মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ২)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ২)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

পথে যেতে যেতে হাফিজ ভাই ঈষৎ হেসে বললেন, “তোমাদের তো এখানে নতুন ভাষা শিখতে হবে। তোমরা কি পুংলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গ বোঝ?” নয়ন বললো, “জ্বী, বুঝিতো অবশ্যই। এই যে, এই শহরের পথে আপাদমস্তক ঢাকা স্যুটেড-বুটেড মানুষগুলো হলো পুংলিঙ্গ; আর কাপড়-চোপড়ের কমতি থাকা অর্ধউলঙ্গ মানুষগুলো হলো স্ত্রীলিঙ্গ।” নয়নের এহেন ব্যাখ্যা শুনে হাফিজ ভাই হেসে ফেললেন। তারপর একটা কৌতুক বললেন। “রাশিয়ান ভাষায় নিষ্প্রাণ জিনিস-পত্রের-ও লিঙ্গ হয়। ক্লাসরুমে ভাষা শিক্ষা টিচার নতুন বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের বললেন ‘পেন্সিল’ (রাশিয়ান ভাষায় করোনদাশ) হলো পুংলিঙ্গ, আর ‘কলম’ (রাশিয়ান ভাষায় রুচকা) হলো স্ত্রীলিঙ্গ। ছাত্রছাত্রীরা কলম আর পেন্সিল উল্টেপাল্টে দেখে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো, কি দেইখা পুংলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গ চিনলো? কৌতুক শুনে নয়ন আর লিপন হাসতে হাসতে শেষ!

কিছুক্ষণ হাটার পরে একটা জায়গায় এসে হাফিজ ভাই থামলেন। বললেন, “এখানে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যেতে হবে।”
নয়ন: এটাই কি মেট্রোতে নামার পথ? নয়ন জানতো যে, এই দেশে মেট্রো মাটির নীচে সুড়ঙ্গ পথে।
হাফিজ ভাই: না। এই পথ মাটির নীচ দিয়েই যাচ্ছে তবে মেট্রোতে নয়। এটা একটা সুড়ঙ্গপথ, যেটাকে এই দেশে যা বলে তার ইংরেজী অনুবাদ হবে ‘আন্ডারপাস’। এই পথে পার হয়ে চওড়া এ্যাভিনিউ-এর ওপাশটাতে যাওয়া যায়। শুধু ওপাশই না, এটা মূলত একটা চৌরাস্তার মোড়, তাই সিঁড়ি দিয়ে মাটির নীচে নেমে চৌরাস্তার যেকোন দিকেই যাওয়া যাবে। খুবই কমফোর্টেবল, এবং এভাবে সড়ক ভীষণ নিরাপদ।

নয়ন মনে মনে ভাবলো যে, সুড়ঙ্গপথের ব্যবহার তো আমাদের দেশেও একসময় ছিলো। ঢাকার লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গপথের দরজা তো নয়ন নিজ চোখেই দেখেছে। কথিত আছে যে মোগল আমলে নির্মিত এই সুড়ঙ্গপথ কেল্লা ও বুড়িগঙ্গা নদীর ঐ পারের সাথে একটি সংযোগপথ ছিলো। তার মানে সুড়ঙ্গটি নদীর নীচ দিয়ে গিয়েছিলো। সেই কয়েক শতাব্দী আগেই বাংলার মানুষের এই টেকনোলজি জানা ছিলো, অথচ আজ এত ব্যাস্ত ঢাকায় একটিও আন্ডারপাস নাই (সেই সময়ে ছিলো না)। আন্ডারপাস তো দূরের কথা, পর্যাপ্ত পরিমানে ও প্রয়োজন অনুযায়ী ওভারব্রীজই তো নাই! এই ওভারব্রীজের অভাবে প্রতি বছরই বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছেন। দেশের উপরমহল নিরাপদ সড়কের কথা কবে বুঝতে পারবেন?

