Categories
অনলাইন প্রকাশনা

ভালোবাসার ইমারত (৯)

ভালোবাসার ইমারত (৯)
——————– রমিত আজাদ

ঝড় ভয় পাই। শৈশবে একবার প্রচন্ড কাল বৈশাখী ঝড় শুরু হলো। বলা নেই কওয়া নেই ধম করে উপস্থিত। কোন রকম পূর্বাভাস না দিয়েই! ঝড় যে এসেছে তা জানতে পারলাম, যখন সে আমাদের ঘরের জানালায় আঘাত হানলো। ঝড় এসেছিলো ঝড়ের বেগেই। ধম ধম করে জানালার পাল্লাগুলো পড়তে শুরু করলো। বাড়ীর সকলে দৌড়ে গিয়ে ক্ষিপ্রতার সাথে জানালাগুলো বন্ধ করলো। তখন ঝড় শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ইলেকট্রিসিটি ফেইল করতো। সম্ভবত বিদ্যুৎ বিভাগই দ্রুত সুইচ অফ করে দিতো দুর্ঘটনা এড়ানোর উদ্দেশ্যে। মানে ঝড় এলো, এলো আঁধার, এলো ঝুঁকি, এলো ভীতি। আমরা তখন থাকতাম ঢাকার মগবাজারে তিনতলা বাড়ীর তৃতীয় তলায়। আশেপাশে সব বাড়ী তখন একতলা। অর্থাৎ ঝড়ের মূল আঘাত তখন এই বাড়ীটাতেই সব চাইতে বেশী। আমি ভীষণ ভয় পেতে শুরু করলাম। এর আগে মানুষের মুখে মুখে শুনেছি, এমন সব ঝড় আসে যে ঘরবাড়ী উড়িয়ে নিয়ে যায়! সেই সময়ে বিটিভি-তে একটা ভয়াবহ নাটক দেখেছিলাম, নাম ‘বরফ গলা নদী’। নাটকের মূল কাহিনী এই ঝড়, যার ভয়াল আঘাতে একটি আস্ত ঘর ভেঙে পড়ে ও একটি পুরো পরিবার নিহত হয়। লেখক জহির রায়হান সম্ভবত এই উপন্যাসের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশকেই চিত্রায়িত করেছিলেন! আরেকটি সিনেমা দেখেছিলাম, নাম ‘সীমানা পেরিয়ে’। সেখানেও মূল কাহিনী ছিলো ঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছাস। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকারী জলোচ্ছাস নিয়ে নির্মিত হয়েছিলো সিনেমাটির কাহিনী। আমি ভয়ে ভয়ে ভাবছিলাম, এমন কিছু হতে যাচ্ছে না তো? হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনলাম, আমি ভাবলাম, এবার বুঝি এই দালানটাই ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে! আমি হাত-পা টান করে সোজা হয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিলাম। জানিনা ঠিক কত সময় নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিলাম। তবে বিপদের কালে সময় যায় ধীরে! এক এক সেকেন্ড-কেও এক এক ঘন্টা মনে হয়। যাহোক, দালান ভাঙার মত তেমন কিছু হয়নি সেবার। আসলে ছাদের উপর ছিলো একটা কাঠ-টিনের কন্টেইনার, প্রবল দমকা বাতাস তাকে টেনে ছাদের একপাশ থেকে আরেকপাশে নিয়ে যায়। তারই বিকট শব্দ আমি/আমরা শুনেছিলাম সিলিং-এর উপর।

