মিডিয়া স্কেপটিসিজম (Media Skepticism)

মিডিয়া স্কেপটিসিজম (Media Skepticism)
—- ড. রমিত আজাদ

বিশৃঙ্খলার একটি সূচক রয়েছে, ফিজিক্সে একে বলা হয় ‘এনট্রোপি’। তেমনি সংবাদ প্রচার মাধ্যমগুলি যে সংবাদ প্রচার করলো তার সত্যতা নিয়ে জনমনে যে সন্দেহের উদ্রেক হয় তার সূচক হলো ‘Media Skepticism’। Skeptic মানে সন্দেহমূলক, আর Skepticism মানে সন্দেহবাদ। প্রচার মাধ্যমগুলোকে বলা হয় ‘চতুর্থ শক্তি’। শক্তি প্রয়োগ করে যেমন অনেক কিছু করা যায়, তেমনি প্রচার মাধ্যমগুলিও অনেক কিছু করতে পারে বলে মনে করা হয়। তাত্ত্বিক এরকম দৃষ্টিভঙ্গী আছে যে, সামাজিক মতামত বাতাবরণ-এ মিডিয়া শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। তবে এখন এই বিষয়ে ‘রাখে’ না বলে ‘রাখতো’ বললেই ভালো হবে। কারন মিডিয়ার প্রতি মানুষের ‘মিসট্রাস্ট (mistrust)’ দিন দিন বেড়েই চলছে।

প্রাচীন রোমে সরকারী নির্দেশনামা ধাতব পাতে লিখে খোলা জায়গায় স্থাপন করে রাখা হতো। এর সূত্রপাত ৫৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে। চীনের হান ডাইনাস্টি ২য় ও ৩য় শতকে সাংবাদপাত সভাসদদের মধ্যে বিতরণ করতো। কাগজ প্রথম আবিষ্কার করে চীনারা, প্রথম ছাপার যন্ত্রও আবিষ্কার করে চীনারা, অতএব সঙ্গত কারণেই প্রথম ছাপানো বইও প্রকাশ করে চীনারাই। এটা নবম শতাব্দীর কথা। দশম শতাব্দীর দিকে মুসলমানরাও ছাপার কাজ শুরু করে। ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দে চীনের বেইজিং-এ প্রথম প্রকাশিত হয় বেসরকারী সংবাদপত্র। আমাদের উপমহাদেশে মোঘল শাসনামলে সংবাদ আদান-প্রদানের প্রচলন ছিলো ব্যাপক। সে সময়ে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাও ছিলো। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব সংবাদের বিপূল স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় ১৭৮০ সালে, যার নাম ‘বেঙ্গল গ্যাজেট’। তবে এই সংবাদপত্র প্রকাশের প্রধান অন্তরায় ছিলো লুটেরা ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’। যেহেতু দেশ তখন পরাধীন তাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তাদের পছন্দ হবে কেন? সেই কারণে লর্ড ওয়েলসলি প্রবর্তন করে কঠোর সেন্সর ব্যবস্থার। এই তো সূত্রপাত বাংলাদেশে ‘মিডিয়া স্কেপটিসিজম’-এর।

খ্যাতিমান চিত্র-পরিচালক আলমগীর কবীর বলেছিলেন “হলুদ পত্রিকাগুলো দুকপি বেশী বিক্রির জন্য, নিজেদের আপন নারীদেরকেও সদরঘাট ঘুরিয়ে নিয়ে আসে”। মানে কি হলুদ পত্রিকার? ইংরেজীতে ‘yellow journalism’ টার্মটি কয়েন করা হয় ১৮৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিৎজার-হার্স্ট দ্বন্দ্বে। এই দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের অপেক্ষাকৃত যোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারীদের অধিক বেতনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। উপরন্তু তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত কেলেংকারির চাঞ্চল্যকর খবর ছাপতে শুরু করেন। পুলিৎজারের ‘নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’ ও হার্স্টের ‘নিউ ইয়র্ক জার্নাল’-এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সঠিক সংবাদের প্রচারের পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনা দানই তাদের নিকট মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

সেই থেকে হলুদ সাংবাদিকতা বলতে বোঝায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশনাকে। এ ধরনের সাংবাতিকতায় সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হল কোন এথিকস না মেনে, যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়ানো। ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পর থেকে রেডিও বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো।
ফ্র্যাঙ্ক লুথার মট হলুদ সাংবাদিকতার পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:

