মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ১০)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ১০)

(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)

——————————————– রমিত আজাদ

নাইট ক্লাব:

ছোটবেলায় নয়ন তার এলাকায় একটা ক্লাব করেছিলো। খেলাধুলার ব্যবস্থা আর লাইব্রেরী ছিলো ঐ ক্লাবে। তারপর এলাকার সিনিয়র ব্যাচ ও অন্যান্যদের চাপে পড়ে ক্লাব-টা একরকম বিলুপ্ত করতে হয়েছিলো তাকে। তাদের একব্যাচ সিনিয়র-রা তাদের এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার বিষয়টিতে ভীষণ হিংসা করতে শুরু করে। তারা করতে পারলো না, কিন্তু ছোটরা করে ফেললো; এটা তারা সহ্যই করতে পারছিলো না। এইটা বোধহয় চিরন্তন!  অপরের কোন ভালো কাজকে স্বাগত না জানিয়ে, হিংসা করে সেটাকে বিনষ্ট করা। তা নয়ন সেই বয়সে একদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে দেখলো একটি মিছিল। বেশিরভাগই ছিলো তরুণ ঐ মিছিলে, পবিত্র রমজান মাসের আগে আগে তারা ঐ মিছিলটি করছিলো। সেখানে তারা উচ্চকন্ঠে শ্লোগান দিচ্ছিলো, “নাইট ক্লাব, মদের কুঠন, ভেঙে ফেলো গুড়িয়ে দাও।” মিছিলে কিছুক্ষণ পরপর তারা তকবীর ধ্বনি দিচ্ছিলো। নয়ন ঐ শুনে মনে মনে প্রশ্ন করেছিলো, ‘কি জিনিস এই নাইট ক্লাব? সে তো প্রতিষ্ঠা করেছে একটা স্পোর্টস ক্লাব। আর ‘নাইট ক্লাব’ কি? কেন তারা নাইট ক্লাব ভাঙতে চায়?” 

বড় হয়ে নয়ন জানলো যে, দুনিয়াতে এমন কিছু ক্লাব আছে যেগুলো চলে রাতের অন্ধকারে!  ধর্মগ্রন্থে লেখা রয়েছে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রীর অপকারিতা  সম্পর্কে। অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত্রীতেই বাইরে বেরিয়ে আসে সব অশুভ অশরীরিরা। আরো বের হয় চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারী ও অন্যান্য অপরাধীরা। মৃত মানুষদের অতৃপ্ত আত্মারা রাতে বাইরে বের হয় কিনা সেটা নয়ন জানে না। সে মনে করে যে, মৃত মানেই মৃত। কারো শুভ-অশুভ করার ক্ষমতা তাদের নাই। বরং মৃত মানুষের চাইতে জীবিত মানুষই বেশি ক্ষতিকর! তারপরেই জীবনের একটা সময় রাতের অন্ধকারকে ভীষণ ভয় করতো নয়ন। আলো নিভালেই তার মনে হতো যে, ঐ ওখানে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। এখুনি তার গলা টিপে ধরবে হয়তো। আবার আলো জ্বালালেই সব ভয় কেটে যেত, বুকে বল ফিরে আসতো। কি এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এই আলোর!

ভীতিকর রাত্রীর আবার একটা ভয়াল আকর্ষণ-ও ছিলো নয়নের। মাঝে মাঝে সে রাতে দালানের ছাদে ঘুমাত একা, ঐ ভয়াল কিছু দেখার আশায়। কিন্তু আকাশ থেকে তারা খসে পড়া ছাড়া, সে আর ভয়ার্ত কিছুই দেখে নাই। গভীর রাতে গণকবরে গিয়েছিলো নয়ন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিলো! কিছুক্ষণ পরপর শিউরে উঠেছিলো, যদি এবার তার সামনে এসে উপস্থিত হয় তাদের কেউ! কিন্তু তারপরেও কিছু ঘটেনি। খুব ভোরে যখনও দিনের আলো ফোটে নাই এমন সময়ে নাকি অশরীরীরা ঘোরে। সেটা দেখার জন্যও সে ঐ সময়ে রাজপথে ঘুরেছে, তাও কিছু দেখা হয় নাই, শুধু ভাসমান মানুষগুলোকে ছাড়া।

