মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ১)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ১)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

‘মিনিস্কার্ট ও টাইট টপস পড়া অল্প বয়সী একটা মেয়ে চলন্ত মেট্রোরেলের সিটে বসে আছে। একটু পরে মেয়েটি লক্ষ্য করলো যে, তার ঠিক উল্টা দিকের সিটে বসা যুবকটি তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! মেয়েটি কি ভাবলো? যুবকটি তার রূপে মুগ্ধ হয়েছে, তাই কিছুতেই চোখ সরাতে পারছে না? তবে চট করে সিদ্ধান্ত নেয়াটা ঠিক না, ভাবলো মেয়েটি। আরেকটু ভালোভাবে তার দৃষ্টি-টা স্টাডি করতে হবে। যুবকটি তার মিনিস্কার্টের মাঝামাঝি তাকিয়ে নেই। যুবকটি তার অর্ধউন্মুক্ত টপসের দিকেও তাকিয়ে নেই। তাহলে কি সে আমার মুখশ্রী দেখছে, আমি কি এতটাই রূপসী? বাহ্‌
বেশ নেইভ তো ছেলেটি! ভাবলো মেয়েটি। অবশেষে খেয়াল করলো, এতকিছুর কোনটাই না! যুবকটি তাকিয়ে আছে মেয়েটির মাথার ঠিক উপরে, যেখানে মেট্রোর ওয়াগনের দেয়ালে লাগানো আছে শহরের মেট্রোর ম্যাপ। যুবকটি আসলে তার গন্তব্যের পথটি বুঝতে চাইছে!’ এটা একটা মেট্রো বিষয়ক প্রচলিত কৌতুক ইউরোপের এই দেশটিতে। এখানে বেশ কিছু বছর ধরে বাস করছে বাংলাদেশী তরুণ নয়ন।

নয়ন ধর্মীয় মূল্যবোধ, অ-ধর্মীয় মূল্যবোধ ইত্যাদি ভালো বোঝে না। সে শুধু বোঝে বাংলাদেশে যেই পরিবার, যেই পরিবেশ ও যেই সামাজিক স্তরে সে বড় হয়েছে সেখানে প্রচলিত মূল্যবোধ-কে। মূল্যবোধ সে শিখেছে কিছুটা তার পরিবার থেকে, কিছুটা তার সামাজিক স্তর (যেটাকে বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত বলা হয়) থেকে, আর কিছু তার বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে। যদিও সেখানেও সব শিক্ষকের মূল্যবোধ শিক্ষা একইরকম ছিলোনা। তারা নিজেরাও সকলে একই ক্যাটাগরির ছিলেন না। তবে বড় হয়ে নয়ন বুঝেছে যে, তার শেখা এই মূল্যবোধগুলোর কিছুটা ইসলাম ধর্মীয় আর কিছুটা জাতীয়। জাতীয় মূল্যবোধগুলো নিয়েও অবশ্য তার মনে প্রশ্ন রয়েছে যে, কি করে বা কোন দর্শনের উপর ভিত্তি করে এই মূল্যবোধগুলো নির্মিত হয়েছিলো? মূল্যবোধগুলো কত পুরাতন? এদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটগুলো কি কি?

বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর। নয়নের মাথা হঠাৎ এলোমেলো হতে শুরু করলো! সমাজের এই নর্মস এ্যান্ড ভ্যালুজ সম্পর্কে সে নতুন করে ভাবতে ও প্রশ্ন রাখতে শুরু করলো। প্রথম যেদিন ইউরোপের মাটিতে পা রাখলো সে একইসাথে বিস্মিত ও লজ্জ্বিত হয়েছিলো এই দেশের মেয়েদের পোশাক-আশাক দেখে! কি আশ্চর্য্য! সোমত্ত মেয়েরা সব অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাংলাদেশে যেটা কল্পনারও বাইরে, তা সে মুসলিম মেয়ে হোক আর অমুসলিম মেয়েই হোক!

