অনলাইন প্রকাশনা
ভুতংগম (পর্ব ০২)

ভুতংগম (পর্ব ০২)

ভুতংগম (পর্ব ০২)

—–সাকি বিল্লাহ্

আজ ৬ মাস হয়েছে পত্রিকা অফিসে আর যাইনি । সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পিয়ন দরজার নীচ দিয়ে দুটি চিঠি দিয়ে গেছে । একটিতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” প্রাপকে আমার নাম, ঠিকানা, কিন্তু প্রেরকের কোনো ঠিকানা দেয়া নেই । খুবই অবাক ব্যাপার । অন্যটা এসেছে “সূর্যের দিন” পত্রিকা অফিস থেকে । জরুরী যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে । প্রেরক, সম্পাদক সাহেব, “সূর্যের দিন” পত্রিকা । চিঠি দুইটি টেবিলের উপর রেখে বাথরুমে ঢুকে গেলাম ফ্রেশ হয়ে সোজা নাস্তার টেবিলে, বাবা নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছেন তাই আর দেরী করলাম না । “তোমার পড়ালেখার কি খবর?” বাবা নাস্তা করতে করতে জিঞ্জেস করলেন । আমি উত্তর দিলাম “জ্বি ভালো, দুদিন ছুটি আছে তাই ভাবছি, নানুকে দেখে আসবো”, বাবা কোনো কথা বললেন না । শুধু আ্ওয়াজ করলেন “হুম” ।

নাস্তা সেরে ঠিক করলাম নানুকে দেখতে যাওয়ার আগে পত্রিকা অফিস হয়ে যাবো । সাথে কিছু টাকা, ব্যাগ, টর্চলাইট, সেভিং এর সরঞ্জাম, মোবাইল চার্জার, প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম । সেবার শ্যামপুরে যাওয়ার সময় অনেক কিছুই সাথে ছিল না । তাই এবার মনে করে প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম মগবাজার পত্রিকা অফিসের উদ্দেশ্যে । পত্রিকার সম্পাদক সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত আমার উপর, আমি দীর্ঘদিন কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখিনি । তবে আমার ফিচার শ্যামপুরের সেই ঘটনা নাকি ওনার কাছে খুব ভালো লেগেছে তাই তিনি আবার আমাকে ডেকেছেন । বিশেষত আমার বেতন খুব সামান্য তবে ফিচার জমা দেয়ার পর এককালীন বিশেষ একটা সম্মাননা ভাতা দেয়া হয় । আমার মনে হল আসলে আমার লেখা নয়, অদ্ভুদ ভুতুরে কোন সংবাদ সংগ্রহের জন্য উনি আমাকে ডেকেছেন । আমি জানি আমি ছাড়া আর কেউ এ ধরনের সংবাদ বা ফিচার সংগ্রহের জন্য রাজি হবে না । একবার ভাবলাম চাকুরীটা ছেড়ে দেই কিন্তু সম্পাদক সাহেব বিশেষত আমার উপর আশা করে আছেন তাই তাকে আর নিরাশ করলাম না । বললাম “নানুর বাসায় যাচ্ছি নরসিংদীতে, সেখানে কালীমন্দিরের কাছে শ্বশানঘাটে নাকি ভুতুরে সব ঘটনা ঘটে, যদি সময় পাই একবার যাব, অদ্ভুত ফিচারের জন্য” শুনে সম্পাদক সাহেব খুব খুশি হলেন বিদায় জানিয়ে প্রথমে বাসে পরে ট্রেনে ঘোড়াশাল পৌঁছলাম । সেখান থেকে অটোরিক্সায় সোজা নানুর বাড়িতে । নানু অনেক খুশি হলেন, দুদিন থাকবো শুনে । বাজার করার মতো কেউ নেই, তাই পাশের বাড়ির এক আত্মীয় সম্পর্কে মামা হয়, তাকে নিয়ে বাজারে গেলাম । তার নাম মোবারক, বয়সে আমার সমান হবে । নানু কে না বলে আমি মোবারক মামাকে সাথে নিয়ে রিকসায় বাজারে চলে এলাম । যাবার সময় অনেক ব্যাপারে মোবারক মামার সাথে কথা হল । কালীমন্দির, শ্বশানঘাট ও বাশঁ ঝাড়ের নীচে কবরস্থান নিয়েও অনেক কথা হল । রীতিমত গাঁ শিউরে উঠে সে গল্প শুনে । কিন্তু আমি প্রমানে বিশ্বাসী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এগুলো মানুষের ভ্রান্ত ধারনা । গল্প করতে করতে আবার রিকসা নিয়ে বাজার করে নানুর বাড়িতে চলে এলাম । তখন সবেমাত্র দুপুর ১২টা বেঁজেছে । মোবারক মামাকে বললাম আমি এখানে কেনো এসেছি । শুনে উনি হাসলেন । বললেন অহেতুক ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কি ? বেড়াতে এসেছেন, কয়েকদিন আনন্দ করে যান ।

