মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৭)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৭)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

মেট্রোতেই পরিচয় হয়েছিলো গুলিত ও তামারার। আফ্রিকার কোপভের্দ-এর ছেলে ‘গুলিত’। তামারা রুশ মেয়ে। মূলত সে ইউক্রেণীয়, তবে আমাদের বিদেশীদের কাছে রুশ, ইউক্রেণীয়, বিলোরুশীয় সবই এক। ওদের পরিচয় পর্ব সম্পর্কে লিখেছিলাম আগে। তা সেদিন তাদের পরিচয় হওয়ার পর, তামারাকে নিয়ে ডরমিটরিতে গিয়েছিলো গুলিত। পরিচয়-এর প্রথম দিনে চা-নাস্তা-স্যাম্পেন ইত্যাদি হলো। তারপর একে অপরকে হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে, পরবর্তি ডেট-এর দিন-তারিখ ঠিক করে নিলো। এটা ইউজুয়ালী হয় উইক এন্ডে। এদেশে সারা সপ্তাহই বেশ খাটুনি যায়। তা সে কর্মক্ষেত্রে হোক কিবা ছাত্রজীবনে হোক। তারপর শনি-রবি দুটা দিন ছুটি। এই ছুটি কাটানোতে ইয়াং জেনারেশনের জন্য সবচাইতে বেশী প্রচলিত ডেটিং, বাংলায় যাকে অভিসার বলে। তবে এই অভিসার ঠিক লেকের ধারে বসে চীনাবাদাম খাওয়ার অভিসার নয়। প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষের অভিসার, empty মিষ্টি মিষ্টি কথায় কি আর আসল চিরা ভেজে? তাই এই দেশে নারী-পুরুষের অভিসার মানেই শরীরবৃত্তিয়। শরীর মানেই তো কাম! স্কুল জীবনে নয়ন পড়েছিলো ষড়রিপুর কথা, কাম, ক্রোধ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য্য। এদের মধ্যে মাৎসর্য্য ও কাম-এর অর্থ বুঝতে পারেনি নয়ন। গেলো বাংলার শিক্ষক সাইফুল ইসলাম স্যারের কাছে। ছোটখাটো কিন্তু বলিষ্ঠ গড়নের স্যারের একটা স্নিগ্ধ ব্যাক্তিত্ব ছিলো। নয়নের প্রশ্ন শুনে তিনি মাৎসর্য্য রিপু-টি খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘কাম’ রিপু-টি না বুঝিয়ে কেমন যেন এড়িয়ে গেলেন। নয়ন ঠিক বুঝলো না ব্যাপারটা। ঘটনাটা একদিন বর্ণনা
করলো দুইবছরের সিনিয়র সাদেক ভাইকে। কথা শুনে তিনি হেসে ফেলে বললেন, “আরে স্যার এই বয়সে তোমাকে ওটা বোঝাতে যাবেন না। সংকোচ হচ্ছে উনার। ‘কাম’ মানে হলো ‘যৌনতা’ সেক্স আরকি। এবার বুঝেছ?” লজ্জ্বা পেয়ে গিয়েছিলো নয়ন। ও আচ্ছা, এই কথা! তা এই দেশে এসে নয়ন দেখলো, এরা রিপু-টিপু নিয়ে অতটা চিন্তিত নয়। পরে বুঝেছিলো যে প্রাচ্যের দর্শন এই আধা-পাশ্চাত্যে খুব একটা পপুলার নয়, দুই-একটি ছাড়া। সে ব্যাপারে আসছি পরে। ষড়রিপুর প্রথম-টি ও তৃতীয়টির সাথে তাদের ব্যাপক সখ্যতা। নারী-পুরুষ বন্ধুত্ব মানেই তো ঐ ‘কাম’ সেটা আবার ব্যাখ্যা করা লাগে নাকি? আর ‘কাম’ এর সাথে ‘মদ’ থাকবে না সেটা আবার হয় নাকি? বিষয়টা সেই পার্শিয়ান পলিম্যাথ ওমার খৈয়ামের রুবাইয়ের মত ‘শরাব ও সাকি’ দুজনে দুজনা।

শরাবের ঘোর লাগে দুজনার দুচোখে,
দুটি দেহ লীন হয়, পালঙ্কে কি সুখে!
মৈথুনে মুগ্ধতা দুজনাকে ছেয়ে যায়,
মন্থনে বন্ধন, কি সোহাগ, কি মায়ায়!

