মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৪) (Ramit Azad)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৪)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

মেট্রোর সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মনে হচ্ছিলো যেন অনন্তকাল পেরিয়ে যাচ্ছে! এতটাই গভীর এখানকার মেট্রো! কোন কোন মেট্রোর গভীরতা ২৮ মিটার, মানে একটি নয়তলা দালানের উচ্চতার সমান। মেট্রোর এই গভীরতা নিয়ে একটা কৌতুক আছে: প্রেমিকা মেট্রোর এস্কেলেটরে ঝগড়া করলো তার প্রেমিকের সাথে। রাগ করে বললো, “আমি এখন সিঁড়ি বেয়ে ফিরে যাচ্ছি।” কিছুদূর গিয়ে প্রেমিকার মনে হলো, এত লম্বা সিঁড়ি বেয়ে যাওয়া সম্ভব না! তার চাইতে বরং এবারের মত ঝগড়াটা মিটিয়ে ফেলি!

মেট্রোর সিঁড়ির গতির সাথে রেলিং-এর উপরে রাখা রাবারের বেল্ট-এর গতির একটা পার্থক্য রয়েছে। সিঁড়িতে দাড়িয়ে সবাই ঐ বেল্টের উপরে হাত রাখে। নয়নের মনে হলো যে হাত রাখার বেল্ট-টির গতিবেগ বেশি। কিছুক্ষণ পরপর তার হাত সামনের দিকে চলে যাচ্ছিলো, আর তাকে হাত ফিরিয়ে আনতে হচ্ছিলো। কেন এই অসমতা? না এটা কোন যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। নয়ন পরে জানতে পেরেছিলো যে, এটা করা হয় এই কারণে যাতে এস্কেলেটরের উপর কেউ ঘুমিয়ে না পড়ে। তাহলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

কয়েক মিনিট পরে নয়ন, লিপন ও হাফিজ ভাই নীচে একেবারে স্টেশনের প্লাটফর্মে নেমে এলো। যেখানে তারা পা রাখলো সেই বিশাল স্টেশন নামক প্রাসাদটি দেখে নয়ন একটা ধাক্কা খেলো! এত জাঁকজমকপূর্ণ জায়গা সে ইতিপূর্বে কখনো দেখেনি! এই যদি হয় একটি মেট্রো স্টেশনের জৌলুশ, তাহলে তাদের রাষ্ট্রপতির প্রাসাদের জৌলুস কতখানী?

পুরো হলটিই মার্বেল পাথরে সজ্জ্বিত। হলের দুইপাশে রয়েছে পাতাল রেলের লাইন; একদিকে যাওয়ার লাইন, আরেকদিকে আসার লাইন। ঝকঝকে দামী টাইলসের মেঝে। অনেকগুলো পিলার পুরো হল জুড়ে। সবগুলি পিলারই দামী পাথরে মোড়া। উপরে প্যারাবোলা শেইপের সিলিং। সেখানেও নানা রকম কারুকার্য্য। বোঝা যাচ্ছে যে, নিপুন শিল্পীদের দ্বারা করানো এই সব জাঁকালো নকশা। আরো রয়েছে অগনিত বিশালাকৃতির বাহারী ঝাড়বাতি।

নয়ন লক্ষ্য করলো যে, স্টেশনের বিভিন্ন জায়গায় ঘড়িতে সময় দেখানো হচ্ছে। একেই বলে জাতীয় সময় সচেতনতা! লাইনের একমাথায় একটি ঘড়িতে সময় দেখানো হচ্ছে। কোন একটি ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে সেই ঘড়িতে দেখানো হচ্ছে যে আগের ট্রেনটি ঠিক কত সময় আগে প্লাটফর্ম ছেড়েছে। নয়ন লক্ষ্য করলো, কয়েকমিনিট পরে পরেই আসছে ট্রেন। পাঁচমিনিটের বেশী কোন ট্রেনের জন্যই অপেক্ষা করতে হয়না।