সিঁড়ি দিয়ে আন্ডারপাসে নেমে নয়ন দেখলো বেশ চওড়া ও দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ। যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও টিপটপ। ঝকঝকে পোশাকে নারী-পুরুষ-সকলে নির্বিঘ্নে রাস্তা পেরোচ্ছেন মাটির নীচ দিয়ে। পথ না জানলে এখানে পথ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আছে। যদিও সাইনবোর্ডে পথের নির্দেশনা দেয়া আছে। নয়ন হাফিজ ভাইয়ের পিছনে পিছনে গেলো। কিছুদূর গিয়ে আরেকটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো ওরা তিনজন। এদিকেও চওড়া ফুটপাথ-ওয়ালা পথ খুব সুন্দর!

হাফিজ ভাই বললেন, “এই পথ ধরে কিছুদূর এগুলেই মেট্রো স্টেশন। আমাদেরকে ওখানে আবারো মাটির নীচে নামতে হবে।” নয়ন প্রশ্ন করলো, “কতটা গভীরে নামতে হবে?” হাফিজ ভাই সংক্ষেপে বললেন, “দেখবে।”

নয়ন যখন স্কুলে পড়তো তখন কারিকুলামে বাংলা সাহিত্যে একটা প্রবন্ধ ছিলো, নাম ‘টিউব রেলওয়ে’। সেখানে বর্ণনা ছিলো পাতাল রেলের। ঐ প্রবন্ধে মূলত লন্ডন টিউবের কথাই বেশি ছিলো। সেই প্রবন্ধ পড়ে নয়ন কিছু থিওরেটিকাল জ্ঞান পেয়েছিলো পাতাল রেল সম্পর্কে। পরবর্তিতে কোলকাতায় টিউব রেলওয়ে নির্মিত হলে সেখানকার শিশু-কিশোরদের পত্রিকা ‘আনন্দমেলা’ পড়েও পাতাল রেল সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলো সে। আজ নিজ চোখে তা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর প্রায় সমগ্র এলাকা জুড়েই রয়েছে বিস্তৃত পাতাল রেল ব্যবস্থা। বলা হয় এটিই বিশ্বের ব্যস্ততম মেট্রো। ১৯৩৫ সালে এটি চালু হয়। অত্যন্ত উন্নত আধুনিকতার কৃতিত্ব হিসাবে ধরা হয় এই মেট্রো। এর স্টেশনগুলির কারুকাজময় নকশা বিখ্যাত। মেট্রো স্টেশনগুলি মস্কোর আর্কিটেকচারাল মাস্টারপিস। প্রতিটি দর্শনার্থী স্টেশনের মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন। প্রতিটি স্টেশন এর সজ্জ্বা জাঁকজমকপূর্ণ হয়। যাদুঘরের প্রদর্শনীর মতো এক একটি স্টেশন। একসময় স্টেশনগুলিতে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদী অনেক শিল্পকর্ম টাঙানো ছিলো। তার পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পকর্মও রয়েছে, আবার ইদানিং আধুনিক কারুকার্যও রয়েছে। রুশ আর্কিটেকচারের অনন্য উদাহরণ এই স্টেশনগুলি। ২০১৭-এর হিসাব অনুযায়ী, এই মেট্রো ব্যবস্থাতে ২০৬টি স্টেশন আছে এবং এর রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য ৩৩৯.১ কিমি (২১০.৭ মা)। মস্কো নগরীর জনসংখ্যা এক কোটি পঁচিশ লক্ষ। এর একটা বিরাট অংশ প্রতিদিনই মেট্রোরেলে চলাচল করে। এই নিয়ে কৌতুক প্রচলিত আছে যে, ‘ প্রশ্ন: এত বিশাল জনসংখ্যার নগরীটির রাস্তাঘাটে লোকজন এত কম দেখা যায় কেন? উত্তর হলো: তা তো হতেই হবে, বেশিরভাগ মানুষই যে মাটির নীচে আছে।’

