ভালোবাসার ইমারত (৪)

ভালোবাসার ইমারত (৪)
——————– রমিত আজাদ

ইমারতে রহস্য ছিলো, অতৃপ্ত আত্মাদের দীর্ঘশ্বাসের রহস্য! ঐ বড় ভাইয়ের কাছে এমন ভয়ংকর কাহিনী শুনে আমাদের তখন একটু অন্ধকার হলেই ভয় লাগতো। ছমছম করে উঠতো শরীর। মনে হতো আঁধারের সুযোগ নিয়ে এই বুঝি অশরীরি কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লো!
মানুষ নিজেই কম রহস্যময় নয়! যেই গল্প শুনলে তার ভয় লাগবে, সেই গল্পটাই বেশী বেশী শুনতে চায়। আমরাও তাই ছিলাম ভয়ের গল্প শুনতে চাইতাম। বড় ভাই কাউকে যদি পেতাম যিনি এই গল্প শোনাতে পছন্দ করেন তাকে বলতাম, “বলেন ভাইয়া, কি হয়েছে খুলে বলেন”। তিনি ঘনিয়ে ঘনিয়ে বলতেন, “আর ভাই বলোনা, কলেজটা তো ছিলো ক্যাম্প। যুদ্ধ-বিগ্রহের ব্যাপার। কত জনকে যে হত্যা করা হয়েছে! পাকিস্তানীরা নিজেরাও তো মারা পড়তো যুদ্ধে, তাদেরকেও তো কবর দেয়া হতো এখানে। এখন রাত-বিরাতে কি সব দেখা যায়! একবার তো এক্স ভাইয়ে যা দেখলো …………..।” একদিকে আমরা এইসব গল্প শুনতাম, আরেকদিকে লাইটস আউটের পর ভয়ের চোটে কম্বল মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাতাম। তখন লোড-শেডিং হত কম, আবার কলেজে কোন জেনারেটরও ছিলো না। একদিন প্রেপ ক্লাসের সময়, গেলো লাইট চলে। ব্যাস পুরো কলেজ অন্ধকার। আমি তখন ছিলাম ফর্ম লীডার। এরকম পরিস্থিতিতে ক্লাস শান্ত রাখা ফর্ম লীডারের দায়িত্ব। ক্লাস শান্ত রাখবো কি, নিজেই ভয়ে অস্থির! আর ক্লাসরুমের জানালার পাশে বসা ‘ত’ উচ্চস্বরে কান্না জুড়ে দিলো। তার পাশে বসা ঘনিষ্ট বন্ধু ‘শ’ বলে “কিরে তুই কান্না করিস কেন?” ‘ত’ কানতে কানতে বলে, “আমি জানি ঐ পাহাড়ে এটা-ওটা আছে! হু হু হু হু!!!!” লাইট না আসা পর্যন্ত সে আর ঠান্ডা হলো না!!!

ক্লাস প্রমোশন হলে রুম চেইঞ্জ হয়। ক্লাস এইটে আমাদের আর রুম লীডার থাকলো না। নিজেরাই রুম লীডার হলাম পরবর্তী ক্লাসের ক্যাডেটদের খবরদারী করার জন্য। পরের বৎসর, আমরা যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন আর ৩৪ নাম্বার রুমে থাকিনা। ঐ করিডোরেই অন্য একটি রুমে থাকি। সেই রুমে যাওয়ার পর একটা রহস্যময় ঘটনার মুখোমুখি হলাম! হঠাৎ হঠাৎ রুমের সিলিং-এ একটা শব্দ হতো। শব্দটার কোন সুনির্দিষ্ট সময় ছিলো না, যে কোন সময়েই হতো। কখনো বিকালে, কখনো সন্ধ্যায়, কখনো মাঝরাতে। প্রথম দিকে ভেবেছিলাম আমাদের উপর তলায় সুরমা হাউজে এই রুমে যারা থাকে, তারা হয়তো পা দিয়ে এরকম কোন শব্দ করে থাকে। এক সন্ধ্যারাতে এরকম শব্দ শুনে ভাবলাম নাহ্‌, উপর তলায় গিয়ে দেখা দরকার, ওরা এরকম শব্দ করে কেন। বিনা অনুমতিতে ইন্টার হাউজ ভিজিটিং নিষিদ্ধ, তাই চট করে উপরে যাওয়ার রিস্ক আছে। ধরা পড়লে পানিশমেন্ট নিশ্চিত। আবার এই ইস্যু নিয়ে স্যারের কাছে অনুমতি চাইতে গেলে হয় হাসাহাসি হবে, নয়তো ধমক শুনতে হবে। যেহেতু ক্লাস নাইনে উঠেছি, তাই কিছুটা লায়েকও হয়ে গিয়েছি। যা থাকে কপালে বলে, কারো অনুমতি ছাড়াই চলে গেলাম তিনতলায়। ভাবটা এমন ছিলো যে, আজ ব্যাটাকে ধরবো-ই। উপরে গিয়ে দেখি ঐ রুমের বাসিন্দা আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়, সবচাইতে ভদ্র মানুষটি। ওকে দেখে তো আমার রাগ জল হয়ে গেলো। সে আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে বলে, “কি রে ভাই আমাদের রুমে হঠাৎ কি মনে করে?” ঘটনা খুলে বললাম বিস্তারিত। তারপর সে বললো, “শব্দটা আমিও শুনতে পাই। তবে উপরে না, পায়ের নীচে।” দুয়ে দুয়ে চার তো হলো। আমরা দোতলায় বসে শব্দ শুনি সিলিং-এ, আর তিনতলায় বসে ও শব্দ শোনে পায়ের নীচে। কিন্তু শব্দটার উৎস কি? সেই রহস্যটা রয়েই গেলো। এই নিয়ে আমরা রুমমেট-রা অনেক গবেষণা করেছিলাম। এমনকি গভীর রাতে গা ছমছম করা ছাদেও উঠেছিলাম। সেখানেও অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবে সেই গল্প পরে বলছি।

