ভালোবাসার ইমারত (৫)

ভালোবাসার ইমারত (৫)
——————– রমিত আজাদ

ইমারতগুলিতেই রয়েছে বড় ভাইদের স্নেহের স্মৃতি। আমাদের সৌভাগ্য যে, ১৯৮২ সালের ৬ই জুন আমরা যখন কলেজে প্রবেশ করি, কলেজের ফার্স্ট ব্যাচ তখনও কলেজে অবস্থান করছিলেন। উনাদের এইচ.এস.সি. পরীক্ষা তখন শেষ, বিদায়ের অপেক্ষা করছিলেন তারা। সেই সময়ে উনাদের চোখে আমরা ছিলাম সব চাইতে ছোট ভাই। সদ্যজাত বলা যায়। পরিবারে সদ্যজাত ছোট ভাইটিকে যেমন সবচাইতে বড় ভাই মোটেও শাসন করেন না, শুধুই ভালোবাসেন। আমাদের অবস্থাও হয়েছিলো তাই। ফার্স্ট ব্যাচের কাছ থেকে আমরা পেয়েছিলাম শুধুই ভালোবাসা!

বিশাল ইমারতটির একপাশে থাকতেন উনারা ফার্স্ট ব্যাচ, আরেকপাশে থাকতাম আমরা সেভেন্থ ব্যাচ। মাঝখানে অন্যান্য সিনিয়র ভাইদের বসবাস। ফার্স্ট ব্যাচের ভাইয়ারা মাঝে মাঝে আমাদের দেখতে আসতেন, খোঁজ-খবর নিতেন। একদিন এলেন নূর হোসেন ভাই (ফার্স্ট ব্যাচ-এর কলেজ ক্যাপ্টেন)। পরম স্নেহ নিয়ে কথা বললেন আমাদের সাথে। একটা সুন্দর উপদেশ দিয়েছিলেন, “ক্যাডেট কলেজ মানে নানান রকম পানিশমেন্ট, এটাই সবার ধারনা। তোমরা কিন্তু ঐভাবে নিয়োনা। শক্তপোক্ত হতে গেলে তো ফিজিকাল ট্রেইনিং লাগবেই। পানিশমেন্ট-কে সব সময় ফিজিকাল ট্রেনিং হিসাবে নেবে।” আরেকদিন উনাদের ডাকে আমরাই গেলাম উনাদের ব্লকে। একরুমে শামস ভাই (বর্তমানে লে. জেনারেল ও কিউ.এম.জি.) ও অন্যান্য ভাইয়ারা ছিলেন। সবাই মধুর স্বরে আমাদের সাথে কথা বললেন ও প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন। এর কিছুদিন পর ভাইয়ারা কলেজ ত্যাগ করেন। তবে উনাদের নাম ছিলো সবার মুখে মুখে। উনাদেরও কলেজের প্রতি ভালোবাসা ছিলো অপরিসীম, সুযোগ পেলেই উনারা কলেজে চলে আসতেন, আমাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন ঐ ইমারতগুলোর মধ্যে, কখনো কমনরুমে কখনো রিডিংরুমে। এইভাবে আমাদের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন জেনারেল শামস ভাই, ডাক্তার শাকিল ভাই, জেনারেল মাসুদ রাজ্জাক ভাই, ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল ভাই, মেজর শাখাওয়াৎ ভাই ও অন্যান্য বড় ভাইয়ারারা। বাড়ীর বড় ভাই সুপ্রতিষ্ঠিত হলে, পরিবারের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা যেমন অনুপ্রাণিত হয়; আমরাও তেমনি আমাদের প্রথম ব্যাচের সাফল্যে ব্যাপক অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