দুপুরে খাওয়ার সময় উনাকে আর খুঁজে পেলাম না । কিছুক্ষণ পর মোবারক মামা হাজির, আমি ওনাকে আমার চিঠিটা দেখালাম যেটাতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” সে চিঠিটা দেখে “থ” হয়ে গেল, এই লেখাটা তো মনে হয় কোথাও দেখেছি । ওনার ধারনা এ লেখাটা উনি কোনো একটা কবরের উপর ফলকে দেখেছেন, তবে কোন কবরে তা আর এখন মনে করতে পারছেন না । কিন্তু কবরস্থানের নামটা তার নাম মনে আছে । আমি কিছুটা ভয় পেলাম কারণ এ ধরনের চিঠি আমাকে কোন মৃত মানুষের কবর থেকে পাঠিয়েছে তা ভেবে । তবে তা সামলে নিয়ে মোবারক মামাকে বললাম “মামা যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কাল সকালে বা বিকেলে ওই কবরস্থানে একটু ঘুরে দেখতে চাই” , তিনি কিছুটা বিমর্ষভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনার কি মাথা খারাপ, ওখানে কেউ যায় নাকি? এখন তো মানুষ কবর দিতেও ওখানে যায় না, তবে যদি দিনের বেলাতে মানে সকালে যান তাহলে সাথে যেতে পারি” , আমি তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে পরের দিন সকালে যাব মনস্থির করলাম ।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম মোবারক মামার জন্য । নানুকে শুধু বললাম ঘুরতে যাচ্ছি, বিকেলেই চলে আসবো । নানু কিছু বললেন না, শুধু বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস্ । মোবারক অনেক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হল । বললাম এতক্ষণ দেরী হল কেন? ।, সে বলল, ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে তাই । নানুকে বিদায় জানানোর সময় মোবারককে বললাম ভিতরে যেতে, নানুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য । সে বলল “উনি মুরুব্বী মানুষ আমাকে নাও চিনতে পারেন, অনেকদিন দেখেন নাতো আর অহেতুক দেরী করে লাভ কি, আমাদের আগে আগে ফিরতে হবে” , আমি আগেও লক্ষ্য করেছি মোবারক মামা নানুর সামনে যেতে চান না । কেন চান না বুঝতে পারলাম অনেক পরে । যাই হোক ঘর থেকে বের হলাম, দুপুরে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার নিয়ে ব্যাগে রাখলাম, সাথে দুই লিটারের এক বোতল মিনারেল ওয়াটার । মোবারক মামাকে জিঞ্জেস করলাম রিকসা নিতে হবে কিনা ? মনে হল তিনি আমার কথায় বেশ মজা পেয়েছেন । তাই বঁত্রিশ দাঁত বের করে হাসছেন, বললেন “আপনার কি ধারনা পরিত্যক্ত একটা কবরস্থানে রিকসা বা গাড়ী যাওয়ার মনোরম রাস্তা থাকবে, হা…হা….হা..” , আমি কিছুটা বিব্রত হলাম, বললাম “ঠিক আছে চলেন যেভাবে যাওয়া যায়, যদি হেটে যেতে হয় তাহলে আমার কোন সমস্যা নেই” ।