তবে বড় হয়ে সে জেনেছে যে, এই রাতের অন্ধকারেই অপরাধ হয় বেশি। অপরাধীরাও সমবেত হয় রাতে। রাতের অন্ধকারেই হয় সামরিক আক্রমণ। পৃথিবীতে বেশিরভাগ যুদ্ধ আক্রমণ হয়েছে রাতে। রাতের অন্ধকারেই বিভিন্ন বাহিনী ধরে নিয়ে যায় বিরুদ্ধ সমর্থক বা কর্মীদেরকে। রাতের অন্ধকারেই সম্পন্ন হয় মৃত্যুদন্ড। বিবাদরত দুটি অপরাধচক্র রাতের অন্ধকারেই গোলাগুলিতে মত্ত হয়! আর একদল লোক এই রাতের অন্ধকারেই মত্ত হয় বিশেষ ধরনের বিনোদনে!

বাংলাদেশে কখনো কোন নাইট ক্লাব ভিজিট করে নাই নয়ন। আসলে জানেও না যে কোথায় আছে ওগুলো। হয়তো আছে পাঁচ তারকা হোটেলে। হয়তো আছে নগরীর অভিজাত এলাকাগুলিতে। অত খোঁজ নেয়নি নয়ন। শুনেছে যে হংকং ও ব্যাংককে নাইট ক্লাবের ছড়াছড়ি। আরো রয়েছে পাশের দেশ নেপালেই। যেখানে যত বেশি ব্যবসা ঠিক সেখানেই তত বেশি নাইট ক্লাব। ব্যবসার সাথে কি সম্পর্ক নাইট ক্লাবের?

নয়নের এক প্রিম্যাচিয়ুড়ড বন্ধু তাকে একবার বলেছিলো যে, “হালাল ব্যবসার সাথে নারীর কোন সম্পর্ক নাই। তবে ব্যবসা যদি হয় হারাম বা দুর্নীতি জড়িত তাহলে সেখানে অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে পড়ে নারী ও মদ।”

বিদেশে অধ্যায়নকালীন সময়ে প্রথমদিকে একাধিক সুযোগ থাকলেও নয়ন কখনো যায়নি নাইটক্লাবে। তবে একবার সরকারের পক্ষ থেকেই সেই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। মানে কি? সিটি গভর্ণমেন্টের তরফ থেকে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো কিছু বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য। নয়নও সেখানে আমন্ত্রিত ছিলো। সোভিয়েত আমলে নাইটক্লাব ছিলো কি ছিলো না বিষয়টা ধোঁয়াশা। ঐ যে বলে না যে, সমাজের উঁচুতলার জন্য সবই ফেয়ার! এনিওয়ে ওপেন নাইটক্লাব চালু হয় ১৯৯১ সালের পট পরিবর্তনের পরে। শহরের অভিজাত একটা নাইটক্লাবে নয়নরা আমন্ত্রিত ছিলো। শেষ বিকেলে মানে সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগে আগে, শুরু হলো অনুষ্ঠান। প্রথমে কিছুটা সময় ক্লাবের বাইরে বারান্দায় অপেক্ষা করতে হয়েছিলো তাদের। এসময় হঠাৎ তারা খেয়াল করলো আঠারো-উনিশ বছর বয়সের একটা তরুণী হেটে গেলো তাদের সামনে দিয়ে, কর্তব্যরত গার্ড ক্লাবের দরজা খুলে দিলো তাকে দেখে। ছিপছিপে গরনের তরুণীটির পোষাক-আশাক দেখে সবার চোখ কপালে উঠে গেলো! মেয়েটি সম্ভবত ক্লাবের ওয়েট্রেস। তার পরনে ছিলো ক্লাবের লোগো আঁকা ক্রীম কালারের খাটো শার্ট, খুবই টাইট ও সেমি-ট্রান্সপারেন্ট। তাই শার্ট ভেদ করে তরুণীটির স্তনদ্বয় ফুটে উঠেছিলো, সেইসাথে ভিতরের লো-কাট ব্রা-র কালো রঙটিও সুস্পষ্ট ছিলো। আর নিচে ছিলো খুবই ছোট একটি শর্টস! সাইজে একটা অন্তর্বাসের চাইতে সামান্য বড় হতে পারে। কালো রঙের শর্টসটি এতটাই ছোট ছিলো যে তরুণীটির টিন-এজড নিতম্বের নিচের অংশটা আর ঢাকতে পারছিলো না, তাই সদম্ভে প্রদর্শিত। ওকে দেখে উপস্থিত বিদেশী তরুণরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলো! আর সেইসাথে তারা আসন্ন ভিতরের পরিবেশও আঁচ করতে পারছিলো। তার মানে ভিতরে অমন হুর-পরী আরো ডজন খানেক ঘোরাঘুরি করবে! এতে নিশ্চয়ই চোখ জুড়াবে আমন্ত্রিত তরুণদের।

