মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৫) (Ramit Azad)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৫)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

মাটির নীচে সুড়ঙ্গপথে চলছে মেট্রো। মেট্রোর ভিতরটা বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত। বগির জানালা দিয়ে বাইরে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো নিকষ অন্ধকার। ছোটবেলায় এইচ জি ওয়েলস-এর ‘টাইম মেশিন’ নামক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে পড়েছিলো নয়ন, পাতালপূরীর কথা। আজ সেই পাতালপূরীতেই চলছে নয়ন নিজে। ঐ গল্পে অবশ্য পাতালপূরীকে ভয়ানক হিসাবেই দেখানো হয়েছিলো! আচ্ছা পাতালপূরীকে সব মিথে এত ভয়াবহ করে কেন দেখানো হয়? সর্প থেকে শুরু করে ইদুর পর্যন্ত সব ভয়াল ও অচ্ছুৎ প্রাণীদের বাস পাতাল ও সুরঙ্গে তাই? নয়নের হাসি পেল, একটা কৌতুক মনে করে। প্রশ্ন: ইদুর ও পুরুষের মধ্যে একটা মিল আছে। মিলটা কি? উত্তর: এরা উভয়েই গর্ত ও সুরঙ্গ খোঁজে! নারীর সুড়ঙ্গপথে ভ্রমণসুখ কেমন সে অভিজ্ঞতা এখনো হয় নি নয়নের; তবে আপাতত মেট্রোর সুরঙ্গপথে ভ্রমণ খারাপ লাগছে না। কিন্তু ওর মাথায় হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগলো। আচ্ছা এখন যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে? এই সুরঙ্গপথে যদি থেমে যায় বা লাইনচ্যুত হয় ট্রেন, যদি কোন বিস্ফোরণ হয়? তাহলে কি হবে? খোলা আকাশের নীচে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলে তো বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানালা দরওয়াজা দিয়ে নেমে বাইরে বেরুতে পারবে, হেটে হোক বা অন্য কোন বাহনে হোক নিজ গন্তব্যে ঠিকই যেতে পারবে। কিন্তু এখানে কি হবে? সুরঙ্গপথে হেটে হেটে কতদূর যাওয়া যাবে, আদৌ এই সুরঙ্গপথ থেকে বের হওয়ার কোন বিকল্প পথ কি আছে? রেস্কিউ টীম কোন মেথডে কাজ করবে? যাত্রীদের বের করবে কিভাবে? এখানকার বগিগুলোর জানালা দরজাও তো বন্ধ! উপরন্তু, এই সুরঙ্গপথে এতগুলো মানুষের অক্সিজেন সরবারহ হয় কোন পদ্ধতিতে? মস্কোর মেট্রোতে কি কখনো কোন দুর্ঘটনা ঘটেছিলো? জানতে হবে? তবে এখানে একটা কিন্তু আছে; এই একদলীয় শাসনতন্ত্রের দেশে বাক-স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলে কিছু নেই। তাই বড় কোন দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ না করে চেপে যাওয়া হয়!

অনেকটা সেই সামন্ততন্ত্রের যুগের রাজা-রাণীদের মত মনোভাব। সে যুগের রাজা বা রাণীরা কেবল বন্দনাই পছন্দ করতেন, সমালোচনা তারা একদম সইতে পারতেন না। আর সেই সমালোচনা যদি হতো তাদের শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাহলে তো আর কথাই নেই, সিংহাসনকে নিষ্কন্টক রাখতে, তারা সমালোচকের গর্দান নিতেও দ্বিধা করতেন না!

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সুর্যের আলো এসে ঢুকলো বগিতে। বিজলী বাতির পাশাপাশি উজ্জ্বল দিবালোকে ভরে গেল ট্রেনের প্রতিটি কামরা। কি ব্যাপার? নয়ন বাইরে তাকিয়ে দেখলো অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য! একটি অপ্রসস্ত নদীর উপর দিয়ে যাচ্ছে তাদের পাতাল রেল। নদীর দুই তীরে হাতে গড়া বাগান, প্রকৃতি ও টিপটপ দালানগুলোর শোভা সব মিলিয়ে একটা স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে!

নয়ন: হাফিজ ভাই এটা কি হলো? পাতাল ফুঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো যে ট্রেন?
হাফিজ ভাই: (মৃদু হাসলেন) এটা মস্কো নদী। এর উপর দিয়ে গিয়ে এখন নদী পার হবে ট্রেন তারপর আবার পাতালে ঢুকে যাবে।
নয়ন: তার মানে কি? এই দেশে নদীর নীচ দিয়ে যায় নাই পাতাল রেল? লন্ডনে শুনেছি টেমস নদীর নীচ দিয়ে টিউব রেলওয়ের সুরঙ্গ রয়েছে!
হাফিজ ভাই: এই নগরীতে অজস্র সুরঙ্গ গিয়েছে নদীর নীচ দিয়ে। তবে এই লাইন-টা স্পেশাল। এই এলাকার সৌন্দর্য্য উপভোগ্য করার জন্য কিছুটা পথ মাটির উপর দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জায়গাটাই স্পেশাল! ঐ দেখো।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো নয়ন। বাহ!
হাফিজ ভাই: ওটা মস্কো অলিম্পিক স্টেডিয়াম।
নয়ন: জ্বী, টেলিভিশনে দেখেছিলাম ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক। এই সেই অলিম্পিক স্টেডিয়াম?
হাফিজ ভাই: হ্যাঁ। এই সেই। তবে এরকম আরো কয়েকটা স্টেডিয়াম আছে এই শহরে।
নয়ন বিস্মিত হয়ে দেখতে লাগলো অপরূপ স্থাপত্যের নিদর্শন ও বিশালাকৃতির এই বিশ্বখ্যাত স্টেডিয়ামটি।
নদী পার হয়ে কিছুক্ষণ পর আবারো পাতালে ঢুকে গেলো ট্রেন। সবশেষ যে স্টেশনটায় তারা তিনজন নামলো, সেটা নগরীর কেন্দ্রস্থলে ছিলো।

