আমরা হেসে ফেলে সুইপারকে বললাম, “কিছু হয় নাই, তুমি যাও। ভাইয়া কবিতা আবৃত্তি করছেন!”
———————————————————–

রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০১৯
সময়: সকাল ১০টা ৫৫ মিনিট

(চলবে)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.