কিছুক্ষণ পর ক্লাবের দরজা খুললো। এবং একে একে ভিতরে প্রবেশ করলো আমন্ত্রিতরা। সত্যিই ক্লাবের ভিতরে এক ধরনের রূপকথার পরিবেশ। ক্লাবের ইন্টেরিওর সজ্জ্বা, লাইটিং, মিউজিক, সবকিছুই ঘোর লাগানোর মত। হলের একপাশে মঞ্চ, সেটাও ঝলমলে। তার উপরে ছিলো একটা যন্ত্র, যা ঘুরে ঘুরে নানা রঙের আলো ঠিকরে দিচ্ছিলো পুরো হলে। এমনটা ইতিপূর্বে নয়ন দেখেছে শুধুই সিনেমাতে। একটু পরে স্বল্পবসনা অর্ধনগ্ন তরুনী ওয়েট্রেসরা ট্রে ভরা জুস-এর গ্লাস নিয়ে পরিবেশন করতে থাকলো অতিথিদেরকে। তারা যা ভেবেছিলো তাই, ওয়েট্রেস তরুণী বা সাকীদের সংখ্যা ডজন খানেক নয়, আরো বেশি; জনা বিশেক তো হবেই। এখন উপস্থিত তরুণরা ভাবনায় পড়লো যে, তাদের কাকে রেখে তারা কাকে দেখবে? রুপ-সৌন্দর্য্য-নগ্নতায় তারা কেউ কারো চাইতে কম নয়! তাদের পেলব অনাবৃ্ত বাহু, পরিপূর্ণ নগ্ন মাখনের মত পদযুগল, নিতম্বের উন্মুক্ত নিম্নাঞ্চল, স্বচ্ছ টপস ভেদ করে ফুটে থাকা সুডৌল স্তনদ্বায়, কেবল ব-দ্বীপ-টা প্রদর্শনই বাকি ছিলো। সব মিলিয়ে এক স্বপ্নিল পরিবেশ! তবে নয়নের দৃষ্টি এড়ালো না যে, বেশ কিছু সসস্ত্র ব্যাক্তি কালো স্যুট পড়ে ঘোরাঘুরি করছিলো। তাদের ভাবভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিলো যে তারা এই ক্লাবের নিরাপত্তারক্ষী। নাইটক্লাবগুলো সবসময়ই একটা আতংকে থাকে যে, যেকোন সময়েই সেখানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে, তাই ক্লাবে আর সবকিছুর সাথে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হয়। তবে হ্যা, বুদ্ধিমান মাত্রেই জানে যে, নাইটক্লাবের ব্যবসা কোন হেজিপেজি লোক করে না, এটা শতভাগ মাফিয়া ব্যবসা! উঁচুদরের ক্ষমতাসীন ব্যাক্তিরাই এই ব্যবসা করে থাকে। হঠাৎ করে হলের একেবারে কর্ণারে একটা লোকের দিকে নজর পড়লো নয়নের। লোকটা নয়নকে দেখে চোখ টিপলো। নয়নও চোখ টিপলো তাকে। লোকটাকে নয়ন চেনে কয়েক বৎসর যাবৎ, ও রুশ নয়, দুর্ধর্ষ পাহাড়ী জাতির পুরুষ। এদেশে ওদেরকে ভয় পায় সবাই। সে লোকাল মাফিয়া দলের সদস্য! নয়ন বুঝলো যে এই ক্লাবের সাথে তার কোন একটা সম্পর্ক রয়েছে।