নয়ন দেখলো যে ষোল বৎসরের ও তদুর্ধ্ব বয়সের রূপসী রূপসী মেয়েরা প্রায় সকলেই হাটুর উপরে স্কার্ট পড়ছে। কারো কারো স্কার্ট খাটো হতে হতে এমনই খাটো হয়েছে যে তা তার ভরাট নিতম্বটাকে কোনরকমে শুধু ঢাকতে পেরেছে; তাও আবার যথেষ্ট টাইট! এতটাই টাইট যে নিতম্বের সব ভাঝ ও খাঁজ কাপড়ের উপর দিয়েই সুস্পষ্ট! এই নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে: “এই মেয়ে তোমার কি টাকা নাই, নাকি দর্জীর কাপড় শর্ট পড়েছিলো যে স্কার্ট এত খাটো হলো?” বসনে উপরের টপসের অবস্থাও ঐ কাপড় শর্ট পড়া টাইপ। কোন রকমে শরীরের অর্ধাংশ ঢাকছে; সুডৌল স্তনদ্বয়ের উপরাংশ ঢাকতেই পারলো না। ক্লিভেজ দেখা যায় না, এমন টপস ওয়ালা মেয়ে প্রায় চোখেই পড়ে না! কিছু কিছু মেয়ের পিনোন্নত স্তনযুগল দেখে মনে হলো যে, তারা কাঁচুলী পড়ায় অভ্যস্ত নয়! মনে পড়ে প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কবিতার হৃদয় কাঁপানো কয়েকটি লাইন, ‘আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচুলি-নিচোর’। কিন্তু এদেশের বালাদেরকে আদৌ যৌবন-ভীতু বলে মনে হলো না; বরং যৌবনের উত্তাল তরঙ্গে তারা অনেকটা বেশিই উদ্বেলিত!

বাংলাদেশে থাকতে বলিউডি সিনেমার কিছু বোল্ড সিন দেখেছিলো নয়ন। যেমন, লাস্যময়ী নায়িকা মন্দাকিনি ও জিনাত আমানের ভিজা ও স্বচ্ছ সাদা শাড়িতে বুকের উপর ফুটে ওঠা পিনোন্নত পুষ্পযুগল! এই বোল্ড সিন দেখে হয়তো কারো কবিতা আওড়াতে ইচ্ছে হবে, ‘কি শোভা কি ছায়া গো! কি মধু কি মায়া গো।’ তবে তা তো সিনেমায়ই। বাস্তবে অমন কোন দৃশ্য বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে দেখা সম্ভব না। এদিকে এদেশের পথেঘাটে এইগুলা পানিভাত।

এইসব দেখে প্রথম দিকে নয়ন যেমনি স্তম্ভিত হয়েছিলো, তেমনি লজ্জ্বিতও হয়েছিলো। সে বারবার শুধু ভাবতো, ‘ওরা এতটা নিলাজ কেন?’ পরবর্তিতে অবশ্য সেই কনজারভেটিভ/রক্ষণশীল/গোড়া/অপ্রগতিশীল নয়নেরই নয়ন যুগল খুব মনযোগ দিয়ে দেখতো নারীদের সকল পাহাড় ও টিলা।

এই দেশে প্রথম দিনটার কথা এখনও মনে পড়ে নয়নের। গর্জিয়াস এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে একটা সুরম্য হোটেলে ছিলো প্রায় সারাটা দিন। সেখানেই সারা দিনের খাওয়া-দাওয়া। সবই সরকারী ব্যবস্থাপনায়। সেই হোটেলের সামনেই প্রথম দিনেই দেখা হয়ে গেলো কলেজ জীবনের বন্ধু লিপনের সাথে। নয়নের সাতদিন আগে লিপন এখানে এসে পৌঁছায়। বিদেশের মাটিতে দুজন দুজনকে দেখে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলো যে একেবারে একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, একদফা কোলাকুলি করে নিয়েছিলো। ওরা সেদিন বুঝতেই পারেনি যে, আশেপাশের লোকজন তাদেরকে কি ভেবেছিলো! ওরা জানতো না যে, এই সমাজে ওপেন এয়ারে ছেলে-মেয়ের আলিঙ্গন খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু ছেলে-ছেলের কোলাকুলি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য! এখানেই জাতীয়/ধর্মীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী মূল্যবোধের পার্থক্য।

