ভালোবাসার ইমারত (১২)

ভালোবাসার ইমারত (১২)
——————– রমিত আজাদ

আমার স্মরণশক্তি ভালো (গর্ব করছি না! প্লিজ ভুল বুঝবেন না!)।

সিলেট ক্যাডেট কলেজের বর্তমান ব্রত ‘আলোকের অভিসারী’ কলেজের প্রথম ব্রত নয়; এটা কলেজের দ্বিতীয় ব্রত। কলেজের প্রথম ব্রতটি ছিলো আরবী ভাষায়, যার অর্থ ছিলো ‘সময় অপচয় করো না’, ‘Do Not Waste Your Time’।

আমার খুব ভালোভাবেই মনে আছে যে, আমরা কলেজ মনোগ্রামে এই আরবী মটো-টাই দেখেছিলাম ও ইউনিফর্মে পড়েছিলাম। স্পষ্ট আরবীতেই হলুদ রঙে তা লেখা ছিলো। যতদূর জানি মটো-টা পবিত্র কোরাণের একটি আয়াত (হাদিসও হতে পারে)।

শ্রদ্ধেয় বাকীয়াতুল্লাহ স্যার অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে প্রথম মটো-টি পরিবর্তিত হয় নি। মটো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, পরবর্তি অধ্যক্ষ কমান্ডার আবুল হোসেন মিঞা স্যারের শাসনামলে।

তারপর সব ক্যাডেটদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা চাওয়া হয়! পবিত্র কোরাণের একটি আয়াত পরিবর্তন করে হঠাৎ মানুষের দেয়া একটা মটো কেন গৃহিত হবে তা আমার ঠিক বোধগম্য নয়! কে/কারা কেন এই মটো পরিবর্তন-এর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো তাও আমরা জানিনা। যাহোক, আমিও তখন একটা মটো প্রস্তাব করে কাগজে লিখে জমা দিয়েছিলাম। আমার প্রস্তাবিত মটো-টি ছিলো ‘ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হও’।

ফাইনালী ‘আলোকের অভিসারী’-টা চূড়ান্তভাবে গৃহিত হয়। যতদূর জানি মটো-টি প্রস্তাব করেছিলেন জনাব ‘নূরুল হক’ স্যার (এই নামটা আমাকে বলেছিলেন মরহুম রকিবুল হাসান স্যার)।

আমি কয়েক বৎসর আগে একবার আমার মেমোরী পরীক্ষা করার জন্য রকিবুল হাসান স্যার-কে ফোন করেছিলাম, বিষয়টি ভেরিফাই করার জন্য, যদিও আমার স্পষ্টই সব মনে আছে! তিনি আমার সাথে একমত হয়েছিলেন। আমি জানতে চেয়েছিলাম, “এখন এটা লিখিতভাবে কোথাও পাওয়া যাবে কিনা?” সেটা স্যার বলতে পারেননি, কারণ কলেজের প্রথম ছাপানো ম্যাগাজিনে দ্বিতীয় মটো-টি আছে।

আমাদের দেশে আর্কাইভিং বিষয়টি এই একবিংশ শতাব্দীতেও খুব একটা প্রচলিত নয়। আর সেই সময় তো ছিলো-ই না। তাই তথ্য পাওয়া মুশকিল হবে। তবে ‘প্রিন্সিপাল’স অফিস’-এ পুরাতন ফাইল ঘাটলে পাওয়া যেতে পারে। কে মটো-টি প্রস্তাব করেছিলেন, এটা সংরক্ষণ করা তো দূরের কথা, তখনই নূরুল হক স্যারের নামটাও ঘোষণা করা হয়নি। যাহোক এই পরিবর্তনের ঘটনা-টি ঘটেছিলো কমান্ডার মিঞা স্যারের সময়কালে। ১৯৮২-৮৩ শিক্ষা বৎসরে।

আমরা ক্লাস সেভেন-এর ছেলেরা তখন ‘অভিসার শব্দটি বুঝতাম না। তাই শ্রদ্ধেয় রকিবুল হাসান স্যার, একটি ক্লাসে আমাদের ব্যাচ-কে অভিসার শব্দটির অর্থ কাব্যিক ভাষায় বুঝিয়েছিলেন: প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল যখন গোপনে শঙ্কিতভাবে কোথাও দেখা করে বা মিলিত হয় তাকে অভিসার বলে। আমার মনে তখনি একটা খটকা লেগেছিলো, আলোক মানে জ্ঞান বা সত্য, তার সন্ধানে আমরা অভিসার মানে গোপনে দেখা করবো কেন? আলোকের সাথে তো প্রকাশ্যে অভিযান করে দেখা করা উচিৎ। তাই মটো-টি তখনই আমার পছন্দ হয়নি!
তবে শ্রুতিমধুর, ও কাব্যিক একটি মটো!