সিলেট ক্যাডেট কলেজের সেই দূর্গসম ইমারতে যখন রেজিমেন্টাল দিন কাটাচ্ছি, সে সময় একবার হলো প্রবল ঝড়। সেটা ছিলো ১৯৮৫ সালের ২৫শে মে। এই ঘূর্ণিঝড়ে ভেসে গিয়েছিলো সমুদ্র উপকূলের ‘উড়ির চর’ সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ভয়াবহ এই ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ১৫৪ কিমি/ঘণ্টা। ঝড়ের কারণে জোয়ারের উচ্চতা ছিলো ৩.০-৪.৬ মিটার। প্রলংকরী এই ঝড়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো। গ্রিক ভাষার ‘কাইক্লোস’ (Kyklos) শব্দের অর্থ কুন্ডলী পাকানো সাপ, এখান থেকেই ‘সাইক্লোন’ শব্দটির উদ্ভব। সেবারের কুন্ডলী পাকানো বাতাসের সাপটি বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে এসে আঘাতে হানলো এস.সি.সি. ক্যাম্পাস সহ সমগ্র বাংলাদেশে। পাহাড়ী এলাকায় খোলা জায়গায় কলেজের সেই বিশাল ইমারতটি। ইমারত যত বিশালই হোক, ট্রপিকাল কন্সট্রাকশন ডিজাইনে, ছাত্রাবাসের কক্ষগুলির এদিক-ওদিক দুইদিকই খোলা। আইদার দুইদিকে নয়তো একদিকে খোলা করিডোর। তাই যেকোন ঝড়ো বাতাস এলে তার ঝাপটা সরাসরি আঘাত হানে ক্যাডেটদের রুমগুলিতে। সারাটা রাত দমকা হাওয়া কিছুক্ষণ পরপর সাঁই সাঁই করে ঝাপটা দিচ্ছিলো। এ রকম বিপর্যয়ে ঘুমানো যায় না! আমরা টাইট করে জানালা বন্ধ করে রাখলাম। অন্ধকারে বসে দোয়া-দরুদ যা জানি পড়তে থাকলাম। এদিকে করিডোরে কি হচ্ছে তা দেখার সাহস আমাদের হচ্ছিলো না। শুধু বুঝতে পারছিলাম যে, বিভিন্ন অবজেক্ট উড়ে উড়ে যাচ্ছে। আমরা ভয়ে ভয়ে কোনরকমে ভয়াল রাতটা পার করলাম। ভোররাতের দিকে ঝড়ের বেগ কমে এলে, ফোর্থ ব্যাচের সাহসী ক্যাডেট আমীর ভাই একটা টর্চ নিয়ে আমাদের জুনিয়রদের রুমে রুমে গিয়ে খোঁজ নিলেন কে কেমন আছে। উনাকে দেখে আমরা ধরে প্রাণ ফিরে পেয়েছিলাম। ছোট ভাইদের প্রতি সিনিয়র ভাইদের এই ভালোবাসা ক্যাডেট কলেজের একটি অন্যতম গুণ! যা এখনো অটুট রয়েছে। (গত রি-ইউনিয়নেও শেষ সকালটিতে কলেজ ক্যাম্পাসে আমীর ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে ব্রেকফাস্ট করিয়েছিলেন) ঐ ঘটনা থেকে আমিও শিখেছিলাম, কিভাবে বিপদের সময়ে ছোটদের পাশে এসে দাঁড়াতে হয়। পরবর্তিতে ক্লাশ ইলেভেনে-টুয়েলভে অধ্যায়নকালীন সময়ে আমিও এরকম বিপর্যয়ে ছোটদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম।

সকালে দিনের আলো ফোটার পর দেখলাম ধ্বংসযজ্ঞ ছিলো ভয়াবহ। করিডোরের অনেক কিছুই ভেঙে বা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিছু কিছু টানানো বোর্ডে ছিড়ে উড়ে চলে গিয়েছে দূরে। ঐগুলা নিয়ে আবার নবম ব্যাচের ক্যাডেট-রা মেতেছে! তখন ওরা খুব ছোট ছোট ছিলো। কলেজের চতুর্থশ্রেণীর কর্মচারীরা থাকতো পূর্বদিকের কলেজ বাউন্ডারীর পাশে পাহাড়ের দিকটাতে। তাদের অনেকের কাঁচা বাড়ীর ক্ষতি হয়েছে। ওদিকে কলেজ ক্যাম্পাসের উল্টা দিকে ‘বাংলাদেশ বনবিদ্যালয়ের প্রধানের বাসভবনের বাহারী বাংলোটির বিশাল বারান্দার টিনের চালই উড়ে গিয়েছে, একপাশ ভেঙে গিয়েছে। (বনবিদ্যালয়ের প্রধানের এক সুদর্শন ছেলে আবার কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের এক্স ক্যাডেট ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে আমাদের ক্যাম্পাসে আসতেন, আমাদের সাথে গল্পগুজব করতেন)।

