ভালোবাসার ইমারত (১)

ভালোবাসার ইমারত (১)
——————– রমিত আজাদ

ইমারতগুলো ভেঙে ফেলা হবে! কথাটা শুনতে পেয়েছিলাম কয়েক বছর আগেই। সে মুহূর্তে খচ করে উঠেছিলো হৃদয়ে। আর এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার পর, বুকের ভিতরে মুগুর ভাঙার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আজ থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে প্রথম দেখা হয় ইমারতগুলোর সাথে। প্রথম দর্শন, প্রথম প্রেম! প্রথম দর্শনেই প্রেম!

রাজধানীর পথে পথে ঘুরে ও খেলে কেটেছে আমার ছেলেবেলা। লেখাপড়াও শুরু করেছিলাম রাজধানীরই একটি বিদ্যালয়ে। তারপর গুরুজনদের সিদ্ধান্ত ও উদ্বুদ্ধকরণে, শুরু হলো আমার প্রচেষ্টা; সেই সময়কার দেশের সেরা বিদ্যাপিঠে ভর্তির আকুতি। প্রচেষ্টা বিফল হয়নি। অবশেষে কিশোর বয়সেই হাতে পেয়েছিলাম প্রতিক্ষিত একটি চিঠি, আমাকে ভর্তির অনুমতি দিয়ে ডাকছে একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানটিকে পুরো অবয়বে আমি ইতিপূর্বে কখনোই দেখিনি, শুধু প্রসপেক্টাস নামক একটি পুস্তিকার কল্যাণে দেখেছিলাম পাহাড়ী নৈসর্গিক দৃশ্যের পটভূমিতে একটি সুবিশাল ইমারতকে।

পাহাড় ছিলো আমার স্বপ্ন! সমতলভূমির সন্তান বলে তখনো পাহাড় দেখা হয়ে ওঠেনি। ছেলেবেলায় যে দু’একটি জায়গায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেদিকেও পাহাড় ছিলো না। বইপত্রে পড়েছিলাম, রূপসী বাংলা মায়েরই একপাশে রয়েছে তার এক অপরূপা কন্যা, নাম তার ‘সিলেট’। সিলেটের মূল পরিচয় বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। তদুপরী সেখানে একাধারে রয়েছে পাহাড়, শ্যামল বন আর চা-বাগান।

সেই সময়ের দৈন্যদশা বাংলাদেশে এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়াটা ছিলো অনেকটা বিদেশ যাত্রার মত। ১৯৮২ সালের ৬ই জুন হয়েছিলো আমার সেই আকাঙ্খিত বিদেশ যাত্রা। দুপুরের দিকে ট্রেন থেকে নেমেছিলাম সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে। শত শত পারাবত শোভিত কিনস ব্রীজ পার হয়ে, মধ্যহ্ন ভোজের বিরতি নিয়েছিলাম অপ্রমত্তা নিষ্পাপ নদী সুরমা-র তীরের সার্কিট হাউসে।

তারপর একটি অর্ধখোলা জীপে চড়ে এগিয়ে চললাম প্রতিক্ষিত সেই প্রতিষ্ঠানটির দিকে, নাম তার ‘সিলেট ক্যাডেট কলেজ’। শুনেছিলাম, শহরের কোলাহলের বাইরে তার অবস্থান। যদিও সিলেট তখনো কোলাহলময় শহর হয়ে ওঠেনি। সেখানে শহরের ভিতরেই ছিলো শান্ত সবুজের ছোঁয়া। একটা জায়গায় এসে বুঝতে পারলাম যে, শহর ছাড়িয়ে ফেলেছি। তারপর হঠাৎ ঝলকানী!

বনের সবুজ, অম্বরের নীল আর চা-বীথিকার ঢাল মিলিয়ে যে সমন্বিত সৌন্দর্য্যের দেখা মিললো তাকে ভূ-স্বর্গীয় না বললে যথামূল্য দেয়া হবে না। লাক্কাতুরা ও মালিনীছড়া চা বাগানের সৌন্দর্য্য এতগুলো দশক পরেও মন কাড়বে যে কোন পর্যটকের। ঐ সৌন্দর্য্যের উদরের ভিতরেই ফুটে উঠলো আরেকটি লাবণ্য! ‘সিলেট ক্যাডেট কলেজ’! যা দেখলাম তার সাথে যে ভবিষ্যতের পুরো জীবনটাই বাঁধা হয়ে যাবে তা তখনও বুঝতে পারিনি। সেই শ্যামলিমা ভূ-স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের পটভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলো বিশাল বিশাল কিছু ইমারত।

কলেজে ক্যাম্পাসে প্রবেশের বর্তমান প্রবেশ পথটিকে আমার কাব্যিক মনে হয় না। সেই সময়ে জেল্লাময় প্রবেশদ্বার না থাকলেও একটি কাব্যিক প্রবেশপথ ছিলো। কেউ যদি সিলেট শহর থেকে আসতো, তাহলে তাকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে কলেজের পুরো ক্যাম্পাসটা অতিক্রম করে কলেজ সীমানার সর্বদক্ষিণে একটি প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকতে হতো। এরপর কলেজ ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে যাত্রা শুরু হতো, পথের দুইপাশের বীথিকার অভ্যর্থনা দিয়ে। চলার শুরুতে বাঁ পাশে ছোটখাট একটা বনের মতই ছিলো। তারপর ফুটে উঠতো একটি বিশাল ইমারত, নাম তার ‘প্রশাসন ভবন’। তার পরপরই দেখা মিলতো আরেকটি অট্টালিকার, এর নাম ‘এ্যাকাডেমিক বিল্ডিং’। সাদা ও মেরুন রঙের সংমিশ্রণে নকশা কাটা ছিলো দুটো ইমারতেই। সাদার উপর মেরুন রঙের স্ট্রাইপ অসম্ভব গাম্ভীর্য্য এনে দিয়েছিলো তাদের মধ্যে। এই দুটি ইমারতের পর সামান্য ফাঁকা জায়গা, যেখানে ছিলো একটি ‘শহীদ মিনার’। আর তারপর সবচাইতে বিশাল ইমারতটি গেথে ও ছড়িয়ে ছিলো ক্যাম্পাসের একটি বিশাল অংশ জুড়ে, এর নাম ‘হাউস’, মানে ক্যাডেটদের ছাত্রাবাস।

একজন নভিস ক্যাডেট হিসাবে আমি প্রথম যেই ইমারতটিতে প্রবেশ করেছিলাম, তা ছিলো এই ‘হাউস’। বৃহৎ অট্টালিকার দোতলার সবচাইতে পাশের বা প্রথম কামড়াটিতে স্থান হয়েছিলো আমার। হয়েছিলো ক্যাডেট জীবনের শুরু। এই ক্যাডেট জীবনে ভালোবাসা যেমন স্থাপিত হয়েছিলো কলেজের সকল ক্যাডেট, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাশ্রেণীর মানুষদের সাথে, তেমনি ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো, ঐ বিশাল ইমারতগুলির সাথেও।

পাঠকগণ আমার এই লেখা ঐ ইমারতগুলিকে নিয়ে। ইমারতগুলির প্রতিটি ইট-কাঠ-রডের সাথে মিশে থাকা আমার/আমাদের আকুল স্মৃতি নিয়ে।

(চলবে)
————————————————–
রচনাতারিখ: ৫ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: দুপুর ১২টা ৩১ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.