আমরা হাটতে থাকলাম । আমার শরীর ক্লান্ত আর ঘামে ভিজে চুপসে গেছে সারা শরীর আর জামাকাপড়, তবুও হাটছি আর হাটছি । মোবারক এ গ্রামেরই ছেলে তাই হয়তো তার শরীর কোন ঘাম নেই । সে দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে পথ চিনিয়ে চিনিয়ে । প্রায় দু ঘন্টামত হাটার পর জন-মানবহীন নীর্জন এক জঙ্গলে এসে পৌঁছলাম । বড় বড় গাছ আর লতাগুল্ম দিয়ে ঘেরা । সূর্যের আলো এখানে ঝিমিয়ে পড়েছে কিন্তু বেলা বাঁজে ১টা মাত্র । দিক ঠিক করা যাচ্ছে না তবে মোবারক মামার মনে হচ্ছে দিক ঠিক করতে কোন সমস্যা হচ্ছে না । আমি কিছুটা সাহস পেলাম এই ভেবে যে আমি একা নই, মোবারক মামা সাথে আছেন । আরো প্রায় ১ ঘন্টা হাটার পর একটা বিশাল বাঁশঝাড়ের সামনে এসে পৌঁছলাম । আমি দেখলাম এটাকে আসলে আগে বাঁশবাগান বলা হলেও এখন তা বাঁশঝাড় বা বাঁশের জঙ্গলে পরিনত হয়েছে । যে কেউ এখানে একা থাকলে ভয়ে তার অঞ্জান হওয়ার মত অবস্থা হবে । চারদিক ঘন লতাগুল্ম আর বাঁশের ঝোপঝাড় ।

মোবারক মামা আমাকে বললেন “এটাই সেই কবরস্থান এখানে অনেকগুলো কবর আছে তবে কোথায় যে আপনার সেই কথাটা লেখা আছে তা আমি বলতে পারবো না, আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে” আমি আশাহতের মত চারদিকে তাকালাম কারন এখানে কোন কবরই ভালোমত বোঝা যাচ্ছে না । ঝোপঝাড়ের কারনে সব ঢেকে গেছে । কিছুক্ষন পর মনে হল আমার পায়ের নীচে একটা কবর, আমি একটা কবরের উপর দাড়িয়ে আছি । ভয়ে আমার সারা শরীরে শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল । সরে গিয়ে পাশে দাড়ালাম । দুপুর প্রায় আড়াইটা বাজে, ক্ষিদে পেয়েছে তাই ব্যাগ খুলে খাবার বের করলাম মোবারক মামাকে বললাম “আগে খেয়ে নিই, পরে কাজে নামব” , মনে হল তিনি আমার কথায় গুরু্ত্ব দিচ্ছেন না । অন্য দিকে বিমর্ষভাবে তাকিয়ে আছেন । কিছুক্ষণ পর আবার আমি বললাম । মোবারক মামা এবার শুনতে পেলেন, উত্তর দিলেন “আমার ক্ষিদে নেই” , আপনি খেয়ে নিন আমি একটু আসছি, বলে তিনি ঝোপের ভিতর চলে গেলেন । আমি খাওয়া সেরে অনেক্ষণ তাকে খুঁজলাম । নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকলাম । ভাবলাম হয়ত সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে । চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, এখন প্রায় বেলা ৫টা বাঁজছে । সূর্য হেলে পড়াতে বাঁশঝাড়ের ভিতরে অন্ধকার নেমে এসেছে । আমি আমার টর্চলাইটটা বের করলাম ব্যাগ থেকে । অনেক খুঁজেও মোবারক মামাকে পেলাম না । তাই ঠিক করলাম বাড়ি ফিরে আসব, হাতে একটা মার্কার পেন আর একটা টর্চলাইট । মার্কার পেন দিয়ে বাশ কিংবা গাছে দাগ টেনে চিহ্ন দিচ্ছিলাম আর সামনে এগুচ্ছিলাম কিন্তু অন্ধকারে কিছুই ভালো দেখা যাচ্ছে না । চারদিক এখন ঘোর অন্ধকার তাই কিছুক্ষণ পরপর টর্চলাইট জ্বালাতে হচ্ছে । একটানা জ্বালালে ব্যাটারী শেষ হয়ে যেতে পারে । এভাবে এগুতে থাকলাম প্রায় আধঘন্টা । হঠাত পা ফসকে একটা গর্তে পড়ে গেলাম । চার দিক সমান ভাবে কাটা, চার দেয়ালে আমি আটকা পড়েছি, আমার আর বুঝতে বাকি রইল না আমি একটা কবরের ভিতরে আটকে গেছি ।

 