তামারা ও গুলিত তাদের পরিচয়ের দ্বিতীয় দিন বা প্রথম ডেট থেকেই শরীরবৃত্তিয় আনন্দে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো। প্রায় প্রতিটি উইকএন্ড-এই গুলিত ডুবে যেত তামারার চোরাবালিতে। গুলিত আফ্রিকান। গায়ের রং আবলুশ কাঠের চাইতেও কালো। তারপরেও সে দেহের গঠন ও চেহারায় হ্যান্ডসাম পুরুষ ছিলো। গুলিত তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর তামারা ইনস্টিউট শেষ করে কোথাও চাকুরী করছিলো। সেই হিসাবে গুলিতের চাইতে বয়সে কিছু বড়ই হবে। তবে এসব বিষয় এখানে গায়ে মাখে না কেউ। শারীরিক-মানসিক প্রয়োজনটাই বড় কথা! তাছাড়া এখানকার কালচারে পুরুষ মানুষ মানেই জেমড বন্ড হওয়া চাই! কেমন সুপুরুষ যে রূপসীকে স্বল্প-পরিচয়েই বিছানায় টেনে নিতে পারে না? অপদার্থ পুরুষর কদর নেই এদেশের নারী মহলে।

পাশ্চাত্য দর্শন ও প্রাচ্যের দর্শন এক নয়। বেসিক পার্থক্য রয়েছে। আর গভীরে তলিয়ে দেখলে জ্যামিতিক হিসাবে একশত আশি ডিগ্রী এদিক-ওদিক। এই বিষয়ে নয়ন-কে প্রথম হিন্টস দিয়েছিলো তার সাহিত্যের অধ্যাপিকা ‘আলেক্সিয়েভনা’। তিনি বলেছিলেন, “কোন এক রুশ পুরুষ পর্যটক দল গিয়েছিলো জাপানের ফুজিয়ামায়। বাস তাদেরকে মাউন্ট ফুজিয়ামার সামনে রেখে চলে গেলো। ফিরে আসবে ঘন্টা তিনেক পরে। এই দেখে রুশ পুরুষরা ভীষণ মর্মাহত হলো। এ কেমন কথা? তারা তো বিয়ার পান করে তাস খেলতে খেলতে বা হইচই করতেই বেশী অভ্যস্ত। আর জাপানীরা বলে কিনা তিন ঘন্টা ধরে শুধু ঐ পাহাড়ের চূড়ার সৌন্দর্য্য দেখতে হবে? একেই নাকি বলে মুগ্ধতা!

কোন এক প্রদর্শনীতে একদল চিত্রশিল্পীকে উপস্থিত ছবি আঁকতে দেয়া হয়েছিলো। সেখানে প্রাচ্যের শিল্পীরা এঁকেছিলো মূলত বাগান ও প্রকৃতির ছবি। কেউ কেউ নারীর সৌন্দর্য্যের ছবি আঁকলেও তাদেরকে সেখানে শালীন পোশাকে উপস্থাপিত করা হয়েছিলো, নারীর মুখভাবে ছিলো কোথাও দুঃখ, কোথাও সৌম্য। ওদিকে পাশ্চাত্যের শিল্পীদের বেশীরভাগই আঁকলো নারীর ছবি, তাও আবার স্বল্পবসনা অর্ধউলঙ্গ; নারীর দেহবল্লরীতেই রয়েছে আসল সৌন্দর্য্য এটাই তারা মনে করে। আর ছবির নারীদের মুখভঙ্গিতে ছিলো কেবলই যৌন আবেদন। নারীর অনুভূতিতে আবেদন ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না তারা। পাশ্চাত্যের শিল্পীরা যদি বাগিচা বা প্রকৃতির ছবি আঁকেও তারপরেও সেখানে থাকবে স্বল্পবসনা, আবেদনময়ী তরুণী। বাণিজ্য নির্ভর প্রোটেস্টান্ট দেশগুলোর (আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, ইত্যাদি) শিল্পীরা প্রকৃতির বাইরেও আঁকে দামী মডেলের গাড়ী অথবা পানশালার ছবি, তবে সেখানে দেখা যাবেই খোলামেলা পোশাকের সাকীদেরকে।