একবার রাতে হাউজ থেকে তাকিয়ে দেখলাম দূরে এ্যাকাডেমিক ব্লকের দোতলার সিঁড়িতে কে যেন দাঁড়িয়ে। এত রাতে ওখানে ক্যাডেট তো দূরের কথা, গার্ডদেরও থাকার কথা নয়। তাহলে ওটা কে দাঁড়িয়ে? এই দেখে গায়ে কটা দিয়ে উঠেছিলো! এরকম একদিন না পরপর কয়েকদিন দেখেছিলাম। পরে অবশ্য সেই রহস্যের সমাধান হয়েছিলো। তবে এই গল্পটাও পরে বলবো।

ঐ যে বললাম, ভয় পাই তবুও আগ্রহ কমে না; রহস্যর দিকে যেতেই থাকি। ক্লাস ইলেভেনে উঠে আমার সাহস বেড়ে গিয়েছিলো, আবার ভয়ও ছিলো মনে, মিশ্র অনুভূতি যাকে বলে। একবার মাথায় রোখ চাপলো, ভাবলাম দেখি না কি আছে, যা থাকে কপালে। কোন এক ছুটির সন্ধ্যারাতে এ্যাকাডেমিক ব্লক যখন জনশূণ্য, তখন ঐ ইমারতের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত অডিটোরিয়ামের পিছন থেকে যাত্রা শুরু করলাম একা, এ্যাকাডেমিক ব্লক-এর পিছনের পেয়ারা বাগানের একপাশ দিয়ে হেটে গেলাম, জনমানবশূণ্য বাগানের মধ্যে ঘুটঘুটে অন্ধকার, গায়ে কাটা দিচ্ছিলো, তারপরেও কৌতুহলের কমতি নেই; একপাশে বাতিনিভানো ইমারত, আরেকপাশে ঘোর অন্ধকার পাহাড়, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ধ্বনি ছাড়া আর কোন শব্দ নেই, তার মধ্যের বাগানের ভিতর দিয়ে হেটে হেটে পুরো বাগানটা পার হলাম। মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ছিলাম। যাহোক এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল হলো, নিরাপদে শেষ মাথা পর্যন্ত পৌঁছালাম।

এরকম আরো দুএকটি এক্সপেরিমেন্ট আমি আগে-পরে করেছিলাম, তবে ইমারতগুলো কখনো বিট্রে করেনি। জানিনা কোন সুক্ষ্মতায় ইমারতের প্রাণ-অনুভূতি আছে কিনা? তবে ইমারতগুলি আমাদের সব সময় আগলে রেখেছিলো।

(চলবে)
—————————————————–
রচনাতারিখ: ৯ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: রাত ৩টা ৪৭ মিনিট
——————————————————–

বারিষ নামে সিলেট জেলায়, আকাশ ভাইঙ্গা কান্দে,
কান্দে যত দালান-কোঠা, ইমারতও কান্দে!
ইমারতের দিন ফুরাইছে, হাতুর দিয়া ভাঙ্গে,
চোখের সামনে ঘর ভাঙতাছে, ক্যাডেট সকল কান্দে!!!

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.