মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৩)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৩)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

মেট্রো স্টেশনের জাঁকালো প্রবেশ পথটি দিয়ে তারা ভিতরে প্রবেশ করলো। এতক্ষণ রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা মনে হলেও মেট্রো স্টেশনের ভিতরে ঢুকতেই মনে হলো এই নগরীতে অনেক মানুষ। প্রবেশ পথে অনেকগুলো দরওয়াজা। সবগুলি দিয়েই বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিতরে ঢুকলো। সামান্য পথ যেতেই কিছু স্বয়ংক্রিয় ছোট ছোট গেইট দেখা গেলো। শোনা গেলো তাদের মধ্যে খটখট শব্দ। নয়ন তাকিয়ে দেখলো যে প্রতিটি ক্ষুদ্র গেইটের মধ্যে দুটি করে লোহার স্টপার রয়েছে। যাত্রীরা ক্ষুদ্র গেইটের কোথাও কিছু একটা ফেলছে, টুক করে আওয়াজ হচ্ছে, সাথে সাথে স্টপার দুইটি দুইদিকে খুলে যাচ্ছে কামার্ত রমণীর দুই ঊরুর মতন। তার ভিতর দিয়ে একজন যাত্রী পাস করার সাথে সাথেই আবার স্টপার দুইটি বন্ধ হয়ে পথ আটকে দিচ্ছে।
আবার কেউ কেউ কোন গেইট ছাড়াই পাস করছে পাশের অন্য একটি পথ দিয়ে, অপেক্ষমান প্রহরিনীকে কিছু একটা দেখিয়ে। সেটা তাদের আইডি কার্ড হতে পারে। এরা কি কেজিবি বা একদলীয় শাসনব্যবস্থার রথী-মহারথীরা? এমন ভাবলো নয়ন? পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলো যে তাদের কারো কারো নানা পথে বিনা পয়সায় মেট্রো চড়ার সরকারী অনুমতি রয়েছে, আর কারো রয়েছে নিজ টাকায় কেনা মান্থলি কার্ড। এইগুলো দেখালেই পাস করার অনুমতি দিচ্ছে মেট্রোর ইউনিফর্ম পরিহিতা প্রহরিনী। এখানে রূপসীরা এই দায়িত্বে আছে? মনে এমন প্রশ্নের উদয় হলো নয়নের! একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছেন স্টেশনে কর্তব্যরত পুলিশ।

হাফিজ ভাই বললেন, “এই নাও”, বলে নয়নের হাতে কিছু গুঁজে দিলেন। নয়ন দেখলো তার হাতে একটি কয়েন, যেখানে একদিকে আল-খোয়ারিজমীর প্রবর্তিত আরবী সংখ্যায় লেখা ‘5’ (ফাইভ)। আর উল্টা দিকে আঁকা প্রবল প্রতাপশালী পরাশক্তি ও তার একদলীয় শাসনতন্ত্রের জাঁকালো প্রতীক কাস্তে-হাতুড়ী। নয়ন বুঝলো এটা পাঁচ কোপেক (পয়সা)-এর একটি কয়েন। এই দিয়েই প্রবেশ করা ও চড়া যাবে স্বপ্নের মেট্রো-তে। মনে মনে ভাবলো নয়ন, এত অত্যাধুনিক একটি বাহনের চার্জ মাত্র পাঁচ পয়সা! আর এদিকে ঢাকায় মধ্যবিত্তের আয়ের একটা বিরাট অংশ খরচ হয়ে যায় ট্রান্সপোর্টের পিছনে।

নয়ন ক্ষুদ্র গেইটের একটি ছিদ্রে ফেললো পাঁচ কোপেক মূল্যমানের ঐ তামার কয়েনটি। অনেকটা কয়েন টেলিফোনে বুথে যেভাবে কয়েন ফেলে। টুক করে একটা শব্দ হলো, সেইসাথে আকাঙ্ক্ষী রমণীর দুই ঊরুর মত খুলে গেলো দু’টি স্টপার। নয়নের তরুণ দেহ তার ভিতর দিয়ে পাস করে প্রবিষ্ট হয়ে গেলো মূল মেট্রো স্টেশনে। এখন সে চড়তে পারবে যেকোন মেট্রোরেলে, খেয়াল খুশী মত সারাদিন ঘুরে বেড়াতে পারবে জালের মত বিছানো এই পাতালপূরীর প্রতিটি বিরতিস্থলে। ভাড়া মাত্র পাঁচ পয়সা!