আমাদের আরেকজন প্রিয় মুখ ছিলেন সেকেন্ড ব্যাচের শহীদ ভাই (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। তিনি ছিলেন ডাইনিং হল প্রিফেক্ট। অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। তাই তিনি ছিলেন আমাদের ‘ওয়ান অব দি আইডলস’। আমরা যখন ক্লাস সেভেনে কয়েকদিন পার করেছি, তিনি একদিন আমাদের পুরো ব্যাচ-কে ডেকে ইমারতের দোতলায় সর্বপশ্চিমে উনার নিজ কক্ষের সামনে করিডোরে দাঁড় করিয়ে একটা অনুপ্রেরণাদায়ক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। উনার ঐ বক্তৃতার বেশীরভাগ কথাই আমার এখনো মনে আছে। উনার বক্তৃতাটি আমাদের পুরো ব্যাচকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে পুরো ক্যাডেট লাইফ, প্লাস পুরো জীবন। সেকেন্ড ব্যাচের ভাইয়ারা ছিলেন আমাদের প্রথম কমান্ডার, তাই উনাদেরকে দেখলে এখনো ভয় পাই! কলেজ প্রিফেক্ট মহিউদ্দিন ভাই ছিলেন দারুণ স্মার্ট, ইংরেজী বলতেন তুখোড়! পানিশমেন্ট দেয়ার ভয় দেখাতেন প্রচুর, কিন্তু কোনদিনও পানিশমেন্ট দেন নি। জনি ভাই ছিলেন ভীষণ হ্যান্ডসাম, একেবারে ‘জেমস বন্ড’ লুক! জেনারেল হুমায়ুন ভাই ছিলেন চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত! আসিফ ভাই, ফয়সল ভাই, গিয়াস ভাই, মুনির ভাই, এডমিরাল নাজমুল ভাই, সকলেই অত্যন্ত স্নেহার্দ ছিলেন। আরো অনেক ভাইয়া সম্বন্ধেই লেখা উচিৎ, তবে এই লেখার পরিসরে এত স্থান হবে না, পরবর্তি কোন লেখায় তা লিখবো।

আমাদের এক এক ক্লাস প্রমোশন হতো, তার চিহ্ন হিসাবে কাঁধের এ্যাপুলেটে এক একটা রিবন বৃদ্ধি পেত। আবার হাউজ ইমারতে আমরা একটু একটু করে সরে যেতাম পূব থেকে পশ্চিমের দিকে। একদিকে ছিলো প্রমোশন পাওয়ার আনন্দ, আরেকদিকে ছিলো বড় ভাইদের-কে বিদায় জানানোর কষ্ট। ১৯৮৫ সাল হবে, কোন এক বিকেলে আমাদের কলেজের ফোর্থ ব্যাচ কলেজ থেকে বিদায় নিচ্ছে। আমরা সবাই যার যার হাউজে সামনের করিডোরে সিঁড়ির কাছে জড়ো হলাম; উদ্দেশ্য, একযোগে নীচে নেমে উনাদেরকে বিদায় জানাবো। এ’ সময়ে অন্য হাউজের ফোর্থ ব্যাচের ইব্রাহীম ভাই এলেন আমাদের হাউজে, হাউজ মাস্টার স্যারকে বিদায় সালাম জানাতে। তিনি করিডোরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। উনার কান্না দেখে আমার চোখ থেকেও ঝরঝর করে অশ্রু ঝরতে লাগলো। দু’একজন আমাকে স্বান্তনা দিয়ে বললো, “কিরে কাঁদিস কেন? থাক থাক। মন খারাপ করিস না।” একটু পরে সবাই যখন নীচে নেমে হাউজ ইমারতের সামনে দাঁড়ালাম, এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হলো, পুরো ফোর্থ ব্যাচ উচ্চস্বরে কাঁদছে! তাই দেখে কেউই আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। স্বয়ং শিক্ষক-রাও কাঁদতে শুরু করলেন! হাউজের সামনে থেকে হাটতে হাটতে এ্যাকাডেমিক ব্লকের পাশ দিয়ে গিয়ে সবাই উপস্থিত হলাম কলেজ গেইটে। আমরা সেখানে দাঁড়ালাম, ফোর্থ ব্যাচের ভাইয়ারা বাসে উঠলেন। তারা অশ্রুসিক্ত নয়নে চলে গেলেন, আমরা ভেজা চোখে দাঁড়িয়ে রইলাম!

আমাদের এই সকল আবেগ-অনুভূতি, হাসি-কান্না, হৃদয়ের বন্ধন, সবকিছুর নীরব স্বাক্ষী হয়ে রইলো ক্যাম্পাসে ঋজু হয়ে দাঁড়ানো সুবিশাল অট্টালিকাগুলি।

(চলবে)
—————————————————————————————–
রচনাতারিখ: ৯ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: দুপুর ১টা ১৯ মিনিট
——————————————————–

তোমার বুকে তোমার কোলে, তোমার গৃহপাতে,
নিয়েছিলাম ঠাঁই যে মোরা, সাধের ইমারতে।
নিরেট হয়েও ছায়া দিলে তোমার আঁচলপাতে,
দিন ফুরালে গেলেম চলে জীবন নদীর পথে।
তবু তোমায় মনে পড়ে বিকেল-সন্ধ্যা-প্রাতে,
আবার তুমি ডাকছো মোদের মমতারই হাতে।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.