হাফিজ ভাইয়ের পিছনে পিছনে নয়ন ও লিপন এগিয়ে গেলো। হাফিজ ভাই গিয়ে উঠলেন একটি চলন্ত সিঁড়িতে। নয়ন-রাও উঠলো। এবার নামা নয়, পাতালপূরী ছেড়ে উপরে ওঠা। সিঁড়ির শেষ মাথায় উঠে, তারা নির্বিঘ্নে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। এখানে আর কোন বাধা নেই, কোন চেকিং বা যন্ত্র পেরুনো নেই। ঐ যে মাত্র পাঁচ পয়সা পে করেছিলো, তাতেই সব হয়ে গেলো।

কোন এক এ্যাভিনিউ ধরে হাটতে হাটতে হঠাৎ এক বিশাল প্রান্তরে এসে পৌঁছালো তারা। এ যে সেই রূপকথার, রাজপ্রাসাদ আর তেপান্তরের মাঠ! নয়নরা যেখানে এসে দাঁড়ালো, তা বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান স্থান ‘রেড স্কয়ার’। যেখানে রয়েছে রুশ জারের প্রাসাদ, দুর্গ ও বিশাল প্যারেড স্কোয়ার। স্কোয়ারের একপাশে নানা ডিজাইন ও রঙের গম্বুজ সম্বলিত নয়নাভিরাম একটি প্রাচীন গীর্জা। এই জায়গাটার বর্ণনা দিতে একটা বইয়ের অনেকগুলো পৃষ্ঠা লাগবে! তাছাড়া এই গল্পটি ‘রেড স্কয়ার’ নিয়ে নয়, মেট্রোরেল নিয়ে। তাই আপাতত, ‘রেড স্কয়ার’-এর বর্ণনা উহ্য রাখা হলো।

এখানে এসে নয়ন লক্ষ্য করলো, বিয়ের পোশাকে স্কোয়ারে ঘুরছে বেশ কিছু যুগল। সাদা রঙের বিবাহ পোষাকে দীর্ঘাঙ্গী, শ্বেতাঙ্গী ও তন্বী রূপসীদেরকে লাগছিলো এক একটা ডানাকাটা পরীর মত। আটসাঁট ও শ্বেতবর্ণ পোশাকে তাদের সারা শরীরের ভাজে ভাজে খেলছিলো মেঘনার উথাল-পাথাল ঢেউ। সাথের ছেলেগুলাও লম্বা-চওড়া গড়নের; তবে তাদেরকে কেন যেন হ্যান্ডসাম বা সুপুরুষ বলে মনে হয় না। পশ্চিমা সিনেমায় দেখা ‘জ্যাক লর্ড’ বা ‘রজারমূর’-দের মত নায়কদের তুলনায় এখানকার পুরুষগুলো কি কিছুটা কম স্মার্ট? এমনকি আমাদের পাশের দেশের (বা বরিশালের) মিঠুন-দাও তো কম স্মার্ট নন! পরে অবশ্য নয়ন জানতে ও বুঝতে পেরেছিলো যে এদেশের যৌবন মদে মত্তা স্বল্পবসনপ্রেমী রূপসীদের কাছে পদ্মা-মেঘনা পারের শ্যামাঙ্গ তরুণদের কদর কিছুমাত্র কম নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেশীই!

লোভাতুর চোখে দেখি মনোলোভা শোভাময়;
কায়া ভরা ঢেউ দেখে, ভরে যায় এ হৃদয়।
মেঘনার ঢেউ খেলে সামনে ও পিছনে,
জল তায় ছলকায় কলতানে বিজনে!

রসালো সে নাশপাতি গিরিচূড়া যুগলে,
নেই রস ইতিহাসে, বশ হই ভূগোলে।
ম্যাপ চষে দেখা চাই ভূগোলের যত ভাঁজ,
চিড়ে কত গভীরতা? আছে কোথা গিরিখাঁজ?

নদী যেথা ঝাঁপ দেয় সাগরের মোহনায়,
লোনা পানি তড়পায়, ললিত সে বাসনায়।
সুখে ভরা অনুভূতি, তবু কিছু কান্না;
অস্ফুট স্বরে বলে, আর না, আর না।

——————————– রমিত আজাদ

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৪শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ০৫মিনিট

Love in Metrorail (5)
——————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.