এই বিপর্যয়ের পর বেশ কয়েকদিন সিলেটের এদিকটাতে বিদ্যুৎ ছিলো না। সম্ভবত বাতাসের ঝাপটায় বিদ্যুৎের পিলার উপড়ে পড়েছিলো, তার ছিড়ে গিয়েছিলো! তাই বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো। আমরা দিনের কলেজ এক্টিভিটিজগুলো মোটামুটি করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সন্ধ্যা বা রাতের এক্টিভিটিজে অনেক সমস্যা হচ্ছিলো। কিভাবে সমস্যার সমাধান হবে তাও বুঝতে পারছিলাম না। তবে একটা জিনিস বেশ ভালো বুঝতে পারছিলাম যে, এই আধুনিক যুগ এমন এক যুগ, যেখানে ইলেকট্রিসিটি ছাড়া জীবন দুর্বিসহ! যাহোক দু’দিন পরে একটা এ্যাসেম্বলি কল করা হলো, তখন আমাদের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক মাসুদ হাসান স্যার। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ একজন কিংবদন্তী শিক্ষক। ঐ বয়সেও তিনি ছিলেন ভীষণ স্মার্ট! স্যার কলেজের সব ক্যাডেটদেরকে ডাইনিং হলে জড়ো করে, আধো অন্ধকার ডাইনিং হলে চমৎকার একটি বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতার অংশবিশেষ আমার মনে আছে, “কদিন যাবৎ অত্র এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। এতে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। ভৌগলিক বিপর্যয়ের কারণে এটা হয়েছে। আমরা বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছেন, আমাদেরকে ও এয়ারপোর্টকে প্রাধান্য দিয়ে তার দ্রুত গতিতে কাজ করছে। আশা করি দ্রুতই কাজ সম্পন্ন হবে। এর মধ্যেই লেখাপড়া ও অন্যান্য কাজ চালিয়ে যাও। তোমরা মনোবল হারাবে না। মনে রাখবে ‘সারভাইবল ফর দ্যা ফিটেস্ট!’ ” স্যারের এই ‘সারভাইবল ফর দ্যা ফিটেস্ট’ আমি সারা জীবন মনে রেখেছি।

(চলবে)

‘বছর ঘুরে এলো সেই খুশীর ঈদ।
খুশী তো আসে না মনে, আসে না তো গীত,
বারে বারে মনে পড়ে সেই রাত্রী,
যে রাতে ঝরে গেছে শত পাপড়ি।’

(উপরের গানটি ঐ প্রলয়ংকারী ঝড়ের পর ঈদের রাতের বিটিভি অনুষ্ঠানে নাজমা জামানের গাওয়া একটি মন কাড়া ব্যাথা জাগানো গান)

(আমার ইতিপূর্বের পর্বগুলিতে দিকভ্রম হয়েছিলো, কেন হবে না বলেন? প্রায় চার দশক আগের কথা! তবে ভুলটা ধরিয়ে দিলেন আমার চাইতেও প্রবীণ ব্যাক্তি, তাও আমারই শিক্ষক, শ্রদ্ধেয় শহীদুল ইসলাম স্যার। শিক্ষক মানেই শিক্ষক, স্যারের স্মৃতিশক্তি আমার চাইতে অনেক বেশী। স্যারকে স্যালুট! কলেজ ক্যাম্পাসে যেদিকে পাহাড় সেটা পূর্বদিক, এয়ারপোর্ট রোডটা ক্যাম্পাসের পশ্চিম দিকে, হাউজের উত্তর দিকে এ্যাকাডেমিক ব্লক, হাউজের দক্ষিণদিকে ডাইনিং হল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমার ভুলটা ধরিয়ে ঠিক করে দেয়ার জন্য শহীদুল ইসলাম স্যার-কে আরেকবার ধন্যবাদ জানাই)

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৫ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: দুপুর ৩টা ১৬মিনিট
—————————————————————————-

এই নিকেতন আমার যে ঘর
———————————- রমিত আজাদ

খোল্ সিম সিম, খোল্ সিম সিম, ইমারতের দুয়ার খোল্,
এই নিকেতন আমার যে ঘর, আমার প্রিয় বাসস্থল!
দ্বার-দুয়ারের মন্ত্র আছে, আমার বুকের অন্তরে,
হৃদয় মাঝে আছড়ে পড়ে, মাতৃস্নেহের প্রান্তরে।

কান্না-হাসি, মধুর বাঁশি সুর ছড়াতো অহেতুক,
নিলয়শিশু আমরা ছিলাম দূর ভূবনের আগন্তুক।
তাও তো তোমার বুকের মাঝে বেঁধেছিলাম আপন ঘর,
এখন তোমার যাবার বেলা, আঁখির নীড়ে উঠছে ঝড়!

————————————————————-
কবিতা রচনাতারিখ: ১৩ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: রাত ৮টা ৩৪মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.