একজন সুন্দরী গায়িকা এসে ডান্স ফ্লোরে হালকা নেচে নেচে গান গাইলো। জুস আর নাস্তা খেতে খেতে তারা শুনলো সেই গান। একটু পরে সুরের মূর্ছনায় শুরু হলো ডিসকো-টেকা, মানে উপস্থিত অতিথিদের নিজেদেরই নাচানাচি। সেদিন কিছু কারণে আমন্ত্রিতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিলো কম। আবার স্বল্পবসনা সাকীদের এই নাচে অংশগ্রহন করা নিষেধ। তারপরেও আমোদের কমতি ছিলো না কারো। এভাবে ডান্স ফ্লোরে অনেক সময় কেটে গেলো। রাত কিছুটা গভীর হলে নয়নের বন্ধু ভারতের মিতুল এসে আরো সুসংবাদ দিলো, “শোন্‌ সবাইকে জানিয়ে দেই একটু পরে শুরু হবে ক্যাবারে ডান্স!” নয়ন বিস্মিত হয়ে বলে, “কি? কি হবে? ক্যাবারে ডান্স?” মিতুল জোর দিয়ে বললো, “হ্যাঁ, হবে। এটা তো নাইটক্লাব! আমাকে জানিয়েছে, আমি তোদের জানিয়ে দিলাম।” হঠাৎ হলের মধ্যে শুরু হলো উচ্চগ্রামের মিউজিক, এখন আর নিজেদের মধ্যেকার কথাও শোনা যায় না! ঘোষণা হলো, “শুরু হচ্ছে আজ রাতের সব চাইতে বড় আকর্ষণ! মঞ্চে আসছে নৃত্যশিল্পী রূপসী তরুণীদের দল! আপনারা সানন্দে উপভোগ করুন।” নড়েচড়ে বসলো সব তরুণেরা, এবার আরো বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

তাই-ই ঘটলো। এক ডজন নৃত্যরত তরুণীর আবির্ভাব হলো মঞ্চে। ‘টপলেস’ শব্দটি শুনেছিলো নয়ন। আজ সেটা চোখের সামনেই দেখলো। এই তরুণীরা গায়ে যে টপসটা পড়েছে, সেটা পড়া আর না-পড়া সমান কথা! পুরোটাই ঢাকাই মসলিন কাপড়ের মতন স্ফটিক স্বচ্ছ। তাই তার ভিতরে থাকা উত্থিত বৃন্তসমেত তাদের পরম সম্পদ পুরোটাই উপচে উপচে পড়ছিলো। আর তাদের দেহের নিম্নাঙ্গে কৌপিন ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। পোশাকের কমতিতে তারা ক্লাবের সাকীদেরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে!

সুর, সঙ্গীত, শরাব, সাকী ও  অপ্সরাদের সৌন্দর্যের আবেশে সেই রাতে ঘোর লেগেছিলো সবার চোখে! একেই বলে নাইটক্লাব!

তবে মস্কোতে আরো পরবর্তিতে যা দেখেছে নয়ন সেটা বর্ণনা না করলে এই গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বিশেষত ‘হাঙরি ডাক’ নামক নাইটক্লাব-টি সেই সময় ছিলো সাগরের মোহনায় সাইক্লোনের মত!

(চলবে)

বুকে তার ফুটে আছে, আপেলের দুটি ফল;

ছিঁড়বো না পিষে দেব, চেপে দেব করতল।

আপেলের স্বাদ পেতে ছুঁয়ে দেই জিভ মোর,

কেঁপে ওঠা আপেলের সৌরভে লাগে ঘোর!

আজ রাতে মনটাকে তুলে রাখো হেঁশেলে,

মন রেখে দেহটাকে পেতে চাই সবলে।

ডান বাম যাই বলো সকলেই খোঁজে ভাজ,

বন্যতা জেগে গেলে, লাজ ফেলে করে কাজ।

নেশাতুর চোখে তাই করি সব ভাঙচুর,

নাভীমূলে গেঁথে দেই বেদনাটা নিষ্ঠুর!

স্বার্থের টানে ছুটি, ভাবিনা তো একবার,

মায়াবতী রূপবতী জ্বলে-পুড়ে ছাড়খাড়!

—————————————————– রমিত আজাদ

———————————————————–

রচনাতারিখ: ২৮শে অক্টোবর, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ০১টা ১০মিনিট

Love in Metrorail ( 10 )

——————- Ramit Azad

আগের পর্বগুলি

https://www.facebook.com/ramit.azad/posts/10225419226964054

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.