১। সাধারণ ঘটনাকে কয়েকটি কলাম জুড়ে বড় আকারের ভয়ার্ত একটি শিরোনাম করা।
২। ছবি আর কাল্পনিক নক্সার অপরিমিত ব্যবহার।
৩। ভুয়া সাক্ষাৎকার, ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে এমন শিরোনাম, ভুয়া বিজ্ঞানমূলক রচনা আর ভূয়া বিশেষজ্ঞ কর্তৃক ভুল শিক্ষামূলক রচনার কূঁচকাওয়াজ।
৪। সম্পূৰ্ণ রঙিন রবিবাসরীয় সাময়িকী প্রকাশ, যার সাথে সাধারণত কমিক্স সংযুক্ত করা হয়।
৫। স্রোতের বিপরীতে সাঁতরানো পরাজিত নায়কদের প্ৰতি নাটকীয় সহানুভূতি প্রদর্শন।

অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন ও মিথ্যে সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টিকাড়া শিরোনাম ব্যবহার করা, তুচ্ছ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্ৰতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্ৰচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি।

হলুদ সাংবাদিকতা যে কি ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে তার প্রমাণ মেলে এই ঘটনায় যে অনেকেই মনে করেন যে, হিসাপানো-আমেরিকা যুদ্ধের পিছনে মূল ভূমিকা রেখেছিলো Pulitzer এবং Hearst-এর হলুদ সাংবাদিকতা, তারা প্রায়শঃই Spanish brutality-র ভূয়া সংবাদ তাদের পত্রিকা জুড়ে প্রকাশ করতেন।

এসবই ছিলো উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ঘটনা। সেই পুলিৎজার ও হার্স্ট পৃথিবী ছেড়েছেন অনেককাল হয়, কিন্তু মৃত্যু হয়নি কেবল হলুদ সাংবাদিকতার। বরং তা নানা ডালপালায় বিস্তৃতও হয়েছে।

একদল সৎ ও নির্ভিক সাংবাদিকরা যখন সত্য অনুসন্ধান ও প্রচারের জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করছেন, আরেকদল অসৎ সাংবাদিক তখন ব্যাস্ত হলুদ সাংবাদিকতায়। কেবলমাত্র পত্রিকার কাটতি বাড়ানো নয়, এখন সেখানে সংযোজিত হয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহ আরও হরেক রঙের উদ্দেশ্য। oligarch-রা এখন আর দু’একজন সাংবাদিককে বখশিস দিয়ে প্রয়োজনমত সংবাদ ছাপিয়ে নেন না, তারা নিজেরাই হয়ে উঠেছেন পুরো পত্রিকার মালিক। দৈনিক প্রকাশিত হচ্ছে তাদের পছন্দানুযায়ী সংবাদ, উদ্দেশ্য তারা যেভাবে চায় ঠিক সেভাবেই যেন জনগণ ভাবতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলো এই কাজ তো করে আসছিলো আরো আগে থেকেই। আর সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি তো এর পাইওনিয়ার। উদাহরণস্বরূপ একবার উল্লেখ করেছি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’-র সেন্সরশীপের কথা। আরেকটি উদাহরণ দিতে চাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানী-কে নিয়ে, সেখানে পারাজিত জার্মানীর মাথার উপর বিজয়ী ফ্রান্স আরো অনেক কিছুর মতই চাপিয়ে দিয়েছিলো মিথ্যে সংবাদের বোঝা। তখনকার জার্মান সবগুলো পত্রিকা জুড়ে থাকতো ফ্রান্সের প্রক্ষালণ। উদ্দেশ্য – জার্মানরা যেন ক্রমাগত নিজেদের ভাবতে শুরু করে ছোট, আর ফরাসীদের ভাবতে শুরু করে বড়, এভাবে যেন ভেঙে পড়ে জার্মানদের মনোবল।

এভাবে সমাজের জন্য হিতকর সংবাদ প্রচার বাদ দিয়ে এক শ্রেণীর হলুদ সাংবাদিকদের দৌরাত্মে সংবাদে ভেজাল প্রবেশের কারণেই পাঠক বা জনমনে সৃষ্টি হয়েছে মিডিয়ার প্রতি মিসট্রাস্ট যাকে অন্য কথায় বলা হয় ‘মিডিয়া স্কেপটিসিজম’। এই ‘মিডিয়া স্কেপটিসিজম’ এখন গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ টপিক।

তারিখ: ৪ঠা মার্চ, ২০১৭
সময়: সকাল ১টা ৪০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.