প্রতিটি ওল্ড জেনারেশনই তাদের নিউ জেনারেশন-এর প্রতি হতাশা ব্যক্ত করে। পূর্ববর্তি জেনারেশন মনে করে যে, তারা যেরকম কষ্ট-ক্লেশ করে জীবনে কিছু অর্জন করেছে, তাদের পরবর্তি জেনারেশন সেরকম হতে পারছে না! অথবা তাদের সময়টা ভালো ছিলো, বর্তমান জেনারেশন অভাগা, তারা তেমন ভালো কিছু পাচ্ছে না। এই বিষয়ে রাশিয়ান লেখক ইভান তুর্গেনেভ-এর লেখা আছে, যেখানে পিতা তার পুত্রকে বলছেন, “আমাদের সময়ে বসন্তকালে কত ফুল ফুটতো এখন আর সেরকম নাই।” অপর এক রাশিয়ান বৃদ্ধ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “কখন ভালো ছিলো? আগে না এখন?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আগে, অবশ্যই আগে!” এবার প্রশ্নকর্তা বললো, “আপনি যখন কিশোর ছিলেন, তখন তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিলো, বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় কি আপনি ভালো ছিলেন?” বৃদ্ধ উত্তর দিলো, “না না, যুদ্ধের মধ্যে ভালো থাকি কি করে? জীবন প্রতিটি মুহূর্তে ছিলো ঝুঁকির মধ্যে। তাছাড়া অনেক সময় তো ঠিকমত খাওয়াই জুততো না!” প্রশ্নকর্তা আবার বললো, “তারপর হয়েছিলো কম্যুনিস্ট বিপ্লব। এরপর দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ! এর মধ্যে কি আপনি ভালো ছিলেন?” বৃদ্ধ উত্তর দিলো, “না না। একদম না। খুব দুঃসময় ছিলো!” প্রশ্নকর্তা আরেকটি প্রশ্ন করলো, “এরপর শুরু হয় কম্যুনিস্ট দমন-পীড়ন ও গণহত্যা। আপনি তখন যুবক। এর মধ্যে কি ভালো ছিলেন?” বৃদ্ধ পুণরায় উত্তর দিলো, “কি ভয়াল ছিলো দিনগুলি! ওর মধ্যে শুধু আমি কেন? কেউই ভালো ছিলো না!” প্রশ্নকর্তা অপর একটি প্রশ্ন করলো, “তারপর আপনার যখন মাঝ বয়স, তখন শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ঐ যুদ্ধের ডামাডোলে কি আপনি ভালো ছিলেন?” বৃদ্ধ করুণ স্বরে বললো, “না বাবা, একদম ভালো ছিলাম না।” এবার প্রশ্নকর্তা হেসে বললো, “তাহলে যে আপনি শুরুতে বললেন, আগে ভালো ছিলো?!” এবার বৃদ্ধ কাষ্ঠ হাসি হেসে বললো, “না মানে আমি তো তখন ইয়াং ছিলাম। বন্ধু-বান্ধব ছিলো, আড্ডাবাজী ছিলো, বান্ধবীদের সাথে মধুর সময় কেটেছে, যা এখন আর আমি পারি না! তাই মনে হয় যে, আগে ভালো ছিলো, এখন নয়।”

আসলে বিষয়টা সেরকমই, আসলে যার যার বসন্ত, তার তার কাছে সুন্দর! যার যার জীবনের কৈশোর বা যৌবনকালটা তার তার কাছে সুন্দর, তা সে যেই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই হোক না কেন! ক্যাডেট কলেজে একজন প্রবেশ করে বাল্যের চঞ্চলতা নিয়ে, সেখান থেকে বেরিয়ে যায় যৌবনের উদ্দামতা নিয়ে। যে কোন মানুষের জীবনেই এটা তার শ্রেষ্ঠ সময়! তাই সেই সময়ের প্রতিটি ঘটনাই মনে পড়ে এই সেদিনের মত!

আমার মনে পড়ে কলেজে থাকাকালীন দুইটি ভূমিকম্পের কথা। এর মধ্যে প্রথমটি আমি একদম টের পাইনি! সেটা ছিলো ১৯৮৬ সালে। রাত সাড়ে নয়/দশটা হতে পারে। সামনে ছিলো ইন্টার হাউজ কালচারাল কম্পিটিশন। আমরা হজরত শাহজালাল (র.) হাউজের পার্টিসিপেন্টস-রা টিভি রুমে বসে মহাআনন্দে প্রাকটিস করছিলাম। যতদূর মনে পড়ে উচ্চকন্ঠে দলীয় সঙ্গীত গাইছিলাম, ‘বৈশাখের ঐ রুদ্র ঝড়ে, আকাশ যখন ভেঙে পড়ে, ছেঁড়া পাল আরো ছিঁড়ে যায়। হোওওও ওহোও হোওওওওও!!!!!!!!!!’ গানের এই উন্মাতাল তানে, বাইরে রোজ কেয়ামত হলো, না কি হলো কিছু টেরই পেলাম না!

গান শেষ হলে একটা শোরগোল শুনলাম। রানা ভাই (আবৃত্তিকার) বললেন, “এই কিছু একটা হৈ চৈ হচ্ছে!” উনার কন্ঠে ছিলো উৎকন্ঠা! এবার আমরা সবাই টিভি রুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। এখানে করিডোর থেকে এইচ শেইপড হাউসের ভিতরের অংশটা দেখা যায়, যার ওপেন স্পেস খুব ছোট, কোন মাঠ নয়, মাঠের অবস্থান অপর পাশে। আমরা দোতলা থেকে নীচের দিকে উঁকি দিলাম। দেখলাম, সেখানে কিছু ক্যাডেট দাঁড়িয়ে আছে। আমাদেরকে দেখে তারা একটু বিস্মিত চোখে তাকালো। আমরাও তাদের দিকে বিস্মিত নয়নে চাইলাম। তারপর রানা ভাই বললেন, “বোধহয় ভূমিকম্প হয়েছে!”

তারপর যা যা শুনলাম সব মিশ্র কথন! সেখানে ভয়াবহতা আছে, আধ্যাত্মিকতা আছে, আছে হাস্যরসও। পরবর্তি পর্বে তা লিখবো।

(চলবে)
—————————————————
রচনাতারিখ: ৪ঠা নভেম্বর, ২০১৯
সময়: রাত ১টা ১৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.