পাশ্চাত্য দর্শনের গভীর বেসিক পার্থক্য নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। কিছুটা ফুটে উঠেছে উপমহাদেশীয় বৌদ্ধ দার্শনিক ‘নাগসেন’ ও গ্রিক রাজা প্রথম মিনান্ডার (পালি: মিলিন্দ)-এর আলোচনায়। যা লিপিবদ্ধ রয়েছে মিলিন্দপঞ্‌হ (মিলিন্দের প্রশ্ন)) গ্রন্থে। তবে পাশ্চাত্য এখনও থেলিস, ডেমোক্রিটাস, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলের ফিলোসফির দ্বারাই মূলতঃ প্রভাবিত। প্রাচ্যের কোন দর্শনই (বৌদ্ধ, সনাতন খ্রীষ্ট, ইসলাম) তারা পুরোপুরি এ্যাবসর্ব করতে পারেনি।

এতকিছুর পরেও প্রাচ্যের কিছু কিছু দর্শনের প্রতি তাদের ফ্যাসিনেশন রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো কামসূত্র! এই কামসূত্রের নাম জানে না এমন কোন নারী-পুরুষ এই দেশে পাওয়া যাবে না। নয়নের পড়ে কোন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে, জুটির বরটি ছিলো বাংলাদেশী ও কনেটি ছিলো লাটভিয়ার। বিয়ের অনুষ্ঠানে শ্যামাঙ্গ তরুণের পাশে স্বর্ণকেশীনী অস্টাদশীকে দারুণ মানিয়েছিলো। সেই দেশের বিয়ের রীতি অনুযায়ী ভোজ সভায় কিছুক্ষণ পরপর পানপাত্র হাতে টোস্ট দিতে হয়। নববিবাহিত বট-কনের শুভকামনা করে কিছু বলতে হয়। তাই করছিলেন জুটির বন্ধু মহল ও মুরুব্বীরা। একসময় পানপাত্র হাতে উঠে দাঁড়ালেন একজন মুরুব্বী। উনার বয়স অর্ধশতক প্লাস হতে পারে। ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়িমন্ডিত সুঠাম দেহের ভদ্রলোক-কে বেশ ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মনে হচ্ছিলো। তিনি দাঁড়াতেই সবাই চুপ হয়ে গেলেন। রঙিন পানপাত্র হাতে তিনি মুচকী হেসে বললেন, “আমাদের বর কিন্তু উপমহাদেশীয়। আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে ঐ দেশীয় অমর দর্শন হলো ‘কামসূত্র’। আশা করি আমাদের বর ঐ দর্শন ভালো জানেন। সুতরাং সেই সূত্র প্রয়োগ করে তিনি আমাদের কন্যাকে সুখী রাখতে পারবেন।” হাসির রোল পড়ে গেলো হলে। সবাই তাকালো বধুবেশি স্বর্ণকেশিনী কনের দিকে। কনে তখন লাজুক এক্সপ্রেশনে ঝলমল করে হাসছে!

‘কামসূত্র’ হলো প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত ‘মল্লনাগ বাৎস্যায়ন’ রচিত সাহিত্যের একটি প্রামাণ্য মানব যৌনাচার সংক্রান্ত গ্রন্থ। গ্রন্থের একটি অংশের উপজীব্য বিষয় হল যৌনতা সংক্রান্ত ব্যবহারিক উপদেশ। গ্রন্থটিতে গদ্য ও পদ্য দুই-ই সন্নিবেশিত হয়েছে। কাম শব্দের অর্থ যৌন আনন্দ; অপরদিকে সূত্র শব্দের আক্ষরিক অর্থ সুতো বা যা একাধিক বস্তুকে সূত্রবদ্ধ রাখে অথবা আইন, টেকনিক, ইত্যাদি। কামসূত্র শব্দটির অর্থ তাই পুস্তকের আকারে এই যৌন জাতীয় উপদেশমালার গ্রন্থনা। এতে রমণীদের জন্য প্রযোজ্য চৌষট্টি কলা বিবৃত হয়েছে।