নয়ন হাফিজ ভাইয়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। হাফিজ ভাই বললেন, “স্টেশন দেখা হয়েছে?”
নয়ন: জ্বী। ভীষণ গর্জিয়াস! আমাদের দেশে এমনটা কল্পনাও করা যায় না।
হাফিজ ভাই: নগরীর সবগুলো স্টেশনই এরকম সৌন্দর্য্যমন্ডিত! একেবারে পেরিফেরির দিকে কিছু স্টেশন আছে সাদামাটা। তবে আস্তে ধীরে ওগুলোকেও জঁমকালো করে ফেলা হবে।
নয়ন: চলেন, এখন তাহলে ট্রেনে উঠি।
হাফিজ ভাই: হুম, চলো।
নয়ন দেখলো। এই সৌম্য সুদর্শন হাফিজ ভাইটা খুবই ভদ্রলোক! বাংলাদেশ দরিদ্র-পশ্চাদপদ দেশ হলেও, অনেক মানুষই আছেন খুব ইন্টেলিজেন্ট ও স্নিগ্ধ ব্যাক্তিত্বের অধিকারী!

পাতাল রেলের লাইনের পাশে এসে দাঁড়ালো ওরা তিনজন। নয়ন দেখলো লাইনের ধার বরাবর এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত একটা লাল রেখা টানা। হাফিজ ভাই বললেন, “ট্রেন আসা পর্যন্ত ঐ লাইনের ওপাশে যাওয়া নিষেধ। এটা বিপজ্জ্বনক!” ভয়ে লাইনের এপাশে দাঁড়িয়ে রইলো নয়ন। আমেরিকান সিনেমায় দেখেছে, এভাবে ক্রাইম হয়। কেউ রেল লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো কোন ক্রিমিনাল। এভাবে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা গেলো ভিক্টিম।

কয়েক মিনিট পরেই প্রবল গতিতে ছুটে এসে অনেকটা সহসাই থেমে গেল ট্রেন। একেবারে মাপা মাপা ভাবে পুরো হলের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত দাঁড়ালো মনোরম নীল রঙের একটি অত্যাধুনিক মেট্রোট্রেন। অটোমেটিক খুলে গেলো লম্বা ট্রেনটির সব কয়টি দরওয়াজা। নয়ন লক্ষ্য করলো যে দূর থেকে দেখে একটি মনে হলেও আসলে লম্বা ট্রেনটির অনেকগুলো বগি। প্রতিটি বগিতেই রয়েছে উভয়পার্শ্বে রয়েছে বিশাল বড় বড় জানালা এবং দুইপাশেই মিনিমাম তিন তিন ছয়টি দরওয়াজা। যখন যেই স্টেশনে থামে সেই স্টেশনের প্লাটফর্মের দিকে থাকা সবগুলো দরওয়াজা খুলে যায়। খোলা দরওয়াজা দিয়ে নয়নরা তিনজন প্রবেশ করলো ঐ ট্রেনটিতে। তাদের সাথে প্রবেশ করলো আরো একদল নারী-পুরুষ।

ভিতরে বগির দুইপাশে বসার ব্যবস্থা। গদিতে মোড়ানো দেয়াল ঘেষা বসার আসন। পৃথক পৃথক চেয়ার নয়, লম্বা টানা কমোন সিট। মাঝে মাঝে ভার্টিকাল রড রয়েছে। উপরেও আছে আনুভূমিক রড। যারা সীট পাবেনা, তারা দাঁড়িয়ে যাবে; এবং তাদের যেন উচ্চ গতিশীল ট্রেনে দাঁড়িয়ে যেতে অসুবিধা না হয়, গতি জড়তার কারণে যেন হেলে দুলে পড়ে না যায়, তাই ধরে থাকার জন্য এই রডগুলোর ব্যবস্থা। তাছাড়া বসা থেকে ওঠা, বা দাঁড়ানো থেকে বসার জন্যও এই রডগুলো ভর দিতে হেল্প করে। বগির মাঝখানটা থাকে খালি, চলাচলের জন্য।