গর্তে মানে কবরের ভিতরে স্যাঁতস্যাঁতে কাঁদামাটি, সাধারণ কবরের চাইতে একটু বেশি গভীর ।  ভিতরে মশা আর কীটপতঙ্গের ছড়াছড়ি । বেশ ঝোপঝাড়ও আছে । কিছুতেই উপরে উঠতে পারলাম না । নিরুপায় হয়ে টর্চলাইট জ্বালালাম । টর্চলাইটের আলো প্রায় নিভু নিভু করছে, মনে হয় ব্যাটারির পাওয়ার শেষ হয়ে আসছে । একে তো চারদিক জনমানবহীন বনজঙ্গল তার উপর আবার ঘোর অন্ধকার । ভয়ে আমার শিড়দাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা হিমশীতল একটা অনুভূতি পা এর তলায় গিয়ে ঠেকল । কবরের ভিতরে আমি একা একজন জীবিত মানুষ ভেবে আমার ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছিল । কিছুক্ষণ আগে একটা কিসের যেন ভৌতিক আওয়াঁজ শুনতে পেলাম ।

আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না, জোরে চিৎকার করলাম, “আমাকে বাচাঁও, আমি ভাঙ্গা কবরে পড়ে আটকে গেছি, আমাকে বাচাঁও” অনেক জোরে চিৎকার করলাম কিন্তু গলা দিয়ে শুধু ফ্যাঁসফ্যাঁস মৃদু আওয়াজ বের হল । নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনলাম মনে হচ্ছে । কেন যে এই জঙ্গলের কবরস্থানে এলাম, মোবারক মামাই বা কোথায় হারিয়ে গেল । নিজের হতবুদ্ধির জন্য নিজেকে ধিক্কার দিলাম । কত কাল যে এভাবে আটকে আছি আমি বলতে পারবো না, মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর হবে আমি এখানে আটকে আছি । হঠাৎ সেই ভৌতিক শব্দটা আবার হল…হররর…রর..র..গর..ররররর..রর, এবার আরো জোরে আরো কাছে মনে হল । হঠাৎ নীল রং এর ৮-১০ টা চোখ কবরের উপর থেকে আমার দিকে তাকাল । আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে । রেডিয়ামের মত দপদপ করছে চোখগুলো, আমি বুঝতে পারলাম এগুলো শেয়াল, নিশাচর বলে রাতে চোখ এমন দেখাচ্ছে । মনে হচ্ছে ওরা আমার অবস্থা দেখে কিছুটা হতাশ কারণ আমি একটা কবরের ভিতরে আটকে, কিন্তু জীবিত । মৃত লাশের মাংস খাওয়ার জন্য ওরা এসেছিল । জীবিত মানুষের মাংস খাবে কিনা তা ঐ মুহুর্তে আমার ধারনা ছিলনা । তবে এই পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে আমাকে আগে থেকে কোন সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে । তাই দোরী না করে ব্যাগ খুলে তা থেকে লাইটার টা খুঁজে বের করলাম, কবরের ভিতরের শুকনো আর ভেঁজা ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলাম, কয়েকবার চেষ্টার পর আগুন ধরলো । আগুনের উজ্জ্বলতা আর ধোঁয়ায় শেয়াল গুলো কোথায় যেন পালিয়ে গেল । কবরের ভিতরে ধোঁয়ায় আমার কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল, কিন্তু সহ্য করতেই হবে নইলে নির্ঘাত শেয়াল আমাকে জীবিত খুবলে খাবে । আগুন জ্বালাতে পেরে মনে অনেকটা সাহস ফিরে পেলাম কিন্তু কবরের ভিতরে বেশি ডালপালা নেই । যার কারণে মনে হচ্ছে না বেশিক্ষণ আগুন জ্বালাতে পারবো । হয়তো ১ ঘন্টা পর আগুন নিভে যাবে । আমি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলাম । নোকিয়া মোবাইল কিন্তু নেটওয়ার্কের কোন কভারেজ পাচ্ছে না । মোবাইলের অপশনে গিয়ে স্টপওয়াচ এ ৪৫ মিনিট দিয়ে অন করে দিলাম । কারণ যা করার এই সময়ের মধ্যেই করতে হবে, ৪৫ মিনিট পর আগুন নিভে যাবে । মোবাইলের টর্চ দিয়ে পরে রাস্তা খুঁজতে কাজে লাগবে তাই এখন মোবাইলের চার্জ টর্চ জ্বালিয়ে শেষ করা যাবে না । বিপদে মানুষের মাথা সঠিকভাবে কাজ করে না তাই বিপদকে জয় করার জন্য চাই মাথা ঠান্ডা রাখা । আমি চোখ বন্ধ করে আমার শৈশবের কিছু সুখ স্মৃতির