তিন-চার মিটার যেতেই পা উঠে গেলো চলন্ত সিঁড়ি বা এস্কেলেটরে। খুব শক্তপোক্ত ও চওড়া এই সিঁড়ির ধাপগুলো। তা হতেই হবে কারণ দীর্ঘদেহী মানুষগুলোর ভার তা নইলে সইতে পারবে না এই সিঁড়ি। স্বপনের সিঁড়ি বেয়ে যেমন উপরে উঠে যায়, তেমনি নিচে মানে পাতালপূরিতে নামতে শুরু করলো যাত্রীরা। সবাই দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়িতে। সিঁড়িই চলছে, টেনে নিচে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে। আধো অন্ধকার এখানে। কারণ সূর্যের আলো আপাতত নেই জ্বলছে বিজলী বাতি। এতক্ষণ খুব যান্ত্রিকভাবে হাফিজ ভাইকে অনুসরণ করছিলো নয়ন। এবার একটু চারদিকে তাকালো সে। একটু আগে চলার পথে যাদেরকে দেখেছিলো, তারাই এখন দাঁড়িয়ে আছে এই এস্কেলেটরে। নারী-পুরুষ-আবাল-বৃদ্ধ সকলেই আছে। প্রতিটি সিঁড়ির ধাপেই ডান দিকে এক-দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে। বাম দিকটা খালি। মাঝে মাঝে এই বাম দিকে দিয়ে কেউ নেমে যাচ্ছে। সিঁড়িই তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবাইকে নিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে, তাহলে তাদের আবার নিজস্ব গতি যোগ করার কি আছে? তবুও সেই রীতি রয়েছে। কারো যদি তাড়াহুড়ো থাকে সময়ের স্বল্পতা থাকে, তারা নিজ পায়ে আরো দ্রুত নেমে যাবে নীচে।

ওপাশের সিঁড়িটি উঠে যাচ্ছে নীচ থেকে উপরে। যেসব যাত্রীরা মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাইরে যাবেন, তারা আছেন ঐ সিঁড়িতে। মাঝে মাঝে এপাশের যাত্রীরা বোরিং ভাব কাটাতে ওপাশের যাত্রিদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষ মানুষকে দেখে। কোথায় যেন নয়ন পড়েছিলো যে, এই দুনিয়ায় মানুষের চাইতে সুন্দর আর কিছু নাই। তাই মানুষ তো মানুষকে দেখবেই। পুরুষেরা তৃষ্ণার্ত চেয়ে থাকে ওপাশের সিঁড়ি দিয়ে ক্রমশ সরে যাওয়া (আরোহিত অথবা অবরোহিত) রূপসীদের দিকে। ঐ দেখাটুকুই সব। কারণ কয়েক মিনিট পরে তারা আর কেউ কাউকে দেখতে পাবে না। একদল হারিয়ে যাবে পাতালপূরীর ভিতরে, আরেকদল হারিয়ে যাবে উপরের খোলা আকাশের নিচে। শোনা যায় যে এত বড় নগরীতে ইনসিডেন্টালি দেখা হওয়া কারো সাথে দ্বিতীয়বার আর দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। পরিসংখ্যানের প্রোবাবিলিটিও তাই-ই বলে। তবে বাস্তব জীবন মাঝে মাঝে ফ্যান্টাসীকেও ছাঁড়িয়ে যায়। ইনসিডেন্টালি দেখা হওয়া দুইএকজনার সাথে নয়নের দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিলো। সেকথা আরেকদিন বলা যাবে। তবে একটি ঘটনা এখনই না উল্লেখ করলে নয়।