নয়ন লক্ষ্য করলো যে, ইয়াং ছেলেমেয়েরা খুব একটা বসছে না সীটে। অধিকাংশ সীটেই বসে আছেন বয়োবৃ্দ্ধরা। পরে নয়ন জেনেছিলো যে, এই দেশে নগরীর ভিতর মেট্রো-বাস-ট্রামের সীটগুলো মূলত বৃদ্ধ, শিশু ও গর্ভবতি নারীদের জন্য। মেট্রো-বাস-ট্রামে প্রবেশের সময়ও তাদেরকে প্রাধান্য দেয়া হয়। তার মানে হলো, এই দেশের আইনে সম-অধিকার নাই, যেটা আছে সেটা হলো সুবিচার। অতি ভদ্র হাফিজ ভাই বসলেন না, দাঁড়িয়ে রইলেন। উনার দেখাদেখি নয়ন ও লিপনও দাঁড়িয়ে রইলো।

ট্রেনের ছাড়ার পর উচ্চগতির কারণে সাঁআআআআআআ জাতীয় এক তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা যেতে থাকলো। এবার নয়ন আশেপাশে তাকালো। নানা বয়সের নারী-পুরুষ রয়েছে এখানে। শিশুদের সংখ্যা কম। হঠাৎ নয়নের চোখ পড়লো, অভুতপূর্ব এক তরুণীর দিকে। ছিপছিপে গড়নের তরুনীটি লম্বায় ছয়ফুটের কাছাকাছি হবে। শ্বেতাঙ্গিনীর মাথার চুল রূপকথার রাজকুমারীর মত সোনালী ও দীঘল। চোখের মণির রঙ পুরোপুরি নীল। আর সকল তরুণীদের মত সেও স্বল্পবসনা। উপরে আটসাঁট খাটো টপস। যা ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে তার যৌবনউদ্বেল অহংকারী স্তনযুগল। কোমর থেকে হাটু পর্যন্ত অংশের অর্ধেকটাই কেবল কাপড়ে ঢাকা নিচের বাকি অংশটুকু পুরোটাই উন্মুক্ত। ঝলমল করছে তার সুদৃশ্য শ্বেতবর্ণ পদযুগল। পরে সে জেনেছে, এই দেশে যে সকল তরুণীদের পদযুগল সৌন্দর্য্যমন্ডিত তারা সবসময়ই খাটো স্কার্ট বা হাফপ্যান্ট পড়ে তাদের সেই মূল্যবান সম্পদ প্রদর্শন করে।

নয়ন কি করবে? লজ্জ্বায় আনত হয়ে দুই লোচন নামিয়ে রাখবে? নাকি, নয়নের নয়ন মেলে আকন্ঠ পান করবে সেই শ্বেতাঙ্গী মহুয়ার সৌন্দর্য্য মদিরা।

কচিফুলে মধুফল আনারের দানাপানি,
দুইখানি আপেলের রূপ-স্বাদ খানদানী!
গাছে পাকা আপেলের সৌষ্ঠব হাসে রে;
আপেলের সৌরভে জিভে জল আসে রে!

জলকণা চিকচিক কপোলে ও চিবুকে,
চন্দনে কম্পনে ছন্দ সে বুকেতে!
জোড়া গিরি খেলে ঢেউ, মাঝখানে গিরিখাত;
সাবধানে নামো ঢালে, নইলে যে কুপোকাত!

ট্রেন হাকে ঝিকঝিক, চলছে তো চলছেই;
গাছে থাকা আপেলেরা দুলছে তো দুলছেই!
কুয়াশারা ঝরে পড়ে শিরীষের বনেতে,
বিজলী তো চমকায় শিহরিত মনেতে।

——————————– রমিত আজাদ

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৪টা ৩৪ মিনিট

Love in Metrorail (4)
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.