কথাবার্তা শুরু হলো ওদের দুজনার।
নয়ন: কেমন আছিস দোস্ত?
লিপন: খুব ভালো আছি।
নয়ন: দোস্ত, সাতদিন হয় এসেছিস তো। তা নতুন কি কি দেখলি?
লিপন: বেশি কিছু না। মেডিকেল চেক আপেই তো কয়েকটা দিন গেলো।
নয়ন: মেট্রো দেখছিস? আমাদের দেশে তো নাই মেট্রো!
লিপন: হ। মেট্রোতে চড়ছি। মেট্রো যায় কি স্পীডে। সাঁ আ আ আ আ আ!!!!!!!!!! (খুব আবেগে ব্যাখ্যা করলো সে)
নয়ন: আমারে চড়াইতে পারবি এখন মেট্রোতে?
লিপন: আমি তো এখনও অত চিনি না। দাঁড়া হাফিজ ভাইরে কইতাছি। উনি আমারে চড়াইছে।

একটু দূরে একজন বাংলাদেশী ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বয়সে নয়নদের সিনিয়র হবে যে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সম্ভবত উনিই লিপনকে এই হোটেলের কাছে নিয়ে এসেছেন। উনার নামই হাফিজ। তারপর লিপন হাফিজ ভাইয়ের সাথে কথা বললো। বোঝা গেলো যে তিনি নিপাট ভদ্রলোক। হাফিজ ভাই নয়নের কাছে এসে সুন্দর করে বললেন, “ছোট ভাইয়ের মেট্রোরেলে চড়ার সখ হইছে? চলো তাইলে দেখাইয়া নিয়া আসি।”

ঝকঝকে চওড়া ফুটপাত ও বাহারি ফুলের বাগান সম্বলিত মনোরম এ্যাভিনিউ দিয়ে হেটে ওরা তিনজন এগিয়ে যাচ্ছিলো। চারপাশে তাকিয়ে নয়ন বুঝতে পারছিলো যে এই দেশটা কত ধনী আর বাংলাদেশটা কতটাই দরিদ্র! এই পর্যায়ে ওর একটা কৌতুক মনে পড়লো। কলেজে ক্লাস নিচ্ছেন অর্থনীতির শিক্ষক। পড়াচ্ছেন ‘দারিদ্রের দুষ্টচক্র’। পড়ানো শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই, দুই-একজন স্টুডেন্ট-এর চোখে পড়লো যে আনফরচুনেটলি স্যারের প্যান্টের চেইনটা খোলা। বয়স্ক মানুষ, হয়তো ওয়াশরুমে গিয়ে আর চেইন লাগাতে মনে নেই। তবে এই দেখে ক্লাসের সবাই হাসতে শুরু করলো। অর্থনীতির শিক্ষক তো আর মূল বিষয়টি জানেন না। তিনি ভাবলেন ওরা বোধহয় ‘দারিদ্রের দুষ্টচক্র’ পড়াটা বুঝতে পেরে খুশী হয়েছে তাই সবাই হাসছে। তিনিও হাসতে হাসতে বললেন, “সুন্দর না জিনিসটা?” একজন রসিক স্টুডেন্ট বললো, “সুন্দর তবে খুব ছোট!” অর্থনীতির শিক্ষক একগাল হেসে বললেন, “এই ছোট জিনিসটাই কিন্তু সারা পৃথিবীটাকে নাচাচ্ছে!” (কালেক্টেড)

যেতে যেতে নয়ন দেখছিলো যে খোলামেলা প্রায়-সংক্ষিপ্ত পোশাকে তরুণীরা হেটে যাচ্ছে। কোন কোন তরুণীর সাথে আছে নানা বয়সী পুরুষ। কাপলগুলো একে অপরের হাত ধরে, বা কোমর পেঁচিয়ে খুব ক্লোজলি চলছে। তারা যেই পথে যাচ্ছে সেই পথেই যাচ্ছে বেশিরভাগ মানুষ। হাফিজ ভাই বললেন, “ওরা সবাই মেট্রো স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। এই নগরীর অধিবাসীরা বেশিরভাগই মেট্রো নির্ভর। এখানে সবচাইতে পপুলার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হলো মেট্রো।”

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২০শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: ভোর ০৪টা ০১ মিনিট

Love in Metrorail (1)
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.