নয়ন দেখেছে এখানকার পশ বুকশপগুলো থেকে শুরু করে ফুটপাতের ফোল্ডিং টেবিলেও বিক্রি হয় ‘কামসূত্র’-এর বই। একবার নয়ন আগ্রহ করে কিনেছিলো পাতলা একটা ‘কামসূত্র’-এর বই। তারপর বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলো বইটি। সব জ্ঞানই জ্ঞান। মানুষ যেহেতু ব্যবহারিক প্রয়োজনে একসময় ঐ জ্ঞানটাও কাজে লাগবে। তবে সেখানে দর্শনের বিস্তারিত কিছু ছিলো না। ছিলো কামকলা-র কিছু বর্ণনা ও যৌনতার নানান ভঙ্গিমার সচিত্র বর্ণনা।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো মন্দিরটি কামোদ্দীপক ভাস্কর্যের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানে মন্দিরের দেয়ালেই খচিত ও প্রদর্শিত রয়েছে কামকলা ও ভঙ্গিমার নানান ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য। ইংরেজীতে একে ‘এরোটিক টেম্পল (erotic temple)’ বলে। ভারতের প্রায় সব সমাজে, সাধারণ মানুষ এবং শক্তিশালী শাসক গোষ্ঠির মধ্যে যৌনচর্চার পার্থক্য বিদ্যমান ছিলো। ভোগসর্বস্ব জীবনধারায় ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের এক্ষেত্রে কোনো সাধারণ নৈতিক মনোভাব ছিলো না। আসলে পুরো ভারত জুড়েই বিভিন্ন মন্দিরে রয়েছে এই ওপেন এরোটিক ভাস্কর্য। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো যে এই এরোটিক ভাস্কর্য নির্মাণ ও প্রদর্শন-এ কোন সভ্যতাই বাদ পরে নাই। পম্পেই নগরীতে খনন কার্য শুরু হলে প্রচুর পরিমানে রোমান এরোটিক ভাস্কর্য সেখানে আবিষ্কৃত হয়। নেপলস-এর গোপন যাদুঘরে (Secret Museum, Naples) সেইগুলি রাখা আছে। তাছাড়া প্রাচীন মিশর, গ্রীক, মেসোপটিমিয়া, পেরুর মাচু-পিচু, চীন, জাপান সর্বত্রই পাওয়া গিয়েছে প্রচুর পরিমানে এরোটিক ভাস্কর্য। তার মানে হলো অতি প্রাচীন কাল থেকেই যৌনতা হলো দর্শন ও শিল্পের অন্যতম ইপাদান।

একসময় নয়ন দেখেছিলো বলিউড হিট ‘কামাসুত্রা’ সিনেমাটি। সেখানে জনপ্রিয় নায়িকা রেখা-র ভাটি বয়সের অভিনয় হয়েছিলো দুর্দান্ত। এই ছবিতে ‘কাম’-এর চৌষট্টি কলার কিছু বর্ণনা ছিলো।

(বল্লানা, নামক বাঙালী কবি ৯০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলায় বসবাস করতেন বলে মনে করা হয়, উনার রচিত একটি এরোটিক কবিতা নীচে উপস্থাপিত হলো।

“লজ্জার সাগর”

যেহেতু সে একবার, খুলেছিলো সব আমার, বসনটি পড়নের;
মম দুটি বাহুদ্বয়, না পেরেছে লুকাতে, স্তনদ্বয় এ’ বুকের ।
তার বুকই হয়ে গেলো, মম দেহে আচ্ছাদন সুখের।

হাতখানি যথা তার, স্পর্শিলো নিতম্ব আমার।
লজ্জার সাগরে, ডুবে যাওয়া আমাকে, যে বাঁচাতে পারতো আর।

বাঁচালেন স্বয়ং প্রেমের দেবতা তায়, যিনি আমাদের শেখান কিভাবে মূর্ছা যায়।

রচনাতারিখ: ২৫শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: দুপুর ০১টা ২৯মিনিট

Love in Metrorail (7)
——————- Ramit Azad

আগের পর্বগুলি
https://www.facebook.com/ramit.azad/posts/10225405282975463

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.