আন্ডারপাস থেকে বেরিয়ে চওড়া ফুটপাত, ফুলের বাগান ও বৃক্ষের সারি সম্বলিত প্রসস্ত রাস্তায় তারা হাটলো আরো অর্ধ কিলোমিটারের মত। যেতে যেতে নয়ন দেখছিলো আবারো সেই অর্ধনগ্ন তরুণীদের ঢল। নর-নারী সম্পর্কের আদি ও মৌলিক উৎসটি শরীর নাকি মন, এই নিয়ে তর্ক হয়তো চলতেই থাকবে অনন্তকাল। তবে বাগিচায় ঘুরে বেড়ানো এইসব হুর-পরীদের না দেখে পারা যায় না। যা এতটাকাল কেবল বোম্বাইয়া ছবিতেই দেখেছে!
রূপসীদের যাদের পরনে কাঁচুলিবিহীন খাটো টপস তাদেরকে দেখে নয়নের মনে হলো যে, নারীর স্তনগুচ্ছের বৃন্ত-চূড়ায় হিমালয় আর আন্ডিজ কেঁপে কেঁপে ওঠে! উদরের নাভিমূল যাদের উন্মুক্ত তারা অবশ্য দেশের শাড়ী পড়া আধুনিকাদের মনে করিয়ে দেয়। তরুনীর উন্মুক্ত নাভিমূল দেখা বাঙালী ছেলের কাছে নতুন কিছু নয়! পথ চলা কারো কারো সুগঠিত নিতম্ব ক্ষুদ্র-ঘাঘরীতে কোনমতে ঢাকা, আটসাঁট স্কার্ট ভেদ করে ফুটে ওঠে সুডৌল পুষ্পগিরিদ্বয়। এই রমণীয় রূপসীদের দেখে মনে হয় যেন এক একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি! যে সব দেশের নারীরা আপাদমস্তক পরিচ্ছদে আবৃত সেখানে ঐ অগ্নিগিরির উদগিরন ক্ষমতা পরিমাপন করা আদৌ সম্ভব নয়। কিন্তু এমন দেশে অনাবৃত সুপ্ত আগ্নেয়গিরিরা যেন তৃষ্ণার্ত পুরুষদের জানাচ্ছে আদি-প্রকৃতির মৌন আহবান! পুরুষের সামান্য স্পর্শেই তারা বিস্ফোরিত হবে! নয়ন কি কোন প্রাচীন প্যাগান যুগে চলে এসেছে?

এসব ভাবতে ভাবতে তারা চলে এলো মেট্রো স্টেশনের সামনে। জাঁকালো প্রবেশ পথ এই স্টেশনের। উঁচু গেইটের উপরে বড় করে বিশেষ স্টাইলে লেখা ‘M’ (এম)। এই সিম্বোলিক এম-এর মানে মেট্রো। এই সিম্বল দেখলেই বোঝা যায় যে, এইটি একটি মেট্রো স্টেশন।

কোন এক বেদানা দানা রঙ ও রস সম্বলিত অধরের খোঁজে
আমি এতটাকাল প্রতীক্ষায় ছিলাম!
শরীর মন্থনে কি সুখ আছে আমি এখনও জানি না।
নক্ষত্রশোভিত কামার্ত রাত্রির সুধা এখনও পান করা হয় নি।
সুনিপূন কুশলতায় সতর্ক অঙ্গুলী চালনায়
এখনও বিভাজিত করিনি কোন অনাবিষ্কৃত গিরিপথ।
বল্লম হাতে চর-দখলের মত
এখনও বিদ্ধ করিনি কারো দেহ-মেঘনায় জেগে ওঠা চর।
বিবশ নিজেকে জ্বালাইনি এখনও কারো বহ্নি-শরীরের অগ্নি-দাহনে।
অগভীর নাভিকুন্ডে ঢেলে শুষে নেইনি সিরাজীর শুরভিত সুরা।
মুগ্ধতায় দেখিনি কভু
ধ্রুপদী ত্রিভুজ হ্রদের ধার ঘেষা, থোকা থোকা শিরিষের গোছা।
তবে রূপসীর রূপের আধার দুটি শিরিন অধর!
ঐ স্ফুরিত অধর যদি হন্তারক অগ্নিও হয়,
আমি আত্মঘাতি পতঙ্গ হতে প্রস্তুত আছি।
একটি আকন্ঠ চুম্বনের লোভে আজন্ম তৃষ্ণার্ত আমি!
রূপসী, তুমি কি তোমার শিরিন ওষ্ঠদ্বয় প্রসারিত করবে?

——————————– রমিত আজাদ

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২২শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: দুপুর ১২টা ০৭ মিনিট

Love in Metrorail (2)
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.