কথা স্বরন করলাম, বাবা-মা, ভাই বোনদের কথা, বন্ধুদের কথা স্বরণ করলাম । আর মনে মনে ভাবলাম আমি মরবো না আমি অবশ্যই এখান থেকে বেঁচে ফিরবো । এভাবে দু-তিন মিনিট মনে মনে চিন্তা করলাম আর মনে সাহস ফিরে এলো । পকেটের মোবাইলটা বের করে দেখলাম আর ৪০ মিনিট বাকি আছে । প্রথমে ব্যাগ খুলে সব কিছু বের করলাম, পানির বোতলের সবটুকু পানিই প্রায় শেষ । টর্চলাইটের ব্যাটারির পাওয়ারও প্রায় ফুরিয়ে গেছে, ম্যাকগাইভার ছুড়ি, সানগ্লাস, টিফিন বক্স, কলম আর ডায়েরী ছাড়া তেমন কিছুই নেই, বাকি জিনিস গুলো কবরস্থানে আসার আগে নানুর বাসায় রেখে এসেছিলাম । প্যান্টের ডান পকেটে একটা লাইটার বাম পকেটে মোবাইল । সব কিছু বিভিন্ন পকেটে নেয়া হয়ে গেছে, কি করতে হবে তা আগে থেকেই ঠিক করে ফেললাম । ব্যাগ চিড়ে একটা দড়ির মত তৈরী করবো, সাথে জুতোর ফিতে দিয়ে যে দড়ি হবে সবগুলো গিঁট দিয়ে জোড়া লাগিয়ে পানির বোতল এ বেঁধে ছুড়ে মারবো বাহিরে যাতে কোন বাঁশঝাড়ে বা ঝোপঝাড়ে আটকে যায় । যেই চিন্তা সেই কাজ । দেরী না করে প্রথমেই জুতোর ফিতে খুলে ফেললাম, দুই ফিতা খুলে গিঁট দিয়ে জোড়া দিলাম, এরপর ছুড়ি দিয়ে ব্যাগটাকে চিড়ে চিকন মত অনেকগুলো অংশে ভাগ করে একইভাবে গিঁট দিয়ে দড়ি বানালাম । সব গুলো জোড়া দিয়ে প্রায় ১০ হাত লম্বা একটা দড়ি তৈরী হল । মোবাইলের স্টপওয়াচে দেখলাম আর মাত্র ২০ মিনিট বাকি আছে, বোতল দিয়ে বেঁধে অনেকবার চেষ্টা করলাম । বোতল প্রায় পানি শুন্য হালকা তাই ছুড়ে দিলেও তা দুরে যাচ্ছে না । কি করবো ভেবে পাচ্ছি না । হঠাৎ পায়ের জুতোর দিকে আমার চোখ গেল, আমি চট জলদি বোতল খুলে লম্বা দড়িটা জুতোর সাথে বাধঁলাম আর ছুড়ে দিলাম বাইরে । মনে হল কোন ঝোপের সাথে বা বাঁশঝাড়ের সাথেআটকে গেছে । দড়ি ধরে উঠতে গিয়ে দড়ি ছিড়ে ভিতরে পরে গেলাম । বাম হাতের কনুইয়ে বেশ চোট পেলাম । আমার ওজন নেয়ার জন্য দড়িটা যথেষ্ট শক্ত ছিল না । সকল আশা সাথে সাথে কর্পুরের মত উড়ে গেল । ভাবলাম আর কোন উপায় নেই । শুধু স্রষ্টাই এখন আমাকে বাঁচাতে পারেন । পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখলাম আর ১০ মিনিট বাকি আছে কিন্তু তার আগেই আগুন নিভে গেছে । চারদিকে মেঘের গর্জন, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে । মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে । আমি কবরের ভিতরে আটকে গেছি । বৃষ্টি হলে আমার অবস্থা কি হবে তা বুঝতে পারছি না । মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল আর কবরের পানিও বাড়তে থাকল । পানি বাড়তে বাড়তে আমার কোমড় পর্যন্ত হয়ে গেল । এতক্ষণ আমি ভয় পেয়েছিলাম বৃষ্টির জন্য কিন্তু এখন স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে থাকলাম যাতে বৃষ্টি আরও কিছুক্ষণ হয়, কারণ কবর পুরোপুরি পানিতে ভরে গেলে আমি সাতরে মাটিতে উঠে যেতে পারবো । বৃষ্টি হল প্রায় ৩ ঘন্টা মত, ঘড়ি নেই তাই সঠিক বলতে পারবো না । কবরটা পুরোপুরি পানিতে ভরে গেছে । আমি আর দেরী না করে হামাগুড়ি দিয়ে কোন রকমে উপরে উঠে এলাম । হাত পা প্রায় অবশ হয়ে এল । এতক্ষণ আমি সাতরে ছিলাম পানিতে ভেসে থাকার জন্য । পা দুটোর একটাতেও আর শক্তি পাচ্ছি না, তারপরও দাড়ালাম, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে । জুতো জোড়ার একটা কবরের পানিতে ভাসছে অন্যটা বাঁশঝাড়ে আটকে আছে । জুতো দুটো পায়ে পরলাম, পকেট হাতরে মোবাইলটা বের করলাম, পানিতে ভিজে বন্ধ হয়ে আছে ।