কয়েক বৎসর পরের কথা। নয়ন ও তার আফ্রিকান বন্ধু গুলিত মেট্রোরেলে চড়ে যাচ্ছিলো কোথাও। গন্তব্যে পৌঁছে তারা যখন বাইরে বেরুনোর চলন্ত সিঁড়িতে উঠলো সিঁড়িটা কিছুদূর ওঠার পর হঠাৎ তাদের চোখে পড়লো ওপাশের নেমে যাওয়া এস্কেলেটরে দাঁড়িয়ে আছে রূপসী এক তরুণী। বয়সে গুলিতের কাছাকাছি-ই হবে। মেয়েটি গুলিতের দিকে তাকালো। একটি সিঁড়ি উঠছে উপর দিকে, আরেকটি নামছে নীচে। তাদের মধ্যে ব্যবধানও অনেক। তাই এমন সুযোগে গুলিত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে একটা মোক্ষম চোখ টিপ দিলো। রিস্ক নাই কোন! মেয়েটি এতে খেপলেও কোন কিছু করতে পারবে না। এটা অনেকটা দুটি বিপরীতমুখী চলন্ত বাস থেকে একে অপরকে ইশারা বা কমেন্ট ছুঁড়ে দেয়ার মত। রাগ হলেও কিছু করার নাই, খুশী হলেও কিছু করার নাই! কিন্তু রূপসী মেয়েটি খেপলো তো নাই, বরং গুলিতকে অবাক করে দিয়ে উল্টা চোখ টিপে জবাব দিলো।

উপরে উঠে থম মারা গুলিতকে দেখে নয়ন জানতে চাইলো, “কি ব্যাপার গুলিত কিছু হয়েছে?” গুলিত নয়নকে খুলে বললো সবকিছু। নয়ন বললো, “আর দেরী নয়। চলো তাড়াতাড়ি আবার ঢুকি স্টেশনে। মেয়েটার মনে ধরলে সে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে নিশ্চয়ই।” গুলিত বললো, “কে জানে? এতক্ষণে হয়তো সে কোন ট্রেনে চেপে কোথায় চলে গেছে!” নয়ন বললো, “আরে গেলে তো গেলো-ই। আর না গিয়ে অপেক্ষা করলে আমরা তাকে খুঁজে পাবো। চলো জলদি। ডোন্ট হেজিটেট।”

তারা দু’জন আবার প্রবেশ করলো ঐ মেট্রো স্টেশনের অভ্যন্তরে। এই স্টেশনটার সাইজ বড় ছিলো না। ভিতরে ঢুকে সামান্য পাঁচ-সাত মিটার হাটতেই দেখা গেলো যে স্টাইলিশ রূপসী তরুণীটি বসে আছে একটি বেঞ্চিতে। তার নারীমন ইনটুইশন হয়তো বলছিলো, ওরা আসবে। গুলিতকে দেখে লাস্যময়ী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো রূপসী, মৃদু হেসে এগিয়ে এলো তার লোভনীয় তন্বী শরীর নিয়ে।

সিঁড়িতেই সাধ জাগে, বান ডাকে শরীরে;
বাসনার আঁশে ভাসে ডানাকাটা পরীরে!
ওরে পরী নেমে আয়, আকাশেই রস না;
রতি ভরা দেহটার কাছে এসে বস না।

মিলনের সুখ দেবো, বিভাবরী গভীরে;
কামনার রঙ ছেনে মেখে দেব আবীরে।
অধরেতে গুঁজে দেব, অধরের সুরা লো;
জিভ ছুঁয়ে জিহবায়, দেব মধু সুধা গো!

আহারে, উহুরে, উষ্ণ সে নিঃশ্বাস;
প্রেমিকের মন্থনে ভাঙবে না বিশ্বাস।
ঝড়ো হাওয়া ঝাপটায় ওরে মোর পরীরে;
দুলে উঠো, জ্বলে উঠো, কম্পিত শরীরে।

——————————– রমিত আজাদ

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ২১ মিনিট

Love in Metrorail (3)
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.