ডান পকেটে লাইটারটা বের করলাম, আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু আগুন জ্বলছে না । মনে হচ্ছে ভেজা বা গ্যাস শেষ কিন্তু চকমকি পাথরের আলোর স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে, অনেকটা ক্যামেরার ফ্লাশের আলোর মত । লাইটারের চকমকি পাথরের আলোর ঝলকানিতে অনেকটা আলো তৈরী হলে সবকিছু এক নজর দেখে কোন দিকে যাব তা ঠিক করে নিলাম । এভাবে ফ্লাশ করে করে আমি প্রায় ঘন্টা খানেক পর রাস্তা খুঁজে পেলাম ।

রাস্তা ধরে সোজা হাটতেই সামনে কিছু গ্রামবাসী হাতে হ্যারিকেন ও মশাল দেখতে পেলাম । পরে বুঝতে পারলাম ওরা আমাকেই খুঁজতে বের হয়েছিল । তাদের সাথে কয়েকজন পুলিশও ছিল । আমাকে নানু জ্বিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছিল? আমি সব কিছু বিস্তর বর্নণা করলাম, শুনে গ্রামবাসী ও পুলিশ খুবই অবাক হলেন, কারণ মোবারক মামা নাকি ৩ বছর আগে গুম হয়েছিলেন । তার লাশ আজও পাওয়া যায়নি । তবে পুলিশ অনুসন্ধান চালাচ্ছে তার গুমের ব্যাপারে । আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলাম না । মোবারক মামা মৃত হলে আমার সাথে কথা বললেন কিভাবে আর ওনাকে নিয়ে আমি একটা কবরস্থানে ঘুরে বেরিয়েছি । আসলেই উনি মৃত তাই যতবারই নানুর সাথে দেখা করতে বলেছিলাম উনি রাজি হননি । ও.সি. সাহেবকে সব খুলে বললাম, শুনে তিনি হাসলেন কিনা বুঝতে পারলাম না ।

পরদিন সকালে ও.সি. সাহেব ও দুইজন কনস্টেবল সহ আমি যেখানটায় আটকা পরে ছিলাম সেখানে গেলাম । পাশে একটা কবরের ফলকে লেখা “দেখা হবে নির্জনে কথা হবে মনে মনে” আমি তার অর্থ কিছুই বুঝতে পারলাম না । তবে আমার অনুরোধে ও.সি. সাহেব গোয়েন্দা পুলিশ ও মেডিকেল অফিসার সহ ঐ কবরস্থানের ১০টি কবর খনন ও ময়না তদন্ত করেন এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, তার একটি কবরের লাশ ছিল মোবারক মামার । তাকে সন্ত্রাসী খুনিরা গুমখুন করে এখানে কবর দিয়েছিল । আজ এত দিন পরেও ঘটনাটি মনে পড়লে আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে হিমশীতল এক অনুভুতিতে, কারণ ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.